অডিও শুনতে এখানে ক্লিক করুন
১তিনি লোকদের কাছে তাঁর সব কথা শেষ করে কফরনাহুমে চলে গেলেন। ২সেখানে একজন শত-সৈন্যের সেনাপতির এক গোলাম ছিলো, যে তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। সে অসুস্থ হয়ে প্রায় মরার মতো হয়েছিলো। ৩তিনি হযরত ইসা আ.র বিষয়ে শুনে ইহুদিদের কয়েকজন বুজুর্গকে তাঁর কাছে অনুরোধ করতে পাঠালেন, যেনো তিনি এসে তার গোলামকে সুস্থ করেন। ৪তারা হযরত ইসা আ.র কাছে এসে তাঁকে বিশেষভাবে অনুরোধ করে বললেন, “আপনি যার জন্য একাজ করবেন, তিনি এর উপযুক্ত। ৫কারণ তিনি আমাদের লোকদের মহব্বত করেন এবং আমাদের জন্য সিনাগোগও তৈরি করে দিয়েছেন।”
৬হযরত ইসা আ. তাদের সাথে গেলেন। তিনি তার বাড়ির কাছে এলে সেই সেনাপতি তার বন্ধুদের দিয়ে তাঁকে বলে পাঠালেন, “মালিক, আর কষ্ট করবেন না। কারণ আপনি যে আমার বাড়িতে ঢোকেন, তার যোগ্য আমি নই। ৭সেজন্য আমি নিজেকে আপনার কাছে যাবার উপযুক্তও মনে করিনি। আপনি কেবল মুখে বলুন, তাতেই আমার গোলাম ভালো হয়ে যাবে। ৮কারণ আমিও অন্যের অধীনে নিযুক্ত এবং আমার অধীনের সৈন্যরাও আমার কথামতো চলে। আমি একজনকে ‘যাও’ বললে সে যায়, অন্যজনকে ‘এসো’ বললে সে আসে। আমার গোলামকে ‘এটি করো’ বললে সে তা করে।”
৯একথা শুনে হযরত ইসা আ. আশ্চর্য হলেন এবং যে-জনতা তাঁর পেছনে পেছনে আসছিলো, তাদের দিকে ফিরে বললেন, “আমি তোমাদের বলছি, এমন ইমান আমি বনি-ইস্রাইলের মধ্যেও পাইনি।” ১০যাদের পাঠানো হয়েছিলো, তারা তার ঘরে ফিরে গিয়ে সেই গোলামকে সুস্থ দেখতে পেলেন।
১১এরপরই তিনি নায়িন নামে একটি শহরে গেলেন। তাঁর হাওয়ারিরা এবং এক বিশাল জনতা তাঁর সাথে সাথে গেলেন। ১২যখন তিনি শহরের দরজার কাছে পৌঁছালেন, তখন লোকেরা একটি মরা মানুষকে বয়ে নিয়ে বাইরে যাচ্ছিলো। সে ছিলো তার মায়ের একমাত্র সন্তান, আর সেই মা-ও ছিলেন বিধবা এবং তার সাথে গ্রামের অনেক লোকও যাচ্ছিলো। ১৩হযরত ইসা আ. তাকে দেখে মমতায় পূর্ণ হলেন এবং তাকে বললেন, “আর কেঁদো না।” ১৪তারপর তিনি কাছে গিয়ে খাটিয়া ছুঁলেন এবং লাশ বহনকারীরা দাঁড়ালো। তিনি বললেন, “যুবক, আমি তোমাকে বলছি, ওঠো!” ১৫তাতে মৃতলোকটি উঠে বসলো ও কথা বলতে লাগলো। হযরত ইসা আ. তাকে তার মায়ের কাছে দিয়ে দিলেন। ১৬তখন তারা সকলে ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলো এবং আল্লাহর প্রশংসা করে বলতে লাগলো, “আমাদের মধ্যে একজন মহান নবি উপস্থিত হয়েছেন!” এবং “আল্লাহ দয়া করে তাঁর বান্দাদের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন!” ১৭তাঁর বিষয়ে এসব কথা ইহুদিয়া ও তার আশেপাশের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়লো।
১৮হযরত ইয়াহিয়া আ.র সাহাবিরা এসব ঘটনার কথা তাকে জানালেন। তখন হযরত ইয়াহিয়া আ. তার দু’জন সাহাবিকে ডাকলেন
১৯এবং হযরত ইসা আ.র কাছে একথা জিজ্ঞেস করতে পাঠালেন, “যাঁর আসার কথা আছে, আপনিই কি তিনি, নাকি আমরা অন্য কারো জন্য অপেক্ষা করবো?”
২০তারা তাঁর কাছে এসে বললেন, “ হযরত ইয়াহিয়া আ. আমাদেরকে আপনার কাছে জিজ্ঞেস করতে পাঠিয়েছেন, ‘যাঁর আসার কথা আছে, আপনিই কি তিনি, নাকি আমরা অন্য কারো জন্য অপেক্ষা করবো?’” ২১সেই সময় হযরত ইসা আ. অনেক লোককে রোগ ও যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করলেন এবং ভূত তাড়ালেন আর অনেক অন্ধকে দেখার শক্তি দিলেন। ২২তিনি তাদের জবাব দিলেন, “তোমরা যা দেখলে ও শুনলে তা গিয়ে ইয়াহিয়াকে বলো- অন্ধরা দেখছে, খোঁড়ারা হাঁটছে, কুষ্ঠরোগীরা পাকসাফ হচ্ছে, কালারা শুনছে, মৃতেরা বেঁচে উঠছে এবং গরিবদের কাছে সুখবর প্রচার করা হচ্ছে। ২৩আর সেই ব্যক্তি রহমতপ্রাপ্ত, যে আমাকে নিয়ে কোনো বাধা না পায়।”
২৪হযরত ইয়াহিয়া আ.র সংবাদ বাহকেরা চলে গেলে পর হযরত ইসা আ. লোকদের কাছে হযরত ইয়াহিয়া আ.র বিষয়ে বলতে লাগলেন, “তোমরা মরুপ্রান্তরে কী দেখতে গিয়েছিলে? বাতাসে দোল খাওয়া একটি নলখাগড়া? ২৫তা না হলে কী দেখতে গিয়েছিলে? দামি পোশাক পরা কোনো লোককে কি? যারা দামি পোশাক পরে ও জাঁকজমকের সাথে বসবাস করে, তারা তো রাজবাড়িতেই থাকে। ২৬তা না হলে কী দেখতে গিয়েছিলে? একজন নবিকে? হ্যাঁ, আমি তোমাদের বলছি, একজন নবির চেয়েও বেশি। ২৭ইনি সেই লোক যাঁর বিষয়ে লেখা আছে, ‘দেখো, আমি তোমার আগে আমার নবিকে পাঠাচ্ছি। সে তোমার আগে গিয়ে তোমার পথ প্রস্তুত করবে।’ ২৮আমি তোমাদের বলছি, মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া কেউই হযরত ইয়াহিয়া আ.র চেয়ে বড়ো নয়। তবুও আল্লাহর রাজ্যে সবচেয়ে যে ছোটো, সেও হযরত ইয়াহিয়া আ.র চেয়ে মহান।”
২৯কর-আদায়কারীরাসহ যতো লোক এসব কথা শুনলো, সবাই আল্লাহ যে ন্যায়বান তা স্বীকার করলো। কারণ তারা হযরত ইয়াহিয়া আ.র কাছে তরিকা নিয়েছিলো। ৩০কিন্তু ফরিসিরা ও আলিমরা তার কাছে বায়াত নিতে অস্বীকার করে নিজেদের জন্য আল্লাহর উদ্দেশ্যকে অগ্রাহ্য করেছেন। ৩১“তাহলে এ-কালের লোকদের আমি কাদের সাথে তুলনা করবো?
তারা কী রকম? ৩২তারা এমন ছেলে-মেয়েদের মতো, যারা বাজারে বসে একে অন্যকে ডেকে বলে, ‘আমরা তোমাদের জন্য বাঁশি বাজালাম কিন্তু তোমরা নাচলে না; আমরা বিলাপ করলাম কিন্তু তোমরা কাঁদলে না।’
৩৩হযরত ইয়াহিয়া আ. এসে রুটি বা আঙুররস খেলেন না বলে তোমরা বললে, ‘ওকে ভূতে পেয়েছে।’ ৩৪আর ইবনুল-ইনসান এসে খাওয়া-দাওয়া করলেন বলে তোমরা বলছো, ‘দেখো, এই লোকটি পেটুক ও মদখোর, কর-আদায়কারী ও গুনাহগারদের বন্ধু।’ ৩৫কিন্তু জ্ঞান তার সন্তানদের দ্বারাই উত্তম বলে প্রমাণিত হয়।”
৩৬এক ফরিসি হযরত ইসা আ.কে তাঁর সাথে খাওয়ার দাওয়াত করলেন এবং তিনি তার বাড়িতে গিয়ে খেতে বসলেন। ৩৭সেই শহরের এক গুনাহগার মহিলা যখন জানলো যে, তিনি ফরিসির ঘরে খেতে বসেছেন, তখন সে একটি সাদা পাথরের পাত্রে করে সুগন্ধি তেল নিয়ে এলো। ৩৮সে তাঁর পেছনে এসে পায়ের কাছে দাঁড়ালো এবং কেঁদে কেঁদে চোখের পানিতে তাঁর পা ভেজাতে লাগলো। সে তার মাথার চুল দিয়ে তাঁর পা মুছে দিলো। তারপর তাঁর পায়ের ওপর চুমু দিতে দিতে সেই সুগন্ধি তেল মাখিয়ে দিলো। ৩৯যে-ফরিসি তাঁকে দাওয়াত করেছিলেন, তিনি তা দেখে মনে মনে বলতে লাগলেন, “ইনি যদি নবি হতেন, তাহলে জানতে পারতেন, কে এবং কী রকম মহিলা তাঁর পা স্পর্শ করছে; সে তো গুনাহগার।”
৪০হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “সিমোন, তোমাকে আমার কিছু বলার আছে।” তিনি বললেন, “হুজুর, বলুন।” ৪১“কোনো এক মহাজনের কাছ থেকে দু’ব্যক্তি ঋণ নিয়েছিলো। একজন নিয়েছিলো পাঁচশো দিনার আর অন্যজন পঞ্চাশ দিনার। ৪২তাদের কারোরই ঋণ শোধ করার ক্ষমতা ছিলো না বলে তিনি দু’জনকেই মাফ করে দিলেন। এখন দু’জনের মধ্যে কে তাকে বেশি মহব্বত করবে?” ৪৩সিমোন বললেন, “আমার মনে হয়, যার বেশি ঋণ মাফ করা হলো, সে-ই।” হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছো।”
৪৪অতঃপর মহিলার দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি সিমোনকে বললেন, “তুমি কি এই মহিলাকে দেখছো? আমি তোমার ঘরে এলে তুমি আমার পা ধোয়ার পানি দাওনি কিন্তু সে চোখের পানিতে আমার পা ধুয়ে তার চুল দিয়ে মুছে দিয়েছে।
৪৫তুমি আমাকে চুমু দাওনি কিন্তু আমি ভেতরে আসার পর থেকেই সে আমার পায়ে চুমু দেয়া বন্ধ করেনি। ৪৬তুমি আমার মাথায় তেল দাওনি কিন্তু সে আমার পায়ের ওপর সুগন্ধি তেল মাখিয়ে দিয়েছে। ৪৭তাই আমি তোমাকে বলছি, তার অনেক গুনাহ, যা মাফ করা হয়েছে, এজন্য সে বেশি মহব্বত দেখিয়েছে। যার অল্প মাফ করা হয়, সে অল্পই মহব্বত দেখায়।
৪৮অতঃপর তিনি মহিলাকে বললেন, “তোমার গুনাহ মাফ করা হয়েছে।” ৪৯যারা তাঁর সাথে খেতে বসেছিলো, তারা মনে মনে বলতে লাগলো, “এ কে, যে গুনাহও মাফ করে?” ৫০কিন্তু তিনি মহিলাকে বললেন, “তোমার ইমান তোমাকে নাজাত দিয়েছে; শান্তিতে চলে যাও।”
Facebook
WhatsApp
Telegram
Email
























