- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০
- ১১
- ১২
- ১৩
- ১৪
- ১৫
- ১৬
- ১৭
- ১৮
- ১৯
- ২০
- ২১
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১-৫)শুরু থেকেই আল্লাহ আছেন। আল্লাহর কালাম তাঁর নিজের মধ্যেই ছিলো, এই কালামই হলো আল্লাহর কথা। আল্লাহ্ তাঁর কথা দ্বারাই সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মুখের কথা ছাড়া কিছুই সৃষ্টি হয়নি। আল্লাহর কালাম জীবন্ত এবং তা মানুষের জন্য আলো। আর এই কালাম অন্ধকারে আলো দিচ্ছে আর অন্ধকার তা গ্রহন করেনি।
(৬)আল্লাহ একজন মানুষকে পাঠালেন, তাঁর নাম ছিলো হযরত ইয়াহিয়া আ.। (৭)তিনি আলোর বিষয়ে সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন, যেনো সকলে তার দ্বারা ইমান আনতে পারে। (৮)তিনি নিজে সেই আলো ছিলেন না কিন্তু তিনি সেই আলোর বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন। (৯)প্রত্যেকের ওপর আলো দানকারী সেই সত্য কালাম দুনিয়াতে আসছিলো।
(১০)কালাম দুনিয়াতে ছিলো এবং দুনিয়া তাঁর দ্বারাই হয়েছিলো, তবুও দুনিয়া তাঁকে বুঝলো না। (১১)যা-কিছু তার নিজের, তিনি তার মধ্যেই এলেন কিন্তু তারা তাঁকে গ্রহণ করলো না। (১২)তবে যতোজন তাঁকে গ্রহণ করলো, যারা তাঁর নামের ওপরে ইমান আনলো, তিনি তাদের আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত হওয়ার অধিকার দিলেন। (১৩)এই অধিকার রক্ত থেকে হয়নি, শারীরিক কামনা বা পুরুষের বাসনা থেকেও হয়নি কিন্তু আল্লাহ্ থেকেই হয়েছে।
(১৪)কালাম মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করে আমাদের মধ্যে বাস করলেন এবং আমরা তাঁর মহিমা দেখেছি; কোনো পিতার একমাত্র ছেলের মহিমার মতো, যা রহমতে ও সত্যে পরিপূর্ণ।
(১৫)হযরত ইয়াহিয়া আ. তাঁর বিষয়ে জোর গলায় সাক্ষ্য দিয়ে বললেন, “ইনিই তিনি, যাঁর বিষয়ে আমি বলেছিলাম, ‘যিনি আমার পরে আসছেন, তিনি আমার চেয়ে মহান, কারণ তিনি আমার আগে থেকেই ছিলেন।’”
(১৬)আমরা সবাই তাঁর পূর্ণতা থেকে রহমতের ওপরে রহমত পেয়েছি। (১৭)নিশ্চয়ই হযরত মুসা আ.এর মধ্য দিয়ে শরিয়ত দেয়া হয়েছিলো কিন্তু হযরত ইসা মসিহের মধ্য দিয়ে রহমত ও সত্য এসেছে।
(১৮)আল্লাহকে কেউ কখনো দেখেনি। তাঁর একমাত্র একান্ত প্রিয় মনোনীতজন, যিনি প্রতিপালকের বুকে ছিলেন, তিনিই তাঁকে প্রকাশ করেছেন।
(১৯)যখন জেরুসালেম থেকে ইহুদিরা তাদের ইমামদের ও লেবীয়দের হযরত ইয়াহিয়া আ.র কাছে জানতে পাঠালো, তখন হযরত ইয়াহিয়া আ. তাদের কাছে এই সাক্ষ্যই দিলেন। তারা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কে?” (২০)তিনি স্বীকার করলেন এবং অস্বীকার করলেন না; বরং স্বীকার করলেন যে, “আমি মসিহ নই।”
(২১)তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তবে কে? আপনি কি হযরত ইলিয়াস আ.?” তিনি বললেন, “না, আমি নই।” “আপনি কি সেই নবি?” জবাবে তিনি বললেন, “না।”
(২২)তখন তারা তাকে বললেন, “তাহলে আপনি কে? যারা আমাদের পাঠিয়েছে, ফিরে গিয়ে তাদের তো জবাব দিতে হবে। আপনার নিজের সম্বন্ধে আপনি কী বলেন?” (২৩)তিনি বললেন, হযরত ইসাইয়া নবি যেমন বলেছেন, “আমি একজনের কণ্ঠস্বর, যিনি মরুপ্রান্তরে চিৎকার করে জানাচ্ছেন, “তোমরা মালিকের পথ সোজা করো।”
(২৪)যাদেরকে ফরিসিদের কাছ থেকে পাঠানো হয়েছিলো, (২৫)তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “যদি আপনি মসিহও নন, ইলিয়াসও নন, কিংবা সেই নবিও নন, তাহলে কেনো বায়াত দিচ্ছেন?”
(২৬)হযরত ইয়াহিয়া আ. জবাবে তাদের বললেন, “আমি পানিতে বায়াত দিচ্ছি। আপনাদের মধ্যে একজন আছেন, যাঁকে আপনারা চেনেন না; (২৭)উনিই তিনি, যিনি আমার পরে আসছেন। আমি তাঁর জুতোর ফিতা খোলার যোগ্যও নই।” (২৮)জর্দান নদীর ওপারে, বেথানিয়ায়, যেখানে হযরত ইয়াহিয়া আ. তরিকা দিচ্ছিলেন, সেখানে এসব ঘটেছিলো।
(২৯)পরদিন তিনি হযরত ইসা আ.কে তার নিজের দিকে আসতে দেখে বলেন, “ওই দেখো, আল্লাহর মেষশিশু, যিনি দুনিয়ার গুনাহ দূর করেন। (৩০)ইনিই তিনি, যাঁর বিষয়ে আমি বলেছিলাম- ‘আমার পরে একজন আসছেন, যিনি আমার চেয়ে মহান, কারণ তিনি আমার আগে থেকেই আছেন।’ (৩১)আমি নিজে তাঁকে চিনতাম না কিন্তু তিনি যেনো বনি-ইস্রাইলের কাছে প্রকাশিত হোন, সেজন্য আমি এসে পানিতে বায়াত দিচ্ছি।”
(৩২)হযরত ইয়াহিয়া আ. এই সাক্ষ্য দিলেন, “আমি আল্লাহর রুহকে কবুতরের মতো হয়ে আসমান থেকে নেমে আসতে এবং তাঁর ওপরে বসে থাকতে দেখেছি। (৩৩)আমি নিজে তাঁকে চিনতাম না কিন্তু যিনি আমাকে পানিতে বায়াত দিতে পাঠিয়েছেন, তিনিই আমাকে বলে দিয়েছেন, ‘যাঁর ওপরে আমার রুহকে নেমে এসে থাকতে দেখবে, তিনিই সেই, যিনি আমার রুহে বায়াত দেবেন।’ (৩৪)এবং আমি নিজে তা দেখেছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ইনিই আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন।”
(৩৫)পরদিন হযরত ইয়াহিয়া আ. ও তার দু’জন সাহাবি আবার সেখানে ছিলেন। (৩৬)হযরত ইসা আ.কে হেঁটে যেতে দেখে তিনি বললেন, “ওই দেখো, আল্লাহর মেষশিশু।” (৩৭)সেই সাহাবি দু’জন তার একথা শুনলেন এবং ইসার পেছনে পেছনে যেতে লাগলেন।
(৩৮)হযরত ইসা আ. পেছন ফিরে তাদের আসতে দেখে বললেন, “তোমরা কীসের খোঁজ করছো?” তারা তাঁকে বললেন, “হুজুর, আপনি কোথায় থাকেন?” (৩৯)তিনি তাদের বললেন, “এসো এবং দেখো।” তারা এলেন ও দেখলেন তিনি কোথায় থাকেন এবং সেই দিন তারা তাঁর সাথেই রইলেন। তখন বিকেল প্রায় চারটে।
(৪০)হযরত ইয়াহিয়া আ.র কথা শুনে যে-দু’জন তাঁর পেছনে পেছনে গিয়েছিলেন, তাদের একজন সাফওয়ান পিতরের ভাই আন্দ্রিয়ান।
(৪১)তিনি প্রথমে তার ভাই সাফওয়ানকে খুঁজে বের করলেন এবং বললেন, “আমরা মসিহের দেখা পেয়েছি।” (৪২)তিনি সাফওয়ানকে হযরত ইসা আ.র কাছে আনলেন, আর তখন হযরত ইসা আ. তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি সাফওয়ান ইবনে ইউহোন্না কিন্তু তোমাকে কৈফা অর্থাৎ পিতর বলে ডাকা হবে।”
(৪৩)পরদিন হযরত ইসা আ. গালিলে যাবেন বলে ঠিক করলেন। তিনি ফিলিপকে পেয়ে বললেন, “এসো, আমার অনুসারী হও।” (৪৪)ফিলিপ ছিলেন বেতসাইদার লোক। আন্দ্রিয়ান এবং পিতরও ওই একই গ্রামের লোক ছিলেন। (৪৫)ফিলিপ নথনেলকে খুঁজে বের করে বললেন, তওরাতে হযরত মুসা আ. যাঁর কথা বলে গেছেন এবং যাঁর বিষয়ে নবিরাও লিখেছেন, আমরা তাঁর দেখা পেয়েছি; তিনি নাসরতের ইসা।”
(৪৬)নথলেন ফিলিপকে বললেন, “নাসরত থেকে কি ভালো কোনোকিছু আসতে পারে?” ফিলিপ তাকে বললেন, “এসে দেখো।”
(৪৭)হযরত ইসা আ. নথনেলকে নিজের দিকে আসতে দেখে তার বিষয়ে বললেন, “ওই দেখো, একজন সত্যিকারের ইস্রাইলীয়, যার মনে কোনো ছলনা নেই।” (৪৮)নথলেন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কেমন করে আমাকে চিনলেন?” ইসা উত্তরে বললেন, “ফিলিপ তোমাকে ডাকার আগে ডুমুরগাছের নিচে তোমাকে দেখেছিলাম।” (৪৯)নথনেল বললেন, “হুজুর, আপনিই আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন! আপনিই বনি-ইস্রাইলের বাদশা!”
(৫০)উত্তরে হযরত ইসা আ. বললেন, “‘তোমাকে ডুমুরগাছের নিচে দেখেছিলাম’, বলায় কি তুমি ইমান আনলে? এর চেয়ে আরো মহৎ ব্যাপার তুমি দেখতে পাবে।” (৫১)এবং তিনি তাকে বললেন, “আমি তোমাকে সত্যি সত্যিই বলছি, তুমি বেহেস্ত খোলা দেখবে এবং আল্লাহর ফেরেস্তাদের ইবনুল-ইনসানের ওপরে নামতে এবং উঠতে দেখবে।”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)তৃতীয় দিনে গালিলের কান্না গ্রামে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান ছিলো এবং হযরত ইসা আ.এর মা সেখানে ছিলেন। (২)হযরত ইসা আ. এবং তাঁর সাহাবিদেরও বিয়েতে দাওয়াত করা হয়েছিলো। (৩)আঙুররস শেষ হয়ে গেলে হযরত ইসা আ.এর মা তাঁকে বললেন, “তাদের আঙুররস শেষ হয়ে গেছে।” (৪)এবং হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “মা, এই বিষয়ে তোমার বা আমার কী? আমার সময় এখনো আসেনি।” (৫)তাঁর মা কর্মচারীদের বললেন, “সে তোমাদের যা বলে তা করো।”
(৬)সেখানে ইহুদিদের রীতি অনুসারে পাকসাফ হওয়ার জন্য পাথরের তৈরি ছ’টা পানির মটকা ছিলো। প্রত্যেকটিতে বিশ থেকে তিরিশ গ্যালন পানি ধরতো। (৭)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “মটকাগুলো পানি দিয়ে ভর্তি করো।” এবং তারা তা কানায় কানায় ভর্তি করলো। (৮)তিনি তাদের বললেন, “এখান থেকে কিছু নাও এবং ভোজের প্রধান কর্তার কাছে নিয়ে যাও।” তারা তা-ই করলো।
(৯)ভোজের কর্তা যখন আঙুররসে পরিণত হওয়া ওই পানির স্বাদ নিয়ে দেখলেন, তখন তিনি বরকে ডাকলেন- তিনি জানতেন না যে, তা কোথা থেকে এসেছে। যদিও যে-কর্মচারীরা পানি তুলেছিলো, তারা তা জানতো- (১০)এবং তাকে বললেন, “সবাই ভালো আঙুররস প্রথমে দেয় এবং মেহমানরা যথেষ্ট পান করার পর কিছু খারাপটা দেয়। কিন্তু তুমি এখনো ভালো আঙুররস রেখে দিয়েছো।”
(১১)হযরত ইসা আ. গালিলের কান্না গ্রামে চিহ্ন হিসেবে প্রথম মোজেজা দেখিয়ে তাঁর মহিমা প্রকাশ করলেন এবং তাঁর সাহাবিরা তাঁর ওপর ইমান আনলেন। (১২)অতঃপর তিনি ও তাঁর মা, ভাইয়েরা ও তাঁর সাহাবিরা কফরনাহুমে গেলেন এবং সেখানে কিছুদিন থাকলেন।
(১৩)ইহুদিদের ইদুল-ফেসাখ কাছে এসে পড়ায় হযরত ইসা আ. জেরুসালেমে গেলেন। (১৪)তিনি দেখলেন, লোকেরা বায়তুল-মোকাদ্দসে গরু, ভেড়া ও কবুতর বিক্রি করছে এবং টাকা বদলকারীরা তাদের টেবিলে বসে আছে। (১৫)তিনি রশি দিয়ে একটি চাবুক তৈরি করে গরু ও ভেড়াসহ তাদের সবাইকে বায়তুল-মোকাদ্দস থেকে তাড়িয়ে দিলেন। টাকা বদলকারীদের টাকা-পয়সা ছড়িয়ে ফেললেন এবং তাদের টেবিল উল্টে দিলেন।
(১৬)যারা কবুতর বিক্রি করছিলো, তাদের তিনি বললেন, “এসব জিনিস এখান থেকে নিয়ে যাও! আমার প্রতিপালকের ঘরকে বাজারে পরিণত করো না।” (১৭)তাঁর সাহাবিদের স্মরণ হলো যে, পূর্বের কিতাবে একথা লেখা আছে, “তোমার ঘরের প্রতি আমার ভালোবাসা ও সংগ্রাম আমাকে গিলে ফেলবে।”
(১৮)তখন ইহুদিরা তাঁকে বললো, “তুমি যে এ-কাজ করছো, তার জন্য চিহ্ন হিসেবে আমাদের কী মোজেজা দেখাতে পারো?” (১৯)হযরত ইসা আ. তাদের উত্তর দিলেন, “এই বায়তুল-মোকাদ্দস ভেঙে ফেলো এবং আমি তিন দিনের মধ্যে তা তুলবো।” (২০)তখন ইহুদিরা বললো, “এই বায়তুল-মোকাদ্দস তৈরি করতে ছেচল্লিশ বছর লেগেছে, আর তুমি তা তিন দিনের মধ্যে গড়ে তুলবে?”
(২১)কিন্তু তিনি তাঁর দেহ-ঘরের কথা বলছিলেন। (২২)তাঁর মৃত থেকে জীবিত হয়ে ওঠার পর সাহাবিদের স্মরণ হলো যে, তিনি একথা বলেছিলেন এবং তারা পূর্বের কিতাবের কথার এবং হযরত ইসা আ.এর বলা কথার ওপর ইমান আনলেন।
(২৩)ইদুল-ফেসাখের সময় তিনি যখন জেরুসালেমে ছিলেন, তখন তিনি চিহ্ন হিসেবে যে-মোজেজা দেখিয়েছিলেন তা দেখে অনেকে তাঁর নামের ওপর ইমান আনলো। (২৪)কিন্তু হযরত ইসা আ. নিজেকে তাদের কাছে ছেড়ে দিলেন না, কারণ তিনি ওই লোকদের জানতেন। (২৫)কোনো মানুষের সাক্ষ্য তাঁর দরকার ছিলো না, কারণ তিনি তাদের প্রত্যেকের অন্তরের কথা জানতেন।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)নিকোদিম নামে একজন ফরিসি ছিলেন; তিনি ছিলেন ইহুদিদের একজন নেতা।
(২)তিনি রাতের বেলায় হযরত ইসা আ.র কাছে এলেন এবং বললেন, “হুজুর, আমরা জানি যে, আপনি আল্লাহর কাছ থেকে আগত একজন শিক্ষক। কারণ আপনি চিহ্ন হিসেবে যে সব মোজেজা দেখাচ্ছেন, আল্লাহ সাথে না থাকলে কেউ তা করতে পারে না।”
(৩)হযরত ইসা আ. তাকে উত্তর দিলেন, “আমি তোমাকে সত্যি সত্যিই বলছি, ওপর থেকে জন্ম না হলে কেউই আল্লাহর রাজ্য দেখতে পারে না।” (৪)নিকোদিম তাঁকে বললেন, “মানুষ বৃদ্ধ হলে পর কীভাবে আবার জন্ম নিতে পারে? সে কি দ্বিতীয়বার মায়ের গর্ভে গিয়ে জন্ম নিতে পারে?” (৫)হযরত ইসা আ. উত্তরে বললেন, “আমি তোমাকে সত্যি সত্যিই বলছি, পানি ও রুহ থেকে জন্ম না নিলে কেউই আল্লাহর রাজ্যে ঢুকতে পারবে না। (৬)যা মাংস থেকে জন্মে তা মাংস এবং যা রুহু থেকে জন্মে তা রুহু।
(৭)আমি তোমাকে একথা বলায় আশ্চর্য হয়ো না যে, ‘তোমাকে ওপর থেকে জন্ম নিতে হবে’। (৮)বাতাস যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে যায় এবং তুমি তার শব্দ শুনতে পাও কিন্তু জানো না তা কোথা থেকে আসে এবং কোথায় যায়। তাই যারা রুহ থেকে জন্ম নেয়, তাদেরও অমন হয়।”
(৯)নিকোদিম তাঁকে বললেন, “এটি কীভাবে সম্ভব?” (১০)হযরত ইসা আ. তাকে উত্তর দিলেন, “তুমি বনি-ইস্রাইলের শিক্ষক হয়েও এসব বোঝো না?
(১১)আমি তোমাকে সত্যিই বলছি, আমরা যা জানি, তাই বলি এবং যা দেখেছি, সে-বিষয়ে সাক্ষ্য দেই; তবুও তোমরা আমাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। (১২)আমি যদি তোমাকে দুনিয়ার বিষয়ে বলি আর তুমি বিশ্বাস না করো, (১৩)তাহলে আমি বেহেস্তের বিষয়ে বললে কীভাবে বিশ্বাস করবে? যিনি বেহেস্ত থেকে নেমে এসেছেন, সেই ইবনুল-ইনসান ছাড়া কেউই বেহেস্তে যায়নি। (১৪)এবং যেভাবে মরুপ্রান্তরে হযরত মুসা আ. সাপকে ওপরে তুলেছিলেন, সেভাবে ইবনুল-ইনসানকেও ওপরে তোলা হবে, (১৫)যেনো যে তাঁর ওপর ইমান আনে, সে আল্লাহর সান্নিধ্য পায়।
(১৬)কারণ আল্লাহ দুনিয়াকে এতো মহব্বত করলেন যে, তাঁর একমাত্র একান্ত প্রিয় মনোনীতজনকে দিলেন, যেনো যারা তাঁর ওপর ইমান আনে, তারা ধ্বংস না হয় কিন্তু তাঁর সান্নিধ্য লাভ করে। (১৭)নিশ্চয়ই দুনিয়াকে দোষী করার জন্য আল্লাহ তাঁর একান্ত প্রিয় মনোনীতজনকে পাঠাননি, বরং পাঠিয়েছেন যেনো তাঁর দ্বারা দুনিয়া নাজাত পায়। (১৮)যারা তাঁর ওপর ইমান আনে তাদের দোষী করা হয় না কিন্তু যারা ইমান আনে না তারা দোষী হয়েই গেছে, কারণ তারা আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজনের নামে ইমান আনেনি।
(১৯)এটাই বিচার যে, দুনিয়াতে আলো এসেছে এবং মানুষ আলোর বদলে অন্ধকারকে ভালোবাসলো, কারণ তাদের কাজগুলো খারাপ। (২০)যারা খারাপ কাজ করে, তারা আলো ঘৃণা করে এবং আলোর কাছে আসে না, যেনো তাদের কাজ প্রকাশ না পায়। (২১)কিন্তু যারা যা সত্য তা করে, তারা আলোর কাছে আসে, যেনো পরিষ্কার দেখা যায় যে, তাদের কাজ আল্লাহর পছন্দের কাজ।”
(২২)অতঃপর হযরত ইসা আ. ও তাঁর সাহাবিরা ইহুদিয়ার গ্রামাঞ্চলে গেলেন। তিনি তাদের সাথে সেখানে কিছুদিন থাকলেন এবং তাদের বায়াত দিলেন।
(২৩)হযরত ইয়াহিয়া আ.ও সালিমের কাছে, ঐনোনে, বায়াত দিচ্ছিলেন, কারণ সেখানে বেশি পানি ছিলো। এবং লোকেরা আসতেই থাকলো ও বায়াত নিলো। (২৪)হযরত ইয়াহিয়া আ.কে তখনো জেলে বন্দি করা হয়নি। (২৫)সেখানে হযরত ইয়াহিয়া আ. এর সাহাবি ও এক ইহুদির মধ্যে পাকসাফের বিষয়ে বাদানুবাদ দেখা দিলো। (২৬)তারা হযরত ইয়াহিয়া আ. এর কাছে এসে বললো, “হুজুর, জর্দানের ওপারে যিনি আপনার সাথে ছিলেন, যাঁর বিষয়ে আপনি সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তিনি এখানে বায়াত দিচ্ছেন এবং সবাই তাঁর কাছে যাচ্ছে।”
(২৭)হযরত ইয়াহিয়া আ. উত্তর দিলেন, “বেহেস্ত থেকে দেয়া না হলে কেউ কিছুই পেতে পারে না। (২৮)তোমরা নিজেরাই আমার সাক্ষী যে, আমি বলেছি, ‘আমি মসিহ নই কিন্তু আমাকে তাঁর আগে পাঠানো হয়েছে।’ (২৯)যার কনে আছে সেই তো বর। বরের বন্ধুরা বরের পক্ষে দাঁড়ায় ও তার কথা শোনে। বরের আওয়াজ পেলে তারা ভীষণভাবে আনন্দিত হয়। (৩০)আর এই কারণেই আমার আনন্দ পূর্ণ হয়েছে। তাঁকে বেড়ে উঠতে হবে এবং আমাকে হ্রাস পেতে হবে।”
(৩১)যিনি ওপর থেকে আসেন তিনি সবার ওপরে। যে দুনিয়া থেকে আসে সে দুনিয়ার এবং দুনিয়াদারির বিষয়ে কথা বলে। যিনি বেহেস্ত থেকে আসেন তিনি সবার ওপরে।
(৩২)তিনি যা দেখেছেন ও শুনেছেন, সেই বিষয়েই সাক্ষ্য দেন, তবুও কেউ তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণ করে না। (৩৩)যে তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণ করে, সে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহই সত্য। (৩৪)আল্লাহ যাঁকে পাঠিয়েছেন তিনি আল্লাহর কালাম বলেন, কারণ রুহকে তিনি মেপে দেন না। (৩৫)আল্লাহ তাঁর একান্ত প্রিয় মনোনীতজনকে মহব্বত করেন এবং তিনি সবকিছুই তাঁর হাতে দিয়েছেন। (৩৬)যে কেউ একান্ত প্রিয় মনোনীতজনের ওপর ইমান আনে, সে আল্লাহর সান্নিধ্য পায়; যে কেউ একান্ত প্রিয় মনোনীতজনের অবাধ্য হয়, সে জীবন পাবে না কিন্তু অবশ্যই আল্লাহর লানতের মধ্যে পড়বে।”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)যখন হযরত ইসা আ. বুঝতে পারলেন যে, ফরিসিরা শুনতে পেয়েছেন, “হযরত ইসা আ. হযরত ইয়াহিয়া আ. এর থেকে বেশি উম্মত বানাচ্ছেন ও বায়াত দিচ্ছেন”- (২)যদিও হযরত ইসা আ. নিজে বায়াত দিতেন না কিন্তু তাঁর সাহাবিরা দিতেন- (৩)তখন তিনি ইহুদিয়া ছেড়ে গালিলের দিকে ফিরে গেলেন। (৪)অবশ্য তাঁকে সামেরিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হলো। (৫)সুতরাং তিনি সামেরিয়ার সুখর নামক একটি শহরে এলেন। হযরত ইয়াকুব আ. এর একখন্ড জমি এই শহরের পাশে ছিলো, যা তিনি তার ছেলে হযরত ইউসুফ আ.কে দিয়েছিলেন। (৬)সেখানে হযরত ইয়াকুব আ. এর কুয়ো ছিলো এবং যাবার পথে ক্লান্ত হয়ে ইসা সেই কুয়োর পাশে বসলেন। (৭)তখন বেলা প্রায় দুপুর।
(৮)এক সামেরীয় মহিলা পানি নিতে এলে হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “আমাকে পানি দাও।” সেই সময় তাঁর সাহাবিরা খাবার কিনতে শহরে গিয়েছিলেন। (৯)মহিলা তাঁকে বললো, “আমি তো সামেরীয়, আপনি ইহুদি হয়ে কেমন করে আমার কাছে পানি চাচ্ছেন?” কারণ সামেরীয়দের সাথে ইহুদিদের ওঠাবসা ছিলো না।
(১০)হযরত ইসা আ. তাকে উত্তর দিলেন, “তুমি যদি জানতে আল্লাহর দান সম্বন্ধে এবং কে তোমাকে বলছেন, ‘আমাকে পানি দাও,’ তাহলে তুমিই তাঁর কাছে চাইতে এবং তিনি তোমাকে জীবন-পানি (আবে-হায়াত) দিতেন।” (১১)মহিলা তাঁকে বললো, “জনাব, আপনার কাছে বালতি নেই এবং কুয়োটাও গভীর। কোথা থেকে আপনি জীবন-পানি পাবেন? (১২)আপনি কি আমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইয়াকুব আ. এর চেয়েও মহান? তিনিই আমাদের এই কুয়োটা দিয়েছিলেন আর এখান থেকে তার পশুপালেরা পান করতো এবং তার ছেলেদের সাথে তিনিও পান করতেন?”
(১৩)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “যতোজন এই কুয়ো থেকে পানি পান করবে তাদের আবার পিপাসা পাবে কিন্তু আমি যে-পানি দেবো তা থেকে যারা পান করবে তাদের পিপাসা পাবে না।
(১৪)আমি যে-পানি দেবো তা তার মধ্যে পানির ঝরনা তৈরি করবে এবং তাকে আল্লাহর সান্নিধ্য পাইয়ে দেবে।” (১৫)মহিলা তাঁকে বললো, “জনাব, আমাকে সেই পানি দিন, তাহলে আমার আর পিপাসা পাবে না বা পানি নেবার জন্য আর এখানে আসতে হবে না।”
(১৬)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “যাও, তোমার স্বামীকে ডেকে নিয়ে এসো।” (১৭)মহিলা তাঁকে উত্তর দিলো, “আমার স্বামী নেই।” (১৮)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছো, ‘আমার স্বামী নেই’, কারণ তোমার পাঁচজন স্বামী ছিলো এবং এখন যে তোমার সাথে আছে সে তোমার স্বামী নয়। তুমি যা বলেছো তা সত্য!” (১৯)মহিলা তাঁকে বললো, “জনাব, আমি বুঝতে পারছি যে, আপনি একজন নবি। (২০)আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই পাহাড়ে ইবাদত করতেন কিন্তু আপনারা বলেন যে, যে-জায়গায় মানুষের ইবাদত করা উচিত তা হচ্ছে জেরুসালেম।”
(২১)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “হে নারী, আমাকে বিশ্বাস করো, সময় আসছে যখন তুমি প্রতিপালকের ইবাদত এই পাহাড়েও করবে না, জেরুসালেমেও করবে না। (২২)তোমরা যা জানো না তার ইবাদত করো; কিন্তু আমরা যা জানি তার ইবাদত করি, কারণ নাজাত ইহুদিদের মধ্য থেকেই এসেছে। (২৩)সময় আসছে এবং এখনই এসে গেছে, যখন প্রকৃত ইবাদতকারীরা রুহে ও সত্যে প্রতিপালকের ইবাদত করবে, কারণ এরকম ইবাদতকারীদেরই তিনি খুঁজছেন। (২৪)আল্লাহ হচ্ছেন রুহ এবং যারা তাঁর ইবাদত করবে, তাদের অবশ্যই রুহে ও সত্যে তাঁর ইবাদত করতে হবে।”
(২৫)মহিলা তাঁকে বললো, “আমি জানি যে, মসিহ আসছেন। তিনি যখন আসবেন তখন সবকিছু আমাদের জানাবেন।” (২৬)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “আমিই তিনি, যিনি তোমার সাথে কথা বলছেন।”
(২৭)তখনই তাঁর সাহাবিরা ফিরে এলেন। একজন মহিলার সাথে তাঁকে কথা বলতে দেখে তারা আশ্চর্য হলেন কিন্তু কেউ বললেন না, “আপনি কী চান?” অথবা “কেনো এই মহিলার সাথে কথা বলছেন?” (২৮)তখন মহিলাটি তার পানির কলস রেখে শহরে ফিরে গেলো। সে লোকদের বললো, “এসো এবং একজন লোককে দেখো! (২৯)আমি জীবনে যা-কিছু করেছি তার সবই তিনি আমাকে বলে দিয়েছেন! তিনি কি মসিহ হতে পারেন? তাঁকে কি মসিহ বলে মনে হয় না?” (৩০)তারা শহর থেকে বেরিয়ে তাঁর কাছে ছুটলো।
(৩১)এদিকে সাহাবিরা তাঁকে জোর অনুরোধ করতে লাগলেন, “হুজুর, কিছু খান।” (৩২)কিন্তু তিনি তাদের বললেন, “আমার কাছে এমন খাবার আছে, যার বিষয়ে তোমরা জানো না।” (৩৩)সাহাবিরা একজন আরেকজনকে বলতে লাগলেন, “নিশ্চয়ই কেউ তাঁকে কোনো খাবার দেয়নি?” (৩৪)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁর ইচ্ছা পালন করা ও তাঁর কাজ úূর্ণ করাই হলো আমার খাবার।”
(৩৫)তোমরা কি বলো না যে, ‘ফসল কাটার আর চার মাস বাকি আছে?’ কিন্তু আমি তোমাদের বলছি, তোমাদের চারপাশে তাকাও এবং দেখো যে, ফসল কাটার জন্য ক্ষেত কীভাবে তৈরি হয়ে আছে।
(৩৬)এরই মধ্যে ফসল সংগ্রহকারী মজুরি পাচ্ছে এবং আল্লাহর দিদার লাভের জন্য ফসল সংগ্রহ করছে, যেনো বপনকারী ও সংগ্রহকারী একত্রে আনন্দ পায়। (৩৭)কারণ এক্ষেত্রেই তো এই প্রচলিত কথাটি সত্য বলে প্রমাণিত হয়- ‘একজনে বীজ বোনে আর অন্যজনে কাটে।’ (৩৮)আমি তোমাদেরকে এমন এক ফসল কাটতে পাঠিয়েছি, যার জন্য তোমরা কোনো পরিশ্রম করোনি; পরিশ্রম করেছে অন্যেরা আর তোমরা তার সুফল ভোগ করছো।”
(৩৯)“আমি জীবনে যা-কিছু করেছি তার সবই তিনি আমাকে বলে দিয়েছেন!”- সেই মহিলার এই সাক্ষ্য শুনে সামেরিয়ার অনেক লোক ইমান এনেছিলো। (৪০)সুতরাং সামেরীয়রা যখন তাঁর কাছে এলো, তখন তারা তাঁকে অনুরোধ করলো তাদের সাথে থাকার জন্য; আর তিনি তাদের সাথে দু’দিন থাকলেন। (৪১)ফলে তাঁর কথায় আরো অনেকে ইমান আনলো। (৪২)তারা মহিলাকে বললো, “এখন আর আমরা তোমার কথায় ইমান আনছি না, কারণ এখন আমরা নিজেদের কানে শুনেছি এবং আমরা জানি যে, ইনিই দুনিয়ার আসল নাজাতকারী।”
(৪৩)দু’দিন পার হলে পর তিনি সেখান থেকে গালিলের উদ্দেশে রওনা হলেন। (৪৪)হযরত ইসা আ. নিজেই বলেছিলেন যে, কোনো নবিই নিজের দেশে সম্মান পান না। (৪৫)তিনি গালিলে আসার পর সেখানকার লোকেরা তাঁকে স্বাগত জানালো, কারণ তারা ইদের সময় জেরুসালেমে তাঁর কাজ দেখেছিলো; তারাও ইদে গিয়েছিলো।
(৪৬)অতঃপর তিনি গালিলের কান্না গ্রামে এলেন; এখানেই তিনি পানিকে আঙুররসে পরিণত করেছিলেন। সেখানে একজন রাজকর্মকর্তা ছিলেন, যার ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো কফরনাহুমে। (৪৭)তিনি যখন শুনলেন যে, হযরত ইসা আ. ইহুদিয়া থেকে গালিলে এসেছেন, তখন তিনি গিয়ে কাকুতি-মিনতি করলেন, যেনো তিনি এসে তাঁর ছেলেকে সুস্থ করেন, কারণ সে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলো। (৪৮)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “চিহ্ন এবং মোজেজা না দেখলে তুমি ইমান আনবে না।” (৪৯)কর্মকর্তা তাঁকে বললেন, “জনাব, আমার ছোটো ছেলেটি মারা যাবার আগে আসুন।” (৫০)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “যাও, তোমার ছেলে বাঁচবে।” লোকটি হযরত ইসা আ. এর কথায় বিশ^াস করলেন এবং তার পথে চলে গেলেন।
(৫১)যখন তিনি যাচ্ছিলেন, তখন পথে তার গোলামদের সাথে দেখা হলো এবং তারা তাকে জানালো যে, তার সন্তান জীবিত রয়েছে। (৫২)তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন যে, কখন সে সুস্থ হতে আরম্ভ করেছে। তারা তাকে বললো, “গতকাল দুপুর একটার সময় তার জ্বর ছেড়ে গেছে।”
(৫৩)পিতা বুঝতে পারলেন যে, ঠিক ওই সময়ই হযরত ইসা আ. তাকে বলেছিলেন, “তোমার ছেলে বাঁচবে।” অতএব, তিনি ও তার পরিবারের সবাই ইমান আনলেন। (৫৪)ইহুদিয়া থেকে গালিলে আসার পর হযরত ইসা আ. চিহ্ন হিসেবে এই দ্বিতীয় মোজেজা দেখালেন।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)এরপর ইহুদিদের আরেকটি ইদের সময় হলো এবং হযরত ইসা আ. জেরুসালেমে গেলেন। (২)জেরুসালেমের মেষ-দরজার কাছে একটি পুকুর ছিলো। (৩)হিব্রু ভাষায় এর নাম হলো বেথেসদা। এর পাঁচটি ঘাট ছিলো। সেখানে অনেক অন্ধ, নুলা, খোড়া ও অবশরোগী পড়ে থাকতো। (৫,৬)এমন একজন লোক সেখানে ছিলো, যে আটত্রিশ বছর ধরে অসুস্থ। যখন হযরত ইসা আ. তাকে সেখানে শুয়ে থাকতে দেখলেন এবং জানলেন যে, সে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে আছে, তখন তিনি তাকে বললেন, “তুমি কি সুস্থ হতে চাও?” (৭)অসুস্থ লোকটি তাঁকে উত্তর দিলো, “হুজুর, আমার এমন কেউ নেই যে, পানি কেঁপে উঠলে সে আমাকে পুকুরে নামিয়ে দেবে; আর তাই আমি যেতে না যেতেই অন্য কেউ আমার আগে নেমে পড়ে।” (৮)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “ওঠো, তোমার বিছানা তুলে নিয়ে হাঁটো।” (৯)তখনই লোকটি সুস্থ হলো এবং তার বিছানা তুলে নিয়ে হাঁটতে লাগলো।
(১০)সেই দিনটি ছিলো সাব্বাত। তাই যে-লোকটিকে সুস্থ করা হয়েছিলো, ইহুদিরা তাকে বললো, “আজ সাব্বাত, তোমার বিছানা বয়ে নেয়া শরিয়ত-সম্মত নয়।” (১১)কিন্তু সে তাদের উত্তর দিলো, “যিনি আমাকে সুস্থ করেছেন তিনিই আমাকে বলেছেন, ‘তোমার বিছানা তুলে নিয়ে হাঁটো।’” (১২)তারা তাকে জিজ্ঞেস করলো, “কে সেই লোক যে তোমাকে বলেছে, ‘এটি ওঠাও এবং হাঁটো?’” (১৩)কিন্তু যে সুস্থ হয়েছিলো সে জানতো না তিনি কে, কারণ সেখানে অনেক মানুষের ভিড় থাকায় হযরত ইসা আ. চলে গিয়েছিলেন।
(১৪)পরে হযরত ইসা আ. তাকে বায়তুল-মোকাদ্দসে পেয়ে বললেন, “দেখো, তুমি সুস্থ হয়েছো! আর গুনাহ করো না, যেনো আরো খারাপ কিছু তোমার না হয়।” (১৫)তখন লোকটি চলে গেলো এবং ইহুদিদের কাছে গিয়ে বললো যে, হযরত ইসা আ. তাকে সুস্থ করেছেন।
(১৬)আর তাই ইহুদিরা হযরত ইসা আ.র ওপর চাপ সৃষ্টি করতে লাগলো, কারণ তিনি সাব্বাতে এসব কাজ করছিলেন। (১৭)কিন্তু হযরত ইসা আ. তাদের উত্তর দিলেন, “আমার প্রতিপালক এখনো কাজ করছেন এবং আমিও কাজ করছি।” (১৮)সুতরাং ইহুদিরা তাঁকে মেরে ফেলার জন্য আরো চেষ্টা করতে লাগলো, কারণ তিনি শুধু সাব্বাত ভঙ্গ করছিলেন না কিন্তু আল্লাহকে তিনি নিজের প্রতিপালক বলছিলেন এবং এভাবে নিজেকে আল্লাহর সমান করে তুলছিলেন।
(১৯)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “আমি তোমাদের সত্যি সত্যিই বলছি, একান্ত প্রিয় মনোনীতজন নিজ থেকে কিছুই করতে পারেন না কিন্তু প্রতিপালককে যা করতে দেখেন, প্রতিপালক যা করেন, তা-ই করেন। (২০)প্রতিপালক একান্ত প্রিয় মনোনীতজনকে মহব্বত করেন এবং তিনি যা করেন তা তাঁকে দেখান; এবং এর থেকেও মহৎ কাজ তাঁকে দেখাবেন, যেনো তোমরা অবাক হও।
(২১)প্রতিপালক যেমন মৃতদের ওঠান ও জীবন দেন, তেমনি একান্ত প্রিয় মনোনীতজনও যাকে ইচ্ছা করেন তাকে জীবন দেন। (২২)প্রতিপালক কারো বিচার করেন না কিন্তু সমস্ত বিচারের ভার তাঁর একান্ত প্রিয় মনোনীতজনকে দিয়েছেন, (২৩)যেনো সবাই যেভাবে প্রতিপালককে সম্মান করে, সেভাবে একান্ত প্রিয় মনোনীতজনকেও সম্মান করতে পারে। যে কেউ তাঁকে সম্মান করে না, সে সেই প্রতিপালককেও সম্মান করে না, যিনি তাঁকে পাঠিয়েছেন।
(২৪)আমি তোমাদের সত্যি সত্যিই বলছি, যে কেউ আমার কথা শোনে এবং যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁর ওপর ইমান আনে, তার জন্য রয়েছে বেহেস্তি জীবন এবং সে বিচারের অধীন হয় না, বরং জাহান্নামের আযাব থেকে বেহেস্তে পার হয়ে গেছে। (২৫)আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, সময় আসছে এবং এখনই এসে গেছে, যখন মৃতেরা আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজনের আওয়াজ শুনবে এবং যারা শুনবে তারা বাঁচবে। (২৬)কারণ যেভাবে প্রতিপালকের নিজের মধ্যে জীবন আছে, তেমনি তিনি একান্ত প্রিয় মনোনীতজনকেও নিজের মধ্যে জীবন রাখতে দিয়েছেন। (২৭)তিনি তাঁকে বিচার করার অধিকার দিয়েছেন, কারণ তিনিই ইবনুল-ইনসান। (২৮)এতে আশ্চর্য হয়ো না; কারণ সময় আসছে, যখন যারা কবরে আছে তারা সবাই তাঁর আওয়াজ শুনবে (২৯)এবং উঠে আসবে- যারা ভালো কাজ করেছে তারা উঠবে বেহেস্তে যাবার জন্য আর যারা মন্দ কাজ করেছে তারা উঠবে দোযখে যাবার জন্য।
(৩০)আমি নিজ থেকে কিছু করতে পারি না। আমি যেমন শুনি, তেমনি বিচার করি এবং আমার বিচার ন্যায়; কারণ আমি নিজের ইচ্ছা পূরণ করি না বরং যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁর ইচ্ছাই পূরণ করি। (৩১)যদি আমি নিজের বিষয়ে সাক্ষ্য দেই তাহলে আমার সাক্ষ্য সত্য নয়। (৩২)আরেকজন আছেন, যিনি আমার বিষয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছেন এবং আমি জানি, আমার বিষয়ে তাঁর সাক্ষ্য সত্য।
(৩৩)তোমরা হযরত ইয়াহিয়া আ.র কাছে লোক পাঠিয়েছো এবং তিনি সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন। (৩৪)আমি মানুষের সাক্ষ্য গ্রহণ করি না কিন্তু আমি বলছি, যেনো তোমরা নাজাত পাও। (৩৫)তিনি আলো দানকারী জ্বলন্ত বাতি ছিলেন এবং তোমরা কিছুদিন তার আলোতে আনন্দ করতে ইচ্ছুক ছিলে।
(৩৬)কিন্তু হযরত ইয়াহিয়া আ. থেকেও মহৎ সাক্ষ্য আমার আছে। প্রতিপালক আমাকে যেসব কাজ সম্পূর্ণ করতে পাঠিয়েছেন, আমি সেসব কাজ করছি আর এগুলো আমার পক্ষে এই সাক্ষ্য দেয় যে, প্রতিপালক আমাকে পাঠিয়েছেন।
(৩৭)এবং যে-প্রতিপালক আমাকে পাঠিয়েছেন, তিনি আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তোমরা কখনো তাঁর রব শোনোনি বা তাঁর আকার দেখোনি (৩৮)এবং তাঁর কালাম তোমাদের অন্তরে থাকে না; কারণ তিনি যাঁকে পাঠিয়েছেন, তোমরা তাঁর ওপর ইমান আনোনি।
(৩৯)তোমরা পূর্বের কিতাবে খোঁজ করে থাকো, কারণ তোমরা মনে করো যে, সেখানে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের কথা আছে (৪০)এবং তা আমার বিষয়েই সাক্ষ্য দেয়। তবুও তোমরা জীবন পাবার জন্য আমার কাছে আসতে অস্বীকার করো। (৪১)আমি মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা গ্রহণ করি না। (৪২)আমি জানি যে, তোমাদের অন্তরে আল্লাহর মহব্বত নেই। (৪৩)আমি আমার প্রতিপালকের নামে এসেছি এবং তোমরা আমাকে গ্রহণ করছো না; কিন্তু যদি কেউ নিজের নামে আসে, তাহলে তোমরা তাকে গ্রহণ করবে। (৪৪)তোমরা যখন একে অন্যের কাছ থেকে প্রশংসা নিয়ে থাকো এবং একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকে যে-প্রশংসা আসে তার খোঁজ করো না, তখন তোমরা কীভাবে ইমান আনতে পারো?
(৪৫)মনে করো না যে, প্রতিপালকের কাছে আমি তোমাদের দোষারোপ করবো। হযরত মুসা আ. তোমাদের দোষারোপ করেন, যার ওপরে তোমরা আশা রাখছো। (৪৬)তোমরা যদি মুসার ওপর ইমান আনতে, তাহলে আমার ওপরও ইমান আনতে, কারণ তিনি আমার বিষয়েই লিখেছেন। (৪৭)কিন্তু তার লেখায় যদি তোমরা ইমান না আনো, তাহলে আমার কথায় কীভাবে ইমান আনবে?”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)অতঃপর হযরত ইসা আ. গালিল লেকের ওপারে গেলেন। একে তিবিরিয়া লেকও বলা হয়। (২)বিশাল এক জনতা তাঁর পেছনে পেছনে যাচ্ছিলো, কারণ রোগীদের ওপর তিনি যে-মোজেজা দেখাচ্ছিলেন তা তারা দেখেছিলো। (৩)হযরত ইসা আ. পাহাড়ের ওপরে উঠে তাঁর সাহাবিদের সাথে বসলেন। (৪)তখন ইহুদিদের ইদুল-ফেসাখ কাছে এসে পড়েছিলো। (৫)হযরত ইসা আ. বিশাল এক জনতাকে তাঁর দিকে আসতে দেখে ফিলিপকে বললেন, “এই লোকদের খাওয়ানোর জন্য আমরা কোথা থেকে রুটি কিনবো?” (৬)তাকে পরীক্ষা করার জন্য তিনি একথা বললেন, কারণ তিনি যা করবেন তা তিনি জানতেন।
(৭)হযরত ফিলিপ রা. উত্তর দিলেন, “এদের প্রত্যেককে সামান্য কিছু করে দিলেও একজনের ছয় মাসের আয়েও কুলাবে না।” (৮)তাঁর এক সাহাবি, হযরত সাফওয়ান পিতরের ভাই হযরত অন্দ্রিয়ান রা., (৯)তাঁকে বললেন, “এখানে একটি ছেলে আছে, যার কাছে পাঁচটি রুটি ও দুটো মাছ আছে। কিন্তু এতো মানুষের মধ্যে এতে কী হবে?” (১০)হযরত ইসা আ. বললেন, “লোকদের বসিয়ে দাও।” সেখানে অনেক ঘাস ছিলো, তাই তারা বসে পড়লো; সব মিলে প্রায় পাঁচ হাজার লোক ছিলো।
(১১)তখন হযরত ইসা আ. রুটি নিয়ে আল্লাহকে শুকরিয়া জানালেন এবং যারা বসে ছিলো, তাদেরকে তা দিলেন। একইভাবে মাছও দিলেন। তারা যতো চাইলো ততোই দিলেন।
(১২)তারা সন্তুষ্ট হলে পর তিনি তাঁর হাওয়ারিদেরকে বললেন, “অবশিষ্ট টুকরোগুলো জমা করো, যেনো কিছুই নষ্ট না হয়।” তাই তারা সবকিছু জমা করলেন। (১৩)এবং পাঁচটি রুটি থেকে সব লোকদের খাবার পর যা অবশিষ্ট রইলো তা দিয়ে তারা বারোটি ঝুড়ি ভর্তি করলেন।
(১৪)লোকেরা তাঁর এই মোজেজা দেখে বলতে লাগলো, “যে-নবির দুনিয়াতে আসার কথা ছিলো, ইনি নিশ্চয়ই তিনি।” (১৫)হযরত ইসা আ. যখন বুঝতে পারলেন যে, লোকেরা জোর করে তাঁকে বাদশা বানানোর জন্য আসছে, তখন তিনি সেই জায়গা ছেড়ে আবার পাহাড়ে চলে গেলেন। (১৬)সন্ধ্যায় তাঁর হাওয়ারিরা লেকের পাড়ে গিয়ে নৌকায় উঠলেন এবং লেকের ওপারের কফরনাহুমের দিকে চললেন। (১৭)তখন অন্ধকার হয়ে গেছে এবং হযরত ইসা আ. তখনো তাদের কাছে আসেননি। (১৮)ঝড়ো-হাওয়ার কারণে লেকে বড়ো বড়ো ঢেউ উঠলো।
(১৯)তিন-চার মাইল যাবার পর তারা দেখলেন যে, হযরত ইসা আ. পানির ওপর দিয়ে হেঁটে তাদের দিকে আসছেন এবং তারা খুব ভয় পেলেন। (২০)কিন্তু তিনি তাদের বললেন, “ভয় করো না, এ তো আমি।” (২১)তখন তারা তাঁকে নৌকায় তুলে নিতে চাইলেন আর তারা যেখানে যাচ্ছিলেন, নৌকা তখনই সেখানে পৌঁছে গেলো।
(২২)পরদিন সকাল পর্যন্ত যে-লোকেরা লেকের পাড়ে রয়ে গিয়েছিলো, তারা দেখেছিলো যে, আগের দিন সেখানে মাত্র একটি নৌকা ছিলো। তারা এও দেখেছিলো যে, হযরত ইসা আ. তাঁর হাওয়ারিদের সাথে নৌকায় ওঠেননি কিন্তু তারা তাঁকে ছাড়াই চলে গেছেন।
(২৩)তখন হযরত ইসা আ. যেখানে শুকরিয়া জানিয়ে রুটি খাইয়েছিলেন, সেখানে তিবিরিয়া থেকে কয়েকটি নৌকা এলো। (২৪)যখন তারা দেখলো যে, হযরত ইসা আ. বা তাঁর হাওয়ারিরা কেউই সেই নৌকাগুলোতে আসেননি, (২৫)তখন তারা নিজেরাই নৌকাগুলোতে উঠে তাঁকে খুঁজতে কফরনাহুমের দিকে চলে গেলো। লেকের ওপারে তাঁকে পেয়ে তারা বললো, “হুজুর, আপনি কখন এখানে এসেছেন?”
(২৬)হযরত ইসা আ. তাদের উত্তর দিলেন, “আমি তোমাদের সত্যি সত্যিই বলছি, তোমরা মোজেজা দেখেছো বলে নয়, বরং তোমরা পেট ভরে রুটি খেয়েছো বলে আমার খোঁজ করছো। (২৭)যে-খাবার নষ্ট হয়ে যায় তার জন্য নয় বরং ইবনুল-ইনসান যে-খাবার দেন, যা আল্লাহর সান্নিধ্য পাইয়ে দেয়, তার জন্য কাজ করো। এজন্যই প্রতিপালক আল্লাহ তাঁকে নিযুক্ত ও মূদ্রাঙ্কিত করেছেন।”
(২৮)তখন তারা বললো, “আল্লাহর কাজ করার জন্য আমাদের অবশ্যই কী করতে হবে?” (২৯)হযরত ইসা আ. তাদের উত্তর দিলেন, “আল্লাহ যাঁকে পাঠিয়েছেন, তাঁর ওপর ইমান আনাই হচ্ছে তাঁর কাজ।” (৩০)তাই তারা তাঁকে বললো, “কী মোজেজা আপনি আমাদের দেখাতে যাচ্ছেন, যা দেখে আমরা আপনার ওপর ইমান আনতে পারি? কী কাজ আপনি করছেন? (৩১)আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা মরু ভূমিতে মান্না খেয়েছিলেন। যেমন লেখা আছে, ‘তিনি আসমান থেকে তাদের রুটি খেতে দিয়েছিলেন।’”
(৩২)অতঃপর হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “আমি তোমাদের সত্যি সত্যিই বলছি, হযরত মুসা আ. তোমাদের রুটি দেননি (৩৩)কিন্তু আমার প্রতিপালকই বেহেস্ত থেকে তোমাদের আসল রুটি দেন। কারণ আল্লাহর রুটি হলো তাই, যা বেহেস্ত থেকে নেমে আসে এবং দুনিয়াকে জীবন দেয়।”
(৩৪)তারা তাঁকে বললো, “হুজুর, এই রুটি আমাদের সব সময় দিন।” (৩৫)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “আমিই জীবন-রুটি। যে কেউ আমার কাছে আসে, তার কখনো খিদে পাবে না এবং যে আমার ওপর ইমান আনে, তার কখনো পিপাসা পাবে না। (৩৬)আমি তোমাদের বলছি, আর তোমরা আমাকে দেখছো, তবুও বিশ্বাস করছো না।
(৩৭)প্রতিপালক আমাকে যা-কিছু দেন তা আমার কাছে আসবে (৩৮)এবং যে কেউ আমার কাছে আসবে, আমি তাকে ফেলে দেবো না। কারণ আমার নিজের ইচ্ছা পালন করার জন্য নয়, বরং যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তাঁর ইচ্ছা পালনের জন্যই আমি বেহেস্ত থেকে নেমে এসেছি। (৩৯)এবং যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তাঁর ইচ্ছা হলো এই- তিনি আমাকে যা দিয়েছেন, তার কিছুই যেনো না হারাই কিন্তু কেয়ামতের দিন ওঠাই। (৪০)নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালকের ইচ্ছা এই যে, যতোজন আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজনকে দেখে এবং ইমান আনে, তারা আল্লাহর সান্নিধ্য পাবে এবং কেয়ামতের দিন আমি তাদের ওঠাবো।”
(৪১)তখন ইহুদিরা অভিযোগ করতে লাগলো। কারণ তিনি বলেছিলেন, “আমিই বেহেস্ত থেকে নেমে আসা রুটি।” (৪২)তারা বলছিলো, “এই হযরত ইসা আ. কি হযরত ইউসুফের ছেলে নয়, যার বাবামাকে আমরা চিনি? এখন সে কীভাবে বলছে যে, ‘আমি বেহেস্ত থেকে নেমে এসেছি’?”
(৪৩)হযরত ইসা আ. তাদের উত্তর দিলেন, “নিজেদের মধ্যে বিবাদ করো না। (৪৪)যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, সেই প্রতিপালক কাউকে না ডাকলে কেউ আমার কাছে আসে না; এবং কেয়ামতের দিন আমিই সেই লোককে ওঠাবো।
(৪৫)নবিরা লিখে গেছেন, ‘আল্লাহ তাদের সবাইকে শেখাবেন।’ যতোজন প্রতিপালকের কাছ থেকে শুনেছে ও শিখেছে, তারা আমার কাছে আসবে। আল্লাহর কাছ থেকে যিনি এসেছেন,
(৪৬)তিনি ছাড়া প্রতিপালককে কেউ দেখেনি; তিনিই তাঁকে দেখেছেন। (৪৭)আমি সত্যিই বলছি, যে ইমান আনে সে আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত।
(৪৮)আমিই জীবনের খাবার। (৪৯)তোমাদের পূর্বপুরুষরা মরুভূমিতে মান্না খেয়েছিলেন এবং তারা মারা গেছেন। (৫০)এই সেই খাবার যা বেহেস্ত থেকে নেমে এসেছে, যেনো যে এ-খাবার থেকে খায় সে না মরে। (৫১)আমিই বেহেস্ত থেকে নেমে আসা জীবন-খাবার। যে কেউ এই খাবার থেকে খায়, সে চিরদিন বেঁচে থাকবে এবং দুনিয়ার জীবনের জন্য আমি যে-খাবার দেবো তা হচ্ছে আমার শরীর।”
(৫২)তখন ইহুদিরা নিজেদের মধ্যে এই বলে তর্কাতর্কি করতে লাগলো, “এই লোক কীভাবে আমাদেরকে তার শরীর খেতে দেবে?”
(৫৩)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “আমি তোমাদের সত্যি সত্যিই বলছি, যদি তোমরা ইবনুল-ইনসানের শরীর না খাও ও তাঁর রক্ত পান না করো, তাহলে তোমাদের জীবন নেই।
(৫৪)যারা আমার শরীর খাবে ও আমার রক্ত পান করবে, তারা আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত এবং কেয়ামতের দিন আমি তাদের ওঠাবো। (৫৫)কারণ আমার শরীরই আসল খাবার এবং আমার রক্ত আসল পানীয়। (৫৬)যারা আমার শরীর খায় ও আমার রক্ত পান করে, তারা আমার সাথে যুক্ত হয় এবং আমি তাদের সাথে যুক্ত হই। (৫৭)যেভাবে প্রতিপালক আমাকে পাঠিয়েছেন এবং আমি তাঁর কারণে বেঁচে থাকি, তেমনিভাবে যারা আমাকে খায়, তারা আমার কারণে বেঁচে থাকে। (৫৮)এই খাবারই বেহেস্ত থেকে এসেছে। তোমাদের পূর্বপুরুষেরা যা খেয়েছেন ও মারা গেছেন, এটি তার মতো নয়। কিন্তু এই খাবার যে খায়, সে চিরদিন বেঁচে থাকবে।”
(৫৯)কফরনাহুমের সিনাগোগে শিক্ষা দেবার সময় তিনি এসব বলছিলেন। (৬০)তাঁর অনেক সাহাবি এসব শুনে বললেন, “এ-শিক্ষা খুবই কঠিন, কে তা গ্রহণ করতে পারে?” (৬১)কিন্তু হযরত ইসা আ. যখন বুঝলেন যে, তাঁর সাহাবিরা এ-বিষয়ে অভিযোগ করছেন, তখন তিনি তাদের বললেন, “এই শিক্ষা কি তোমাদের কষ্ট দিচ্ছে? (৬২)তাহলে ইবনুল-ইনসান আগে যেখানে ছিলেন, তাঁকে সেখানে যেতে দেখলে কী বলবে? রুহই জীবন দেয়, শরীর কিছু নয়। (৬৩)যে-কালাম তোমাদের কাছে বলা হয়েছে তা-ই রুহ ও জীবন। (৬৪)কিন্তু তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছে, যারা ইমান আনবে না।” কারণ হযরত ইসা আ. প্রথম থেকেই জানতেন যে, কে তাঁর ওপর ইমান আনবে না এবং কে তাঁর সাথে বেইমানি করবে। (৬৫)তিনি বললেন, “এজন্য আমি তোমাদের বলছি যে, আল্লাহ না চাইলে কেউই আমার কাছে আসতে পারে না।” (৬৬)এর ফলে তাঁর অনেক উম্মত তাঁকে ছেড়ে চলে গেলো এবং তাঁর পেছনে আর এলো না।
(৬৭)তাই হযরত ইসা আ. বারোজনকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরাও কি চলে যেতে চাও?”
(৬৮)হযরত সাফওয়ান পিতর রা. উত্তর দিলেন, “হুজুর, আমরা কার কাছে যাবো? আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার কালাম তো আপনার কাছেই আছে। (৬৯)আমরা জেনেছি এবং ইমান এনেছি যে, আপনিই আল্লাহর পবিত্রজন।” (৭০)হযরত ইসা আ. তাদের উত্তর দিলেন, “আমি কি তোমাদের বারোজনকে বেছে নেইনি? তবুও তোমাদের মধ্যে একজন ইবলিস আছে।” (৭১)ইহুদা ইবনে সিমোন ইস্কারিয়োতের বিষয়ে তিনি একথা বলছিলেন। যদিও তিনি বারোজনের একজন ছিলেন, তবুও তিনি তাঁর সাথে বেইমানি করেছিলেন।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)এরপর হযরত ইসা আ. গালিলে চলাফেরা করছিলেন। তিনি ইহুদিয়ায় যেতে চাইলেন না, কারণ ইহুদিরা তাঁকে হত্যা করার সুযোগ খুঁজছিলো। (২)এই সময় ইহুদিদের ইদুল-খিয়াম বা (ইদুল খেমেশশীম) কাছে এসে পড়েছিলো। (৩)তাই তাঁর ভাইয়েরা তাঁকে বললেন, “ইহুদিয়াতে যাও, যেনো তুমি যেসব কাজ করছো তা তোমার উম্মতরাও দেখতে পায়।
(৪)যদি কেউ চায় মানুষ তার সম্বন্ধে জানুক, তাহলে সে গোপনে কাজ করে না। যদি তুমি এসব করো, তাহলে দুনিয়ার সামনে নিজেকে দেখাও।”
(৫)কারণ তাঁর ভাইয়েরাও তাঁর ওপর ইমান আনেননি। (৬)হযরত ইসা আ. তাঁদের বললেন, “আমার সময় এখনো আসেনি কিন্তু তোমাদের সময় তো সব সময়ই। (৭)দুনিয়া তোমাদের ঘৃণা করতে পারে না কিন্তু আমাকে ঘৃণা করে, কারণ আমি তার খারাপ কাজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেই। (৮)তোমরাই ইদে যাও, আমি এই ইদে যাচ্ছি না, কারণ আমার সময় এখনো পূর্ণ হয়নি।” (৯)একথা বলে তিনি গালিলেই থেকে গেলেন। (১০)কিন্তু তাঁর ভাইয়েরা ইদে চলে যাবার পর তিনিও গেলেন; প্রকাশ্যে নয় কিন্তু গোপনে গেলেন। (১১)ইদের সময় ইহুদিরা তাঁর খোঁজ করছিলো এবং বলছিলো, “তিনি কোথায়?”
(১২)জনতার মধ্যে তাঁর সম্পর্কে অনেক মতবিরোধ ছিলো। কেউ কেউ বলছিলো যে, “তিনি একজন ভালো মানুষ,” অন্যরা বলছিলো, “না, তিনি জনতাকে ঠকাচ্ছেন।” (১৩)তবুও ইহুদিদের ভয়ে কেউই খোলাখুলিভাবে কথা বলার সাহস করছিলো না। (১৪)ইদের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বায়তুল-মোকাদ্দসে গেলেন এবং শিক্ষা দিতে লাগলেন। (১৫)এতে ইহুদিরা খুবই অবাক হয়ে বললো, “এই লোক এসব কীভাবে শিখলো, তাকে তো কখনো কেউ শেখায়নি?
(১৬)তখন হযরত ইসা আ. তাদের উত্তর দিলেন, “আমি যে-শিক্ষা দেই তা আমার নয়, বরং যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁরই। (১৭)যে কেউ আল্লাহর ইচ্ছা পালন করতে চায় সে জানবে যে, এই শিক্ষা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে নাকি আমি নিজ থেকে বলছি।
(১৮)যারা নিজের থেকে কথা বলে, তারা নিজের প্রশংসা চায়; কিন্তু সেই ব্যক্তিই সত্য, যিনি তার প্রেরণকারীর প্রশংসা চান এবং তার মধ্যে কোনো মিথ্যা নেই।
(১৯)হযরত মুসা আ. কি তোমাদের শরিয়ত দেননি? কিন্তু তোমরা শরিয়ত পালন করো না। কেনো তোমরা আমাকে হত্যা করার সুযোগ খুঁজছো?”
(২০)জনতা উত্তর দিলো, “তোমার মধ্যে একটি ভূত আছে! কে তোমাকে হত্যা করতে চেষ্টা করছে?” (২১)হযরত ইসা আ. তাদের উত্তর দিলেন, “আমি একটি কাজ করেছি আর তোমরা সবাই আশ্চর্য হচ্ছো। (২২)হযরত মুসা আ. তোমাদের খতনা দিয়েছেন- অবশ্য তা হযরত মুসা আ.-র কাছ থেকে নয় কিন্তু পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহিম আ.-র কাছ থেকে- এবং তোমরা সাব্বাতে লোকের খতনা করে থাকো। (২৩)হযরত মুসা আ.-র শরিয়ত যাতে ভঙ্গ না হয়, এজন্য মানুষ যদি সাব্বাতে খতনা করায়, তাহলে আমি একজনের সমস্ত শরীর সুস্থ করেছি বলেই কি তোমরা আমার ওপর রাগ করেছো? (২৪)মুখ দেখে বিচার করো না, বরং ন্যায়বিচার করো।”
(২৫)জেরুসালেমের কিছু লোক বলছিলো, “এই লোককেই কি তারা হত্যা করতে চেষ্টা করছে না? (২৬)তিনি এখানে খোলাখুলিভাবে কথা বলছেন কিন্তু তারা তাঁকে কিছু বলছে না! তাহলে ক্ষমতাশালীরা কি আসলেই জানেন যে, ইনিই মসিহ? (২৭)আমরা জানি তিনি কোথা থেকে এসেছেন; কিন্তু যখন মসিহ আসবেন, তখন কেউ জানবে না তিনি কোথা থেকে এলেন।”
(২৮)তখন হযরত ইসা আ. বায়তুল-মোকাদ্দসে শিক্ষা দিচ্ছিলেন এবং চিৎকার করে বললেন, “তোমরা আমাকে চেনো এবং আমি কোথা থেকে এসেছি তাও জানো। আমি নিজের ইচ্ছায় আসিনি। কিন্তু যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তিনি সত্য এবং তোমরা তাঁকে জানো না। (২৯)আমি তাঁকে জানি, কারণ আমি তাঁর কাছ থেকে এসেছি এবং তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন।” (৩০)তখন তারা তাঁকে ধরতে চাইলো কিন্তু কেউ তাঁর গায়ে হাত দিলো না, কারণ তখনো তাঁর সময় আসেনি। (৩১)তবুও জনতার মধ্যে অনেকেই তাঁর ওপর ইমান আনলো এবং বলতে লাগলো, “ইনি চিহ্ন হিসেবে যতো মোজেজা দেখিয়েছেন, মসিহ এলে কি তার থেকে বেশি করবেন?” (৩২)জনতা তাঁর বিষয়ে যা যা বলছিলো, ফরিসিরা তা শুনলেন। প্রধান ইমামেরা ও ফরিসিরা তাঁকে ধরে আনার জন্য বায়তুল-মোকাদ্দসের পুলিশ পাঠালেন।
(৩৩)তখন হযরত ইসা আ. বললেন, “আমি আর অল্প কিছুদিন তোমাদের সাথে থাকবো। অতঃপর যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তাঁর কাছে চলে যাবো। (৩৪)তোমরা আমার খোঁজ করবে কিন্তু পাবে না; এবং আমি যেখানে, তোমরা সেখানে আসতে পারো না।” (৩৫)ইহুদিরা একে অন্যকে বললো, “এই লোক কোথায় যাবে যে, আমরা তাকে খুঁজে পাবো না? সে কি গ্রিকদের কাছে চলে যেতে চাচ্ছে এবং তাদেরকে শিক্ষা দেবে? (৩৬)‘তোমরা আমার খোঁজ করবে কিন্তু পাবে না;’ এবং ‘আমি যেখানে, তোমরা সেখানে আসতে পারো না’ বলে সে কী বোঝাতে চায়?”
(৩৭)ইদের শেষ দিন হচ্ছে প্রধান দিন। হযরত ইসা আ. সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি চিৎকার করে বললেন, “যে কেউ পিপাসিত, আমার কাছে এসো। (৩৮)এবং যে আমার ওপর ইমান এনেছে সে পান করুক। পূর্বের কিতাবে যেমন লেখা আছে, ‘ইমানদারদের অন্তর থেকে জীবন-পানির নদী বইবে।’”
(৩৯)আল্লাহর রুহ সম্পর্কে তিনি একথা বলেছিলেন, যারা তাঁর ওপরে ইমান আনবে, তারা তাঁকে গ্রহণ করবে; হযরত ইসা আ. তখনো মহিমা পাননি বলে আল্লাহ-রুহও আসেননি। (৪০)একথা শুনে ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ কেউ বললো, “নিশ্চয়ই ইনি সেই নবি।” (৪১)অন্যরা বললো, “ইনিই মসিহ।” (৪২)আবার কেউ কেউ বললো, “নিশ্চয়ই মসিহ গালিল থেকে আসবেন না, তাই না? পূর্বের কিতাব কি একথা বলেনি যে, মসিহ হবেন হযরত দাউদের বংশধর এবং হযরত দাউদ আ. বৈতলেহেমের যে-শহরে থাকতেন, সেখান থেকে আসবেন?” (৪৩)তাই তাঁকে নিয়ে জনতার মধ্যে বিভেদ দেখা দিলো। (৪৪)তাদের কয়েকজন তাঁকে বন্দি করতে চাইলো কিন্তু কেউই তাঁর গায়ে হাত দিলো না।
(৪৫)তখন বায়তুল-মোকাদ্দসের পুলিশরা প্রধান ইমামদের ও ফরিসিদের কাছে ফিরে গেলো। তারা তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “কেনো তোমরা তাকে ধরে আনোনি?” (৪৬)পুলিশরা উত্তর দিলো, “এর আগে কেউ কখনো এরকম কথা বলেনি!” (৪৭)তখন ফরিসিরা বললেন, “নিশ্চয়ই তোমরা তার ধোঁকায় পড়ে যাওনি, পড়েছো কি? (৪৮)নেতাদের বা ফরিসিদের মধ্যে কেউ কি তার ওপর ইমান এনেছেন? (৪৯)কিন্তু এই জনতা, যারা শরিয়ত জানে না, লানতপ্রাপ্ত।”
(৫০)যে-নিকদিম আগে একবার হযরত ইসা আ.র কাছে গিয়েছিলেন, তিনিও তাদের মধ্যে ছিলেন। (৫১)তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আমাদের শরিয়ত প্রথমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কারো বিচার করে না, করে কি?”
(৫২)তারা উত্তর দিলেন, “নিশ্চয়ই তুমিও গালিলের লোক নও? খোঁজ করে দেখো, গালিল থেকে কোনো নবি আসার কথা নয়।”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)অতঃপর তারা প্রত্যেকে বাড়ি চলে গেলেন। এদিকে হযরত ইসা আ.ও জৈতুন পাহাড়ে চলে গেলেন। (২)এবং খুব ভোরে উঠে তিনি আবার বায়তুল-মোকাদ্দসে এলেন। সমস্ত লোক তাঁর কাছে এলো এবং তিনি বসলেন (৩)ও তাদের শিক্ষা দিতে লাগলেন। (৪)ফরিসিরা ও আলিমরা এক মহিলাকে ধরে আনলেন, যাকে তারা জিনা করার সময় হাতেনাতে ধরেছিলেন এবং তাকে সবার সামনে দাঁড় করালেন। তারা তাঁকে বললেন, “হুজুর, এই মহিলাকে আমরা জিনা করার সময় হাতেনাতে ধরেছি। (৫)হযরত মুসা আ. এর শরিয়ত এমন মহিলাদের পাথর মারার হুকুম দেয়। এখন আপনি কী বলেন?”
(৬)তারা তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য একথা বললেন, যেনো তাঁকে দোষ দিতে পারেন। হযরত ইসা আ. নিচু হয়ে তাঁর আঙুল দিয়ে মাটিতে লিখতে লাগলেন। (৭)যখন তারা তাঁকে প্রশ্ন করতেই থাকলেন, তখন তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাদের বললেন, “তোমাদের মধ্যে যার কোনো গুনাহ নেই, সে-ই প্রথমে তাকে পাথর মারো।” (৮)অতঃপর আবার তিনি নিচু হয়ে মাটিতে লিখতে লাগলেন।
(৯)একথা শুনে একজন একজন করে সবাই সেখান থেকে চলে গেলেন। প্রথমেই বুজুর্গরা গেলেন। এবং হযরত ইসা আ. এর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলার সাথে তিনি একা রইলেন। (১০)হযরত ইসা আ. উঠে দাঁড়ালেন এবং তাকে বললেন, “হে মহিলা, ওরা সবাই কোথায়? কেউ কি তোমাকে দোষী করেনি?” (১১)সে বললো, “কেউ না, হুজুর।” হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “আমিও করি না। চলে যাও এবং এখন থেকে আর গুনাহ করো না।”
(১২)আবার হযরত ইসা আ. তাদের কাছে কথা বললেন, “আমিই দুনিয়ার আলো। যে আমার পেছনে আসবে, সে কখনো অন্ধকারে হাঁটবে না কিন্তু জীবনের আলো পাবে।” (১৩)অতঃপর ফরিসিরা তাঁকে বললেন, “তুমি তোমার নিজের বিষয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছো, তোমার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।” (১৪)হযরত ইসা আ. বললেন, “যদিও আমি নিজের বিষয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছি, তবুও আমার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। কারণ আমি জানি আমি কোথা থেকে এসেছি এবং কোথায় যাচ্ছি কিন্তু তোমরা জানো না আমি কোথা থেকে এসেছি এবং কোথায় যাচ্ছি।
(১৫)তোমরা মানুষের মতো বিচার করে থাকো। কিন্তু আমি কারো বিচার করি না। (১৬)আর আমি যদি বিচার করি, তাহলে আমার বিচার সত্য। কারণ আমি একা বিচার করি না কিন্তু আমি এবং আমার প্রতিপালক, যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, আমরাই বিচার করি।
(১৭)তোমাদের শরিয়তে লেখা আছে যে, দু’জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। (১৮)আমি আমার নিজের বিষয়ে সাক্ষ্য দেই এবং আমার প্রতিপালক, যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তিনিও আমার বিষয়ে সাক্ষ্য দেন।”
(১৯)অতঃপর তারা তাঁকে বললেন, “কোথায় তোমার প্রতিপালক?” হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “তোমরা আমাকে জানো না এবং আমার প্রতিপালককেও জানো না। যদি তোমরা আমাকে জানতে, তাহলে আমার প্রতিপালককেও জানতে।” (২০)বায়তুল-মোকাদ্দসের কোষাগারের সামনে শিক্ষা দেবার সময় তিনি এসব কথা বললেন কিন্তু কেউ তাঁকে ধরলো না, কারণ তাঁর সময় তখনো আসেনি।
(২১)আবার তিনি তাদের বললেন, “আমি চলে যাচ্ছি আর তোমরা আমার খোঁজ করবে এবং তোমরা তোমাদের গুনাহেই মরবে। আমি যেখানে যাচ্ছি, তোমরা সেখানে আসতে পারো না।” (২২)তখন ইহুদিরা বললো, “‘আমি যেখানে যাচ্ছি, তোমরা সেখানে আসতে পারো না’ বলে কি সে একথাই বোঝাতে চাচ্ছে যে, সে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে?”
(২৩)তিনি তাদের বললেন, “তোমরা নিচ থেকে এসেছো, আমি উপর থেকে এসেছি। তোমরা এই দুনিয়ার, আমি এই দুনিয়ার নই। (২৪)আমি তোমাদের বলেছি যে, ‘তোমরা তোমাদের গুনাহেই মরবে’- কারণ আমিই তিনি, একথার ওপর ইমান না আনলে তোমরা তোমাদের গুনাহেই মরবে।” (২৫)তারা তাঁকে বললো, “তুমি কে?” হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “আমি তোমাদের সাথে কেনোই-বা এসব কথা বলছি? (২৬)তোমাদের দোষ দেবার ও তোমাদের বিষয়ে বলার আমার অনেককিছু আছে; কিন্তু আমাকে যিনি পাঠিয়েছেন তিনি সত্য এবং আমি তাঁর কাছে যা শুনেছি তা দুনিয়ার কাছে প্রকাশ করছি।”
(২৭)তারা বুঝলো না যে, তিনি প্রতিপালকের বিষয়ে তাদের কাছে কথা বলছেন। (২৮)তাই হযরত ইসা আ. বললেন, “তোমরা যখন ইবনুল-ইনসানকে ওপরে তুলবে, তখন বুঝবে যে, আমিই তিনি; এবং আমি নিজ থেকে কিছুই করি না কিন্তু প্রতিপালক যেভাবে আমাকে হুকুম দিয়েছেন, আমি সেভাবেই কথা বলি। (২৯)যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন তিনি আমার সাথে আছেন। তিনি আমাকে একা রেখে চলে যাননি, কারণ যা তাঁকে সন্তুষ্ট করে, আমি সব সময় তাই করি।”
(৩০)তিনি যখন এসব কথা বলছিলেন, তখন অনেকেই তাঁর ওপর ইমান আনলো। (৩১)অতঃপর যে ইহুদিরা তাঁর ওপর ইমান এনেছিলো, তিনি তাদের বললেন, “যদি তোমরা আমার কথামতো চলো, তাহলে সত্যিই তোমরা আমার সাহাবি। (৩২)তোমরা সত্য জানবে এবং সেই সত্য তোমাদের মুক্ত করবে।” (৩৩)তারা তাঁকে উত্তর দিলো, “আমরা হযরত ইব্রাহিম আ.র বংশধর এবং কখনো কারো গোলাম ছিলাম না। ‘তোমাদের মুক্ত করা হবে’ বলে তুমি কী বোঝাতে চাও?”
(৩৪)হযরত ইসা আ. তাদের উত্তর দিলেন, “আমি তোমাদের সত্যি সত্যিই বলছি, যে গুনাহ করে সে গুনাহর গোলাম। (৩৫)পরিবারের মধ্যে গোলামের স্থান স্থায়ী নয় কিন্তু সন্তানের স্থান চিরদিনের।
(৩৬)তাই একান্ত প্রিয় মনোনীতজন যদি তোমাদের মুক্ত করেন, তাহলে তোমরা নিশ্চয়ই মুক্ত হবে। (৩৭)আমি জানি তোমরা হযরত ইব্রাহিম আ.র বংশধর, তবুও তোমরা আমাকে হত্যা করার সুযোগ খুঁজে থাকো; কারণ তোমাদের হৃদয়ে আমার কথার কোনো স্থান নেই। (৩৮)আমি আমার প্রতিপালকের কাছে যা দেখেছি, আমি তাই বলি; কিন্তু তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে যা শোনো তাই করো।”
(৩৯)তারা তাঁকে উত্তর দিলো, “হযরত ইব্রাহিম আ. আমাদের পিতা।” হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “যদি তোমরা হযরত ইব্রাহিমের সন্তান হতে, তাহলে হযরত ইব্রাহিম আ. যা করেছিলেন, তোমরাও তা করতে। (৪০)কিন্তু এখন তোমরা আমাকেই হত্যা করতে চেষ্টা করছো, যে-আমি আল্লাহর কাছ থেকে যে-সত্য শুনেছি তা-ই তোমাদের বলেছি। হযরত ইব্রাহিম আ. তোমাদের মতো এরকম করতেন না।
(৪১)তোমাদের পিতা যা করে, তোমরা তা-ই করছো।” তারা তাঁকে বললো, “আমরা জারজ নই। আমাদের একজন প্রতিপালক আছেন, তিনি আল্লাহ।” (৪২)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “যদি আল্লাহ তোমাদের প্রতিপালক হতেন, তাহলে তোমরা আমাকে মহব্বত করতে। কারণ আমি আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি এবং এখন এখানে আছি। আমি নিজ থেকে আসিনি কিন্তু তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন। (৪৩)আমি যা বলি তা তোমরা কেনো বোঝো না? কারণ তোমরা আমার কথা গ্রহণ করতে পারো না।
(৪৪)ইবলিসই তোমাদের প্রতিপালক এবং তোমরা তারই; তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইচ্ছা পালন করতে চাও। সে প্রথম থেকেই খুনি। সে সত্যে থাকে না এবং সত্য তার মধ্যে নেই। সে তার চরিত্র অনুসারেই মিথ্যা বলে। কারণ সে মিথ্যাবাদী এবং মিথ্যার জন্মদাতা। (৪৫)আমি সত্য বলি বলেই তোমরা আমার ওপর ইমান আনো না। (৪৬)তোমাদের মধ্যে কে আমাকে গুনাহগার বলে দোষ দিতে পারে? যদি আমি সত্য বলি, তাহলে আমার ওপর ইমান আনো না কেনো? (৪৭)যারা আল্লাহর তারা আল্লাহর কালাম শোনে। তোমরা তা শোনো না, কারণ তোমরা আল্লাহর নও।”
(৪৮)ইহুদিরা তাঁকে উত্তর দিলো, “আমাদের একথা কি ঠিক নয় যে, তুমি একজন সামেরীয় এবং তোমাকে ভূতে ধরেছে?” (৪৯) হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “আমাকে ভূতে ধরেনি। আমি আমার প্রতিপালককে সম্মান করি কিন্তু তোমরা আমাকে অসম্মান করো। (৫০)তবুও আমি আমার নিজের প্রশংসা চাই না। একজন আছেন, তিনি তা চান এবং তিনিই বিচারক। (৫১)আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, যে আমার কথা মানে, সে কখনো মরবে না।”
(৫২)ইহুদিরা তাঁকে বললো, “এখন আমরা বুঝতে পারছি যে, তোমাকে ভূতে ধরেছে। হযরত ইব্রাহিম আ. ইন্তেকাল করেছেন এবং নবিরাও; আর তুমি বলছো, ‘যে আমার কথা মানে, সে কখনো মরবে না।’ (৫৩)আমাদের পিতা হযরত ইব্রাহিম আ., যিনি ইন্তেকাল করেছেন, তুমি কি তাঁর থেকেও মহান? নবিরাও ইন্তেকাল করেছেন। তুমি নিজেকে কী দাবি করছো?”
(৫৪)হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “যদি আমি নিজেই নিজের প্রশংসা করি, তাহলে সে-প্রশংসার কোনো দাম নেই। আমার প্রতিপালক আমাকে প্রশংসিত করেছেন। তাঁর বিষয়ে তোমরা বলে থাকো, ‘তিনি আমাদের আল্লাহ,’ (৫৫)যদিও তোমরা তাঁকে জানো না কিন্তু আমি তাঁকে জানি। যদি আমি বলি যে, আমি তাঁকে জানি না, তাহলে আমি তোমাদের মতো মিথ্যাবাদী হবো। কিন্তু আমি তাঁকে জানি ও তাঁর কালাম মানি। (৫৬)তোমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহিম আ. আমার দিন দেখার আশায় আনন্দ করেছিলেন এবং তিনি তা দেখেছিলেন ও আনন্দিত হয়েছিলেন।”
(৫৭)অতঃপর ইহুদিরা তাঁকে বললো, “তোমার বয়স পঞ্চাশ বছরও হয়নি আর তুমি ইব্রাহিমকে দেখেছো?”
(৫৮)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “আমি তোমাদের সত্যি সত্যিই বলছি, ইব্রাহিমের আগে থেকেই আমি আছি।” (৫৯)তাই তারা তাঁকে পাথর মারতে চাইলো কিন্তু হযরত ইসা আ. লুকিয়ে বায়তুল-মোকাদ্দস থেকে বেরিয়ে গেলেন।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)যেতে যেতে তিনি এক জন্মান্ধকে দেখতে পেলেন। (২)তাঁর সাহাবিরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “হুজুর, কার গুনাহর কারণে এই লোকটি অন্ধ হয়ে জন্মেছে, তার নিজের নাকি তার বাবা-মার?” (৩)হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “এই লোকটি কিংবা তার বাবা-মা গুনাহ করেনি। এ অন্ধ হয়ে জন্মেছে যেনো আল্লাহর কাজ তার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। (৪)যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, দিন থাকতে থাকতেই আমাদেরকে তাঁর কাজ করতে হবে। রাত আসছে, তখন কেউ কাজ করতে পারে না। (৫)আমি যতোদিন দুনিয়াতে আছি, ততোদিন আমিই দুনিয়ার আলো।”
(৬)একথা বলে তিনি মাটিতে থুথু দিয়ে কাদা বানালেন এবং তা লোকটির চোখে লেপটে দিলেন, (৭)আর তাকে বললেন, “সিলো নামক পুকুরে গিয়ে ধুয়ে ফেলো।” অতঃপর সে গিয়ে ধুয়ে ফেললো এবং দেখতে পেয়ে ফিরে এলো। (৮)তার প্রতিবেশীরা এবং যারা তাকে আগে ভিক্ষা করতে দেখেছিলো, তারা বলতে লাগলো, “এই লোকটি না এখানে বসে ভিক্ষা করতো?” (৯)কেউ কেউ বলছিলো, “এ সে-ই।” অন্যেরা বলছিলো, “না কিন্তু তারই মতো একজন।” সে বলতে থাকলো, “আমিই সেই লোক।”
(১০)কিন্তু তারা তাকে জিজ্ঞেস করতেই থাকলো, “তাহলে তোমার চোখ কীভাবে খুললো?” (১১)সে উত্তর দিলো, “ইসা নামের এক লোক মাটিতে কাদা বানিয়ে আমার চোখে লেপটে দিলেন এবং আমাকে বললেন, ‘সিলো নামক পুকুরে গিয়ে ধুয়ে ফেলো।’ তখন আমি গিয়ে ধুয়ে ফেললাম এবং দেখতে পেলাম।” (১২)তারা তাকে বললো, “কোথায় তিনি?” সে বললো, “আমি জানি না।”
(১৩)আগে যে-লোকটি অন্ধ ছিলো, তারা তাকে ফরিসিদের কাছে নিয়ে গেলো। (১৪)যেদিন হযরত ইসা আ. কাদা তৈরি করে লোকটির চোখ খুলে দিয়েছিলেন, সেদিন ছিলো সাব্বাত।
(১৫)তখন ফরিসিরাও তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে সে দেখার শক্তি পেয়েছে। সে তাদের বললো, “তিনি আমার চোখে কাদা লাগিয়ে দিলেন। তারপর আমি ধুয়ে ফেললাম এবং এখন আমি দেখতে পাচ্ছি।” (১৬)কয়েকজন ফরিসি বললেন, “এই লোক আল্লাহর কাছ থেকে আসেনি, কারণ সে সাব্বাত পালন করে না।” কিন্তু অন্যেরা বললেন, “একজন গুনাহগার কীভাবে এরকম মোজেজা দেখাতে পারে?” এবং তারা দু’দলে ভাগ হয়ে গেলেন। (১৭)তাই তারা সেই অন্ধ লোকটিকে আবার বললেন, “তুমি তার সম্পর্কে কী বলো? তোমার চোখ তো সে-ই খুলে দিয়েছে।” সে বললো, “তিনি একজন নবি।”
(১৮)ইহুদিরা লোকটির বাবা-মাকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত বিশ্বাস করলো না যে, লোকটি আগে অন্ধ ছিলো এবং এখন দেখতে পাচ্ছে। (১৯)তারা তাদের জিজ্ঞেস করলো, “এ কি তোমাদের ছেলে, যে অন্ধ হয়ে জন্মেছিলো? তাহলে এখন সে কীভাবে দেখতে পাচ্ছে?” (২০)তার বাবা-মা উত্তর দিলেন, “আমরা জানি এ আমাদের ছেলে এবং এ অন্ধ হয়ে জন্মেছিলো। (২১)কিন্তু আমরা জানি না যে, সে কীভাবে এখন দেখতে পাচ্ছে; এবং এ-ও জানি না যে, কে তার চোখ খুলে দিয়েছেন। তাকে জিজ্ঞেস করুন, সে প্রাপ্তবয়স্ক। সে নিজের কথা নিজেই বলবে।”
(২২)ইহুদিদের ভয়ে তার বাবামা একথা বললেন। কারণ ইহুদিরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো যে, যে কেউ হযরত ইসাকে মসিহ বলে স্বীকার করবে, তাকে সিনাগোগ থেকে বের করে দেয়া হবে। (২৩)আর তাই তার বাবা-মা বললেন, “সে প্রাপ্তবয়স্ক, তাকেই জিজ্ঞেস করুন।” (২৪)সুতরাং যে-লোকটি আগে অন্ধ ছিলো, তারা দ্বিতীয়বার তাকে ডাকলো এবং বললো, “আল্লাহর প্রশংসা করো! আমরা জানি যে, সেই লোকটি গুনাহগার।” (২৫)সে উত্তর দিলো, “তিনি একজন গুনাহগার কিনা তা আমি জানি না কিন্তু একটি বিষয় আমি জানি যে, আমি অন্ধ ছিলাম এবং এখন দেখতে পাচ্ছি।”
(২৬)তারা তাকে বললো, “সে তোমাকে কী করেছে? কীভাবে সে তোমার চোখ খুলে দিয়েছে?” (২৭)সে তাদের উত্তর দিলো, “আমি আপনাদের বলেছি এবং আপনারা শুনছেন না। আপনারা আবার শুনতে চান কেনো? আপনারাও কি তাঁর সাহাবি হতে চান?” (২৮)তখন তারা তাকে গালি দিয়ে বললো, “তুই তার সাহাবি কিন্তু আমরা হযরত মুসা আ.র উম্মত। (২৯)আমরা জানি যে, আল্লাহ হযরত মুসা আ. এর সাথে কথা বলেছেন কিন্তু এই লোক কোথা থেকে এসেছে তা আমরা জানি না।”
(৩০)লোকটি উত্তর দিলো, “খুবই আশ্চর্যের বিষয়! আপনারা জানেন না তিনি কোথা থেকে এসেছেন অথচ তিনিই আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। (৩১)আমরা জানি যে, আল্লাহ গুনাহগারদের কথা শোনেন না কিন্তু যে তাঁর এবাদত করে ও তাঁর বাধ্য হয়, তার কথা শোনেন। (৩২)দুনিয়ার শুরু থেকে একথা কখনো শোনা যায়নি যে, কেউ কোনো জন্মান্ধের চোখ খুলে দিয়েছে। (৩৩)যদি এই লোক আল্লাহর কাছ থেকে না এসে থাকেন, তাহলে তিনি কিছুই করতে পারতেন না।” (৩৪)তারা তাকে উত্তর দিলো, “একেবারে গুনাহর মধ্যে তোর জন্ম হয়েছে, আর তুই আমাদের শিক্ষা দিতে চাচ্ছিস?” এবং তারা তাকে বাইরে বের করে দিলো।
(৩৫)হযরত ইসা আ. শুনলেন যে, তারা তাকে বের করে দিয়েছে এবং তিনি যখন তাকে পেলেন, তখন বললেন, “তুমি কি ইবনুল-ইনসানের ওপর ইমান এনেছো?” (৩৬)সে উত্তর দিলো, “হুজুর, তিনি কে? আমাকে বলুন, যেনো আমি তাঁর ওপর ইমান আনতে পারি।” (৩৭)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “তুমি তাঁকে দেখেছো এবং যিনি তোমার সাথে কথা বলছেন, তিনিই ইবনুল-ইনসান।” (৩৮)সে বললো, “হুজুর, আমি ইমান এনেছি।” এবং সে নিচু হয়ে তাঁর পায়ে পড়ে তাঁকে সালাম করলো।
(৩৯)হযরত ইসা আ. বললেন, “আমি এই দুনিয়ায় বিচার নিয়ে এসেছি, যেনো যারা দেখতে না পায়, তারা দেখতে পায় এবং যারা দেখতে পায়, তারা অন্ধ হয়ে যায়।” (৪০)কয়েকজন ফরিসি তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে থেকে একথা শুনলেন এবং তাঁকে বললেন, “নিশ্চয়ই আমরা অন্ধ নই?” (৪১)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “যদি তোমরা অন্ধ হতে, তাহলে তোমাদের গুনাহ হতো না। যেহেতু তোমরা বলো যে, ‘আমরা দেখতে পাই,’ তাই তোমাদের গুনাহ রয়েছে।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)আমি তোমাদের সত্যি সত্যিই বলছি, যে কেউ দরজা দিয়ে না ঢুকে অন্য উপায়ে ভেড়ার খোঁয়াড়ে ঢোকে, সে চোর ও ডাকাত। (২)যে দরজা দিয়ে ঢোকে, সে হচ্ছে ভেড়ার রাখাল। (৩)দারোয়ান তাকে দরজা খুলে দেয় এবং ভেড়াগুলো তার আওয়াজ চেনে। সে তার নিজের ভেড়াগুলোকে নাম ধরে ডাকে এবং বাইরে নিয়ে যায়।
(৪)তার নিজের সবগুলোকে বাইরে নিয়ে যাবার পর সে তাদের আগে আগে চলে এবং ভেড়াগুলো তার পেছনে পেছনে যায়, কারণ তারা তার আওয়াজ চেনে। (৫)তারা অপরিচিত কারো পেছনে যাবে না বরং তার কাছ থেকে পালিয়ে যাবে, কারণ তারা অপরিচিত লোকের আওয়াজ চেনে না।” (৬)হযরত ইসা আ. দৃষ্টান্তের মাধ্যমে তাদের সাথে কথা বললেন কিন্তু তারা বুঝলেন না তিনি তাদের কী বলছেন।
(৭)তাই আবার তিনি তাদের বললেন, “আমি সত্যি সত্যিই তোমাদের বলছি, আমিই ভেড়ার খোঁয়াড়ের দরজা। (৮)আমার আগে যারা এসেছিলো তারা সবাই ছিলো চোর ও ডাকাত কিন্তু ভেড়াগুলো তাদের কথা শোনেনি। (৯)আমিই দরজা। যে আমার মধ্য দিয়ে ভেতরে আসে সে নাজাত পাবে, সে আমার মধ্য দিয়ে ভেতরে আসবে ও বাইরে যাবে এবং খাবার পাবে। (১০)চোর আসে কেবল চুরি, হত্যা ও ধ্বংস করতে। আমি এসেছি যেনো তারা জীবন পায় এবং সেই জীবন উপচে পড়ে।
(১১)আমিই উত্তম রাখাল। উত্তম রাখাল ভেড়াগুলোর জন্য তার জীবন দেয়। (১২)বেতনভোগী রাখাল ভেড়ার মালিক নয়; বাঘ আসতে দেখলে সে পালিয়ে যায় এবং বাঘ ভেড়াগুলোকে ধরে নিয়ে যায় এবং ক্ষতবিক্ষত করে। (১৩)বেতনভোগী রাখাল পালিয়ে যায়, কারণ সে ভেড়াগুলোর যত্ন নেয় না।
(১৪)আমি উত্তম রাখাল। আমি নিজেরগুলো চিনি এবং তারা আমাকে চেনে। (১৫)যেভাবে প্রতিপালক আমাকে জানেন, সেভাবে আমিও তাঁকে জানি। আমি ভেড়াগুলোর জন্য আমার জীবন দেই। (১৬)আমার আরো ভেড়া আছে, যারা এই দলের মধ্যে নেই। তাদেরও আমাকে আনতে হবে এবং তারা আমার কথা শুনবে, যেনো সব মিলে একটি দল হয় এবং একজন রাখাল হয়।
(১৭)এজন্যই প্রতিপালক আমাকে মহব্বত করেন, কারণ আমি আমার জীবন দেই, যেনো আবার তা গ্রহণ করতে পারি। (১৮)কেউ আমার কাছ থেকে তা নেয় না কিন্তু আমি নিজের ইচ্ছায় তা দেই। এটি দিয়ে দেবার ক্ষমতা এবং আবার নিয়ে নেবার ক্ষমতা আমার আছে। এই হুকুম আমি আমার প্রতিপালকের কাছ থেকে পেয়েছি।”
(১৯)এসব কথার জন্য ইহুদিদের মধ্যে আবার মতভেদ দেখা দিলো। (২০)তাদের অনেকে বললো, “এর মধ্যে ভূত আছে এবং সে পাগল হয়ে গেছে। কেনো তার কথা শুনবো?” (২১)অন্যেরা বললো, “এসব কোনো ভূতে পাওয়া মানুষের কথা নয়। কোনো ভূত কি অন্ধের চোখ খুলে দিতে পারে?”
(২২)সেই সময়টা ছিলো জেরুসালেমে ইদুল-তাশদিদের সময়। তখন শীতকাল ছিলো। (২৩)এবং হযরত ইসা আ. বায়তুল-মোকাদ্দসের সোলায়মান নামের বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। (২৪)ইহুদিরা তাঁর চারপাশে জমা হয়ে বললো, “আর কতো দিন আমাদের সন্দেহের মধ্যে রাখবেন? যদি আপনি মসিহ হন, তাহলে আমাদের সোজাসুজি বলুন।” (২৫)হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “আমি তোমাদের বলেছি কিন্তু তোমরা ইমান আনোনি। আমি আমার প্রতিপালকের নামে যেসব কাজ করি, সেগুলো আমার বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়; (২৬)কিন্তু তোমরা ইমান আনো না, কারণ তোমরা পালের মধ্যে নও। (২৭)আমার ভেড়াগুলো আমার কথা শোনে। আমি তাদের চিনি এবং তারা আমাকে চেনে। আমি তাদের আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যাই, (২৮)এবং তারা কখনো ধ্বংস হবে না। কেউই তাদেরকে আমার হাত থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। (২৯)আমার প্রতিপালক আমাকে যা দিয়েছেন তা সব থেকে মহান এবং কেউই তা তাঁর হাত থেকে কেড়ে নিতে পারে না। (৩০)আমার প্রতিপালক এবং আমি, আমরা এক।”
(৩১)ইহুদিরা আবারো তাঁকে পাথর মারতে চাইলো। (৩২)হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “আমি প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমাদের অনেক ভালো কাজ দেখিয়েছি। সেগুলোর কোনটার জন্য তোমরা আমাকে পাথর মারতে চাও?” (৩৩)ইহুদিরা উত্তর দিলো, “ভালো কাজের জন্য নয়, বরং তোমার কুফরির জন্যই আমরা তোমাকে পাথর মারতে যাচ্ছি। তুমি একজন সাধারণ মানুষ হয়ে নিজেকে আল্লাহর সমান করে তুলছো।”
(৩৪)হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “তোমাদের কিতাবে কি একথা লেখা নেই যে, ‘আমি বলছি, তোমরা আল্লাহ?’ (৩৫)আল্লাহর কালাম যাদের কাছে এসেছিলো, তাদের যদি ‘আল্লাহ’ বলা হয়, তাহলে পূর্বের কিতাব তো বাদ দেয়া যায় না। (৩৬)প্রতিপালক যাকে পবিত্র করেছেন এবং এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, তিনি নিজেকে ‘আমিই আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন’ বলায় তোমরা কেনো বলছো তিনি কুফরি করছেন?
(৩৭)যদি আমি আমার প্রতিপালকের কাজ না করি, তাহলে আমার ওপর ইমান এনো না। (৩৮)কিন্তু যদি আমি সেগুলো করি, আমার ওপর ইমান না আনলেও কাজগুলোর ওপর ইমান আনো, যেনো জানতে ও বুঝতে পারো যে, প্রতিপালক আমার মধ্যে আছেন এবং আমি প্রতিপালকের মধ্যে আছি।”
(৩৯)তারা আবারো তাঁকে গ্রেফতার করতে চেষ্টা করলো কিন্তু তিনি তাদের হাত থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন। (৪০)আবার তিনি জর্দান পার হয়ে যেখানে হযরত ইয়াহিয়া আ. বায়াত দিতেন, সেখানে চলে গেলেন এবং সেখানেই থাকলেন। (৪১)অনেকে তাঁর কাছে এলো এবং বলতে লাগলো, “হযরত ইয়াহিয়া আ. কোনো মোজেজা দেখাননি কিন্তু এই লোক সম্পর্কে তিনি যা যা বলেছিলেন তার সবই সত্য।” (৪২)এবং সেখানে অনেকে তাঁর ওপর ইমান আনলো।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)বেথানিয়া গ্রামের লাসার নামে এক লোকের অসুখ হয়েছিলো। মরিয়ম ও তার বোন মার্থা সেই একই গ্রামে থাকতেন। (২)ইনি সেই মরিয়ম, যিনি সুগন্ধি তেল দিয়ে মসিহকে অভিষেক করেছিলেন এবং নিজের চুল দিয়ে তাঁর পা মুছে দিয়েছিলেন। তারই ভাই লাসার অসুস্থ ছিলেন। (৩)সুতরাং লাসারের বোনেরা ইসার কাছে খবর পাঠালেন, “হুজুর, আপনি যাকে মহব্বত করেন তিনি অসুস্থ। (৪)কিন্তু হযরত ইসা আ. একথা শুনে বললেন, “এই অসুখ মৃত্যুর জন্য নয় বরং আল্লাহর মহিমা প্রকাশের জন্য হয়েছে, যেনো এর মাধ্যমে তাঁর একান্ত প্রিয় মনোনীতজনও মহিমান্বিত হন।”
(৫)যদিও হযরত ইসা আ. মার্থা ও তার বোন এবং লাসারকে মহব্বত করতেন, (৬)তবুও লাসারের অসুখের খবর পেয়েও তিনি যেখানে ছিলেন, সেখানে আরো দু’দিন থাকলেন। (৭)এরপর তিনি তাঁর হাওয়ারিদের বললেন, “চলো, আমরা আবার ইহুদিয়াতে যাই।” (৮)হাওয়ারিরা তাঁকে বললেন, “হুজুর, এই ক’দিন আগে ইহুদিরা আপনাকে পাথর মারতে চেয়েছিলো, আর আপনি এখন আবার সেখানে যাবেন?” (৯)হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “দিনের আলো কি বারো ঘন্টা থাকে না? যারা দিনে চলাফেরা করে, তারা হোঁচট খায় না, কারণ তারা দুনিয়ার আলো দেখে। (১০)কিন্তু যারা রাতে চলাফেরা করে, তারা হোঁচট খায়, কারণ তাদের মধ্যে আলো নেই।”
(১১)এসব বলার পর তিনি তাদের বললেন, “আমাদের বন্ধু লাসার ঘুমিয়ে পড়েছে কিন্তু আমি তাকে জাগাতে যাচ্ছি।” (১২)হাওয়ারিরা তাঁকে বললেন, হুজুর, যদি ঘুমিয়েই থাকে, তাহলে সে ভালো হয়ে যাবে।” (১৩)হযরত ইসা আ. তার মৃত্যুর কথা বলছিলেন কিন্তু তারা মনে করলেন যে, তিনি স্বাভাবিক ঘুমের কথা বলছেন।
(১৪)তখন হযরত ইসা আ. তাদের পরিষ্কার করে বললেন, “লাসার মারা গেছে। (১৫)তোমাদের জন্য আমি আনন্দিত, কারণ আমি সেখানে ছিলাম না, যেনো তোমরা ইমান আনতে পারো। কিন্তু এখন চলো, আমরা তার কাছে যাই।” (১৬)থোমা, যাকে যমজ বলা হতো, অন্য হাওয়ারিদের বললেন, “চলো, আমরাও যাই, যেনো তার সাথে মরতে পারি।”
(১৭)হযরত ইসা আ. সেখানে পৌঁছে জানতে পারলেন যে, লাসারকে চার দিন আগে দাফন করা হয়েছে। (১৮,১৯)জেরুসালেম থেকে বেথানিয়া প্রায় দু’মাইল দূরে ছিলো। মার্থা ও মরিয়মের ভাইয়ের মৃত্যুতে তাদের সান্ত্বনা দেবার জন্য ইহুদিরা অনেকেই এসেছিলো। (২০)মার্থা যখন শুনলেন যে, হযরত ইসা আ. আসছেন, তখন তিনি গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করলেন; এ-সময় মরিয়ম ঘরের ভেতরেই রইলেন। (২১)মার্থা হযরত ইসা আ.কে বললেন, “হুজুর, আপনি যদি এখানে থাকতেন, তাহলে আমার ভাই মারা যেতো না। (২২)কিন্তু আমি এখনো জানি, আপনি আল্লাহর কাছে যা চাবেন, তিনি তা দেবেন।”
(২৩)হযরত ইসা আ. তাঁকে বললেন, “তোমার ভাই আবার উঠবে।” (২৪)মার্থা তাঁকে বললেন, “আমি জানি যে, কেয়ামতের দিনে সে আবার উঠবে।” (২৫)হযরত ইসা আ. তাঁকে বললেন, “আমিই পুনরুত্থান ও জীবন। যারা আমার ওপর ইমান আনে, তারা মরলেও জীবিত হবে। (২৬)এবং যে কেউ জীবিত আছে ও আমার ওপর ইমান আনে, সে মরবে না। তুমি কি এতে বিশ্বাস করো?” (২৭)তিনি তাঁকে বললেন, “হ্যাঁ, হুজুর। আমি বিশ্বাস করি, দুনিয়াতে যাঁর আসার কথা, আপনিই সেই মসিহ- আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন।”
(২৮)একথা বলার পর মার্থা চলে গেলেন। তিনি তার বোন মরিয়মকে ডেকে গোপনে বললেন, “ওস্তাদ এখানে এসেছেন এবং তোমাকে ডাকছেন।” (২৯)তিনি একথা শুনে তাড়াতাড়ি করে তাঁর কাছে গেলেন। (৩০)হযরত ইসা আ. তখনো গ্রামের ভেতরে আসেননি, মার্থা তাঁর সাথে যেখানে দেখা করেছিলেন, সেখানেই থেকে গিয়েছিলেন।
(৩১)যে ইহুদিরা তাকে সান্ত্বনা দেবার জন্য তার ঘরে এসেছিলো, মরিয়মকে তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে যেতে দেখে তারা তার পেছনে পেছনে গেলো; কারণ তারা মনে করলো যে, তিনি কবরের কাছে কাঁদতে যাচ্ছেন। (৩২)ইসা যেখানে ছিলেন, মরিয়ম সেখানে এসে তাঁকে দেখে তাঁর পায়ে পড়ে বললেন, “হুজুর, আপনি যদি এখানে থাকতেন, তাহলে আমার ভাই মারা যেতো না।”
(৩৩)হযরত ইসা আ. মরিয়মকে ও তাঁর সাথে যে ইহুদিরা এসেছিলো, তাদের কাঁদতে দেখে অন্তরে খুবই দুঃখিত ও ভীষণভাবে অস্থির হলেন। (৩৪)তিনি বললেন, “তাকে কোথায় রেখেছো?” তারা তাঁকে বললো, “হুজুর, এসে দেখুন।”
(৩৫)হযরত ইসা আ. কাঁদতে লাগলেন। (৩৬)এতে ইহুদিরা বললো, “দেখো, তিনি তাকে কতো মহব্বত করতেন!” (৩৭)কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ বললো, “যিনি অন্ধ মানুষের চোখ খুলে দিয়েছেন, তিনি কি এই লোকের মৃত্যু আটকাতে পারতেন না?”
(৩৮)তখন হযরত ইসা আ. আবার অন্তরে খুবই দুঃখিত হয়ে কবরের কাছে এলেন। কবরটা ছিলো একটি গুহা এবং মুখটা ছিলো পাথর দিয়ে বন্ধ করা।
(৩৯-৪০)হযরত ইসা আ. বললেন, “পাথরটা সরিয়ে দাও।” মৃত লোকটির বোন মার্থা বললেন, “হুজুর, এখন দুর্গন্ধ হয়ে গেছে, কারণ আজ চার দিন হয় তার মৃত্যু হয়েছে।” হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “আমি কি তোমাকে বলিনি যে, যদি তুমি বিশ্বাস করো, তাহলে আল্লাহর মহিমা দেখতে পাবে?”
(৪১)তাই তারা পাথরটা সরিয়ে ফেললো এবং হযরত ইসা আ. ওপরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হে আমার প্রতিপালক, আমার কথা শুনেছো বলে তোমার শুকরিয়া আদায় করি। (৪২)আমি জানি, তুমি সব সময়ই আমার দোয়া কবুল করে থাকো; কিন্তু আমার চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের জন্য একথা বললাম, যেনো তারা বিশ্বাস করতে পারে যে, তুমিই আমাকে পাঠিয়েছো।”
(৪৩)একথা বলার পর তিনি জোরে ডাক দিয়ে বললেন, “লাসার, বেরিয়ে এসো!” (৪৪)মৃত মানুষটি বেরিয়ে এলেন। তার হাত ও পা কাপড়ের ফিতে দিয়ে পেঁচানো এবং তার মুখে একটি রুমাল বাঁধা ছিলো। হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “তার বাঁধন খুলে দিয়ে তাকে যেতে দাও।” (৪৫)যে ইহুদিরা মরিয়মের সাথে এসেছিলো, (৪৬)তাদের অনেকে ইসার কাজ দেখে তাঁর ওপর ইমান আনলো; কিন্তু তাদের কয়েকজন ফরিসিদের কাছে গিয়ে যা ঘটেছে তা জানালো।
(৪৭)তখন প্রধান ইমামেরা ও ফরিসিরা পরিষদের সভা ডাকলেন এবং বললেন, “আমাদের কী করা উচিত? এই লোকটি অনেক মোজেজা দেখাচ্ছে। (৪৮)আমরা যদি তাকে এভাবে চলতে দেই, তাহলে সবাই তার ওপর ইমান আনবে এবং রোমীয়রা এসে আমাদের পবিত্র জায়গা ও জাতিকে ধ্বংস করে দেবে।”
(৪৯)কিন্তু তাদের মধ্যে কাইয়াফা নামে একজন ওই বছর প্রধান ইমাম ছিলেন। (৫০)তিনি বললেন, তোমরা কিছুই জানো না! তোমরা বোঝো না যে, গোটা জাতি ধ্বংস হওয়ার চেয়ে সব মানুষের হয়ে একজনের মৃত্যু ভালো।” (৫১)তিনি নিজ থেকে একথা বলেননি কিন্তু ওই বছর প্রধান ইমাম হওয়ার কারণে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে, হযরত ইসা আ. জাতির জন্য মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছেন; (৫২)তবে শুধু এই জাতির জন্য নয় কিন্তু আল্লাহর যেসব প্রিয় বান্দা চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে তাদের জন্যও, যেনো তাদের এক করতে পারেন।
(৫৩)তাই সেদিন থেকেই তারা তাঁকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করতে লাগলেন। অতঃপর হযরত ইসা আ. আর খোলাখুলিভাবে ইহুদিদের মধ্যে চলাফেরা করলেন না (৫৪)কিন্তু মরুপ্রান্তরের কাছাকাছি এলাকায় ইফ্রাইম নামে এক শহরে চলে গেলেন এবং তাঁর হাওয়ারিদের সাথে সেখানেই থাকলেন।
(৫৫)ইহুদিদের ইদুল-ফেসাখ কাছে এসে পড়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকেরা জেরুসালেমে গেলো, যেনো ইদের আগে তারা পাকসাফ হতে পারে। (৫৬)তারা হযরত ইসা আ.-র খোঁজ করছিলো এবং বায়তুল-মোকাদ্দসে দাঁড়িয়ে একে অন্যকে জিজ্ঞেস করছিলো, “তোমার কী মনে হয়? নিশ্চয়ই তিনি ইদে আসবেন না, তাই না?”
(৫৭)প্রধান ইমামেরা ও ফরিসিরা এই হুকুম দিয়েছিলেন যে, কেউ যদি জানে হযরত ইসা আ. কোথায় আছেন, তাহলে তাদের জানাতে হবে, যেনো তারা তাঁকে ধরতে পারেন।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)ইদুল-ফেসাখের ছয়দিন আগে হযরত ইসা আ. বেথানিয়ায় লাসারের বাড়িতে এলেন। এই লাসারকেই তিনি মৃত থেকে জীবিত করে তুলেছিলেন। (২)সেখানে তারা তাঁর খাবারের আয়োজন করলেন। মার্থা মেহমানদারি করছিলেন এবং অন্যান্যদের সাথে লাসারও টেবিলে খেতে বসেছিলেন।
(৩)মরিয়ম আধা কেজি খুব দামি ও খাঁটি সুগন্ধি তেল নিয়ে হযরত ইসা আ.র পায়ে ঢেলে দিলেন এবং তাঁর চুল দিয়ে তা মুছে দিলেন। তেলেন সুগন্ধে সারা ঘর ভরে গেলো। (৪)কিন্তু হাওয়ারিদের একজন- সেই ইহুদা ইস্কারিয়োত, যিনি তাঁর সাথে বেইমানি করেছিলেন- বললেন, (৫)“কেনো এই তেল তিনশো দিনারে বিক্রি করে টাকাটা গরিবদের দেয়া হলো না?”
(৬)গরিবদের প্রতি তার মহব্বতের কারণে যে তিনি একথা বললেন তা নয়, বরং তিনি ছিলেন চোর। সাধারণ তহবিল তার কাছে থাকতো এবং তিনি সেখান থেকে চুরি করতেন। (৭)হযরত ইসা আ. বললেন, “তাকে কষ্ট দিয়ো না, সে এটি কিনেছে, যেনো আমাকে দাফন করার দিনের জন্য তা রাখতে পারে। (৮)তোমরা সব সময়ই গরিবদের পাবে কিন্তু আমাকে সব সময় পাবে না।”
(৯)যখন ইহুদিদের বিশাল এক জনতা জানতে পারলো যে, তিনি সেখানে আছেন, তখন তারা যে শুধু হযরত ইসা আ.কে দেখতে এলো তা নয় কিন্তু যে লাসারকে তিনি মৃত থেকে জীবিত করেছিলেন, তাকেও দেখতে এলো। (১০)তাই প্রধান ইমামেরা লাসারকেও মেরে ফেলার পরিকল্পনা করলেন; (১১)কারণ তার জন্যই অনেক ইহুদি দল ছেড়ে চলে যাচ্ছিলো এবং ইসার ওপর ইমান আনছিলো।
(১২)পরদিন ইদে উপস্থিত বিশাল এক জনতা জানতে পারলো যে, হযরত ইসা আ. জেরুসালেমে আসছেন। (১৩)তাই তারা খেঁজুর গাছের ডাল নিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে গেলো এবং চিৎকার করে বলতে লাগলো, “হোশান্না! তিনি রহমতপ্রাপ্ত, যিনি আল্লাহর নামে আসছেন- তিনি ইস্রাইলের বাদশা! ”
(১৪)হযরত ইসা আ. একটি বাচ্চা-গাধা পেয়ে তার ওপরে বসলেন। (১৫)পূর্বের কিতাবে যেমন লেখা আছে- “হে সিয়োন-কন্যা, ভয় করো না। দেখো, বাচ্চা-গাধায় চড়ে তোমার বাদশা আসছেন!” (১৬)প্রথমে তাঁর হাওয়ারিরা এর অর্থ বোঝেননি কিন্তু তিনি মহিমান্বিত হওয়ার পর তাদের স্মরণ হলো যে, এই সবই তাঁর বিষয়ে লেখা হয়েছিলো এবং তাঁর প্রতিই ঘটেছিলো।
(১৭)তিনি লাসারকে মৃত থেকে জীবিত করে যখন কবর থেকে ডেকে বের করেছিলেন, তখন যারা তাঁর সাথে ছিলো, তারা সাক্ষ্য দিতেই থাকলো। (১৮)তিনি চিহ্ন হিসেবে এই মোজেজা দেখিয়েছেন শুনে অনেক লোক তাঁর সাথে দেখা করতে গেলো। (১৯)ফরিসিরা একে অন্যকে বলতে লাগলেন, “আপনারা দেখছেন, আপনারা কিছুই করতে পারবেন না। দেখুন, সারা দুনিয়া তার পেছনে চলে গেছে!”
(২০)ইদের সময় যারা এবাদত করতে গিয়েছিলো, তাদের মধ্যে কয়েকজন গ্রিকও ছিলো। (২১)তারা গালিলের বেতসাইদা গ্রামের ফিলিপের কাছে এসে বললো, “জনাব, আমরা হযরত ইসা আ. এর সাথে দেখা করতে চাই।” (২২)হযরত ফিলিপ র. গিয়ে হযরত আন্দ্রিয়ান রা.কে বললেন, তারপর হযরত আন্দ্রিয়ান রা. ও ফিলিপ গিয়ে হযরত ইসা আ.কে বললেন।
(২৩)হযরত ইসা আ. তাদের উত্তর দিলেন, “ইবনুল-ইনসানের মহিমান্বিত হওয়ার সময় এসেছে। (২৪)আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, একটি গমের দানা মাটিতে না পড়লে এবং না মরলে একটি দানাই থাকে কিন্তু যদি মরে, তাহলে অনেক ফল দেয়। (২৫)যে নিজের জীবন ভালোবাসে, সে তা হারাবে; কিন্তু যে এই দুনিয়াতে নিজের জীবনকে ঘৃণা করে, সে চিরদিনের জন্য তা রক্ষা করবে। (২৬)যে আমার খেদমত করে, সে অবশ্যই আমার পেছনে আসবে এবং আমি যেখানে থাকি, আমার খেদমতকারীও সেখানে থাকবে। যে আমার খেদমত করবে, প্রতিপালক তাকে সম্মানিত করবেন।
(২৭)এখন আমার প্রাণ অস্থির হচ্ছে। আমি কি বলবো- ‘হে প্রতিপালক, এই সময় থেকে আমাকে উদ্ধার করো’? না, এজন্যই তো আমি এই সময় পর্যন্ত এসেছি। (২৮)হে প্রতিপালক, তোমার নাম মহিমান্বিত করো।” অতঃপর আসমান থেকে এই বাণী শোনা গেলো, “আমি তা মহিমান্বিত করেছি এবং আবার মহিমান্বিত করবো।” (২৯)যে জনতা সেখানে দাঁড়িয়েছিলো, তারা তা শুনলো এবং বললো, “এটি মেঘের গর্জন ছিলো।” অন্যরা বললো, “একজন ফেরেস্তা তাঁর সাথে কথা বলেছেন।” (৩০)হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “এই বাণী তোমাদের জন্য এসেছে, আমার জন্য নয়।
(৩১)এখন দুনিয়ার বিচার হবে। এই দুনিয়ার বাদশাকে বাইরে ফেলে দেয়া হবে। (৩২)এবং যদি আমাকে যখন মাটি থেকে উঁচুতে তোলা হবে, তাহলে আমি সব কিছুকেই আমার কাছে টেনে আনবো” (৩৩)তিনি যে কীভাবে ইন্তেকাল করবেন তা বোঝানোর জন্য একথা বললেন।
(৩৪)জনতা তাঁকে উত্তর দিলো, “আমরা পূর্বের কিতাবে শুনেছি যে, মসিহ চিরদিন থাকবেন। আপনি কীভাবে বলেন যে, ইবনুল-ইনসানকে উঁচুতে তোলা হবে? কে এই ইবনুল-ইনসান?” (৩৫)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “আরো কিছুদিন আলো তোমাদের সাথে থাকবে। আলো তোমাদের কাছে থাকতে থাকতেই চলাফেরা করো, যেনো অন্ধকার তোমাদের জয় করতে না পারে।
(৩৬)যদি তোমরা অন্ধকারে চলো, তাহলে জানবে না যে, কোথায় যাচ্ছো। তোমাদের কাছে আলো থাকতে থাকতে আলোর ওপর ইমান আনো, যেনো তোমরা আলোর সন্তান হতে পারো।” হযরত ইসা আ. একথা বলার পর গোপনে তাদের কাছ থেকে চলে গেলেন।
(৩৭)যদিও তিনি তাদের সামনে চিহ্ন হিসেবে অনেক মোজেজা দেখালেন, তবুও তারা তাঁর ওপর ইমান আনলো না। (৩৮)এটি হলো যেনো হযরত ইসাইয়া নবির কথা পূর্ণ হয়- “হে আল্লাহ, কে আমাদের কথায় ইমান এনেছে এবং আল্লাহর হাত কার কাছেইবা প্রকাশিত হয়েছে?” (৩৯)তারা ইমান আনতে পারলো না, কারণ হযরত ইসাইয়া নবি আরো বলেছেন,
(৪০)“তিনি তাদের চোখ অন্ধ করে দিয়েছেন এবং তাদের মন কঠিন করেছেন, যেনো তারা চোখে না দেখে এবং অন্তরে না বোঝে এবং না ফেরে, আর আমি তাদের সুস্থ করি।” (৪১)হযরত ইসাইয়া নবি একথা বলেছেন, কারণ তিনি তাঁর মহিমা দেখেছেন এবং তাঁর বিষয়ে কথা বলেছেন।
(৪২)তবুও শাসনকর্তাদের মধ্যে অনেকে তাঁর ওপর ইমান আনলেন কিন্তু ফরিসিরা হয়তো তাদের সিনাগোগ থেকে বের করে দেবেন এই ভয়ে তারা তা স্বীকার করলেন না। (৪৩)কারণ তারা আল্লাহর কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ার চেয়ে মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়াকে বেশি ভালোবাসতেন।
(৪৪)হযরত ইসা আ. জোরে জোরে বললেন, “যে আমার ওপর ইমান আনে, সে আমার ওপর নয় কিন্তু যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তাঁর ওপর ইমান আনে। (৪৫)এবং যে আমাকে দেখে, যিনি আমাকে পাঠিছেন, সে তাঁকেই দেখে। (৪৬)আমি আলো, এই দুনিয়াতে এসেছি, যেনো যে কেউ আমার ওপর ইমান আনে, সে অন্ধকারে না থাকে।
(৪৭)যে আমার কথা শোনে অথচ তা পালন করে না, আমি তার বিচার করি না, কারণ আমি দুনিয়ার বিচার করতে আসিনি বরং নাজাত করতে এসেছি। (৪৮)যে আমাকে এবং আমার কালাম গ্রহণ করে না, তার একজন বিচারক আছে। যে কালাম আমি প্রচার করেছি, কেয়ামতের দিন সেই কালামই তার বিচার করবে।
(৪৯)কারণ আমি নিজে থেকে কথা বলিনি। যে প্রতিপালক আমাকে পাঠিয়েছেন, তিনিই আমাকে হুকুম দিয়েছেন যে, কী বলতে হবে এবং কী প্রকাশ করতে হবে। (৫০)আর আমি জানি যে, তাঁর হুকুমই হচ্ছে তাঁর সান্নিধ্য লাভ করা। তাই আমি যা বলি, আমার প্রতিপালক আমাকে যেভাবে বলে দিয়েছেন, সেভাবেই বলি।”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)ইদুল-ফেসাখের আগে হযরত ইসা আ. বুঝতে পারলেন যে, তাঁর এই দুনিয়া ছেড়ে প্রতিপালকের কাছে চলে যাবার সময় হয়ে গেছে। এই দুনিয়ায় তিনি যাদেরকে মহব্বত করেছিলেন, তাঁর সেই নিজের লোকদেরকে তিনি শেষ পর্যন্ত মহব্বত করে গেলেন।
(২)রাতের খাবারের সময় হলো। এর আগেই শয়তান ইহুদা ইবনে সিমোন ইস্কারিয়োতের মনে হযরত ইসা আ. এর সাথে বেইমানি করার চিন্তা ঢুকিয়ে দিলো। (৩)হযরত ইসা আ. জানতেন যে, আল্লাহ সবকিছুই তাঁর হাতে দিয়েছেন এবং তিনি আল্লাহর কাছ থেকে এসেছেন ও আল্লাহর কাছেই যাচ্ছেন। (৪)তিনি টেবিল থেকে উঠলেন এবং ওপরের জামাটা খুলে রেখে কোমরে একটি গামছা বাঁধলেন। (৫)একটি গামলায় পানি নিয়ে হাওয়ারিদের পা ধুয়ে এবং কোমরে জড়ানো গামছা দিয়ে তা মুছে দিতে লাগলেন।
(৬)তিনি হযরত সাফওয়ান পিতরের কাছে এলে তিনি বললেন, “হুজুর, আপনি কি আমার পা ধুয়ে দিতে যাচ্ছেন?” (৭)হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “তুমি এখন জানো না আমি কী করছি কিন্তু পরে বুঝতে পারবে।”
(৮)হযরত পিতর রা. তাঁকে বললেন, “আপনি কখনো আমার পা ধোবেন না।” হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “আমি যদি তোমাকে না ধুই, তাহলে আমার সাথে তোমার কোনো অংশ নেই।” (৯)হযরত সাফওয়ান পিতর তাঁকে বললেন, “হুজুর, শুধু আমার পা নয় কিন্তু আমার হাত এবং মাথাও ধুয়ে দিন!” (১০)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “যে গোসল করেছে, তার পা ছাড়া আর কোনোকিছু ধোয়ার প্রয়োজন নেই, সে সম্পূর্ণ পাকসাফ। এবং তোমরা তো পাকসাফ আছো- যদিও তোমাদের সবাই নয়।” (১১)তিনি জানতেন কে তাঁর সাথে বেইমানি করবে, এজন্যই তিনি একথা বললেন, “তোমাদের মধ্যে সকলে পাকসাফ নয়।”
(১২)তাদের পা ধুয়ে দেবার পর তিনি তাঁর জামাটা গায়ে দিলেন এবং তাঁর জায়গায় গিয়ে বসে তাদের বললেন, “আমি তোমাদের প্রতি যা করলাম তা কি তোমরা বুঝতে পেরেছো?” (১৩)তোমরা আমাকে মালিক এবং ওস্তাদ বলে থাকো, আর তোমরা তা ঠিকই বলো, কারণ আমি তা-ই। (১৪)যদি আমি তোমাদের মালিক এবং ওস্তাদ হয়ে তোমাদের পা ধুয়ে দেই, তাহলে তোমাদেরও উচিত একে অন্যের পা ধুয়ে দেয়া। (১৫)আমি তোমাদের সামনে একটি দৃষ্টান্ত রাখলাম, যেনো আমি যা করলাম, তোমরাও তা করো।
(১৬)আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, গোলাম তার মালিকের চেয়ে বড়ো নয়; যাকে পাঠানো হয় সে প্রেরকের চেয়ে বড়ো নয়। (১৭)তোমরা রহমতপ্রাপ্ত, যদি তোমরা এসব জানো ও করো। (১৮)আমি তোমাদের সবার কথা বলছি না; আমি জানি আমি কাদের বেছে নিয়েছি। কিন্তু পূর্বের কিতাবের কথা অবশ্যই পূর্ণ হবে, ‘এমন একজন রয়েছে, যে আমার রুটি খাচ্ছে, সে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।’ (১৯)এসব ঘটার আগেই আমি তোমাদের বললাম, যেনো যখন এসব ঘটবে, তখন তোমরা বিশ্বাস করতে পারো যে, আমিই তিনি।
(২০)আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, আমি যাদের পাঠাই, তাদের একজনকে যে গ্রহণ করে, সে আমাকে গ্রহণ করে এবং যে আমাকে গ্রহণ করে, যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, সে তাঁকেই গ্রহণ করে।” (২১)একথা বলার পর হযরত ইসা আ. অন্তরে অস্থির হলেন এবং বললেন, “আমি তোমাদের সত্যি সত্যিই বলছি, তোমাদের মধ্যে একজন আমার সাথে বেইমানি করবে।” (২২)হাওয়ারিরা একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগলেন; বুঝতে পারলেন না যে, তিনি কার কথা বলছেন।
(২৩)তাঁর এক হাওয়ারি- যাকে হযরত ইসা আ. মহব্বত করতেন- তাঁর পাশেই বসেছিলেন। (২৪)হযরত সাফওয়ান পিতর তাঁকে বললেন, যেনো তিনি হযরত ইসা আ.কে জিজ্ঞেস করেন যে, তিনি কার বিষয়ে বলছেন। (২৫)তাই তিনি হযরত ইসা আ.-র দিকে ঝুঁকে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “হুজুর, সে কে?”
(২৬)হযরত ইসা উত্তর দিলেন, “এই রুটির টুকরো পাত্রে ডুবিয়ে আমি যাকে দেবো, সে-ই সে।” তিনি রুটি ডুবিয়ে ইহুদা ইবনে সিমোন ইস্কারিয়োতকে দিলেন।
(২৭)রুটির টুকরো নেবার পর শয়তান তার ভেতরে ঢুকলো। হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “যা করতে যাচ্ছো তা তাড়াতাড়ি করো।”
(২৮)টেবিলে যারা বসেছিলেন, তারা কেউ জানতেন না যে, তিনি কেনো তাকে একথা বলছেন। (২৯)কেউ কেউ মনে করলেন, যেহেতু তহবিল ইহুদার কাছে রয়েছে, তাই তিনি তাকে বলছেন, ‘ইদে আমাদের যা লাগবে তা কিনে আনো’; অথবা হয়তো গরিবদের কিছু দিতে বলছেন। (৩০)রুটির টুকরো নেবার পর সাথে সাথেই তিনি বাইরে চলে গেলেন। তখন ছিলো রাত।
(৩১)তিনি বাইরে চলে যাবার পর হযরত ইসা আ. বললেন, “ইবনুল-ইনসান এখন মহিমান্বিত হয়েছেন এবং আল্লাহ তাঁর মধ্য দিয়ে মহিমান্বিত হয়েছেন। (৩২)যদি আল্লাহ তাঁর মধ্য দিয়ে মহিমান্বিত হয়ে থাকেন, তাহলে আল্লাহও তাঁকে মহিমান্বিত করবেন এবং এখনই মহিমান্বিত করবেন।
(৩৩)আমার সন্তানেরা, আমি আর অল্প কিছুদিন তোমাদের সাথে আছি। তোমরা আমার খোঁজ করবে। আমি যেমন ইহুদিদের বলেছি, তেমনি তোমাদেরও বলছি, ‘আমি যেখানে যাচ্ছি, তোমরা সেখানে আসতে পারো না। (৩৪)আমি তোমাদের একটি নতুন হুকুম দিচ্ছি যে, তোমরা একজন অন্যজনকে মহব্বত করো। আমি যেভাবে তোমাদের মহব্বত করেছি, একইভাবে তোমাদেরও উচিত একে অন্যকে মহব্বত করা। (৩৫)যদি তোমাদের একজনের জন্য অন্যজনের মহব্বত থাকে, তাহলে সবাই জানবে যে, তোমরা আমার উম্মত।”
(৩৬)হযরত সাফওয়ান পিতর তাঁকে বললেন, “হুজুর, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?” হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “আমি যেখানে যাচ্ছি, তোমরা এখন সেখানে যেতে পারো না কিন্তু পরে তোমরা আমার কাছে আসবে।” (৩৭)হযরত পিতর রা. তাঁকে বললেন, “হুজুর, কেনো আমি এখনই আপনার সাথে যেতে পারবো না? আমি আপনার জন্য আমার জীবন দেবো।” (৩৮)হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “তুমি কি আমার জন্য তোমার জীবন দেবে? আমি তোমাকে সত্যিই বলছি, আজ মোরগ ডাকার আগেই তুমি আমাকে তিনবার অস্বীকার করবে।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)তোমরা অন্তরে অস্থির হয়ো না। আল্লাহর ওপর ইমান রাখো, আমার ওপরও ইমান রাখো। (২)আমার প্রতিপালকের কাছে থাকার অনেক জায়গা আছে। যদি না থাকতো, তাহলে কি আমি তোমাদের বলতাম যে, আমি তোমাদের জন্য জায়গা প্রস্তুত করতে যাচ্ছি? (৩)এবং যদি আমি যাই আর তোমাদের জন্য জায়গা প্রস্তুত করি, আমি আবার ফিরে আসবো এবং তোমাদেরকে আমার কাছে নিয়ে যাবো, যেনো আমি যেখানে থাকি, তোমরাও সেখানে থাকতে পারো। (৪)আর আমি যেখানে যাচ্ছি, সেখানে যাবার পথ তোমরা জানো।”
(৫)হযরত থোমা রা. তাঁকে বললেন, “হুজুর, আপনি কোথায় যাচ্ছেন তা আমরা জানি না, আমরা কীভাবে সেই পথ জানবো?” (৬)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “আমিই পথ, সত্য ও জীবন। আমার মধ্য দিয়ে না গেলে কেউই আল্লাহর কাছে আসতে পারে না।
(৭)যদি তোমরা আমাকে জানো, তাহলে আমার প্রতিপালককে জানবে। এখন থেকে তোমরা তাঁকে জানবে এবং তোমরা তাঁকে দেখেছো।”
(৮)হযরত ফিলিপ রা. তাঁকে বললেন, “হুজুর, প্রতিপালককে আমাদের দেখান, তাহলে আমরা সন্তুষ্ট হবো।” (৯)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “ফিলিপ, এতোদিন ধরে আমি তোমাদের সাথে সাথে আছি অথচ এখনো তুমি আমাকে চেনো না? যে আমাকে দেখেছে, সে প্রতিপালককে দেখেছে। (১০)কীভাবে তুমি বলতে পারো যে, ‘প্রতিপালককে আমাদের দেখান?’ তুমি কি বিশ্বাস করো না যে, আমি প্রতিপালকের মধ্যে আছি এবং প্রতিপালক আমার মধ্যে আছেন? আমি যেকথা বলি তা আমার নিজের কথা নয় কিন্তু যিনি আমার মধ্যে আছেন, সেই প্রতিপালক তাঁর নিজের কাজ করেন। (১১)আমার ওপর ইমান রাখো যে, আমি প্রতিপালকের মধ্যে আছি এবং প্রতিপালক আমার মধ্যে আছেন। কিন্তু তুমি যদি তা না করো, তবে কাজগুলোর জন্য আমার ওপর ইমান আনো।
(১২)আমি তোমাকে সত্যি সত্যিই বলছি, যে কেউ আমার ওপর ইমান আনে, আমি যে-কাজ করি সে তা করবে; এমনকি এর থেকেও মহৎ কাজ করবে, কারণ আমি প্রতিপালকের কাছে যাচ্ছি।
(১৩)তোমরা আমার নামে যা চাবে, আমি তা করবো, যেনো একান্ত প্রিয় মনোনীতজনের মাধ্যমে আল্লাহ মহিমান্বিত হন। (১৪)তোমরা যদি আমার নামে আমার কাছে কিছু চাও, তাহলে নিশ্চয়ই আমি তা করবো।
(১৫)যদি তোমরা আমাকে মহব্বত করো, তাহলে আমার হুকুমগুলো পালন করবে। (১৬)আমি প্রতিপালকের কাছে চাবো এবং তিনি তোমাদের সাথে চিরদিন থাকার জন্য আরেকজন সাহায্যকারী পাঠাবেন। (১৭)ইনি হচ্ছেন সত্যের রুহ। দুনিয়া তাঁকে গ্রহণ করতে পারে না, কারণ দুনিয়া তাঁকে দেখতে পায় না এবং জানেও না; কিন্তু তোমরা তাঁকে জানো, কারণ তিনি তোমাদের সাথে থাকবেন এবং তিনি তোমাদের মধ্যে থাকবেন।
(১৮)আমি তোমাদের অসহায় রেখে যাবো না, আমি তোমাদের কাছে আসবো। (১৯)কিছুদিনের মধ্যে দুনিয়া আমাকে আর দেখতে পাবে না কিন্তু তোমরা আমাকে দেখবে, কারণ আমি জীবিত এবং তোমরাও জীবিত থাকবে। (২০)সেদিন তোমরা জানবে যে, আমি প্রতিপালকের মধ্যে আছি আর তোমরা আমার মধ্যে আছো এবং আমি আছি তোমাদের মধ্যে।
(২১)আমার হুকুম যাদের কাছে আছে এবং যারা তা পালন করে, তারাই আমাকে মহব্বত করে। এবং যারা আমাকে মহব্বত করে, আমার প্রতিপালক তাদের মহব্বত করবেন; আমিও তাদের মহব্বত করবো এবং নিজেকে তাদের কাছে প্রকাশ করবো।”
(২২)ইহুদা, ইস্কারিয়োত নন- তাঁকে বললেন, “হুজুর, এটি কেমন কথা যে, আপনি নিজেকে আমাদের কাছে প্রকাশ করবেন অথচ দুনিয়ার কাছে নয়।” (২৩)হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “যারা আমাকে মহব্বত করে, তারা আমার হুকুম পালন করবে এবং আমার প্রতিপালক তাদের মহব্বত করবেন আর আমরা এসে তাদের মধ্যে বসবাস করবো।
(২৪)যে আমাকে মহব্বত করে না, সে আমার কালাম পালন করে না। এবং তোমরা যে কালাম শুনছো তা আমার নয় কিন্তু তা আমার প্রতিপালকের, যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন।
(২৫)আমি তোমাদের সাথে থাকতে থাকতেই তোমাদের এসব কথা বলছি। (২৬)কিন্তু সাহায্যকারী, যিনি সত্যের রুহ, যাকে প্রতিপালক আমার নামে পাঠিয়ে দেবেন, তিনি তোমাদের সবকিছু শিক্ষা দেবেন। এবং আমি যা যা বলেছি, তার সব তোমাদের স্মরণ করিয়ে দেবেন। (২৭)আমি তোমাদের জন্য শান্তি রেখে যাচ্ছি; আমার শান্তি আমি তোমাদের দিচ্ছি। দুনিয়া যেভাবে দেয় আমি সেভাবে তোমাদেরকে দেই না। তোমাদের অন্তর অস্থির হতে দিয়ো না এবং ভয় পেয়ো না।
(২৮)তোমরা আমাকে একথা বলতে শুনেছো, ‘আমি চলে যাচ্ছি এবং আমি আবার তোমাদের কাছে আসছি।’ যদি তোমরা আমাকে মহব্বত করো, তাহলে আনন্দ করবে, কারণ আমি আল্লাহর কাছে যাচ্ছি এবং তিনি আমার থেকে মহান।
(২৯)এসব ঘটার আগেই আমি তোমাদের বললাম, যেনো যখন এসব ঘটবে, তখন তোমরা ইমান আনতে পারো। (৩০)আমি তোমাদের আর বেশি কথা বলবো না, কারণ এই দুনিয়ার শাসনকর্তা আসছে। আমার ওপর তার কোনো ক্ষমতা নেই। (৩১)প্রতিপালক আমাকে যে-হুকুম দিয়েছেন, আমি তা-ই করছি, যেনো দুনিয়া জানতে পারে যে, আমি প্রতিপালককে মহব্বত করি। ওঠো, চলো, আমরা আমাদের পথে যাই।
Facebook
WhatsApp
Telegram
Telegram
