ইবনুল-ইনসান: রুকু – ২৩

248619
Total
Visitors
অডিও শুনতে এখানে ক্লিক করুন
১তখন মহাসভার সবাই উঠে হযরত ইসা আ.কে পিলাতের কাছে নিয়ে গেলেন। ২তারা এই বলে তাঁর বিরুদ্ধে দোষ দিতে লাগলেন, “আমরা দেখেছি, এই লোকটি আমাদের লোকদের সরকারের বিরুদ্ধে নিয়ে যাচ্ছে।

সে কাইসারকে কর দিতে নিষেধ করে এবং নিজেই নিজেকে মসিহ- একজন বাদশা- বলে দাবি করে।” ৩পিলাত তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি ইহুদিদের বাদশা?” তিনি উত্তর দিলেন, “আপনিই তা বলছেন।” ৪তখন পিলাত প্রধান ইমামদের ও সমস্ত লোকদের বললেন, “আমি তো এই লোকটিকে দোষারোপ করার কোনো কারণ দেখতে পাচ্ছি না।” ৫কিন্তু তারা জোর দিয়ে বলতে লাগলেন, “ইহুদিয়া প্রদেশের সব জায়গায় সে শিক্ষা দিয়ে লোকদের ক্ষেপিয়ে তুলেছে। সে শুরু করেছে গালিল প্রদেশ থেকে আর এখন এখানেও এসেছে।”

৬একথা শুনে পিলাত জিজ্ঞেস করলেন লোকটি গালিলের কিনা। ৭তিনি যখন বুঝলেন যে, তিনি হেরোদের শাসনাধীন এলাকার লোক, তখন তিনি তাঁকে হেরোদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন, কারণ সেই সময় হেরোদও জেরুসালেমে ছিলেন। ৮হযরত ইসা আ.কে দেখে হেরোদ খুব খুশি হলেন। তিনি অনেকদিন থেকে তাঁকে দেখতে চাচ্ছিলেন। কারণ তিনি তাঁর বিষয়ে শুনেছিলেন এবং তাঁর কাছ থেকে চিহ্ন হিসেবে মোজেজা দেখার আশা করছিলেন। ৯তিনি তাঁকে অনেক প্রশ্ন করলেন কিন্তু হযরত ইসা আ. তার কোনো কথারই জবাব দিলেন না।

১০প্রধান ইমামেরা এবং আলিমরা সেখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে তাঁকে দোষারোপ করতে থাকলেন। ১১হেরোদও তার সৈন্যদের নিয়ে তাঁকে অপমান ও ঠাট্টা করলেন। তারপর তিনি তাঁকে ঝলমলে একটি পোশাক পরিয়ে পিলাতের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। ১২ওই দিন থেকে পিলাত ও হেরোদ একে অন্যের বন্ধু হয়ে গেলেন। এর আগে তাদের মধ্যে শত্রুতা ছিলো।

১৩পিলাত তখন প্রধান ইমামদের, নেতাদের এবং লোকদের ডেকে একত্র করে বললেন, ১৪“আপনারা এই লোকটিকে এই দোষে আমার কাছে এনেছেন যে, সে লোকদের নিয়ে যাচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে কিন্তু আমি আপনাদের সামনেই তাকে জেরা করেছি। আপনারা তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করছেন, তার একটিতেও সে দোষী বলে আমি প্রমাণ পাইনি। ১৫হেরোদও তার কোনো দোষ পাননি, কারণ তিনি তাকে আমাদের কাছে ফেরত পাঠিয়েছেন। নিশ্চয়ই সে মৃত্যুদন্ডের যোগ্য কোনো দোষ করেনি। ১৬তাই আমি তাকে শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেবো।”

১৭প্রত্যেক ইদুল ফেসাখের সময় একজন কয়েদিকে ছেড়ে দেবার নিয়ম প্রচলিত ছিলো।

১৮তখন তারা একসাথে চিৎকার করে বলতে লাগলো, “ওকে মেরে ফেলুন, আমাদের জন্য বারাব্বাকে ছেড়ে দিন।” ১৯শহরের মধ্যে বিদ্রোহ ও খুনোখুনির জন্য এই বারাব্বাকে জেলে দেয়া হয়েছিলো।

২০পিলাত হযরত ইসা আ.কে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি আবার তাদের সাথে কথা বললেন। ২১কিন্তু তারা এই বলে চিৎকার করতে থাকলো, “ওকে সলিবে দিন, সলিবে দিন।”

২২তৃতীয়বার তিনি তাদের বললেন, “কেনো, এ কী দোষ করেছে? আমি তো মৃত্যুদন্ড দেবার মতো তার কোনো দোষই পাইনি; এজন্য আমি তাকে অন্য শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেবো।” ২৩কিন্তু তারা চিৎকার করে বলতে থাকলো যে, তাকে সলিবে দেয়া হোক এবং শেষে তারা চিৎকার করেই জয়ী হলো। ২৪পিলাত তাদের দাবি মেনে নিয়ে তার রায় দিলেন। ২৫তারা যাকে চেয়েছিলো, তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন, বিদ্রোহ ও খুনের জন্য তাকে জেলে দেয়া হয়েছিলো। এবং তিনি তাদের ইচ্ছামতোই হযরত ইসা আ.কে হত্যা করার জন্য দিয়ে দিলেন।

২৬তারা যখন তাঁকে নিয়ে যাচ্ছিলো, তখন সিমোন নামে কুরিনি শহরের এক লোককে তারা আটকালো। সে গ্রামের দিক থেকে আসছিলো। তারা সলিবটি তার কাঁধে তুলে দিলো এবং তাকে বাধ্য করলো হযরত ইসা আ.র পেছনে পেছনে তা বয়ে নিয়ে যেতে। ২৭বিরাট একদল লোক তাঁর পেছনে পেছনে চললো। তাদের মধ্যে মহিলারাও ছিলেন। তারা তাঁর জন্য বুক চাপড়ে বিলাপ করছিলেন।

২৮কিন্তু হযরত ইসা আ. তাদের দিকে ফিরে বললেন, “জেরুসালেমের মহিলারা, আমার জন্য কেঁদো না কিন্তু তোমাদের নিজেদের ও তোমাদের সন্তানদের জন্য কাঁদো। ২৯কারণ এমন দিন অবশ্যই আসছে, যখন তারা বলবে, ‘ভাগ্যবতী তারা, যারা বন্ধ্যা, যাদের গর্ভ সন্তান ধরেনি এবং সে, যে বুকের দুধ খাওয়ায়নি।’ ৩০তারা তখন পর্বতকে বলতে থাকবে, ‘আমাদের ওপরে পড়ো,’ আর পাহাড়কে বলবে, ‘আমাদের ঢেকে রাখো।’

৩১কারণ গাছ সবুজ থাকতে যদি তারা এরকম করে, তাহলে গাছ শুকিয়ে গেলে কী ঘটবে?”

৩২তারা অন্য দু’জন অপরাধীকেও তাঁর সাথে হত্যা করার জন্য নিয়ে চললো। ৩৩তারা মাথারখুলি নামক জায়গায় পৌঁছে হযরত ইসা আ.কে ও সেই দুই অপরাধীকে- একজনকে তাঁর ডান দিকে ও অন্যজনকে তাঁর বাঁ দিকে- সলিবে দিলো।

৩৪তখন হযরত ইসা আ. বললেন, “হে প্রতিপালক, এদের মাফ করো, কারণ এরা কী করছে তা এরা জানে না।” তারা ভাগ্যপরীক্ষা করে তাঁর জামাকাপড় নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলো। ৩৫লোকেরা কাছে দাঁড়িয়ে দেখছিলো। নেতারা তাঁকে ঠাট্টা করে বললেন, “সে তো অন্যদের রক্ষা করতো; সে যদি মসিহ হয়, তাঁর মনোনীত লোক হয়, তাহলে সে নিজেকে রক্ষা করুক!” ৩৬সৈন্যরাও তাঁকে ঠাট্টা করতে লাগলো। তারা তাঁকে সিরকা খেতে দেবার জন্য তাঁর কাছে নিয়ে গিয়ে বললো, ৩৭“তুমি যদি ইহুদিদের বাদশা হও, তাহলে নিজেকে রক্ষা করো!” ৩৮সলিবে তাঁর মাথার ওপরের দিকে একটি ফলকে একথা লেখা ছিলো, “এই লোকটি ইহুদিদের বাদশা।”

৩৯সেখানে টাঙানো দোষীদের একজন তাঁকে টিটকারি করে বললো, “তুমি নাকি মসিহ? তাহলে নিজেকে ও আমাদের রক্ষা করো!” ৪০তখন অন্য লোকটি তাকে ধমক দিয়ে বললো, “তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? তুমিও তো একইরকম শাস্তি পাচ্ছো। ৪১আমরা উচিত শাস্তি পাচ্ছি। আমাদের যা পাওনা আমরা তা-ই পাচ্ছি কিন্তু এই লোকটি কোনো দোষ করেননি।” ৪২তারপর সে বললো, “হে ইসা, আপনি যখন আপনার রাজ্যে রাজত্ব করতে ফিরবেন, তখন আমাকে স্মরণ করবেন।” ৪৩তিনি উত্তর দিলেন, “আমি তোমাকে সত্যি বলছি, তুমি আজই আমার সাথে জান্নাতে যাবে।”

৪৪তখন বেলা প্রায় বারোটা। বিকেল তিনটা পর্যন্ত সারা দেশ অন্ধকারে ছেয়ে গেলো। ৪৫সূর্য যখন অন্ধকারে ঢেকে গেলো এবং বায়তুল-মোকাদ্দসের পর্দাটি মাঝখান দিয়ে চিরে দু’ভাগ হয়ে গেলো, ৪৬তখন হযরত ইসা আ. জোরে চিৎকার করে বললেন, “হে প্রতিপালক, আমি তোমার হাতে আমার রুহ তুলে দিলাম।” একথা বলে তিনি ইন্তেকাল করলেন।

৪৭এসব দেখে রোমীয় শত সৈন্যের সেনাপতি আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন, “সত্যিই এই লোকটি দীনদার ছিলেন।” ৪৮যে-লোকেরা সেখানে জমায়েত হয়েছিলো, তারা এই সমস্ত ঘটনা দেখে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বাড়ি ফিরে গেলো। ৪৯যারা হযরত ইসা আ.কে চিনতেন এবং যে-মহিলারা গালিল থেকে তাঁর সাথে সাথে এসেছিলেন, তারা সবাই দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিলেন।

৫০ইউসুফ নামে এক সৎ ও দীনদার লোক ছিলেন। তিনি মহাসভার সদস্যও ছিলেন। ৫১তিনি তাদের কাজ ও পরিকল্পনার সাথে একমত ছিলেন না। তিনি ইহুদিদের গ্রাম অরিমাথিয়া থেকে এসেছিলেন এবং তিনি আল্লাহর রাজ্যের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ৫২তিনি পিলাতের কাছে গিয়ে হযরত ইসা আ.র দেহ-মোবারক চেয়ে নিলেন। ৫৩তিনি তা সলিব থেকে নামিয়ে লিনেন কাপড়ের কাফনে জড়ালেন এবং পাথর কেটে তৈরি করা একটি কবরে দাফন করলেন। সেই কবরে আর কখনো কাউকে দাফন করা হয়নি।

৫৪এটি ছিলো সাব্বাতের প্রস্তুতির দিন এবং সাব্বাত প্রায় শুরু হয়ে গিয়েছিলো। ৫৫যে-মহিলারা তাঁর সাথে গালিল থেকে এসেছিলেন, তারা তাঁর পেছনে পেছনে গিয়ে কবরটি দেখলেন এবং কীভাবে তাঁর দেহ-মোবারক দাফন করা হলো, তাও দেখলেন। ৫৬তারপর তারা ফিরে গিয়ে তাঁর দেহ-মোবারকের জন্য সুগন্ধি মসলা এবং সুগন্ধি তেল তৈরি করলেন। সাব্বাতে তারা শরিয়ত অনুসারে বিশ্রাম করলেন।
Facebook
WhatsApp
Telegram
Email
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ১
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ২
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ৩
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ৪
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ৫
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ৬
ইবনুল-ইনসান: রুকু – ৭
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ৮
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ৯
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ১০
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ১১
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ১২
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ১৩
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ১৪
ইবনুল-ইনসান: রুকু ১৫
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ১৬
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ১৭
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ১৮
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ১৯
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ২০
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ২১
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ২২
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ২৩
ইবনুল-ইনসান: রুকু - ২৪