- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০
- ১১
- ১২
- ১৩
- ১৪
- ১৫
- ১৬
- ১৭
- ১৮
- ১৯
- ২০
- ২১
- ২২
- ২৩
- ২৪
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
১(১,২) মাননীয় থিয়ফিল, আমাদের মধ্যে যেসব ঘটনা ঘটেছে তা যারা প্রথম থেকে নিজের চোখে দেখেছেন ও আল্লাহর কালাম প্রচার করেছেন, তারা আমাদের কাছে সমস্ত বিষয় জানিয়েছেন, আর তাদের কথামতোই অনেকে সেসব বিষয় পরপর সাজিয়ে লিখেছেন। (৩)আমি সেসব বিষয় সম্বন্ধে প্রথম থেকে ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে আপনার জন্য তা একটি একটি করে লেখা ভালো মনে করলাম; (৪)এর ফলে আপনি যা জেনেছেন তা সত্যি কিনা জানতে পারবেন।
(৫)ইহুদিয়া প্রদেশের বাদশাহ হেরোদের সময় ইমাম আবিযার বংশের যারা ইমাম ছিলেন, হযরত জাকারিয়া আ. ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। তার স্ত্রী ছিলেন হযরত হারুন আ. এর বংশধর এবং তার নাম ছিলো হযরত ইলিছাবেত রা.। (৬)তারা দু’জনই আল্লাহর চোখে দীনদার ছিলেন এবং আল্লাহর বাধ্য থেকে তাঁর সমস্ত হুকুম নিখুঁতভাবে পালন করতেন। (৭)তাদের কোনো ছেলেমেয়ে ছিলো না, কারণ হযরত ইলিছাবেত রা. ছিলেন বন্ধ্যা এবং তাদের বয়সও খুব বেশি হয়ে গিয়েছিলো।
(৮)একবার নিজের দলের পালার সময় তিনি ইমাম হিসেবে আল্লাহর এবাদত করছিলেন। (৯)ইমাম নির্বাচনের প্রচলিত নিয়ম অনুসারে ভাগ্য পরীক্ষা দ্বারা তাকেই বেছে নেয়া হয়েছিলো, যেনো তিনি বায়তুল মোকাদ্দসের পবিত্র-স্থানে গিয়ে সুগন্ধি জ্বালাতে পারেন। (১০)হযরত জাকারিয়া আ. যখন সুগন্ধি জ্বালাচ্ছিলেন, তখন সমাজের সব লোক বাইরে মোনাজাত করছিলো।
(১১)এমন সময় সুগন্ধি জ্বালানোর স্থানের ডান দিকে আল্লাহর এক ফেরেস্তা হঠাৎ এসে তাকে দেখা দিলেন। (১২)তাকে দেখে হযরত জাকারিয়া আ. অস্থির হয়ে উঠলেন এবং ভয় তাঁকে ঘিরে ধরলো। (১৩)ফেরেস্তা তাকে বললেন, “জাকারিয়া, ভয় করো না, কারণ তোমার মোনাজাত কবুল হয়েছে। তোমার স্ত্রী ইলিছাবেতের একটি ছেলে হবে এবং তুমি তার নাম রাখবে ইয়াহিয়া। (১৪)সে তোমার খুশি ও আনন্দের কারণ হবে এবং তার জন্মে আরো অনেকে আনন্দিত হবে; (১৫)কারণ আল্লাহর চোখে সে মহান হবে। সে কখনো আঙুররস বা নেশাজাতীয় কোনো কিছু পান বা গ্রহণ করবে না। এমনকি মায়ের গর্ভে থাকতেই সে আল্লাহর রুহে পূর্ণ হবে।
(১৬)বনি-ইস্রাইলের অনেককেই সে তাদের মালিক আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিনের কাছে ফিরিয়ে আনবে। (১৭) সে হযরত ইলিয়াস আ. এর রুহ ও ক্ষমতা নিয়ে তাঁর আগে আসবে, যেনো সে পিতার মন সন্তানের দিকে, অবাধ্যদের দীনদারীর জ্ঞানের দিকে ফেরাতে এবং আল্লাহর জন্য একদল লোককে প্রস্তুত করতে পারে।”
(১৮)হযরত জাকারিয়া আ. ফেরেস্তাকে বললেন, “এসব যে ঘটবে তা আমি কীভাবে বুঝবো? কারণ আমি তো বৃদ্ধ হয়েছি এবং আমার স্ত্রীও বৃদ্ধা।”
(১৯)ফেরেস্তা তাকে বললেন, “আমি জিব্রাইল, আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। তোমার সাথে কথা বলার ও তোমাকে এই সুখবর দেবার জন্য আমাকে পাঠানো হয়েছে। (২০)আমার কথা সময়মতোই পূর্ণ হবে কিন্তু তুমি আমার কথায় বিশ্বাস করোনি বলে যতোদিন এসব না ঘটে, ততোদিন তুমি কথা বলতে পারবে না- বোবা হয়ে থাকবে।”
(২১)এদিকে লোকেরা হযরত জাকারিয়া আ. এর জন্য অপেক্ষা করছিলো। বায়তুল-মোকাদ্দসের পবিত্র-স্থানে তার দেরি হচ্ছে দেখে তারা চিন্তা করতে লাগলো। (২২)তিনি যখন বেরিয়ে এলেন, তখন তাদের সাথে কথা বলতে পারলেন না। এতে তারা বুঝতে পারলো যে, তিনি সেখানে কোনোকিছু দেখেছেন। তিনি তাদের কাছে ইশারা করতে থাকলেন কিন্তু কথা বলতে পারলেন না। (২৩)ইমামতির কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি বাড়ি ফিরে গেলেন।
(২৪)সেই দিনগুলোর পর তাঁর স্ত্রী হযরত ইলিছাবেত রা গর্ভবতী হলেন এবং পাঁচ মাস পর্যন্ত বাড়ি ছেড়ে বাইরে গেলেন না। (২৫)তিনি বললেন, “আল্লাহ আমার জন্য একাজ করেছেন। মানুষের কাছে আমার লজ্জা দূর করার জন্য তিনি আমার প্রতি নজর দিয়েছেন।”
(২৬)তার যখন ছ’মাসের গর্ভ, তখন আল্লাহ গালিলের নাসরত গ্রামের এক কুমারীর কাছে হযরত জিব্রাইল আ. কে পাঠালেন। (২৭)হযরত দাউদ আ. এর বংশের হযরত ইউসুফ র. নামে এক লোকের সাথে তাঁর বিয়ে ঠিক হয়েছিলো। সেই কুমারীর নাম ছিলো হযরত মরিয়ম আ.। (২৮)তিনি তার কাছে এসে তাকে বললেন, “আস্সালামু আলাইকুম, তুমি আল্লাহর বিশেষ রহমত পেয়েছো; তিনি তোমার সাথে আছেন!” (২৯)কিন্তু একথা শুনে হযরত মরিয়ম আ. হতবাক হয়ে গেলেন এবং ভাবতে লাগলেন, এই সব কথার মানে কী!
(৩০)ফেরেস্তা তাকে বললেন, “মরিয়ম, ভয় করো না, কারণ তুমি আল্লাহর রহমত পেয়েছো। (৩১)এখন তুমি গর্ভবতী হবে আর তোমার একটি ছেলে হবে। তুমি তাঁর নাম রাখবে ইসা। (৩২)তিনি মহান হবেন; তাঁকে সর্বশক্তিমানের একান্ত প্রিয় মনোনীতজন বলা হবে এবং আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিন তাঁর পূর্বপুরুষ হযরত দাউদ আ. এর সিংহাসন তাঁকে দেবেন। (৩৩)তিনি হযরত ইয়াকুব আ. এর বংশের লোকদের ওপর চিরকাল রাজত্ব করবেন; তাঁর রাজত্ব কখনো শেষ হবে না।”
(৩৪)হযরত মরিয়ম আ. ফেরেস্তাকে বললেন, “এটি কীভাবে হবে, আমি তো এখনো কুমারী? ” (৩৫)ফেরেস্তা তাঁকে বললেন, “আল্লাহর রুহ তোমার ওপর আসবেন এবং সর্বশক্তিমানের শক্তি তোমাকে ছায়া দেবে। এজন্য যে-সন্তানের জন্ম হবে, তিনি হবেন পবিত্র এবং তাঁকে আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন বলে ডাকা হবে। (৩৬)দেখো, এই বৃদ্ধ বয়সে তোমার আত্মীয়া ইলিছাবেতও ছেলে গর্ভে ধারণ করেছে। লোকে তাকে বন্ধ্যা বলতো কিন্তু এখন তার ছ’মাসের গর্ভ চলছে। (৩৭)আসলে, আল্লাহর পক্ষে কোনোকিছুই অসম্ভব নয়।”
(৩৮)হযরত মরিয়ম আ. বললেন, “আমি আল্লাহর দাসী; আপনার কথামতোই আমার প্রতি তা হোক।” এরপর ফেরেস্তা তার কাছ থেকে চলে গেলেন।
(৩৯)সেই দিনগুলোতে হযরত মরিয়ম আ. ইহুদিয়া প্রদেশের পাহাড়ি এলাকার একটি গ্রামে গিয়ে থাকলেন। (৪০)তিনি সেখানে হযরত জাকারিয়া আ. এর বাড়িতে ঢুকে হযরত ইলিছাবেত রা.-কে সালাম জানালেন।
(৪১)তিনি যখন হযরত মরিয়ম আ. এর সালাম শুনলেন, তখন তাঁর গর্ভের শিশুটি নেচে উঠলেন এবং হযরত ইলিছাবেত রা. আল্লাহর রুহে পূর্ণ হলেন। (৪২)তিনি চিৎকার করে বললেন, “মহিলাদের মধ্যে তুমি রহমতপ্রাপ্তা এবং তোমার গর্ভের ফলও রহমতপ্রাপ্ত। (৪৩)আমার প্রতি কেনো এমন হলো যে, আমার মনিবের মা আমার কাছে এসেছে? (৪৪)কারণ তোমার সালাম শোনার সাথে সাথে আমার গর্ভের শিশুটি আনন্দে নেচে উঠলো। (৪৫)সে-ই ধন্য, যে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তার কাছে যা বলেছেন তা পূর্ণ হবে।”
(৪৬)হযরত মরিয়ম আ. বললেন, “আমার হৃদয় আল্লাহর প্রশংসা করছে। (৪৭)আমার অন্তর আমার নাজাতদাতা আল্লাহর প্রশংসা করছে। (৪৮)কারণ তিনি তাঁর এই সামান্য দাসীর দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এখন থেকে সর্বকালের লোকেরা আমাকে ভাগ্যবতী বলবে। (৪৯)কারণ সর্বশক্তিমান আমার জন্য মহৎ কাজ করেছেন- সুবহান আল্লাহ! (৫০)যারা তাঁকে ভয় করে, বংশের পর বংশ ধরেই, তিনি তাদের দয়া করেন। (৫১)তিনি নিজ হাতে মহাশক্তির কাজ করেছেন। তিনি অহংকারীদের অহংকারী চিন্তা ধ্বংস করে দিয়েছেন। (৫২)তিনি সিংহাসন থেকে ক্ষমতাশালীদের নামিয়ে দিয়েছেন এবং অবহেলিতদের উন্নত করেছেন। (৫৩)ক্ষুধার্তদের তিনি ভালো ভালো জিনিস দিয়ে সন্তুষ্ট করেছেন এবং ধনীদের খালি হাতে বিদায় করেছেন। (৫৪)তিনি তাঁর রহমতের কথা স্মরণ করে তাঁর বান্দা ইয়াকুবকে দয়া করেছেন। (৫৫)আমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহিম আ. ও তাঁর বংশের প্রতি চিরকালের ওয়াদার কথা তিনি মনে রেখেছেন।” (৫৬)হযরত মরিয়ম আ. প্রায় তিন মাস তাঁর কাছে থাকার পর নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন।
(৫৭)সন্তান প্রসবের সময় হলে হযরত ইলিছাবেত রা. একটি ছেলের জন্ম দিলেন। (৫৮)তার প্রতিবেশী ও আত্মীয়েরা শুনলো যে, আল্লাহ তার প্রতি অশেষ দয়া করেছেন এবং তারা তাঁর সাথে আনন্দ করলো। (৫৯)আট দিনের দিন তারা ছেলেটির খতনা করাতে এলো এবং ছেলেটির নাম তার পিতার নামানুসারে জাকারিয়া রাখতে চাইলো। (৬০)কিন্তু তার মা বললেন, “না, তাকে ইয়াহিয়া বলে ডাকা হবে।” (৬১)তারা তাকে বললো, “ওই নাম তো আপনার আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কারো নেই।” (৬২)তখন তারা ইশারায় ছেলেটির পিতার কাছে জানতে চাইলো, তিনি কী নাম রাখতে চান। (৬৩)তিনি লেখার জিনিস চেয়ে নিয়ে লিখলেন, “ওর নাম হবে ইয়াহিয়া।” এতে সবাই অবাক হলো।
(৬৪)তখনই তার মুখ খুলে গেলো ও তার জিভ মুক্ত হলো এবং তিনি কথা বলতে ও আল্লাহর প্রশংসা করতে লাগলেন। (৬৫)এতে প্রতিবেশীরা সবাই ভয় পেলো। আর ইহুদিয়ার সমস্ত পাহাড়ি এলাকার লোকেরা এসব বিষয়ে বলাবলি করতে লাগলো।
(৬৬)যারা এসব কথা শুনলো, তারা প্রত্যেকেই মনে মনে ভাবতে লাগলো আর বললো, “এই ছেলেটি তাহলে কী হবে?” নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে আছেন!”
(৬৭)তার পিতা হযরত জাকারিয়া আ. আল্লাহর রুহে পূর্ণ হয়ে এই ভবিষ্যদ্বাণী করলেন- (৬৮)“হযরত ইয়াকুব আ. এর মালিক আল্লাহর প্রশংসা হোক। কারণ তিনি তাঁর নিজের লোকদের উদ্ধারের জন্য এসেছেন ও তাদের মুক্ত করেছেন। (৬৯,৭০)অনেক আগেই পবিত্র নবিদের মাধ্যমে তিনি যেকথা বলেছিলেন, সেই কথা অনুসারে তাঁর বান্দা হযরত দাউদ আ. এর বংশ থেকে আমাদের জন্য এক ক্ষমতাশালী নাজাতদাতাকে তুলেছেন, (৭১)যেনো শত্রুদের এবং যারা আমাদের ঘৃণা করে, তাদের হাত থেকে আমরা রক্ষা পাই।
(৭২-৭৫)তিনি আমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহিম আ.র কাছে তাঁর করা ওয়াদা এবং আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি তাঁর দয়া ও পবিত্র চুক্তির কথা স্মরণ করেছেন, যেনো তিনি শত্রুদের হাত থেকে আমাদের উদ্ধার করেন এবং আমরা চিরদিন নির্ভয়ে, পবিত্রতার সাথে ও সৎভাবে তাঁর ইবাদত করতে পারি।
(৭৬)হে আমার সন্তান, তোমাকে সর্বশক্তিমানের নবি বলা হবে; কারণ তুমি মনিবের পথ প্রস্তুত করার জন্য তাঁর আগে আগে যাবে। (৭৭)তুমি তাঁর লোকদের গুনাহ মাফের মাধ্যমে কীভাবে নাজাত পাওয়া যায় তা জানাবে, কারণ (৭৮)আল্লাহর মহাদয়ায় বেহেস্ত থেকে এক উঠন্ত সুর্যের আলো আমাদের ওপর প্রকাশিত হবে, (৭৯)যেনো যারা অন্ধকারে ও মৃত্যুর ছায়ায় বসে আছে, তাদের আলো দিতে এবং আমাদেরকে শান্তির পথে চালাতে পারেন।” (৮০)শিশুটি বেড়ে উঠলেন ও মানসিকভাবে শক্তিশালী হলেন এবং হযরত ইয়াকুব আ. এর সন্তানদের সামনে প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত নির্জন এলাকায় থাকলেন।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১) সেই সময় আগস্ত কাইসার তার গোটা সাম্রাজ্যে আদম-শুমারির হুকুম দিলেন। (২)সিরিয়ার গভর্নর কুরিনিয়ের সময় এই প্রথমবারের মতো আদম-শুমারি হয়। (৩)নাম লেখানোর জন্য প্রত্যেকে নিজ নিজ গ্রামে গেলো।
(৪)হযরত ইউসুফ র.ও গালিল প্রদেশের নাসরত গ্রাম থেকে ইহুদিয়ার বৈতলেহেম নামক দাউদের শহরে গেলেন, কারণ তিনি ছিলেন হযরত দাউদ আ. এর বংশের লোক। (৫)তিনি হযরত মরিয়ম আ.কে- যার সাথে তাঁর বিয়ে ঠিক হয়েছিলো এবং যিনি ছিলেন সন্তান সম্ভবা, তাঁকে সাথে নিয়ে নাম লেখাতে গেলেন। (৬)সেখানে থাকতেই তাঁর সন্তান জন্মের সময় এসে গেলো।
(৭)এবং তিনি তাঁর প্রথম সন্তান, একটি ছেলে, জন্ম দিলেন ও ছেলেটিকে কাপড়ে জড়িয়ে জাবপাত্রে রাখলেন; কারণ তাদের থাকার জন্য মুসাফির-খানায় কোনো জায়গা ছিলো না।
(৮)ওই এলাকার রাখালেরা মাঠে বসবাস করছিলো এবং রাতে তারা তাদের ভেড়ার পাল পাহারা দিচ্ছিলো। (৯)এমন সময় আল্লাহর এক ফেরেস্তা তাদের সামনে উপস্থিত হলেন এবং আল্লাহর মহিমা তাদের চারদিকে উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিলো। এতে রাখালেরা খুব ভয় পেলো। (১০)কিন্তু ফেরেস্তা তাদের বললেন, “ভয় করো না, কারণ আমি তোমাদের কাছে মহানন্দের সুখবর এনেছি। এই আনন্দ সব লোকেরই জন্য। (১১)আজ দাউদের শহরে তোমাদের নাজাতদাতা জন্মেছেন। তিনিই মসিহ, তিনিই মালিক। (১২)তোমাদের জন্য তাঁর চিহ্ন হলো এই- তোমরা কাপড়ে জড়ানো এবং জাবপাত্রে শোয়ানো একটি শিশুকে দেখতে পাবে।” (১৩)এ-সময় হঠাৎ সেই ফেরেস্তার সাথে সেখানে আরো অনেক ফেরেস্তাকে দেখা গেলো। তারা আল্লাহর প্রশংসা করে বলতে লাগলেন, (১৪)“বেহেস্তের সর্বত্র আল্লাহর প্রশংসা হোক এবং দুনিয়াতে যাদের ওপর তিনি সন্তুষ্ট, তাদের প্রতি শান্তি হোক।”
(১৫)ফেরেস্তারা তাদের কাছ থেকে বেহেস্তে চলে যাবার পর রাখালেরা একে অন্যকে বললো, “চলো, আমরা বৈতলেহেমে যাই এবং যে-ঘটনার কথা আল্লাহপাক আমাদের জানালেন তা গিয়ে দেখি।” (১৬)তারা তাড়াতাড়ি গিয়ে হযরত মরিয়ম আ., হযরত ইউসুফ র. ও জাবপাত্রে শোয়ানো সেই শিশুটিকে দেখতে পেলো। (১৭)তারা যখন দেখলো, তখন তাদের কাছে ওই শিশুটির বিষয়ে যা বলা হয়েছিলো তা লোকদের জানালো। (১৮)রাখালদের কথা শুনে সবাই আশ্চর্য হলো। ১৯কিন্তু হযরত মরিয়ম আ. এই সমস্ত কথা তার মনে গেঁথে রাখলেন এবং চিন্তা করতে থাকলেন।
(২০)রাখালদের কাছে যা বলা হয়েছিলো, সবকিছু সেই রকম দেখে ও শুনে তারা আল্লাহর প্রশংসা ও গৌরব করতে করতে ফিরে গেলো। (২১)আট দিন পর শিশুটির খতনা করানোর সময় হলো এবং তাঁর নাম রাখা হলো ইসা। মায়ের গর্ভে আসার আগেই ফেরেস্তা তাঁর এই নাম দিয়েছিলেন।
(২২)পরে হযরত মুসা আ. এর শরিয়ত অনুসারে তাদের পাকসাফ হওয়ার সময় এলে তারা তাঁকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত করার জন্য জেরুসালেমে নিয়ে গেলেন। (২৩) কারণ আল্লাহর শরিয়তে লেখা আছে, “প্রত্যেক প্রথমজাত ছেলে-সন্তানকে আল্লাহর জন্য পবিত্র বলে ধরা হবে।” (২৪)এবং তারা আল্লাহর শরিয়ত অনুসারে “দুটো ঘুঘু কিম্বা দুটো কবুতরের বাচ্চা” কোরবানি দিলেন।
(২৫)জেরুসালেমে তখন হযরত সামাউন রা. নামে একজন দীনদার ও আল্লাহভক্ত লোক ছিলেন। তিনি বনি-ইস্রাইলের নাজাতের জন্য অপেক্ষা করছিলেন এবং আল্লাহর রুহ তার ওপর ছিলেন। (২৬)আল্লাহর রুহ তার কাছে প্রকাশ করেছিলেন যে, আল্লাহর সেই মসিহকে না দেখে তিনি ইন্তেকাল করবেন না।
(২৭)হযরত সামাউন আ. আল্লাহর রুহের দ্বারা চালিত হয়ে বায়তুল-মোকাদ্দসে এলেন। আর শিশু হযরত ইসা আ. এর বাবা-মা শরিয়ত অনুসারে যা ফরজ তা আদায় করতে তাঁকে সেখানে নিয়ে এলেন। (২৮)হযরত সামাউন র. তখন তাঁকে কোলে নিলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন, (২৯)“পরওয়ারদেগার, তুমি তোমার কথামতো তোমার গোলামকে এখন শান্তিতে বিদায় দিচ্ছো। (৩০)কারণ আমার চোখ তোমার নাজাত দেখেছে, (৩১)যা তুমি সমস্ত মানুষের সামনে প্রস্তুত করেছো। (৩২)অইহুদিদের কাছে এটি পথ দেখানোর আলো, আর তোমার ইস্রাইলের কাছে গৌরব।”
(৩৩)শিশুটির বিষয়ে যা বলা হলো, এতে তাঁর মা ও হযরত ইউসুফ র. খুবই আশ্চর্য হলেন। (৩৪)পরে হযরত সামাউন র. তাদের দোয়া করলেন এবং তাঁর মা হযরত মরিয়ম আ. কে বললেন, “এই শিশুটি ইস্রায়েল বংশের অনেকের উত্থান-পতনের কারণ হবেন এবং এমন একটি চিহ্ন হবেন, যার বিরুদ্ধে অনেকেই কথা বলবে। (৩৫)তাতে অনেকের মনের চিন্তা প্রকাশ হয়ে পড়বে আর তরবারির আঘাতের মতো তোমার অন্তর বিদ্ধ করবে।
(৩৬)সেখানে হযরত হান্না আ. নামে একজন নবিও ছিলেন। তিনি আসের বংশের ফানুয়েলের মেয়ে। তার অনেক বয়স হয়েছিলো। (৩৭)সাত বছর স্বামীর ঘর করার পর চুরাশি বছর পর্যন্ত তিনি বিধবার জীবন কাটাচ্ছিলেন। তিনি বায়তুল-মোকাদ্দস ছেড়ে কোথাও যেতেন না, বরং রোজা ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে দিনরাত ইবাদত করতেন। (৩৮)তিনিও ঠিক সেই সময় এগিয়ে এসে আল্লাহর প্রশংসা করতে লাগলেন; এবং যারা জেরুসালেমের মুক্তির অপেক্ষায় ছিলো, তাদের কাছে শিশুটির বিষয়ে কথা বলতে লাগলেন। (৩৯)আল্লাহর শরিয়ত অনুসারে সবকিছু শেষ করে হযরত ইউসুফ র. ও হযরত মরিয়ম আ. গালিলে, তাদের নিজেদের গ্রাম নাসরতে ফিরে গেলেন।
(৪০)শিশু- হযরত ইসা আ. বয়সে বেড়ে বলিষ্ঠ হয়ে উঠলেন এবং জ্ঞানে পূর্ণ হতে থাকলেন। আর তাঁর ওপরে আল্লাহর রহমত ছিলো। (৪১)প্রত্যেক বছর ইদুল-ফেসাখের সময় তাঁর মা ও হযরত ইউসুফ আ. জেরুসালেমে যেতেন। (৪২) এবং তাঁর বয়স যখন বারো বছর, তখন নিয়ম অনুসারে তারা সেই ইদে গেলেন। (৪৩)ইদের শেষে তারা যখন বাড়ি ফিরছিলেন, তখন হযরত ইসা আ. জেরুসালেমেই থেকে গেলেন কিন্তু তাঁর মা ও হযরত ইউসুফ র. সেকথা জানতেন না। (৪৪)তিনি সঙ্গীদের মাঝে আছেন মনে করে তারা এক দিনের পথ চলে গেলেন। পরে তারা তাদের আত্মীয় ও জানাশোনা লোকদের মধ্যে তাঁর খোঁজ করতে লাগলেন। (৪৫)তাঁকে না পেয়ে, খোঁজ করতে করতে, তারা আবার জেরুসালেমে ফিরে গেলেন।
(৪৬) তিন দিন পর তারা তাঁকে বায়তুল-মোকাদ্দসে পেলেন। তিনি আলিমদের মধ্যে বসে তাদের কথা শুনছিলেন ও তাদের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছিলেন। (৪৭)যারা তাঁর কথা শুনছিলেন, তারা সবাই তাঁর জ্ঞান দেখে ও তাঁর জবাব শুনে অবাক হলেন।
(৪৮)তাঁর মা ও হযরত ইউসুফ র. তাঁকে দেখে আশ্চর্য হলেন। তাঁর মা তাঁকে বললেন, “বাবা, তুমি আমাদের সাথে কেনো এমন করলে? দেখো, তোমার বাবা ও আমি কতো ব্যাকুল হয়ে তোমার খোঁজ করছিলাম।”
(৪৯)তিনি তাদের বললেন, “তোমরা কেনো আমার খোঁজ করছিলে? তোমরা কি জানতে না যে, আমার প্রতিপালকের ঘরে আমাকে থাকতে হবে?” (৫০)কিন্তু তিনি যা বললেন তা তারা বুঝলেন না।
(৫১)এরপর তিনি তাদের সাথে নাসরতে ফিরে গেলেন এবং তাদের বাধ্য হয়েই রইলেন। তাঁর মা এই সবকিছু মনে গেঁথে রাখলেন। (৫২)হযরত ইসা আ. জ্ঞানে, বয়সে এবং আল্লাহ ও মানুষের মহব্বতে বেড়ে উঠতে লাগলেন।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১) সম্রাট টাইবেরিয়াসের রাজত্বের পনের বছরের সময় পন্তিয়াস পিলাত যখন ইহুদিয়া প্রদেশের গভর্নর, হেরোদ গালিল প্রদেশ এবং তার ভাই ফিলিপ ইতুরিয়া ও ত্রাখোনিয়া প্রদেশের শাসনকর্তা, লুসানিয়া ছিলেন অবিলিনির শাসনকর্তা (২)আর হান্নান ও কাইয়াফা ছিলেন ইহুদিদের মহাইমাম, তখন মরু প্রান্তরে হযরত ইয়াহিয়া ইবনে জাকারিয়ার আ. এর ওপর আল্লাহর কালাম নাযিল হলো।
(৩)তিনি জর্দান নদীর চারদিকে, সমস্ত এলাকায় গিয়ে গুনাহ মাফের জন্য তওবার বায়াত প্রচার করতে লাগলেন। (৪)হযরত ইসাইয়া আ. এর সহিফায় যেমন লেখা আছে, “মরুপ্রান্তরে একজনের কণ্ঠস্বর চিৎকার করে ঘোষণা করছে, ‘তোমরা মালিকের পথ প্রস্তুত করো, তাঁর রাস্তা সোজা করো। (৫)সমস্ত উপত্যকা ভরা হবে, পাহাড়-পর্বত নিচু করা হবে, আঁকাবাঁকা রাস্তা সোজা করা হবে, অ-সমান রাস্তা সমান করা হবে। (৬)এবং গোটা দুনিয়া আল্লাহর নাজাত দেখতে পাবে।’”
(৭)বায়াত নিতে আসা জনতাকে হযরত ইয়াহিয়া আ. বললেন, “সাপের বংশধরেরা! আসন্ন গজব থেকে পালিয়ে যাবার জন্য কে তোমাদের সতর্ক করলো? (৮)তওবার উপযুক্ত ফল দেখাও। তোমরা মনে মনে ভেবো না যে, ‘হযরত ইব্রাহিম আ. আমাদের পূর্বপুরুষ।’ আমি তোমাদের বলছি, এই পাথরগুলো থেকে আল্লাহ হযরত ইব্রাহিম আ. এর বংশধর তৈরি করতে পারেন। (৯)এমনকি এখনই গাছের গোড়ায় কুড়াল লাগানো আছে। যে গাছে ভালো ফল ধরে না তা কেটে আগুনে ফেলে দেয়া হবে।”
(১০)লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, “তাহলে আমরা কী করবো?”
(১১)উত্তরে তিনি তাদের বললেন, “যার দু’টো জামা আছে, সে যার নেই, তাকে একটি দিক এবং যার খাবার আছে, সেও ওরকমই করুক।” (১২)এমনকি কর-আদায়কারীরাও বায়াত নেবার জন্য এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, “হুজুর, আমরা কী করবো?” (১৩)তিনি তাদের বললেন, “আইনে যা আছে তার বেশি আদায় করো না।” (১৪)সৈন্যরাও তাকে জিজ্ঞেস করলো, “কিন্তু আমরা কী করবো?” তিনি তাদের বললেন, “জুলুম করে বা মিথ্যা দোষ দেখিয়ে কারো কাছ থেকে কিছু আদায় করো না এবং তোমাদের বেতনেই সন্তুষ্ট থেকো।”
(১৫)লোকেরা খুব আশা নিয়ে মনে মনে ভাবছিলো যে, হয়তো-বা হযরত ইয়াহিয়া আ.ই মসিহ, (১৬)তাই হযরত ইয়াহিয়া আ. তাদের সবাইকে বললেন, “আমি তোমাদের পানিতে বায়াত দিচ্ছি কিন্তু যিনি আমার চেয়ে ক্ষমতাবান, তিনি আসছেন। আমি তাঁর জুতার ফিতা খোলারও যোগ্য নই। তিনি আল্লাহর রুহে ও আগুনে তোমাদের বায়াত দেবেন। (১৭)ফসল মাড়ানোর জায়গা পরিষ্কার করে ফসল গোলায় জমা করার জন্য তাঁর কুলা তাঁর হাতেই আছে। কিন্তু যে-আগুন কখনো নেভে না, সেই আগুনে তিনি তুষ পুড়িয়ে ফেলবেন।”
(১৮)আরো অনেক উপদেশের মধ্য দিয়ে তিনি লোকদের মনে উৎসাহ জাগিয়ে সুখবর প্রচার করলেন।
(১৯)শাসনকর্তা হেরোদের সমস্ত অন্যায় কাজ ও তার ভাইয়ের স্ত্রী হেরোদিয়ার জন্য হযরত ইয়াহিয়া আ. তাকে তিরস্কার করেছিলেন। (২০)হেরোদ হযরত ইয়াহিয়া আ.কে জেলে বন্দি করে ওগুলোর সাথে আরো একটি কুকর্ম যোগ করলেন।
(২১)সব লোককে যখন বায়াত দেয়া হলো এবং হযরত ইসা আ.ও বায়াত নিয়ে যখন মোনাজাত করছিলেন, তখন আসমান খুলে গেলো, (২২)এবং আল্লাহর রুহ কবুতরের আকার নিয়ে তাঁর ওপরে নেমে এলেন। আর বেহেস্ত থেকে এক কণ্ঠস্বর শোনা গেলো, “তুমিই আমার একান্ত প্রিয় মনোনীতজন, তোমার ওপর আমি খুবই সন্তুষ্ট।”
(২৩)প্রায় ত্রিশ বছর বয়সে হযরত ইসা আ. তাঁর কাজ শুরু করলেন। লোকে মনে করতো তিনি হযরত ইউসুফ র. ছেলে। (২৪)হযরত ইউসুফ আলির ছেলে; আলি মাতাতের ছেলে; মাতাত লেবির ছেলে; লেবি মাল্কির ছেলে; মাল্কি ইয়ান্নার ছেলে; ইয়ান্না ইউসুফের ছেলে; (২৫)ইউসুফ মাতাতিয়ার ছেলে; মাতাতিয়া আমোসের ছেলে; আমোস নাহুমের ছেলে; নাহুম হাসলির ছেলে; হাসলি নাজ্জার ছেলে;
(২৬)নাজ্জা মাতের ছেলে; মাত মাতাতিয়ার ছেলে; মাতাতিয়া সিমির ছেলে; সিমি ইউসেখের ছেলে; (২৭)ইউসেখ ইহুদার ছেলে; ইহুদা ইউহোন্নার ছেলে; ইউহোন্না রিসার ছেলে; রিসা ঝারবাবিলের ছেলে; ঝারবাবিল সলতিয়েলের ছেলে; (২৮)সলতিয়েল নিরের ছেলে; নির মালকির ছেলে; মালকি আদ্দার ছেলে; আদ্দা কুসামের ছেলে; কুসাম মুদামের ছেলে; মুদাম ইরের ছেলে; (২৯)ইর ইয়াসুয়ার ছেলে; ইয়াসুয়া লায়াঝারের ছেলে; লায়াঝার ইউরিমের ছেলে; ইউরিম মাতাতের ছেলে; মাতাত লেবির ছেলে;
(৩০)লেবি সিমোনের ছেলে; সিমোন ইহুদার ছেলে; ইহুদা ইউসুফের ছেলে; ইউসুফ ইউনুসের ছেলে; ইউনুস আলি ইয়াকিমের ছেলে; (৩১)আলি ইয়াকিম মালায়ার ছেলে; মালায়া মান্নার ছেলে; মান্না মাতাতার ছেলে; মাতাতা নাসোনের ছেলে; নাসোন দাউদের ছেলে; (৩২)দাউদ ইয়াচ্ছার ছেলে; ইয়াচ্ছা ওবেদের ছেলে; ওবেদ বোয়াযের ছেলে; বোয়ায সালিমের ছেলে; সালিম নাহিসের ছেলে; (৩৩)নাহিস আমিনাদাবের ছেলে; আমিনাদাব অরামের ছেলে; অরাম হাছিরের ছেলে; হাছির ফারিসের ছেলে; ফারিস ইহুদার ছেলে;
(৩৪)হযরত ইহুদা হযরত ইয়াকুব আ.র ছেলে; হযরত ইয়াকুব হযরত ইসহাক আ.র ছেলে; হযরত ইসহাক আ. হযরত ইব্রাহিম আ. এর ছেলে; হযরত ইব্রাহিম আ. তারহের ছেলে; তারহ নাহুরের ছেলে; (৩৫)নাহুর সারুজের ছেলে; সারুজ রাউর ছেলে; রাউ ফালাকের ছেলে; ফালাক আবিরের ছেলে; আবির সালাহের ছেলে; (৩৬)সালাহ কেনানের ছেলে; কেনান আরফাখসাদের ছেলে; আরফাখসাদ সামের ছেলে; সাম নুহের ছেলে; হযরত নুহ আ. লামিকের ছেলে; (৩৭)লামিক মাতুসালার ছেলে; মাতুসালা ইদ্রিসের ছেলে; ইদ্রিস ইয়ারিদের ছেলে; ইয়ারিদ মাহলালিলের ছেলে; মাহলালিল কেনানের ছেলে; (৩৮)কেনান আনুসের ছেলে; আনুস হযরত শিশ আ. ছেলে; হযরত শিশ আ. হযরত আদম আ. এর ছেলে; হযরত আদম আ. আল্লাহর খলিফা।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১) হযরত ইসা আ. আল্লাহর রুহে পূর্ণ হয়ে জর্দান থেকে ফিরে এলেন এবং সেই রুহের পরিচালনায় তাঁকে মরু প্রান্তরে যেতে হলো। (২)সেখানে চল্লিশ দিন ধরে ইবলিস তাঁকে লোভ দেখালো। ওই দিনগুলোতে তিনি কিছুই খেলেন না এবং ওই দিনগুলো শেষ হলে তাঁর খিদে পেলো। (৩)তখন ইবলিস তাঁকে বললো, “তুমি যদি আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন হও, তাহলে এই পাথরটিকে রুটি হয়ে যেতে বলো।” (৪)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন “একথা লেখা আছে, ‘মানুষ কেবল রুটিতেই বাঁচে না।’”
(৫)এরপর ইবলিস তাঁকে একটি উঁচু জায়গায় নিয়ে গেলো এবং মুহূর্তের মধ্যে দুনিয়ার সব রাজ্য দেখিয়ে বললো, (৬)“এসবের অধিকার ও এগুলোর জাঁকজমক আমি তোমাকে দেবো। কারণ এসব আমাকে দেয়া হয়েছে এবং আমার যাকে ইচ্ছা আমি তাকেই তা দিতে পারি। (৭)তুমি যদি আমাকে সিজদা করো, তাহলে এই সবই তোমার হবে।”
(৮)হযরত ইসা আ. তাকে জবাব দিলেন, “একথা লেখা আছে, ‘তুমি তোমার মালিক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং কেবল তাঁরই বাধ্য থাকবে।’”
(৯)তখন ইবলিস তাঁকে জেরুসালেমে নিয়ে গেলো আর বায়তুল মোকাদ্দসের চূড়ায় দাঁড় করিয়ে বললো, “তুমি যদি আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন হও, তাহলে এখান থেকে লাফিয়ে নিচে পড়ো। (১০)কারণ একথা লেখা আছে, ‘তিনি তাঁর ফেরেস্তাদের তোমার বিষয়ে হুকুম দেবেন, যেনো তারা তোমাকে রক্ষা করেন।’ (১১)এবং ‘তারা তোমাকে হাত দিয়ে ধরে ফেলবেন, যাতে তোমার পায়ে পাথরের আঘাত না লাগে।’” (১২)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “একথাও বলা হয়েছে, ‘তোমার মালিক আল্লাহকে তুমি পরীক্ষা করো না।’” (১৩)সমস্ত রকম লোভ দেখানো শেষ করে ইবলিস আরেকটি সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে চলে গেলো।
(১৪)পরে হযরত ইসা আ. আল্লাহর রুহের শক্তিতে পূর্ণ হয়ে গালিলে ফিরে গেলেন এবং তাঁর খবর সে এলাকার চারপাশের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়লো। (১৫)তিনি তাদের সিনাগোগগুলোতে গিয়ে শিক্ষা দিতে শুরু করলেন এবং সবাই তাঁর প্রশংসা করতে লাগলো। (১৬)তিনি নাসরতে এলেন। এখানেই তিনি বড়ো হয়েছিলেন। তিনি নিজের নিয়ম অনুসারে সাব্বাতে সিনাগোগে গেলেন এবং তেলাওয়াত করার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। (১৭)তাঁর হাতে হযরত ইসাইয়া আ. এর গুটিয়ে রাখা সহিফাখানা দেয়া হলো। তিনি তা খুলে সেই জায়গা পেলেন, যেখানে লেখা আছে- (১৮)“আল্লাহর রুহ আমার ওপরে আছে। কারণ তিনিই আমাকে অভিষিক্ত করেছেন, যেনো আমি গরিবদের কাছে সুখবর নিয়ে আসি।
তিনি আমাকে বন্দিদের কাছে স্বাধীনতার কথা, অন্ধদের কাছে দেখতে পাওয়ার কথা ঘোষণা করতে, মজলুমদের মুক্ত করতে (১৯)এবং আল্লাহর রহমতের বছর ঘোষণা করতে পাঠিয়েছেন।”
(২০)অতঃপর সহিফাখানা গুটিয়ে খাদেমের হাতে দিয়ে তিনি বসলেন। সিনাগোগের প্রত্যেকটি লোক স্থিরদৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলো।
(২১)তখন তিনি বলতে আরম্ভ করলেন, “পাক-কিতাবের এই কথাগুলো আজ তোমাদের শোনার সাথে সাথে পূর্ণ হলো।” (২২)সবাই তাঁর প্রশংসা করলো এবং তাঁর মুখে সুন্দর সুন্দর কথা শুনে অবাক হলো। তারা বললো, “এ কি ইউসুফের ছেলে নয়?” (২৩)তিনি তাদের বললেন, “তোমরা নিশ্চয়ই আমাকে এই প্রবাদটি বলবে, ‘ডাক্তার, নিজেকে সুস্থ করো’ এবং আরো বলবে, ‘কফরনাহুমে যেসব কাজ করার কথা আমরা শুনেছি, সেসব নিজের গ্রামেও করে দেখাও।’” (২৪)তিনি আরো বললেন, “আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, কোনো নবিকেই তাঁর নিজের গ্রামের লোকেরা গ্রহণ করে না।
(২৫)কিন্তু সত্য হচ্ছে এই যে, হযরত ইলিয়াস আ. এর সময় যখন তিন বছর ছ’মাস বৃষ্টি হয়নি, আসমান বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো এবং সারা দেশে ভীষণ দুর্ভিক্ষ হয়েছিলো, তখন ইস্রাইলেও অনেক বিধবা ছিলো, (২৬)কিন্তু তাদের কারো কাছে হযরত ইলিয়াস আ. কে পাঠানো হয়নি, কেবল সিডন এলাকার সারিফত গ্রামের বিধবার কাছে পাঠানো হয়েছিলো। (২৭)হযরত ইয়াসা আ. সময় ইস্রাইলে অনেক কুষ্ঠরোগী ছিলো কিন্তু তাদের কাউকে পাকসাফ করা হয়নি, কেবল সিরিয়ার নামানকেই করা হয়েছিলো।”
(২৮)একথা শুনে সিনাগোগের সমস্ত লোক রেগে আগুন হয়ে গেলো। (২৯)তারা উঠে তাঁকে গ্রামের বাইরে ঠেলে নিয়ে গেলো। আর তাদের গ্রামটি যে-পাহাড়ের চূড়ায় ছিলো, সেখান থেকে তাঁকে নিচে ফেলে দিতে চাইলো। (৩০)কিন্তু তিনি তাদের মধ্য দিয়েই হেঁটে চলে গেলেন।
(৩১)তিনি গালিলের কফরনাহুম শহরে গেলেন এবং সাব্বাতে তাদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন। (৩২)তাঁর শিক্ষায় লোকেরা আশ্চর্য হলো। কারণ তিনি অধিকারসহ কথা বলছিলেন। (৩৩)সিনাগোগে ভূতে পাওয়া এক লোক ছিলো এবং সে জোরে চিৎকার করে বললো,
(৩৪)“হে নাসরতের ইসা, আমাদের একা থাকতে দিন! আমাদের সাথে আপনার কী? আপনি কি আমাদের ধ্বংস করতে এসেছেন? আমি জানি আপনি কে- আপনিই আল্লাহর সেই পবিত্রজন।” (৩৫)কিন্তু হযরত ইসা আ. তাকে ধমক দিয়ে বললেন, “চুপ করো, ওর ভেতর থেকে বেরিয়ে যাও!” সেই ভূত তখন লোকটিকে সকলের সামনে আছড়ে ফেল দিলো এবং তার কোনো ক্ষতি না করে তার ভেতর থেকে বেরিয়ে গেলো। (৩৬)এতে সবাই আশ্চর্য হয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলো, “এ কেমন কথা? অধিকার ও ক্ষমতা নিয়ে তিনি ভূতদের হুকুম দেন আর তারা বেরিয়ে যায়!” (৩৭)সেই এলাকার সব জায়গায় তাঁর কথা ছড়িয়ে পড়তে লাগলো।
(৩৮)সিনাগোগ থেকে বেরিয়ে তিনি হযরত সাফওয়ান রা.র বাড়িতে গেলেন। তার শাশুড়ির খুব জ্বর হয়েছিলো এবং তারা হযরত ইসা আ.কে তার বিষয়ে বললেন। (৩৯)তখন তিনি তার পাশে দাঁড়িয়ে জ্বরকে ধমক দিলেন। তাতে জ্বর তাকে ছেড়ে গেলো আর তিনি তখনই উঠে তাঁদের মেহমানদারি করতে লাগলেন।
(৪০)সূর্য ডোবার সময় লোকেরা সমস্ত রোগীকে তাঁর কাছে নিয়ে এলো। তারা নানা রোগে ভুগছিলো। তিনি তাদের প্রত্যেকের গায়ে হাত রেখে তাদের সুস্থ করলেন। (৪১)অনেক লোকের ভেতর থেকে ভূতও বেরিয়ে গেলো। তারা চিৎকার করে বললো, “আপনিই আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন!” কিন্তু তিনি তাদের ধমক দিলেন এবং কথা বলতে দিলেন না, কারণ তারা জানতো যে, তিনিই মসিহ।
(৪২)ফজরে তিনি সেই জায়গা ছেড়ে একটি নির্জন জায়গায় চলে গেলেন। অনেক লোক তাঁর খোঁজ করতে করতে তাঁর কাছে গেলো এবং যাতে তিনি তাদের ছেড়ে চলে না যান, সেজন্য তাঁকে ফেরাতে চেষ্টা করলো।
(৪৩)কিন্তু তিনি তাদের বললেন, “আরো অনেক জায়গায় আমাকে আল্লাহর রাজ্যের সুখবর প্রচার করতে হবে, এজন্যই আমাকে পাঠানো হয়েছে।” (৪৪)সুতরাং তিনি ইহুদিয়ার গালিলের সিনাগোগগুলোতে প্রচার করতে থাকলেন।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)এক সময় হযরত ইসা আ. গিনেসরত লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং লোকেরা আল্লাহর কালাম শোনার জন্য তাঁর চারপাশে ভিড় করে ঠেলাঠেলি করছিলো। (২)তিনি লেকের ধারে দুইটা নৌকা দেখতে পেলেন। জেলেরা নৌকা থেকে নেমে তাদের জাল ধুচ্ছিলো। (৩)তখন তিনি একটি নৌকায় উঠে বসলেন। এটি ছিলো হযরত সাফওয়ান রা. এর নৌকা এবং তিনি তাকে নৌকাটি কিনারা থেকে একটু দূরে নিয়ে যেতে বললেন। তারপর তিনি নৌকায় বসে লোকদের শিক্ষা দিতে লাগলেন।
(৪)শিক্ষা দেয়া শেষ করে তিনি হযরত সাফওয়ান রা.-কে বললেন, “মাছ ধরার জন্য গভীর পানিতে গিয়ে তোমাদের জাল ফেলো।” (৫)তিনি বললেন, “হুজুর, আমরা সারারাত পরিশ্রম করে কিছুই ধরতে পারিনি, তবুও আপনার কথামতো আমি জাল ফেলবো।”
(৬)তারা যখন জাল ফেললেন, তখন এতো মাছ পেলেন যে, তাদের জাল ছিঁড়ে যেতে লাগলো। (৭)তখন তারা সাহায্যের জন্য ইশারা করে অন্য নৌকার সঙ্গীদের ডাকলেন। তারা এসে দুটো নৌকায় এতো মাছ বোঝাই করলেন যে, সেগুলো ডুবে যেতে লাগলো। (৮)তা দেখে হযরত সাফওয়ান পিতর রা. হযরত ইসা আ. এর সামনে হাঁটু গেড়ে বললেন, “হুজুর, আমি গুনাহগার, আমার কাছ থেকে চলে যান।” (৯)এতো মাছ ধরা পড়েছে দেখে তিনি ও তার সঙ্গীরা অবাক হলেন। (১০)হযরত সাফওয়ান রা. এর ব্যবসার অংশীদার হযরত ইয়াকুব রা. ও হযরত ইউহোন্না রা. নামে জাবিদির দু’ছেলেও আশ্চর্য হলেন। তখন হযরত ইসা আ. হযরত সাফওয়ান রা.কে বললেন, “ভয় করো না। এখন থেকে তুমি মানুষ ধরবে।” (১১)তারপর তারা নৌকাগুলো কিনারে আনলেন এবং সবকিছু ফেলে রেখে হযরত ইসা আ.কে অনুসরণ করলেন।
(১২)একবার তিনি কোনো এক শহরে গেলেন। সেখানে এক লোকের সারা গায়ে কুষ্ঠরোগ ছিলো। হযরত ইসা আ.কে দেখে সে উবুড় হয়ে পড়ে কাকুতি-মিনতি করে বললো, “হুজুর, আপনি ইচ্ছা করলেই আমাকে পাকসাফ করতে পারেন।” (১৩)তিনি হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁয়ে বললেন, “আমি তা-ই চাই, তুমি পাকসাফ হও।” আর তখনই কুষ্ঠরোগ তাকে ছেড়ে গেলো।
(১৪)আর তিনি তাকে এ-বিষয়ে কাউকে কিছু বলতে নিষেধ করে বললেন, “যাও, ইমামের কাছে গিয়ে নিজেকে দেখাও এবং তাদের কাছে সাক্ষ্য হিসেবে পাকসাফ হওয়ার জন্য হযরত মুসা আ. যা কোরবানি দেবার হুকুম দিয়েছেন তা আদায় করো।”
(১৫)কিন্তু এভাবে হযরত ইসা আ. এর কথা আরো বেশি ছড়িয়ে পড়লো। তাঁর কথা শোনার ও রোগ থেকে সুস্থ হওয়ার জন্য অনেক লোক তাঁর কাছে আসতে লাগলো। (১৬)কিন্তু তিনি প্রায়ই নির্জন জায়গায় মোনাজাত করার জন্য একা একা চলে যেতেন।
(১৭)একদিন তিনি যখন শিক্ষা দিচ্ছিলেন, তখন ফরিসিরা ও আলিমরা সেখানে বসে ছিলেন। তারা গালিল, ইহুদিয়া ও জেরুসালেমের প্রত্যেক গ্রাম থেকে এসেছিলেন। এবং সুস্থ করার জন্য আল্লাহর ক্ষমতা তাঁর সাথে ছিলো। (১৮)তখনই কয়েক ব্যক্তি এক অবশরোগীকে খাটে করে বয়ে আনলো। তারা তাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে হযরত ইসা আ.র সামনে রাখার চেষ্টা করলো (১৯)কিন্তু ভিড়ের জন্য ভেতরে যাওয়ার পথ পেলো না। তখন তারা ছাদে উঠলো এবং ছাদের টালি সরিয়ে বিছানাসহ তাকে লোকদের মাঝখানে, হযরত ইসা আ. এর সামনে নামিয়ে দিলো। (২০)তাদের ইমান দেখে তিনি বললেন, “বন্ধু, তোমার গুনাহ মাফ করা হলো।”
(২১)এতে আলিমরা ও ফরিসিরা মনে মনে ভাবতে লাগলেন, “এই লোকটি কে, যে কুফরি করছে? একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কে গুনাহ মাফ করতে পারে?” (২২)হযরত ইসা আ. তাদের মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, “কেনো তোমরা মনে মনে ওই কথা ভাবছো? (২৩)কোনটি বলা সহজ, ‘তোমার গুনাহ মাফ করা হলো,’ নাকি ‘তুমি উঠে হেঁটে বেড়াও’? (২৪)কিন্তু তোমরা যেনো জানতে পারো যে, দুনিয়াতে গুনাহ মাফ করার ক্ষমতা ইবনুল-ইনসানের আছে।” এ পর্যন্ত বলে তিনি সেই অবশরোগীকে বললেন, “আমি তোমাকে বলছি, ওঠো, তোমার বিছানা তুলে নিয়ে তোমার বাড়ি চলে যাও।”
(২৫)সে তখনই সকলের সামনে উঠে দাঁড়ালো এবং যে বিছানার ওপর শুয়ে ছিলো তা তুলে নিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করতে করতে নিজের বাড়ি চলে গেলো। (২৬)তাতে সবাই খুব আশ্চর্য হলো এবং সশ্রদ্ধ ভয়ে আল্লাহর প্রশংসা করে বললো, “আজ আমরা কি আশ্চর্য ঘটনা দেখলাম!”
(২৭)এরপর হযরত ইসা আ. বাইরে গেলেন এবং কর আদায় করার ঘরে লেবি নামে এক কর-আদায়কারীকে বসে থাকতে দেখলেন। তিনি তাকে বললেন, “আমাকে অনুসরণ করো।” (২৮)একথা শুনে তিনি উঠলেন এবং সবকিছু ফেলে রেখে তাঁকে অনুসরণ করলেন। (২৯)পরে হযরত লেবি রা. তাঁর সম্মানে নিজের বাড়িতে একটি বড়ো ভোজের আয়োজন করলেন এবং তাদের সাথে অনেক কর-আদায়কারী ও অন্য লোকেরা খেতে বসলো। (৩০)ফরিসিরা ও তাদের আলিমরা তাঁর হাওয়ারিদের কাছে অভিযোগ করে বললেন, “তোমরা কর-আদায়কারী ও গুনাহগারদের সাথে খাওয়া-দাওয়া করো কেনো?”
(৩১)হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “সুস্থদের জন্য ডাক্তারের দরকার নেই, বরং অসুস্থদের জন্যই দরকার আছে। (৩২)আমি দীনদারদের নয় কিন্তু গুনাহগারদের তওবা করার জন্য ডাকতে এসেছি।”
(৩৩)পরে তারা তাঁকে বললেন, “ফরিসিদের অনুসারীদের মতো হযরত ইয়াহিয়া আ. এর সাহাবিরা প্রায়ই রোজা রাখেন ও মোনাজাত করেন কিন্তু আপনার হাওয়ারিরা শুধু খাওয়া-দাওয়া করেন।” (৩৪)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “বর সাথে থাকতে তোমরা বিয়ে বাড়ির লোকদের রোজা রাখাতে পারো না, পারো কি? (৩৫)কিন্তু এমন সময় আসবে, যখন তাদের কাছ থেকে বরকে নিয়ে যাওয়া হবে, আর তখন ওই দিনগুলোতে তারা রোজা রাখবে।”
(৩৬)তিনি তাদের একটি দৃষ্টান্তও দিলেন- “নতুন জামা থেকে কেটে নিয়ে কেউ পুরোনো জামায় তালি দেয় না। যদি দেয়, তাহলে নতুনটিও নষ্ট হয়ে যায়, আর সেই নতুন তালিটিও পুরোনো জামার সাথে মানায় না। (৩৭) টাটকা আঙুররস কেউ পুরোনো চামড়ার থলিতে রাখে না। যদি রাখে, তাহলে টাটকা রসে থলি ফেটে যায়। তাতে রসও পড়ে যায়, থলিও নষ্ট হয়। (৩৮)কিন্তু টাটকা আঙুররস নতুন চামড়ার থলিতেই রাখা হয়। (৩৯)পুরোনো আঙুররস খাবার পরে কেউ টাটকা আঙুররস খেতে চায় না, বরং বলে, ‘পুরোনোটাই ভালো।’”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
৬(১) কোনো এক সাব্বাতে হযরত ইসা আ. ফসলের মাঠ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এসময় তাঁর হাওয়ারিরা শিষ ছিঁড়ে হাতে ঘষে ঘষে খেতে লাগলেন। (২)এতে কয়েকজন ফরিসি বললেন, “শরিয়ত মতে সাব্বাতে যা করা উচিত নয়, তোমরা তা করছো কেনো?” (৩)হযরত ইসা আ. বললেন, “ হযরত দাউদ আ. ও তার সঙ্গীরা যখন ক্ষুধার্ত ছিলেন, তখন তিনি যা করেছিলেন তা কি তোমরা পড়োনি? (৪)তিনি তো আল্লাহর ঘরে ঢুকে আল্লাহর উদ্দেশে দান করা রুটি, যা ইমামদের ছাড়া আর কারো খাওয়ার নিয়ম ছিলো না, তা নিয়ে তিনি নিজে খেয়েছিলেন এবং তার সঙ্গীদেরও দিয়েছিলেন। (৫)অতঃপর তিনি তাদের বললেন, “ইবনুল-ইনসানই সাব্বাতের মালিক।”
(৬)অন্য এক সাব্বাতে তিনি সিনাগোগে গিয়ে শিক্ষা দিচ্ছিলেন। সেখানে এমন এক লোক ছিলো, যার ডান হাত শুকিয়ে গিয়েছিলো। (৭)তিনি সাব্বাতে কাউকে সুস্থ করেন কিনা তা দেখার জন্য আলিমরা ও ফরিসিরা তাঁর ওপর নজর রাখছিলেন, যেনো তারা তাঁকে দোষ দিতে পারেন। (৮)যদিও তিনি তাদের মনের চিন্তা জানতেন, তবুও তিনি যার হাত শুকিয়ে গিয়েছিলো, সেই লোকটিকে বললেন, “এখানে এসে দাঁড়াও।”সে উঠে এসে সেখানে দাঁড়ালো।
(৯)তখন হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “আমি তোমাদের জিজ্ঞেস করি, সাব্বাতে কোন কাজ করা শরিয়ত-সম্মত? ভালো কাজ করা, নাকি খারাপ কাজ করা? প্রাণ রক্ষা করা, নাকি নষ্ট করা?” (১০)অতঃপর চারপাশের সকলের দিকে তাকিয়ে লোকটিকে বললেন, “তোমার হাত বাড়িয়ে দাও।” সে তা করলে পর তার হাত সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেলো। (১১)কিন্তু তারা ভীষণ রাগ করলেন এবং হযরত ইসা আ.কে নিয়ে কী করা যায় তা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগলেন।
(১২)ওই সময় একদিন মোনাজাত করার জন্য তিনি পাহাড়ে গেলেন এবং সারারাত আল্লাহর কাছে মোনাজাত করে কাটালেন।
(১৩)সকালে তিনি তাঁর অনুসারীদের নিজের কাছে ডাকলেন এবং তাদের মধ্য থেকে বারোজনকে বেছে নিলেন, যাদের তিনি নাম দিলেন হাওয়ারি। (১৪)তারা হলেন- হযরত সাফওয়ান রা., যাকে তিনি নাম দিলেন পিতর এবং তার ভাই হযরত আন্দ্রিয়ান রা.; হযরত ইয়াকুব রা. ও হযরত ইউহোন্না রা., হযরত ফিলিপ রা. ও হযরত বর্থলময় রা., (১৫)হযরত মথি রা. ও হযরত থোমা রা, হযরত ইয়াকুব ইবনে আলফিয়াস, দেশপ্রেমিক হযরত সিমোন রা., (১৬)হযরত ইহুদা ইবনে ইয়াকুব এবং হযরত ইহুদা ইস্কারিয়োত রা.- যিনি বেইমান হয়ে গিয়েছিলেন।
(১৭)তিনি তাদের সাথে নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে একটি সমান জায়গায় গিয়ে তাঁর সাহাবিদের বড়ো একটি দলের সাথে দাঁড়ালেন। এছাড়া ইহুদিয়া, জেরুসালেম এবং টায়ার ও সিডন এলাকার উপকূল থেকেও অনেক লোক সেখানে জড়ো হয়েছিলো। (১৮)তারা তাঁর কথা শোনার এবং নানা রোগ থেকে সুস্থ হওয়ার জন্য সেখানে এসেছিলো। যারা ভূতের দ্বারা কষ্ট পাচ্ছিলো, তারা ভালো হচ্ছিলো। (১৯)সব লোক তাঁকে ছোঁয়ার চেষ্টা করছিলো, কারণ তাঁর ভেতর থেকে শক্তি বেরিয়ে সকলকে সুস্থ করছিলো।
(২০)অতঃপর তিনি তাঁর সাহাবিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমরা যারা গরিব, তারা রহমতপ্রাপ্ত, কারণ আল্লাহর রাজ্য তোমাদেরই। (২১)রহমতপ্রাপ্ত তোমরা, এখন যাদের খিদে আছে, কারণ তোমরা তৃপ্ত হবে। রহমতপ্রাপ্ত তোমরা, যারা এখন কাঁদছো, কারণ তোমরা হাসবে।
(২২)রহমতপ্রাপ্ত তোমরা, যখন লোকে ইবনুল-ইনসানের জন্য তোমাদের ঘৃণা করে, সমাজ থেকে বের করে দেয়, অপমান করে এবং তোমাদের নামে নিন্দা করে। (২৩)সেই সময় তোমরা খুশি হয়ো ও আনন্দে নেচে উঠো। নিশ্চয়ই বেহেস্তে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম পুরস্কার। এই লোকদের পূর্বপুরুষেরা নবিদের ওপরও এরকম করতো।
(২৪)কিন্তু ধনীরা, দুর্ভাগ্য তোমাদের, কারণ তোমরা তোমাদের সান্ত্বনা পেয়েছো। (২৫)যারা এখন তৃপ্ত, দুর্ভাগ্য তোমাদের, কারণ তোমরা ক্ষুধার্ত হবে। যারা এখন হাসছো, দুর্ভাগ্য তোমাদের, কারণ তোমরা দুঃখ করবে ও কাঁদবে। (২৬)দুর্ভাগ্য তোমাদের, যখন লোকেরা তোমাদের প্রশংসা করে, কারণ এদের পূর্বপুরুষেরা ভন্ড নবিদেরও প্রশংসা করতো।
(২৭)কিন্তু তোমরা যারা শুনছো, আমি তোমাদের বলছি- তোমাদের শত্রুদেরও মহব্বত করো। যারা তোমাদের ঘৃণা করে, তাদের উপকার করো। (২৮)যারা তোমাদের অভিশাপ দেয়, তাদের জন্য দোয়া করো। যারা অত্যাচার-নির্যাতন করে, তাদের জন্য মোনাজাত করো।
(২৯)যে তোমার এক গালে চড় মারে, তাকে অন্য গালটিও পেতে দিয়ো। যে তোমার চাদর নিয়ে যায়, তাকে জামাও নিতে নিষেধ করো না। (৩০)যারা তোমার কাছে চায়, তাদের প্রত্যেককে দিয়ো। কেউ তোমার কোনো জিনিস নিয়ে গেলে তা আর ফেরত চেয়ো না। (৩১)অন্যের কাছ থেকে যেমন পেতে চাও, তোমরাও তাদের প্রতি তেমনই করো।
(৩২)যারা তোমাদের মহব্বত করে, তোমরা যদি কেবল তাদেরই মহব্বত করো, তাহলে তাতে প্রশংসার কী আছে? গুনাহগারেরাও তো তাদেরই মহব্বত করে, যারা তাদের মহব্বত করে। (৩৩)যারা তোমাদের উপকার করে, তোমরা যদি কেবল তাদেরই উপকার করো, তাহলে তাতে প্রশংসার কী আছে? গুনাহগারেরাও তো তা-ই করে থাকে। (৩৪) যাদের কাছ থেকে তোমরা ফিরে পাবার আশা করো, যদি তাদেরই টাকা-পয়সা ধার দাও, তাহলে তাতে প্রশংসার কী আছে? গুনাহগারেরাও ফেরত পাবে বলেই গুনাহগারদের ধার দিয়ে থাকে।
(৩৫)কিন্তু তোমরা তোমাদের শত্রুদের ভালোবেসো এবং তাদের উপকার করো। কোনোকিছুই ফেরত পাবার আশা না রেখে ধার দিয়ো। তোমাদের জন্য মহাপুরস্কার রয়েছে। আর তোমরা হবে সর্বশক্তিমানের সান্নিধ্যপ্রাপ্ত। কারণ তিনি অকৃতজ্ঞ এবং দুষ্টদের দয়া করেন। (৩৬)তোমাদের প্রতিপালক যেমন দয়ালু, তোমরাও তেমনি দয়ালু হও।
(৩৭)বিচার করো না, তাহলে তোমাদেরও বিচার করা হবে না। দোষ ধরো না, তাহলে তোমাদেরও দোষ ধরা হবে না। ক্ষমা করো, তাহলে তোমাদেরও ক্ষমা করা হবে।
(৩৮)দান করো, তাহলে তোমাদেরও দেয়া হবে। অনেক বেশি করে চেপে চেপে ঝাকিয়ে ঝাকিয়ে উপচে পড়ার মতো করে তোমাদের কোল ভরে দেয়া হবে। কারণ যেভাবে তোমরা মেপে দাও, সেভাবেই তোমরা ফিরে পাবে।
(৩৯)তিনি তাদের একটি দৃষ্টান্তও দিলেন- “এক অন্ধ কি আরেক অন্ধকে পথ দেখাতে পারে? তাহলে তারা দু’জনেই কি গর্তে পড়বে না? (৪০)ছাত্র তার শিক্ষকের চেয়ে বড়ো নয় কিন্তু পরিপূর্ণ শিক্ষা পেয়ে প্রত্যেক ছাত্রই তার শিক্ষকের মতো হয়ে ওঠে।
(৪১)কেনো তোমার ভাইয়ের চোখের ধূলিকণা দেখছো? তোমার নিজের চোখের কড়িকাঠ দেখছো না কেনো? (৪২)যখন তোমার নিজের চোখের কড়িকাঠ দেখছো না, তখন কেমন করে তোমার প্রতিবেশীকে বলতে পারো, ‘বন্ধু, এসো, তোমার চোখের ধূলিকণা বের করে দেই?’ ভন্ড, প্রথমে তোমার নিজের চোখ থেকে কড়িকাঠটি বের করে ফেলো, তাহলে তোমার প্রতিবেশীর চোখের ধূলিকণা বের করার জন্য স্পষ্ট দেখতে পাবে।
(৪৩)ভালো গাছে খারাপ ফল ধরে না, আবার খারাপ গাছে ভালো ফল ধরে না। (৪৪)প্রত্যেকটি গাছকেই তার ফল দিয়ে চেনা যায়। কাঁটাঝোপ থেকে ডুমুর কিম্বা কাঁটাঝোপ থেকে আঙুর তোলা যায় না। (৪৫)ভালো মানুষ তার অন্তরে জমানো ভালো থেকে ভালো কথাই বের করে, আর খারাপ মানুষ তার অন্তরে জমানো খারাপি থেকে খারাপিই বের করে। কারণ মানুষের অন্তর যা দিয়ে পূর্ণ থাকে, মুখ সেই কথাই বলে।
(৪৬)তোমরা কেনো আমাকে ‘হুজুর, হুজুর করো, অথচ আমি যা বলি তা তোমরা করো না? (৪৭)যে কেউ আমার কাছে এসে আমার কথা শোনে এবং সেই মতো কাজ করে, সে কার মতো তা আমি তোমাদের দেখাবো।
(৪৮)সে এমন এক লোকের মতো, যে ঘর তৈরি করার জন্য গভীর করে মাটি কেটে পাথরের ওপর ভিত্তি গাঁথলো। পরে বন্যা এলো এবং নদীর পানির স্রোত সেই ঘরের ওপর এসে পড়লো কিন্তু ঘরটি নাড়াতে পারলো না। কারণ সেটি শক্ত করেই তৈরি করা হয়েছিলো।
(৪৯)কিন্তু যে শোনে অথচ সেই মতো কাজ করে না, সে এমন এক লোকের মতো, যে মাটির ওপর ভিত্তি ছাড়াই ঘর তৈরি করলো। পরে নদীর পানির স্রোত যখন ঘরের ওপর পড়লো, তখনই সেই ঘরটি পড়ে একেবারে ধ্বংস হয়ে গেলো।’”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)তিনি লোকদের কাছে তাঁর সব কথা শেষ করে কফরনাহুমে চলে গেলেন। (২)সেখানে একজন শত-সৈন্যের সেনাপতির এক গোলাম ছিলো, যে তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। সে অসুস্থ হয়ে প্রায় মরার মতো হয়েছিলো। (৩)তিনি হযরত ইসা আ. এর বিষয়ে শুনে ইহুদিদের কয়েকজন বুজুর্গকে তাঁর কাছে অনুরোধ করতে পাঠালেন, যেনো তিনি এসে তার গোলামকে সুস্থ করেন। (৪)তারা হযরত ইসা আ. এর কাছে এসে তাঁকে বিশেষভাবে অনুরোধ করে বললেন, “আপনি যার জন্য একাজ করবেন, তিনি এর উপযুক্ত। (৫)কারণ তিনি আমাদের লোকদের মহব্বত করেন এবং আমাদের জন্য সিনাগোগও তৈরি করে দিয়েছেন।”
(৬)হযরত ইসা আ. তাদের সাথে গেলেন। তিনি তার বাড়ির কাছে এলে সেই সেনাপতি তার বন্ধুদের দিয়ে তাঁকে বলে পাঠালেন, “হুজুর, আর কষ্ট করবেন না। কারণ আপনি যে আমার বাড়িতে ঢোকেন, তার যোগ্য আমি নই। (৭)সেজন্য আমি নিজেকে আপনার কাছে যাবার উপযুক্তও মনে করিনি। আপনি কেবল মুখে বলুন, তাতেই আমার গোলাম সুস্থ হয়ে যাবে। (৮)কারণ আমিও অন্যের অধীনে নিযুক্ত এবং আমার অধীনের সৈন্যরাও আমার কথামতো চলে। আমি একজনকে ‘যাও’ বললে সে যায়, অন্যজনকে ‘এসো’ বললে সে আসে। আমার গোলামকে ‘এটি করো’ বললে সে তা করে।”
(৯) একথা শুনে হযরত ইসা আ. আশ্চর্য হলেন এবং যে জনতা তাঁর পেছনে পেছনে আসছিলো, তাদের দিকে ফিরে বললেন, “আমি তোমাদের বলছি, এমন ইমান আমি বনি ইস্রাইলের মধ্যেও পাইনি।” (১০)যাদের পাঠানো হয়েছিলো, তারা তার ঘরে ফিরে গিয়ে সেই গোলামকে সুস্থ দেখতে পেলেন।
(১১)এরপরই তিনি নায়িন নামে একটি শহরে গেলেন। তাঁর হাওয়ারিরা এবং এক বিশাল জনতা তাঁর সাথে সাথে গেলেন। (১২)যখন তিনি শহরের দরজার কাছে পৌঁছলেন, তখন লোকেরা একটি মরা মানুষকে বয়ে নিয়ে বাইরে যাচ্ছিলো। সে ছিলো তার মায়ের একমাত্র সন্তান, আর সেই মা-ও ছিলেন বিধবা এবং তার সাথে গ্রামের অনেক লোকও যাচ্ছিলো। (১৩)হযরত ইসা আ. তাকে দেখে মমতায় পূর্ণ হলেন এবং তাকে বললেন, “আর কেঁদো না।” (১৪)তারপর তিনি কাছে গিয়ে খাটিয়া ছুঁলেন এবং লাশ বহনকারীরা দাঁড়ালো। তিনি বললেন, “যুবক, আমি তোমাকে বলছি, ওঠো!”
(১৫)তাতে মৃতলোকটি উঠে বসলো ও কথা বলতে লাগলো। হযরত ইসা আ. তাকে তার মায়ের কাছে দিয়ে দিলেন। (১৬)তখন তারা সকলে ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলো এবং আল্লাহর প্রশংসা করে বলতে লাগলো, “আমাদের মধ্যে একজন মহান নবি উপস্থিত হয়েছেন!” এবং “আল্লাহ দয়া করে তাঁর বান্দাদের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন!” (১৭)তাঁর বিষয়ে এসব কথা ইহুদিয়া ও তার আশেপাশের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়লো।
(১৮)হযরত ইয়াহিয়া আ. এর সাহাবিরা এসব ঘটনার কথা তাকে জানালেন। তখন হযরত ইয়াহিয়া আ. তার দু’জন সাহাবিকে ডাকলেন (১৯)এবং হযরত ইসা আ. এর কাছে একথা জিজ্ঞেস করতে পাঠালেন, “যাঁর আসার কথা আছে, আপনিই কি তিনি, নাকি আমরা অন্য কারো জন্য অপেক্ষা করবো?”
(২০)তারা তাঁর কাছে এসে বললেন, “হযরত ইয়াহিয়া আ. আমাদেরকে আপনার কাছে জিজ্ঞেস করতে পাঠিয়েছেন, ‘যাঁর আসার কথা আছে, আপনিই কি তিনি, নাকি আমরা অন্য কারো জন্য অপেক্ষা করবো?’” (২১)সেই সময় হযরত ইসা আ. অনেক লোককে রোগ ও যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করলেন এবং ভূত তাড়ালেন আর অনেক অন্ধকে দেখার শক্তি দিলেন। (২২)তিনি তাদের জবাব দিলেন, “তোমরা যা দেখলে ও শুনলে তা গিয়ে হযরত ইয়াহিয়া আ.-কে বলো- অন্ধরা দেখছে, খোঁড়ারা হাঁটছে, কুষ্ঠরোগীরা পাকসাফ হচ্ছে, কালারা শুনছে, মৃতেরা বেঁচে উঠছে এবং গরিবদের কাছে সুখবর প্রচার করা হচ্ছে। (২৩)আর সেই ব্যক্তি রহমতপ্রাপ্ত, যে আমাকে নিয়ে কোনো বাধা না পায়।”
(২৪)হযরত ইয়াহিয়া আ. এর সংবাদ বাহকেরা চলে গেলে পর হযরত ইসা আ. লোকদের কাছে হযরত ইয়াহিয়া আ.র বিষয়ে বলতে লাগলেন, “তোমরা মরুপ্রান্তরে কী দেখতে গিয়েছিলে? বাতাসে দোল খাওয়া একটি নলখাগড়া? (২৫)তা না হলে কী দেখতে গিয়েছিলে? দামি পোশাক পরা কোনো লোককে কি? যারা দামি পোশাক পরে ও জাঁকজমকের সাথে বসবাস করে, তারা তো রাজবাড়িতেই থাকে। (২৬)তা না হলে কী দেখতে গিয়েছিলে? একজন নবিকে? হ্যাঁ, আমি তোমাদের বলছি, একজন নবির চেয়েও বেশি। (২৭)ইনি সেই লোক যাঁর বিষয়ে লেখা আছে, ‘দেখো, আমি তোমার আগে আমার নবিকে পাঠাচ্ছি। সে তোমার আগে গিয়ে তোমার পথ প্রস্তুত করবে।’(২৮)আমি তোমাদের বলছি, মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া কেউই হযরত ইয়াহিয়া আ. এর চেয়ে বড়ো নয়। তবুও আল্লাহর রাজ্যে সবচেয়ে যে ছোটো, সেও তাঁর চেয়ে মহান।”
(২৯)কর-আদায়কারীরাসহ যতো লোক এসব কথা শুনলো, সবাই আল্লাহ যে ন্যায়বান তা স্বীকার করলো। কারণ তারা হযরত ইয়াহিয়া আ. এর কাছে বায়াত নিয়েছিলো। (৩০)কিন্তু ফরিসিরা ও আলিমরা তার কাছে বায়াত নিতে অস্বীকার করে নিজেদের জন্য আল্লাহর উদ্দেশ্যকে অগ্রাহ্য করেছেন। (৩১)“তাহলে এ-কালের লোকদের আমি কাদের সাথে তুলনা করবো? তারা কী রকম?
(৩২)তারা এমন ছেলে-মেয়েদের মতো, যারা বাজারে বসে একে অন্যকে ডেকে বলে, ‘আমরা তোমাদের জন্য বাঁশি বাজালাম কিন্তু তোমরা নাচলে না; আমরা বিলাপ করলাম কিন্তু তোমরা কাঁদলে না।’
(৩৩)হযরত ইয়াহিয়া আ. এসে রুটি বা আঙুররস খেলেন না বলে তোমরা বললে, ‘ওকে ভূতে পেয়েছে।’
(৩৪)আর ইবনুল-ইনসান এসে খাওয়া-দাওয়া করলেন বলে তোমরা বলছো, ‘দেখো, এই লোকটি পেটুক ও মদখোর, কর-আদায়কারী ও গুনাহগারদের বন্ধু।’(৩৫)কিন্তু জ্ঞান তার সন্তানদের দ্বারাই উত্তম বলে প্রমাণিত হয়।”
(৩৬)একজন ফরিসি হযরত ইসা আ. কে তাঁর সাথে খাওয়ার জন্য দাওয়াত করলেন এবং তিনি তার বাড়িতে গিয়ে খেতে বসলেন। (৩৭)সেই শহরের এক গুনাহগার মহিলা যখন জানলো যে, তিনি ফরিসির ঘরে খেতে বসেছেন, তখন সে একটি সাদা পাথরের পাত্রে করে সুগন্ধি তেল নিয়ে এলো। (৩৮)সে তাঁর পেছনে এসে পায়ের কাছে দাঁড়ালো এবং কেঁদে কেঁদে চোখের পানিতে তাঁর পা ভেজাতে লাগলো। সে তার মাথার চুল দিয়ে তাঁর পা মুছে দিলো। তারপর তাঁর পায়ের ওপর চুমু দিতে দিতে সেই সুগন্ধি তেল মাখিয়ে দিলো। (৩৯)যে ফরিসি তাঁকে দাওয়াত করেছিলেন, তিনি তা দেখে মনে মনে বলতে লাগলেন, “ইনি যদি নবি হতেন, তাহলে জানতে পারতেন, কে এবং কী রকম মহিলা তাঁর পা স্পর্শ করছে; সে তো গুনাহগার।”
(৪০)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “সিমোন, তোমাকে আমার কিছু বলার আছে।”তিনি বললেন, “হুজুর, বলুন।” (৪১)“কোনো এক মহাজনের কাছ থেকে দু’ব্যক্তি ঋণ নিয়েছিলো। একজন নিয়েছিলো পাঁচশো দিনার আর অন্যজন পঞ্চাশ দিনার। (৪২)তাদের কারোরই ঋণ শোধ করার ক্ষমতা ছিলো না বলে তিনি দু’জনকেই মাফ করে দিলেন। এখন দু’জনের মধ্যে কে তাকে বেশি মহব্বত করবে?” (৪৩)সিমোন বললেন, “আমার মনে হয়, যার বেশি ঋণ মাফ করা হলো, সে-ই।”হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছো।”
(৪৪)অতঃপর মহিলার দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি সিমোনকে বললেন, “তুমি কি এই মহিলাকে দেখছো? আমি তোমার ঘরে এলে তুমি আমার পা ধোয়ার পানি দাওনি কিন্তু সে চোখের পানিতে আমার পা ধুয়ে তার চুল দিয়ে মুছে দিয়েছে। (৪৫)তুমি আমাকে চুমু দাওনি কিন্তু আমি ভেতরে আসার পর থেকেই সে আমার পায়ে চুমু দেয়া বন্ধ করেনি। (৪৬)তুমি আমার মাথায় তেল দাওনি কিন্তু সে আমার পায়ের ওপর সুগন্ধি তেল মাখিয়ে দিয়েছে। (৪৭)তাই আমি তোমাকে বলছি, তার অনেক গুনাহ, যা মাফ করা হয়েছে, এজন্য সে বেশি মহব্বত দেখিয়েছে। যার অল্প মাফ করা হয়, সে অল্পই মহব্বত দেখায়।
(৪৮)অতঃপর তিনি মহিলাকে বললেন, “তোমার গুনাহ মাফ করা হয়েছে।”(৪৯)যারা তাঁর সাথে খেতে বসেছিলো, তারা মনে মনে বলতে লাগলো, “এ কে, যে গুনাহও মাফ করে?” (৫০)কিন্তু তিনি মহিলাকে বললেন, “তোমার ইমান তোমাকে নাজাত দিয়েছে; শান্তিতে চলে যাও।”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)এরপরই হযরত ইসা আ. গ্রামে গ্রামে ও শহরে শহরে ঘুরে আল্লাহর রাজ্যের সুখবর প্রচার করতে লাগলেন। তাঁর সাথে সেই বারোজনও ছিলেন।
(২)কয়েকজন মহিলাও ছিলেন, যারা ভূতের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন ও রোগ থেকে সুস্থ হয়েছিলেন। এরা হলেন- মরিয়ম, যাকে মগ্দলিনি বলা হতো ও যার ভেতর থেকে সাতটি ভূত বেরিয়ে গিয়েছিলো; (৩)বাদশা হেরোদের কর্মচারী খুযের স্ত্রী জোয়ান্না, সোসান্না এবং আরো অনেকে। এরা নিজেদের সম্পদ থেকে তাদের খরচ মেটাতেন।
(৪)ভিন্ন ভিন্ন শহর ও গ্রাম থেকে অনেক লোক তাঁর কাছে এসে যখন ভিড় করলো, তখন তিনি তাদের একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বললেন-
(৫)“একজন চাষী তার বীজ বুনতে গেলো এবং বোনার সময় কতকগুলো বীজ পথের ওপর পড়লো। লোকেরা সেগুলো পায়ে মাড়ালো এবং পাখিরা এসে খেয়ে ফেললো। (৬)কতকগুলো পাথরের ওপর পড়ে গজিয়ে উঠলো কিন্তু রস না পেয়ে শুকিয়ে গেলো। (৭)কতকগুলো কাঁটাবনের মধ্যে পড়লো। পরে কাঁটাগাছ সেই চারাগুলোর সাথে বেড়ে উঠে সেগুলো চেপে রাখলো। (৮)কতকগুলো ভালো জমিতে পড়লো এবং বেড়ে উঠে সেগুলো একশো গুণ ফল দিলো।” একথা বলার পরে তিনি জোরে জোরে বললেন, “যার শোনার কান আছে, সে শুনুক।”
(৯)অতঃপর তাঁর হাওয়ারিরা তাঁকে এই দৃষ্টান্তের অর্থ জিজ্ঞেস করলেন। (১০)তিনি বললেন, “আল্লাহর রাজ্যের গোপন সত্যগুলো তোমাদেরই জানতে দেয়া হয়েছে কিন্তু অন্যদের কাছে আমি দৃষ্টান্তের মধ্য দিয়ে বলি, যেনো তারা দেখেও না দেখে আর শুনেও না বোঝে।
(১১)দৃষ্টান্তটির অর্থ এই- বীজ হলো আল্লাহর কালাম। (১২)পথের ওপর পড়া বীজের মধ্য দিয়ে তাদের সম্বন্ধেই বলা হয়েছে, যারা সেই কালাম শোনে। পরে ইবলিস এসে তাদের অন্তর থেকে কালাম তুলে নিয়ে যায়, ফলে তারা ইমান আনতে পারে না ও নাজাত পায় না। (১৩)পাথরের ওপর পড়া বীজের মধ্য দিয়ে তাদের সম্বন্ধেই বলা হয়েছে, যারা সেই কালাম শুনে আনন্দের সাথে গ্রহণ করে। কিন্তু তাদের মধ্যে তার শেকড় ভালো করে বসে না। তারা অল্প সময়ের জন্য ইমান রাখে আর পরীক্ষার সময় তারা সরে যায়। (১৪)কাঁটাবনের মধ্যে পড়া বীজের মধ্য দিয়ে তাদের সম্বন্ধেই বলা হয়েছে, যারা শোনে কিন্তু জীবন-পথে চলতে চলতে সংসারের চিন্তা-ভাবনা, ধন-স¤পত্তি এবং সুখভোগের মধ্যে তারা চাপা পড়ে যায় এবং তাদের ফল পরিপক্ক হয় না।
(১৫)ভালো জমিতে পড়া বীজের মধ্য দিয়ে তাদের সম্বন্ধেই বলা হয়েছে, যারা সৎ ও সরল মনে সেই কালাম শুনে শক্ত করে ধরে রাখে এবং তাতে স্থির থেকে ধৈর্য ধরে ফল দেয়।
(১৬)কেউ বাতি জ্বেলে কোনো পাত্র দিয়ে তা ঢেকে কিংবা খাটের নিচে রাখে না কিন্তু বাতিদানির ওপরেই রাখে, যেনো যারা ভেতরে আসে, তারা আলো দেখতে পায়। (১৭)এমন কিছুই লুকানো নেই, যা প্রকাশিত হবে না। আবার এমন কিছু গোপন নেই, যা জানা যাবে না কিংবা প্রকাশ পাবে না। (১৮)এজন্য কীভাবে শুনছো, সে-বিষয়ে মনোযোগ দাও। কারণ যাদের আছে, তাদেরকে আরো দেয়া হবে কিন্তু যাদের নেই, তাদের যা আছে বলে তারা মনে করে, তাও তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হবে।”
(১৯)পরে তাঁর মা ও ভাইয়েরা তাঁর কাছে এলেন কিন্তু ভিড়ের জন্য তাঁর সাথে দেখা করতে পারলেন না। (২০)তাঁকে জানানো হলো, “আপনার মা ও ভাইয়েরা আপনার সাথে দেখা করার জন্য বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।”(২১)কিন্তু তিনি তাদের বললেন, “যারা আল্লাহর কালাম শোনে ও আমল করে, তারাই আমার মা ও আমার ভাই।”
(২২)একদিন তিনি ও তাঁর হাওয়ারিরা একটি নৌকায় উঠলেন। অতঃপর তিনি তাদের বললেন, “চলো, আমরা লেকের ওপারে যাই।” তারা যখন নৌকা বেয়ে যাচ্ছিলেন (২৩)তখন তিনি নৌকাতে ঘুমিয়ে পড়লেন। সেই সময় লেকে ঝড় উঠলো। নৌকাটি পানিতে ভরে যেতে লাগলো এবং তারা খুব বিপদে পড়লেন। (২৪)তারা তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে জাগিয়ে চিৎকার করে বললেন, “হুজুর, হুজুর, আমরা যে মরলাম!” তিনি উঠে বাতাস ও পানির প্রচন্ড ঢেউকে ধমক দিলেন, তাতে তা থেমে গেলো এবং সবকিছু শান্ত হলো। (২৫)তিনি তাদের বললেন, “তোমাদের ইমান কোথায়?” তারা ভয়ে ও আশ্চর্য হয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন, “ইনি তাহলে কে, যিনি বাতাস ও পানিকে হুকুম দেন আর তারাও তাঁর কথা শোনে?”
(২৬)অতঃপর তারা গালিলের উল্টো দিকে গেরাসিনিদের এলাকায় পৌঁছলেন। (২৭)তিনি যখন নৌকা থেকে নামলেন, তখন সেই গ্রামের এক লোক এলো; তাকে ভূতে পেয়েছিলো। সে অনেকদিন ধরে জামা-কাপড় পরতো না এবং বাড়িতে না থেকে কবরস্থানে থাকতো। (২৮)হযরত ইসা আ.কে দেখে সে তাঁর সামনে উবুড় হয়ে পড়লো এবং জোরে চিৎকার করে বলে উঠলো, “হযরত ইসা আ., সর্বশক্তিমান আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন, আমার সাথে আপনার কী? আমি বিনয় করি, দয়া করে আমাকে যন্ত্রণা দেবেন না।”
(২৯)কারণ ভূতটিকে তিনি লোকটির ভেতর থেকে বেরিয়ে যাবার হুকুম দিয়েছিলেন। সেই ভূত বারবার লোকটিকে আঁকড়ে ধরতো। তাকে পাহারা দেয়া হতো। যদিও তখন তার হাতপা শেকল দিয়ে বাঁধা থাকতো, তবুও সে সেই শেকল ছিঁড়ে ফেলতো আর সেই ভূত তাকে নির্জন জায়গায় তাড়িয়ে নিয়ে যেতো।
(৩০)হযরত ইসা আ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী?” সে বললো, “বাহিনী।” কারণ তার ভেতরে অনেকগুলো ভূত ঢুকেছিলো। (৩১)তারা তাঁকে কাকুতি-মিনতি করতে লাগলো, যেনো তিনি তাদের জাহান্নামে যাবার হুকুম না দেন। (৩২)সেখানে পাহাড়ের ঢালে খুব বড়ো একপাল শূকর চরে বেড়াচ্ছিলো। ভূতেরা হযরত ইসা আ.কে কাকুতি-মিনতি করলো, যেনো তিনি তাদেরকে সেগুলোর ভেতরে ঢুকতে অনুমতি দেন। সুতরাং তিনি তাদের অনুমতি দিলেন। (৩৩)তারা লোকটির ভেতর থেকে বেরিয়ে শূকরগুলোর ভেতরে ঢুকলো। সেই শূকরের পাল লেকের ঢালু পাড় দিয়ে জোরে দৌড়ে গিয়ে পানিতে ডুবে মরলো।
(৩৪)যারা শূকর চরাচ্ছিলো, তারা এই ঘটনা দেখে দৌড়ে গিয়ে সেই গ্রামে ও তার আশেপাশের সব জায়গায় এই খবর দিলো।
(৩৫)তখন কী ঘটেছে তা দেখার জন্য লোকেরা বেরিয়ে এলো। হযরত ইসা আ. এর কাছে এসে তারা দেখলো, যার ভেতর থেকে ভূতগুলো বেরিয়ে গেছে, সে জামা-কাপড় পরে সুস্থমনে তাঁর পায়ের কাছে বসে আছে। এতে তারা ভয় পেলো। (৩৬)যারা এ ঘটনা দেখেছিলো, তারা ভূতে পাওয়া লোকটি কীভাবে সুস্থ হয়েছে তা ওই লোকদের জানালো। (৩৭)তখন গেরাসিনিদের এলাকার সব লোক হযরত ইসা আ.কে তাদের কাছ থেকে চলে যেতে অনুরোধ করলো। কারণ তারা ভীষণ ভয় পেয়েছিলো। ফলে তিনি ফিরে যাওয়ার জন্য নৌকায় উঠলেন।
(৩৮)যে-লোকটির ভেতর থেকে ভূতগুলো বেরিয়ে গিয়েছিলো, সে কাকুতি-মিনতি করলো, যেনো সে তাঁর সাথে যেতে পারে। কিন্তু তিনি তাকে একথা বলে পাঠিয়ে দিলেন- (৩৯)“তুমি বাড়ি ফিরে যাও এবং আল্লাহ তোমার জন্য কতো বড়ো কাজ করেছেন তা প্রচার করো।” সে চলে গেলো এবং হযরত ইসা আ. তার জন্য কতো বড়ো কাজ করেছেন তা সমস্ত গ্রামে বলে বেড়াতে লাগলো।
(৪০)অতঃপর হযরত ইসা আ. যখন ফিরে এলেন, তখন লোকেরা তাঁকে স্বাগত জানালো। কারণ তারা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলো। (৪১)তখন জায়ির নামে সিনাগোগের এক নেতা সেখানে এলেন। তিনি হযরত ইসা আ. এর পায়ের ওপর পড়ে (৪২)তার বাড়িতে আসার জন্য তাঁর কাছে কাকুতি-মিনতি করতে লাগলেন। কারণ তার বারো বছরের একমাত্র মেয়েটি মরার মতো হয়েছিলো। হযরত ইসা আ. যখন যাচ্ছিলেন, তখন লোকেরা ঠেলাঠেলি করে তাঁর ওপরে পড়ছিলো।
(৪৩)সেখানে বারো বছর ধরে রক্তস্রাবে ভুগতে থাকা এক মহিলা ছিলো। ডাক্তার-কবিরাজদের পেছনে সে তার সবকিছুই খরচ করেছিলো কিন্তু কেউই তাকে সুস্থ করতে পারেনি। (৪৪)সে পেছন দিক থেকে এসে হযরত ইসা আ. এর কাপড়ের ঝালর ছুঁলো আর তখনই তার রক্তস্রাব বন্ধ হয়ে গেলো। (৪৫)তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কে আমাকে ছুঁলো?” সবাই যখন তা অস্বীকার করলো, তখন হযরত পিতর রা. বললেন, “হুজুর, লোকেরা চারপাশে ঠেলাঠেলি করে আপনার ওপর পড়ছে।” (৪৬)কিন্তু হযরত ইসা আ. বললেন, “কেউ আমাকে ছুঁয়েছে। কারণ আমি বুঝতে পারলাম যে, আমার ভেতর থেকে শক্তি বেরিয়ে গেছে।”
(৪৭)মহিলাটি যখন দেখলো, সে আর গোপন থাকতে পারবে না, তখন সে কাঁপতে কাঁপতে তাঁর সামনে উবুড় হয়ে পড়লো এবং সকলের সামনেই বললো, কেনো সে তাঁকে ছুঁয়েছে আর কীভাবে সে তখনই সুস্থ হয়েছে। (৪৮)তিনি তাকে বললেন, “মা, তোমার ইমান তোমাকে সুস্থ করেছে; শান্তিতে চলে যাও।”
(৪৯)তিনি তখনো কথা বলছেন, এমন সময় সেই নেতার বাড়ি থেকে এক লোক এসে বললো, “আপনার মেয়েটি মারা গেছে, হুজুরকে আর কষ্ট দেবেন না।” (৫০)একথা শুনে হযরত ইসা আ. বললেন, “ভয় করো না; কেবল বিশ্বাস করো এবং সে বাঁচবে।”
(৫১)বাড়িতে পৌঁছে তিনি হযরত পিতর রা., হযরত ইউহোন্না রা. ও হযরত ইয়াকুব রা. এবং মেয়েটির বাবা-মা ছাড়া তাঁর সাথে আর কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দিলেন না।
(৫২)সবাই মেয়েটির জন্য কান্নাকাটি ও বিলাপ করছিলো। কিন্তু তিনি বললেন, “কেঁদো না। সে মারা যায়নি কিন্তু ঘুমাচ্ছে।” (৫৩)লোকেরা তাঁকে ঠাট্টা করতে লাগলো, কারণ তারা জানতো যে, মেয়েটি মারা গেছে। (৫৪)কিন্তু তিনি মেয়েটির হাত ধরে ডেকে বললেন, “খুকি, ওঠো!” (৫৫)মেয়েটির প্রাণ ফিরে এলো এবং সে তখনই উঠে দাঁড়ালো। তখন তিনি মেয়েটিকে কিছু খেতে দিতে বললেন। (৫৬)মেয়েটির বাবা-মা খুব অবাক হয়ে গেলেন। কিন্তু কী ঘটেছে তা কাউকে বলতে তিনি তাদের নিষেধ করলেন।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)অতঃপর তিনি সেই বারোজনকে একত্রে ডাকলেন এবং তাদেরকে সমস্ত ভূতের ওপরে ক্ষমতা ও অধিকার এবং রোগ ভালো করার ক্ষমতাও দিলেন। (২)তিনি তাদের আল্লাহর রাজ্যের বিষয়ে প্রচার করতে ও রোগীদের সুস্থ করতে পাঠিয়ে দিলেন। (৩)তিনি তাদের বললেন, “তোমরা পথের জন্য লাঠি, থলি, রুটি বা টাকা-পয়সা, কিছুই নিয়ো না। এমনকি অতিরিক্ত জামাও না। (৪)যে-বাড়িতে তোমরা ঢুকবে, শেষ পর্যন্ত সেখানেই থেকো এবং সেখান থেকেই বিদায় নিয়ো।
(৫)যদি লোকে তোমাদের গ্রহণ না করে, তাহলে তাদের শহর ছেড়ে যাবার সময় তোমাদের পায়ের ধুলো ঝেড়ে ফেলো, যেনো সেটিই তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হয়। (৬)তারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে আল্লাহর রাজ্যের সুখবর প্রচার করতে এবং রোগ ভালো করতে লাগলেন।
(৭)যা-কিছু ঘটছে, শাসনকর্তা হেরোদ তা শুনছিলেন কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কারণ কেউ কেউ বলছিলো, হযরত ইয়াহিয়া আ. মৃত্যু থেকে বেঁচে উঠেছেন। (৮)কেউ কেউ বলছিলো, হযরত ইলিয়াস আ. দেখা দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলছিলো, অনেকদিন আগেকার একজন নবি বেঁচে উঠেছেন। (৯)হেরোদ বললেন, “আমি তো হযরত ইয়াহিয়া আ. এর মাথা কেটে ফেলেছি; তাহলে যাঁর বিষয়ে আমি এসব শুনছি, তিনি কে?” তিনি তাঁকে দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন।
(১০)হাওয়ারিরা ফিরে এলেন এবং তারা যা যা করেছেন, তার সবকিছু হযরত ইসা আ.-কে জানালেন। তিনি তাদের নিয়ে গোপনে বেতসাইদা নামক শহরে গেলেন। (১১)এ-খবর জানতে পেরে অনেক লোক তাঁর পেছনে পেছনে চললো। তিনি তাদের গ্রহণ করলেন। তাদের কাছে আল্লাহর রাজ্যের বিষয়ে কথা বললেন এবং যাদের সুস্থ হওয়ার দরকার ছিলো, তাদের সুস্থ করলেন।
(১২)বেলা যখন শেষ হয়ে এলো, তখন সেই বারোজন তাঁর কাছে এসে বললেন, “এই লোকদের বিদায় দিন, যেনো তারা আশেপাশের শহর ও গ্রামগুলোতে গিয়ে খাবার এবং থাকার জায়গা খুঁজে নিতে পারে; কারণ আমরা একটি নির্জন জায়গায় রয়েছি। (১৩)কিন্তু তিনি তাদের বললেন, “তোমরাই ওদের কিছু খেতে দাও।” তারা বললেন, “আমাদের কাছে পাঁচটি রুটি ও দুটো মাছ ছাড়া আর কিছুই নেই। এই সব লোককে খাওয়াতে হলে আমাদের খাবার কিনতে হবে।”
(১৪)সেখানে কমবেশি পাঁচ হাজার পুরুষ ছিলো এবং তিনি তাঁর হাওয়ারিদের বললেন, “পঞ্চাশজন পঞ্চাশজন করে এক এক দলে লোকদের বসিয়ে দাও।” (১৫)তারা সেভাবেই সবাইকে বসিয়ে দিলেন। (১৬)ওই পাঁচটি রুটি ও দুটো মাছ নিয়ে তিনি আসমানের দিকে তাকালেন এবং শুকরিয়া জানিয়ে সেগুলো টুকরা টুকরা করে লোকদের দেবার জন্য হাওয়ারিদের হাতে দিলেন। (১৭)সবাই পেট ভরে খেলো। পরে যে-টুকরাগুলো অবশিষ্ট রইলো তা দিয়ে বারোটি ঝুড়ি ভর্তি করা হলো।
(১৮)একবার হযরত ইসা আ. একটি নির্জন জায়গায় মোনাজাত করছিলেন। তাঁর সাথে কেবল তাঁর হাওয়ারিরাই ছিলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কে, এ-বিষয়ে লোকে কী বলে?” (১৯)তারা বললেন, “কেউ কেউ বলে, আপনি হযরত ইয়াহিয়া আ.; কেউ কেউ বলে, হযরত ইলিয়াস আ.; আবার কেউ কেউ বলে, অনেকদিন আগেকার একজন নবি বেঁচে উঠেছেন।” (২০)তিনি তাদের বললেন, “কিন্তু তোমরা কী বলো, আমি কে?” হযরত পিতর রা. উত্তর দিলেন, “আল্লাহর মসিহ।” (২১)তিনি তাদের সাবধান করলেন এবং হুকুম দিলেন, যেনো তারা কাউকে একথা না বলেন। (২২)তিনি বললেন, “ইবনুল-ইনসানকে অনেক দুঃখভোগ করতে হবে। বুজুর্গরা, প্রধান ইমামেরা ও আলিমরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবেন। তাঁকে হত্যা করা হবে এবং তৃতীয় দিনে তাঁকে জীবিত হয়ে উঠতে হবে।”
(২৩)অতঃপর তিনি সবাইকে বললেন, “যদি কেউ আমার অনুসারী হতে চায়, তাহলে সে নিজেকে অস্বীকার করুক। এবং প্রত্যেক দিন নিজের সলিব বয়ে নিয়ে আমার পেছনে আসুক। (২৪)কারণ যারা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে চায়, তারা তা হারাবে কিন্তু যারা আমার জন্য তাদের প্রাণ হারায়, তারা তা রক্ষা করবে। (২৫)যদি তারা সমস্ত দুনিয়া লাভ করেও নিজেদের প্রাণ হারায়, তাহলে তাতে তাদের কী লাভ?
(২৬)যারা আমাকে ও আমার কালাম নিয়ে লজ্জাবোধ করে, ইবনুল-ইনসান যখন নিজের ও প্রতিপালকের মহিমায় এবং তাঁর পবিত্র ফেরেস্তাদের মহিমায় আসবেন, তখন তিনিও তাদের সম্বন্ধে লজ্জাবোধ করবেন। (২৭)কিন্তু আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, এখানে এমন কয়েকজন আছে, যারা আল্লাহর রাজ্য না দেখা পর্যন্ত মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে না।”
(২৮)এসব কথা বলার প্রায় আট দিন পর মোনাজাত করার জন্য হযরত ইসা আ. হযরত পিতর রা., হযরত ইউহোন্না রা. ও হযরত ইয়াকুব রা.কে নিয়ে পাহাড়ের ওপরে গেলেন। (২৯)মোনাজাতের সময় তাঁর মুখের চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেলো এবং তাঁর জামা-কাপড় চোখ ঝলসানো সাদা হয়ে গেলো। (৩০)হঠাৎ তারা হযরত মুসা আ. ও হযরত ইলিয়াস আ.কে তাঁর সাথে কথা বলতে দেখলেন। (৩১)তারা মহিমার সাথে এলেন এবং তাঁর চলে যাওয়ার বিষয়ে কথাবার্তা বলছিলেন, যা তিনি জেরুসালেমে পূর্ণ করতে যাচ্ছেন।
(৩২)হযরত পিতর রা. ও তার সঙ্গীরা তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। তারা জেগে উঠে তাঁর মহিমা দেখতে পেলেন এবং তাঁর সাথে দাঁড়ানো দু’জন লোককেও দেখলেন।
(৩৩)সেই দু’জন যখন তাঁর কাছ থেকে চলে যাচ্ছিলেন, তখন হযরত পিতর রা. হযরত ইসা আ.-কে বললেন, “হুজুর, আমাদের জন্য ভালোই হয়েছে যে, আমরা এখানে আছি। আসুন, আমরা এখানে তিনটে কুঁড়েঘর তৈরি করি- একটি আপনার, একটি হযরত মুসা আ. ও একটি হযরত ইলিয়াস আ. এর জন্য।” তিনি যে কী বলছিলেন তা তিনি নিজেই বুঝলেন না। (৩৪)তিনি যখন একথা বলছিলেন, তখন একখন্ড মেঘ এসে তাঁদের ঢেকে ফেললো এবং যখন তাঁরা মেঘের মধ্যে ঢুকলেন, তখন হাওয়ারীরা ভয় পেলেন। (৩৫)অতঃপর সেই মেঘ থেকে একটি কণ্ঠস্বর বললেন, “এ-ই আমার একান্ত প্রিয়জন, যাকে আমি মনোনীত করেছি; তার কথা শোনো!” (৩৬)কণ্ঠস্বর থেমে গেলে দেখা গেলো, হযরত ইসা আ. একাই রয়েছেন। তারা যা দেখেছিলেন, সে-বিষয়ে ওই দিনগুলোতে কাউকে কিছু না বলে তারা নীরব রইলেন।
(৩৭)পরদিন তারা পাহাড় থেকে নেমে এলে অনেক লোক তাঁর সাথে দেখা করতে এলো। (৩৮)তখন ভিড়ের মধ্য থেকে এক লোক চিৎকার করে বললো, “হুজুর, দয়া করে আমার ছেলেটিকে দেখুন। সে আমার একমাত্র সন্তান। (৩৯)একটি ভূত তাকে প্রায়ই ধরে এবং সে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে। সেই ভূত যখন তাকে মুচড়ে ধরে, তখন তার মুখ থেকে ফেনা বের হয়। তারপর সে তাকে খুব কষ্ট দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে ছেড়ে দেয়। (৪০)আমি আপনার হাওয়ারিদের কাছে কাকুতি-মিনতি করেছিলাম, যেনো এটিকে ছাড়িয়ে দেন কিন্তু তারা পারলেন না।”
(৪১)হযরত ইসা আ. বললেন, “অবিশ্বাসী ও দুষ্ট লোকেরা! আর কতোদিন আমি তোমাদের সাথে থাকবো এবং তোমাদের সহ্য করবো? তোমার ছেলেকে এখানে আনো।” (৪২)তাকে যখন আনা হচ্ছিলো, তখন সেই ভূত তাকে আছাড় মেরে মুচড়ে ধরলো। কিন্তু হযরত ইসা আ. সেই ভূতকে ধমক দিলেন এবং ছেলেটিকে সুস্থ করে তার বাবার কাছে ফিরিয়ে দিলেন।
(৪৩)আল্লাহর মহত্ত্ব দেখে এবং তিনি যা-কিছু করেছেন তা দেখে সবাই যখন আশ্চর্য হলো, তখন তিনি তাঁর হাওয়ারিদেরকে বললেন, (৪৪)“আমার একথা মন দিয়ে শোনো- ইবনুল-ইনসানকে মানুষের হাতে তুলে দেয়া হবে।” (৪৫)কিন্তু তারা সেকথা বুঝলেন না। তাদের কাছ থেকে তা গোপন রাখা হয়েছিলো, যেনো তারা বুঝতে না পারেন। এবং এ-বিষয়ে তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করতেও তাদের ভয় হলো।
(৪৬)একদিন হাওয়রিদের মধ্যে কে বড়ো, এ-বিষয়ে তাদের মধ্যে তর্ক হচ্ছিলো। (৪৭)কিন্তু হযরত ইসা আ. তাদের মনের চিন্তা বুঝতে পেরে একটি শিশুকে নিয়ে নিজের পাশে দাঁড় করালেন (৪৮)এবং তাদের বললেন, “যে কেউ আমার নামে এই শিশুকে গ্রহণ করে, সে আমাকেই গ্রহণ করে এবং যে আমাকে গ্রহণ করে, যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, সে তাঁকেই গ্রহণ করে; কেননা তোমাদের সকলের মধ্যে যে সবচেয়ে ছোটো, সে-ই বড়ো।”
(৪৯) হযরত ইউহোন্না রা. বললেন, “হুজুর, আপনার নামে আমরা একজনকে ভূত ছাড়াতে দেখেছি। সে আমাদের দলের লোক নয় বলে আমরা তাকে নিষেধ করেছি।”
(৫০) কিন্তু হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “তাকে নিষেধ কোরো না, কারণ যে তোমাদের বিপক্ষে নয়, সে তো তোমাদের পক্ষেই।”
(৫১) তাঁকে যখন ওপরে তুলে নেবার সময় এগিয়ে আসছিলো, তখন তিনি জেরুসালেমে যাবার জন্য মনস্থির করলেন। (৫২) তিনি তাঁর আগে সংবাদ-বাহকদেরও পাঠিয়ে দিলেন। যাবার পথে তারা তাঁর জন্য সবকিছুর ব্যবস্থা করতে সামেরীয়দের একটি গ্রামে ঢুকলেন। (৫৩) কিন্তু তিনি জেরুসালেমে যাচ্ছেন বলে তারা তাঁকে গ্রহণ করলো না। (৫৪)এই অবস্থা দেখে তাঁর হাওয়ারি হযরত ইয়াকুব রা. ও হযরত ইউহোন্না রা. বললেন, “হুজুর, আপনি কি চান যে, আমরা এদের ধ্বংস করার জন্য আকাশ থেকে আগুন নামিয়ে আনি?” (৫৫)কিন্তু তিনি তাদের দিকে ফিরে তাদেরকে ধমক দিলেন। (৫৬)অতঃপর তারা অন্য গ্রামে গেলেন।
(৫৭)তারা পথে যাচ্ছেন, এমন সময় কেউ একজন তাঁকে বললো, “আপনি যেখানে যাবেন, আমিও আপনার সাথে সেখানে যাবো।”(৫৮)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “শিয়ালের গর্ত আছে এবং পাখির বাসা আছে কিন্তু ইবনুল-ইনসানের মাথা রাখার জায়গা নেই।”(৫৯)অন্য আরেকজনকে তিনি বললেন, “আমাকে অনুসরণ করো।” কিন্তু সে বললো, “হুজুর, আগে আমার বাবাকে দাফন করে আসতে দিন।”(৬০)হযরত ইসা আ.তাকে বললেন, “মৃতেরাই তাদের মৃতদের দাফন করুক কিন্তু তুমি এসে আল্লাহর রাজ্যের কথা ঘোষণা করো।”(৬১)আরেকজন বললো, “হুজুর, আমি আপনার সাথে যাবো কিন্তু আগে আমাকে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে আসতে দিন।”(৬২)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “লাঙলে হাত দিয়ে যে পেছন দিকে তাকিয়ে থাকে, সে আল্লাহর রাজ্যের উপযুক্ত নয়।”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)অতঃপর মসিহ আরো সত্তরজনকে মনোনীত করলেন। তিনি নিজে যে যে গ্রামে ও যে যে জায়গায় যাবেন বলে ঠিক করেছিলেন, সেসব জায়গায় তাদেরকে দু’জন দু’জন করে তাঁর আগে পাঠিয়ে দিলেন। (২)তিনি তাদের বললেন, “ফসল অনেক কিন্তু কাজ করার লোক কম। এজন্য ফসলের মালিকের কাছে মোনাজাত করো, যেনো তিনি তাঁর ফসল কাটার জন্য লোক পাঠিয়ে দেন। (৩)তোমরা যাও; নেকড়ে বাঘের মধ্যে ভেড়ার মতোই আমি তোমাদের পাঠাচ্ছি। (৪)টাকার থলি, ঝুলি বা জুতো সাথে নিয়ো না এবং রাস্তায় কাউকে সালাম জানাবে না। (৫)তোমরা যে-বাড়িতে যাবে, প্রথমে বলবে, ‘এই বাড়িতে শান্তি বর্ষিত হোক।’ (৬)শান্তি ভালোবাসে এমন কেউ যদি সেখানে থাকে, তাহলে তোমাদের শান্তি তার ওপরে থাকবে কিন্তু যদি না থাকে, তাহলে তা তোমাদের কাছেই ফিরে আসবে। (৭)সেই বাড়িতেই থেকো এবং তারা যা দেয়, তাই খেয়ো ও পান করো; কারণ যে কাজ করে সে বেতন পাবার যোগ্য। এক বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়িতে যেয়ো না।
(৮)তোমরা যখন কোনো গ্রামে যাও এবং সেখানকার লোকেরা তোমাদের গ্রহণ করে, তখন তারা তোমাদের যা দেয় তাই খেয়ো। (৯)সেখানকার অসুস্থদের সুস্থ করো এবং তাদের বলো, ‘আল্লাহর রাজ্য তোমাদের কাছে এসেছে।’
(১০)কিন্তু তোমরা যখন কোনো গ্রামে যাও, তখন সেখানকার লোকেরা যদি তোমাদের গ্রহণ না করে, তাহলে সেই গ্রামের রাস্তায় গিয়ে এই কথা বলো- (১১)‘তোমাদের গ্রামের যে-ধুলো আমাদের পায়ে লেগেছে, তা-ও আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে ঝেড়ে ফেললাম। তবুও তোমরা জেনে রেখো, আল্লাহর রাজ্য কাছে এসে গেছে।’ (১২)আমি তোমাদের বলছি, ওই দিন সেই গ্রামের চেয়ে বরং সদোম শহরের অবস্থা অনেক সহনীয় হবে।
(১৩)হায় কোরাযিন! হায় বেতসাইদা! ধিক তোমাদের; কারণ যেসব আশ্চর্য কাজ তোমাদের মধ্যে করা হয়েছে তা যদি টায়ার ও সিডন শহরে করা হতো, তাহলে অনেক আগেই তারা চট পরে ছাই মেখে তওবা করতো।’ (১৪)কিন্তু কেয়ামতের দিন টায়ার ও সিডনের অবস্থা বরং তোমাদের চেয়ে অনেক সহনীয় হবে। (১৫)আর তুমি কফরনাহুম, তুমি নাকি আকাশ পর্যন্ত উঁচুতে উঠবে? না, তোমাকে সব থেকে নিচে নামানো হবে।
(১৬)যারা তোমাদের কথা শোনে, তারা আমারই কথা শোনে। যারা তোমাদের গ্রহণ করে না, তারা আমাকেই গ্রহণ করে না। যারা আমাকে গ্রহণ করে না, যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তারা তাঁকেই গ্রহণ করে না।”
(১৭)সেই সত্তরজন আনন্দের সাথে হযরত ইসা আ. এর কাছে ফিরে এসে বললেন, “হুজুরে আকরাম, আপনার নামে ভূতেরা পর্যন্ত আমাদের কথা শোনে!” (১৮)তিনি তাদের বললেন, “আমি শয়তানকে বেহেস্ত থেকে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো করে পড়ে যেতে দেখেছি।
(১৯)দেখো, আমি তোমাদের সাপ ও বিছাকে পায়ের তলে মাড়াবার এবং শয়তানের সমস্ত শক্তির ওপরে ক্ষমতা দিয়েছি। কোনোকিছুই তোমাদের ক্ষতি করবে না। (২০)কিন্তু ভূতেরা তোমাদের কথা শোনে, এজন্য আনন্দিত হয়ো না, বরং বেহেস্তে তোমাদের নাম লেখা রয়েছে বলে আনন্দ করো।”
(২১)একই সময়ে হযরত ইসা আ. আল্লাহর রুহের দ্বারা আনন্দিত হয়ে বললেন, “হে আমার প্রতিপালক, দুনিয়া ও বেহেস্তের মালিক, আমি তোমার শুকরিয়া আদায় করি। কারণ তুমি এসব বিষয় জ্ঞানী ও বুদ্ধিমানদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছো কিন্তু শিশুর মতো লোকদের কাছে প্রকাশ করেছো। হ্যাঁ, প্রতিপালক, তোমার মহান ইচ্ছাতেই এসব হয়েছে।
(২২)আমার প্রতিপালক সবকিছু আমারই হাতে দিয়েছেন। প্রতিপালক ছাড়া আর কেউ তাঁর একান্ত প্রিয় মনোনীতজনকে জানে না, আবার একান্ত প্রিয় মনোনীতজন ছাড়া আর কেউ প্রতিপালককে জানে না এবং একান্ত প্রিয় মনোনীতজন যার কাছে প্রতিপালককে প্রকাশ করতে ইচ্ছা করেন, কেবল সে-ই জানে।
(২৩)অতঃপর হযরত ইসা আ. হাওয়ারিদের দিকে ফিরলেন এবং তাদেরকে গোপনে বললেন, “তোমরা যা দেখছো তা যারা দেখতে পায়, তারা ভাগ্যবান।
(২৪)আমি তোমাদের বলছি, তোমরা যা যা দেখছো, অনেক নবি ও বাদশা তা দেখতে চেয়েও দেখতে পাননি। আর তোমরা যা যা শুনছো তা শুনতে চেয়েও শুনতে পাননি।”
(২৫)তখন একজন আলিম দাঁড়ালেন এবং হযরত ইসা আ.কে পরীক্ষা করার জন্য বললেন, “হুজুর, কী করলে আমি বেহেস্তে যেতে পারবো?” (২৬)তিনি তাকে বললেন, “তওরাতে কী লেখা আছে? সেখানে কী পড়েছো?” (২৭)তিনি জবাব দিলেন, “তুমি তোমার স¤পূর্ণ হৃদয়, মন, প্রাণ এবং সামর্থ্য দিয়ে তোমার মালিক আল্লাহকে মহব্বত করবে; এবং তোমার প্রতিবেশীকেও নিজের মতো মহব্বত করবে।” (২৮)তিনি তাকে বললেন, “তুমি ঠিক জবাবই দিয়েছো। সেরকমই করো, তাহলে তুমি বেহেস্তে যেতে পারবে।” (২৯)কিন্তু তিনি নিজেকে দীনদার দেখাবার জন্য ইসাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কে আমার প্রতিবেশী?”
(৩০)হযরত ইসা আ. জবাব দিলেন, “এক লোক জেরুসালেম থেকে জিরিহো শহরে যাবার পথে ডাকাতদের হাতে পড়লো। তারা লোকটির জামা-কাপড় খুলে ফেললো এবং তাকে মেরে আধমরা করে রেখে গেলো। (৩১)একজন ইমাম সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলো। সে লোকটিকে দেখলো এবং পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। (৩২)ঠিক সেভাবে একজন লেবীয় সেই জায়গায় এলো এবং তাকে দেখতে পেয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। (৩৩)কিন্তু একজন সামেরীয় সেই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তার কাছে এলো এবং তাকে দেখে তার মমতা হলো। (৩৪)লোকটির কাছে গিয়ে সে তার ক্ষতস্থানের ওপর তেল আর আঙুররস ঢেলে বেঁধে দিলো। তারপর তাকে তার নিজের বোঝা বহনকারী পশুর ওপর বসিয়ে একটি হোটেলে নিয়ে গিয়ে তার সেবাযত্ন করলো।
(৩৫)পরদিন সেই সামেরীয় দুটো দিনার বের করে হোটেলের মালিককে দিয়ে বললো, ‘এই লোকটির যত্ন নেবেন এবং এর বেশি যা খরচ হয়, আমি ফিরে এসে তা শোধ করবো।’(৩৬)এখন তোমার কী মনে হয়? এই তিনজনের মধ্যে কে সেই ডাকাতদের হাতে পড়া লোকটির প্রতিবেশী?” (৩৭)তিনি বললেন, “যে তাকে দয়া করলো, সে-ই।”হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “তাহলে তুমিও গিয়ে সেরকম করো।”
(৩৮)অতঃপর তাঁরা যখন নিজেদের পথে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি কোনো একটি গ্রামে ঢুকলেন। সেখানে মার্থা নামে এক মহিলা তাঁকে তার ঘরে দাওয়াত করলেন।
(৩৯)মরিয়ম নামে তার এক বোন ছিলেন। তিনি হুজুরের পায়ের কাছে বসে তাঁর কথা শুনছিলেন। (৪০)কিন্তু মার্থা তার অনেক কাজের মাঝে ব্যস্ত ছিলেন। সুতরাং তিনি এসে তাঁকে বললেন, “হুজুর, আপনি কি দেখেন না, আমার বোন সমস্ত কাজ আমার একার ওপরে ফেলে দিয়েছে? আপনি ওকে বলুন, যেনো ও আমাকে সাহায্য করে।”(৪১)কিন্তু উত্তরে হুজুরে আকরাম তাকে বললেন, “মার্থা, মার্থা, তুমি অনেক বিষয়ে চিন্তিত ও ব্যস্ত, (৪২)কিন্তু একটি মাত্র বিষয়ই দরকারি; মরিয়ম সেই ভালো বিষয়টিই বেছে নিয়েছে, সেটি তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হবে না।”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)তিনি কোনো এক জায়গায় মোনাজাত করছিলেন। মোনাজাত শেষ হলে তাঁর কোনো এক হাওয়ারি তাঁকে বললেন, “হুজুর, হযরত ইয়াহিয়া আ. যেভাবে তার সাহাবিদেরকে মোনাজাত করতে শিখিয়েছিলেন, সেভাবে আমাদেরও আপনি মোনাজাত করতে শেখান।”
(২)তিনি তাদের বললেন, “যখন তোমরা মোনাজাত করো, তখন বোলো- ‘হে আমাদের প্রতিপালক, সমস্ত প্রশংসা ও গুণগান তোমারই। তোমার রাজ্য আসুক। (৩)আজকের খাবার আজ আমাদের দাও। (৪)আমাদের গুনাখাতা মাফ করো, কারণ যারা আমাদের বিরুদ্ধে অন্যায় করেছে, আমরাও তাদের মাফ করেছি এবং আমাদের পরীক্ষায় পড়তে দিয়ো না।”
(৫)অতঃপর তিনি তাদের বললেন, “মনে করো, তোমাদের মধ্যে একজন মাঝরাতে তার বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে বললো, ‘বন্ধু, আমাকে তিনটে রুটি ধার দাও। (৬)কারণ আমার এক বন্ধু এসেছে, তাকে খেতে দেবার মতো আমার কিছুই নেই।’ (৭)ঘরের ভেতর থেকে সে জবাব দিলো, ‘আমাকে বিরক্ত করো না। দরজা তালা দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে, আর আমার ছেলে-মেয়েরা বিছানায় আমার কাছে শুয়ে আছে। আমি উঠে তোমাকে কিছুই দিতে পারবো না।’ (৮)আমি তোমাদের বলছি, সে যদি বন্ধু হিসেবে উঠে তাকে কিছু না-ও দেয়, তবুও তার নাছোড়বান্দা-স্বভাবের কারণে সে উঠবে এবং তার যা দরকার তা তাকে দেবে।
(৯)সুতরাং আমি তোমাদের বলছি, চাও, তোমাদের দেয়া হবে। খোঁজ করো, পাবে। কড়া নাড়ো, তোমাদের জন্য দরজা খোলা হবে। (১০)কারণ যারা চায়, তারা প্রত্যেকে পায়। যে খোঁজ করে, সে পায়। আর যে দরজায় কড়া নাড়ে, তার জন্য দরজা খোলা হয়।
(১১)তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, তোমার সন্তান মাছ চাইলে যে তাকে মাছের বদলে সাপ দেবে? (১২)অথবা ডিম চাইলে বিছা দেবে? (১৩)তাহলে তোমরা খারাপ হয়েও যদি তোমাদের ছেলেমেয়েদের ভালো ভালো জিনিস দিতে জানো, তাহলে যারা প্রতিপালকের কাছে চায়, তিনি যে তাদের আল্লাহর রুহ দেবেন, এটি কতো না নিশ্চিত!”
(১৪)এ-সময় তিনি একটি বোবা ভূত ছাড়াচ্ছিলেন। ভূত চলে গেলে বোবা লোকটি কথা বলতে লাগলো এবং লোকেরা খুবই আশ্চর্য হলো। (১৫)কিন্তু তাদের কয়েকজন বললো, “ভূতের রাজা বেলসবুলের সাহায্যেই সে ভূত ছাড়ায়।”(১৬)অন্য লোকেরা তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য বেহেস্ত থেকে একটি মোজেজা দেখানোর দাবি জানাতে থাকলো। (১৭)তাদের মনের কথা বুঝতে পেরে তিনি বললেন, “যে-রাজ্য নিজের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, সে-রাজ্য ধ্বংস হয়। এবং পরিবার নিজের মধ্যে ভাগ হলে পরিবার ভেঙে যায়। (১৮)শয়তানও যদি নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাহলে কেমন করে তার রাজ্য টিকবে? তোমরা বলছো, আমি বেলসবুলের সাহায্যে ভূত ছাড়াই। (১৯)আমি যদি বেলসবুলের সাহায্যেই ভূত ছাড়াই, তাহলে তোমাদের লোকেরা কার সাহায্যে ভূত ছাড়ায়? সুতরাং তারাই তোমাদের বিচার করবে। (২০)কিন্তু আমি যদি আল্লাহর ক্ষমতায় ভূত ছাড়াই, তাহলে আল্লাহর রাজ্য তোমাদের কাছে এসে গেছে।
(২১)একজন বলবান সবরকম অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যখন নিজের ঘর পাহারা দেয়, তখন তার জিনিসপত্র নিরাপদে থাকে। (২২)কিন্তু তার চেয়েও বলবান কেউ এসে যদি তাকে হামলা করে হারিয়ে দেয়, তাহলে যে-অস্ত্রশস্ত্রের ওপর সে ভরসা করেছিলো, অন্য লোকটি সেগুলো কেড়ে নেয় আর লুট করা জিনিসগুলো ভাগ করে নেয়। (২৩)যে আমার পক্ষে নয়, সে আমার বিপক্ষে। যে আমার সাথে কুড়ায় না, সে ছড়ায়।
(২৪)কোনো ভূত যখন কোনো লোকের ভেতর থেকে বেরিয়ে যায়, তখন সে শুকনো জায়গার মধ্যে ঘোরাফেরা করে বিশ্রামের জন্য স্থান খুঁজতে থাকে। পরে তা না পেয়ে সে বলে, ‘আমি যে-ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছি, আবার সেই ঘরেই ফিরে যাবো।’(২৫)সে ফিরে এসে সেই ঘরটি খালি, পরিষ্কার এবং সাজানো দেখতে পায়। (২৬)তখন সে গিয়ে নিজের চেয়েও খারাপ অন্য আরো সাতটি ভূত সাথে নিয়ে আসে এবং সেখানে ঢুকে বাস করতে থাকে। তার ফলে সেই লোকটির প্রথম অবস্থা থেকে পরের অবস্থা আরো খারাপ হয়।”(২৭)তিনি যখন এসব কথা বলছিলেন, তখন ভিড়ের মধ্য থেকে এক মহিলা চিৎকার করে বললো, “ভাগ্যবতী সেই মহিলা, যিনি আপনাকে গর্ভে ধরেছেন এবং বুকের দুধ খাইয়েছেন।”
(২৮)কিন্তু তিনি বললেন, “এর চেয়ে বরং ভাগ্যবান তারা, যারা আল্লাহর কালাম শোনে এবং সেই অনুসারে কাজ করে।”
(২৯)লোকের ভিড় বাড়তে থাকলে তিনি বলতে শুরু করলেন, “এ-কালের লোকেরা খারাপ। তারা চিহ্ন হিসেবে মোজেজার খোঁজ করে। কিন্তু হযরত ইউনুস আ. এর চিহ্ন ছাড়া আর কোনো চিহ্নই তাদের দেখানো হবে না। (৩০)নিনবি শহরের লোকদের জন্য হযরত ইউনুস আ. যেমন নিজেই চিহ্ন হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি করে এ-কালের লোকদের জন্য ইবনুল-ইনসানই চিহ্ন হবেন।
(৩১)কেয়ামতের দিন দক্ষিণের রানী উঠে এ-কালের লোকদের দোষ দেখিয়ে দেবে। কারণ বাদশা সোলায়মানের মহাজ্ঞানের কথা শোনার জন্য সে দুনিয়ার শেষ সীমা থেকে এসেছিলো। আর দেখো, এখানে সোলায়মানের চেয়েও মহান একজন আছেন। (৩২)কেয়ামতের দিন নিনবি শহরের লোকেরা উঠে এ-কালের লোকদের দোষী করবে। কারণ হযরত ইউনুস আ.র প্রচারের ফলে তারা তওবা করেছিলো। আর দেখো, এখানে হযরত ইউনুস আ.-র চেয়ে মহান একজন আছেন।
(৩৩)কেউ বাতি জ্বেলে কোনো গোপন জায়গায় বা ঝুড়ির নিচে রাখে না বরং বাতিদানির ওপরেই রাখে, যেনো যারা ভেতরে ঢোকে তারা আলো দেখতে পায়।
(৩৪)তোমার চোখ তোমার শরীরের বাতি। তোমার চোখ যদি ভালো হয়, তাহলে তোমার গোটা শরীরই আলোতে পূর্ণ হবে। কিন্তু তা যদি ভালো না থাকে, তাহলে তোমার শরীরও অন্ধকারে পূর্ণ হবে।
(৩৫)সুতরাং দেখো, যে-আলো তোমার ভেতরে আছে তা যেনো অন্ধকার না হয়। (৩৬)তোমার গোটা শরীর যদি আলোয় পূর্ণ হয় এবং একটুও অন্ধকার না থাকে, তাহলে তা স¤পূর্ণ আলোকিত হবে, ঠিক যেমন বাতির আলো তোমার ওপরে পড়লে তোমার শরীর আলোকিত হয়।”
(৩৭)তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখন এক ফরিসি তাঁকে তার সাথে খাওয়ার দাওয়াত দিলেন। সুতরাং তিনি ভেতরে গিয়ে খেতে বসলেন। (৩৮)খাওয়ার আগে তিনি হাত ধুলেন না দেখে সেই ফরিসি অবাক হলেন। (৩৯)তখন হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “তাহলে শোনো, তোমরা ফরিসিরা থালাবাটির বাইরের দিক পরিষ্কার করে থাকো কিন্তু তোমাদের ভেতরটা লোভ ও স্বার্থপরতায় পূর্ণ। (৪০)তোমরা মূর্খ! যিনি বাইরের দিক তৈরি করেছেন, তিনি কি ভেতরের দিকও তৈরি করেননি? (৪১)ভেতরে যা আছে তা-ই বরং ভিক্ষার মতো দান করো; তোমাদের জন্য সবকিছুই পাকসাফ করা হবে।
(৪২)ফরিসিরা, লানত তোমাদের ওপর! কারণ তোমরা আল্লাহকে পুদিনা, তেজপাতা ও সবরকমের শাকের দশ ভাগের এক ভাগ দিয়ে থাকো কিন্তু ন্যায়বিচার ও আল্লাহর প্রতি মহব্বতের দিকে মনোযোগ দাও না। ন্যায়বিচার ও আল্লাহর প্রতি মহব্বতের দিকে মনোযোগী হওয়ার সাথে সাথে ওগুলোও তোমাদের পালন করা উচিত। (৪৩)ফরিসিরা, লানত তোমাদের ওপর! কারণ তোমরা সিনাগোগের সম্মানের আসনে বসতে এবং হাটবাজারে সালাম পেতে ভালোবাসো। (৪৪)ফরিসিরা, লানত তোমাদের ওপর! কারণ তোমরা তো চিহ্ন না দেয়া কবরের মতো; লোকে না জেনে তার ওপর দিয়ে হেঁটে যায়।”
(৪৫)তখন আলিমদের মধ্যে একজন তাঁকে বললেন, “হুজুর, এই কথাগুলো বলে আপনি আমাদেরও অপমান করছেন।” (৪৬)তিনি বললেন, “আলিমরা, লানত তোমাদের ওপর! কারণ তোমরা লোকদের ওপর ভারি বোঝা চাপিয়ে দিয়ে থাকো কিন্তু তাদের সাহায্য করার জন্য নিজেরা একটি আঙুলও নাড়াও না। (৪৭)লানত তোমাদের ওপর! কারণ তোমরা নবিদের কবর নতুন করে গেঁথে থাকো। তোমাদের পূর্বপুরুষেরাই তো তাদের হত্যা করেছিলো। (৪৮)সুতরাং তোমরাই তোমাদের পূর্বপুরুষদের কাজের সাক্ষী এবং তোমরাই তা অনুমোদন করছো। তারা হত্যা করেছে আর তোমরা কবর গাঁথছো।
(৪৯)এজন্য আল্লাহর মহাজ্ঞান বলছে, আমি তাদের কাছে নবি ও রাসুলদের পাঠিয়ে দেবো। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে তারা হত্যা করবে ও অন্যদের ওপর নির্যাতন চালাবে, (৫০)যেনো পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে যতো নবিকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের রক্তের দায় তাদের ওপরে বর্তায়- (৫১)হযরত হাবিল আ.-র রক্ত থেকে শুরু করে হযরত জাকারিয়া আ., যাকে কোরবানি দেবার স্থান ও পবিত্রস্থানের মাঝখানে হত্যা করা হয়েছিলো, তার রক্ত পর্যন্ত- হ্যাঁ, আমি তোমাদের বলছি, এ-কালের লোকেরাই এর জন্য দায়ী হবে। (৫২)আলিমরা, লা’নত তোমাদের ওপর! কারণ তোমরা জ্ঞানের চাবি সরিয়ে নিয়েছো; তোমরা নিজেরাও ভেতরে ঢোকো না আর যারা ঢুকতে চায়, তাদেরকেও ঢুকতে দাও না।”
(৫৩)যখন তিনি বাইরে গেলেন, তখন আলিমরা ও ফরিসিরা তাঁর বিরুদ্ধে শত্রুতা করার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য তারা নানা বিষয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে থাকলেন আর অপেক্ষা করতে থাকলেন, (৫৪)যেনো তাঁকে তাঁর কথার ফাঁদে ফেলতে পারেন।
রুকু PDF আকরে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)এর মধ্যে হাজার হাজার লোক এমনভাবে জড়ো হলো যে, তারা ঠেলাঠেলি করে একে অন্যের ওপর পড়তে লাগলো। তিনি প্রথমে তাঁর হাওয়ারিদেরকে বললেন, “ফরিসিদের খামি থেকে সাবধান হও; এটি হলো তাদের ভন্ডামি। ২লুকোনো কিছুই নেই, যা প্রকাশ পাবে না এবং গোপন কিছুই নেই, যা জানানো হবে না। ৩সুতরাং তোমরা অন্ধকারে যা বলেছো তা আলোতে শোনা যাবে এবং ভেতরের ঘরে যা কানে কানে বলেছো তা ছাদের ওপর থেকে প্রচার করা হবে।
(৪)বন্ধুরা আমার, আমি তোমাদের বলছি, যারা শরীর ধ্বংস করার পরে আর কিছুই করতে পারে না, তাদের ভয় কোরো না। (৫)কিন্তু কাকে ভয় করবে, সে-বিষয়ে আমি তোমাদের সাবধান করে দিচ্ছি- তোমাদের হত্যা করার পরে জাহান্নামে ফেলে দেবার ক্ষমতা যাঁর আছে, তাঁকেই ভয় করো। হ্যাঁ, আমি তোমাদের বলছি, তাঁকেই ভয় করো। (৬)পাঁচটি চড়ুই কি দু’পয়সায় বিক্রি হয় না? তবুও আল্লাহ সেগুলোর একটিকেও ভুলে যান না।
(৭)এমনকি তোমাদের মাথার চুলগুলোও তাঁর গোনা আছে। ভয় করো না, অনেক অনেক চড়ুইয়ের চেয়েও তোমাদের মূল্য অনেক বেশি।
(৮)আমি তোমাদের বলছি, যে কেউ লোকদের সামনে আমাকে স্বীকার করে, ইবনুল-ইনসানও তাকে আল্লাহর ফেরেস্তাদের সামনে স্বীকার করবেন। (৯)কিন্তু যে কেউ আমাকে লোকদের সামনে অস্বীকার করে, তাকে আল্লাহর ফেরেস্তাদের সামনে অস্বীকার করা হবে।
(১০)ইবনুল-ইনসানের বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বললে তাকে ক্ষমা করা হবে কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর রুহের বিরুদ্ধে কুফরি করে, তাকে ক্ষমা করা হবে না।
(১১)তারা যখন তোমাদের সিনাগোগে এবং শাসনকর্তাদের ও ক্ষমতাশালী লোকদের সামনে নিয়ে যাবে, তখন কীভাবে নিজেদের পক্ষে কথা বলবে বা কী জবাব দেবে, সে-বিষয়ে চিন্তিত হয়ো না। (১২)কারণ কী বলতে হবে তা আল্লাহর রুহই সেই মুহূর্তে তোমাদের শিখিয়ে দেবেন।”
(১৩)ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন তাঁকে বললো, “হুজুর, আমার ভাইকে বলুন, যেনো আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি আমাকে ভাগ করে দেয়। ১৪কিন্তু তিনি তাকে বললেন, “বন্ধু, তোমাদের সম্পত্তি ভাগ করে দিতে বা বিচার করতে কে আমাকে তোমাদের ওপরে নিয়োগ করেছে?” (১৫)তিনি তাদের বললেন, “সাবধান! সবরকম লোভের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করো, কারণ অনেক ধন-সম্পত্তি থাকার মধ্যেই মানুষের জীবন নয়।”
(১৬)এরপর তিনি তাদের একটি দৃষ্টান্ত দিলেন- “কোনো এক ধনী লোকের জমিতে অনেক ফসল হয়েছিলো।
(১৭)সে মনে মনে চিন্তা করতে লাগলো, ‘এতো ফসল রাখার জায়গা তো আমার নেই; আমি এখন কী করবো?’ (১৮)অতঃপর সে বললো, ‘আমি একটি কাজ করবো; আমার গোলাঘরগুলো ভেঙে ফেলে বড়ো বড়ো গোলাঘর তৈরি করবো এবং আমার সমস্ত ফসল ও জিনিসপত্র সেখানে রাখবো।
(১৯)পরে আমি নিজেকে বলবো, অনেক বছরের জন্য অনেক ভালো জিনিস জমা আছে। আরাম করো, খাওয়া-দাওয়া করো, আনন্দ-ফুর্তিতে দিন কাটাও।’(২০)কিন্তু আল্লাহ তাকে বললেন, ‘আরে বোকা! আজ রাতেই তোমাকে মরতে হবে। তাহলে যেসব জিনিস তুমি জমা করেছো, সেগুলো কার হবে?’ (২১)সুতরাং যে নিজের জন্য ধন-সম্পত্তি জমা করে অথচ আল্লাহর চোখে ধনী নয়, তার অবস্থা ওরকমই হবে।”
(২২)তিনি তাঁর হাওয়ারিদেরকে বললেন, “এজন্যই আমি তোমাদের বলছি, কী খাবে বলে জীবনের বিষয়ে কিংবা কী পরবে বলে শরীরের বিষয়ে চিন্তা করো না। (২৩)কারণ জীবনটা খাওয়া-দাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর শরীরটা জামা-কাপড়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। (২৪)কাকগুলোর দিকে চেয়ে দেখো; তারা বীজও বোনে না, ফসলও কাটে না। তাদের গুদাম বা গোলাঘরও নেই। তবুও আল্লাহ তাদের খাইয়ে থাকেন। তোমরা তো পাখিদের চেয়ে আরো কতো-না বেশি মূল্যবান!
(২৫)তোমাদের মধ্যে কেউ কি চিন্তা-ভাবনা করে নিজের আয়ু এক ঘন্টা বাড়াতে পারে? (২৬)এই সামান্য কাজটিও যদি তোমরা করতে না পারো, তাহলে অন্যান্য বিষয়ের জন্য কেনো দুশ্চিন্তা করো? (২৭)ভেবে দেখো, ফুল কেমন করে বেড়ে ওঠে- তারা পরিশ্রম করে না, সুতোও কাটে না। তবুও আমি তোমাদের বলছি, বাদশা সোলায়মান এতো জাঁকজমকের মধ্যে থেকেও এগুলোর একটির মতোও নিজেকে সাজাতে পারেননি। (২৮)মাঠে যে-ফুল আজ আছে আর কাল চুলোয় ফেলে দেয়া হবে, আল্লাহ তা যখন এভাবে সাজান, (২৯)তখন হে অল্প বিশ্বাসীরা, তিনি যে তোমাদের সাজাবেন তা কতো না নিশ্চিত! সুতরাং কী খাওয়া-দাওয়া করবে, সে-বিষয়ে চিন্তা করে করে অস্থির হয়ো না। (৩০)এই দুনিয়ার জাতিগুলো ওসবের পেছনে দৌঁড়ায় কিন্তু তোমাদের প্রতিপালক তো জানেন যে, তোমাদের এগুলোর দরকার আছে। (৩১)তার চেয়ে তোমরা বরং তাঁর রাজ্যের পেছনে দৌড়াও, তাহলে এগুলোও তোমাদের দেয়া হবে।
(৩২)হে আমার ছোটো দল, ভয় কোরো না, কারণ তোমাদের প্রতিপালকের ইচ্ছা এই যে, এই রাজ্য তিনি তোমাদের দেবেন। (৩৩)তোমাদের বিষয়-সম্পত্তি বিক্রি ও দান খয়রাত করো। যে-টাকার থলি কখনো পুরোনো হয় না তা-ই নিজেদের জন্য তৈরি করো। অর্থাৎ যে-ধন চিরদিন টিকে থাকে তা-ই বেহেস্তে জমা করো। সেখানে চোরও আসে না এবং পোকায়ও নষ্ট করে না। (৩৪)কারণ তোমাদের ধন যেখানে থাকে, তোমাদের মন সেখানেই থাকবে।
(৩৫)কোমর বেঁধে এবং তোমাদের বাতি জ্বালিয়ে নিয়ে প্রস্তুত থাকো।
(৩৬)এমন লোকদের মতো হও, যারা বিয়েভোজ থেকে তাদের মালিকের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে, যেনো সে ফিরে এসে দরজায় কড়া নাড়লেই তারা দরজা খুলে দিতে পারে।
(৩৭)মালিক যে-গোলামদের জেগে থাকতে দেখবে, তারাই ভাগ্যবান। আমি তোমাদের সত্যি বলছি, সে এসে কোমরে গামছা বেঁধে নিয়ে তাদের খেতে বসাবে এবং খাবার দেবে। (৩৮)ভাগ্যবান সেসব গোলাম, মালিক এসে যাদের জেগে থাকতে দেখবে- তা মাঝরাতে হোক বা শেষরাতে হোক।
(৩৯)কিন্তু একথা জেনে রেখো- চোর কোন সময়ে আসবে তা যদি বাড়ির মালিক জানতো, তাহলে জেগে থাকতো; সেই চোরকে তার ঘরের বেড়া ভেঙে ঘরে ঢুকতে দিতো না। (৪০)তোমরাও প্রস্তুত থাকো। কারণ যে-সময়ের কথা তোমরা চিন্তাও করবে না, সেই সময়েই ইবনুল-ইনসান আসবেন।”
(৪১)হযরত পিতর আ. বললেন, “হুজুর, আপনি কি আমাদের উদ্দেশে এ-দৃষ্টান্তটি দিচ্ছেন, নাকি সকলের উদ্দেশে?” (৪২)হযরত ইসা আ. বললেন, “সেই বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান ম্যানেজার কে, যাকে মালিক তার গোলামদের ঠিক সময়ে খাবার ভাগ করে দেবার ভার দেবে? (৪৩)ভাগ্যবান সেই গোলাম, যাকে তার মালিক এসে কাজের মধ্যে পাবে। (৪৪)আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, সে তাকে তার সমস্ত বিষয়-স¤পত্তির ভার দেবে। (৪৫)কিন্তু সেই গোলাম যদি মনে মনে বলে, ‘আমার মালিক আসতে দেরি করছেন,’ এবং সে অন্য গোলাম ও দাসীদের মারধর শুরু করে এবং খাওয়া-দাওয়া করার পরে মদ খেয়ে মাতাল হয়, (৪৬)তাহলে যেদিন তার আসার সময়ের কথা সে চিন্তাও করবে না এবং যে-সময়ের কথা সে জানেও না, সেদিন ও সেই সময়েই তার মালিক এসে হাজির হবে এবং সে তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে অবিশ্বাসীদের মধ্যে ফেলে দেবে। (৪৭)যে-গোলাম তার মালিকের ইচ্ছা জেনেও প্রস্তুত থাকেনি কিংবা মালিক যা চায় তা করেনি, তাকে ভীষণভাবে মার খেতে হবে। (৪৮)কিন্তু না জেনে যে শাস্তি পাবার কাজ করেছে, তার অল্পই শাস্তি হবে। যাকে বেশি দেয়া হয়েছে, তার কাছে বেশি দাবি করা হবে এবং যার কাছে বেশি রাখা হয়েছে, তার কাছে বেশিই চাওয়া হবে।
(৪৯)আমি পৃথিবীতে আগুন জ্বালাতে এসেছি। যদি তা আগেই জ্বলে উঠতো, তাহলে কতোই না ভালো হতো!
(৫০)আমার একটি বায়াত আছে, যে-বায়াত আমাকে নিতে হবে; আর যতোদিন তা পূর্ণ না হচ্ছে, ততোদিন আমি কি কষ্টের মধ্যেই না আছি! (৫১)তোমাদের কি মনে হয় যে, আমি দুনিয়াতে শান্তি দিতে এসেছি? না, আমি তোমাদের বলছি, তা নয় বরং বিভেদ! (৫২)এখন থেকে এক বাড়ির পাঁচজন ভাগ হয়ে যাবে- তিনজন দু’জনের বিরুদ্ধে আর দু’জন তিনজনের বিরুদ্ধে। (৫৩)তারা ভাগ হয়ে যাবে- বাবা ছেলের বিরুদ্ধে ও ছেলে বাবার বিরুদ্ধে; মা মেয়ের বিরুদ্ধে ও মেয়ে মায়ের বিরুদ্ধে; শাশুড়ি পুত্রবধূর বিরুদ্ধে ও পুত্রবধূ শাশুড়ির বিরুদ্ধে।”
(৫৪)তিনি লোকদের এও বললেন, “তোমরা পশ্চিম দিকে মেঘ জমতে দেখলে তখনই বলে থাকো, ‘বৃষ্টি হবে’ আর তা-ই হয়। (৫৫)আবার দখিনা বাতাস বইতে দেখলে বলো, ‘গরম পড়বে’, আর তা-ই হয়। (৫৬)তোমরা ভন্ড! তোমরা দুনিয়া ও আকাশের চেহারার অর্থ বুঝতে পারো কিন্তু কেনো এখনকার সময়ের অর্থ করতে পারো না?
(৫৭)কোনটি ন্যায়, সে-বিষয়ে কেনো নিজেই বিচার করো না?
(৫৮)তোমার বিপক্ষের সাথে বিচারকের কাছে যাওয়ার সময় পথেই তার সাথে একটি মীমাংসা করে নাও। তা না হলে সে তোমাকে বিচারকের কাছে টেনে নিয়ে যাবে আর বিচারক তোমাকে পুলিশে দেবে এবং পুলিশ তোমাকে জেলে দেবে। (৫৯)আমি তোমাকে বলছি, শেষ পয়সাটা না দেয়া পর্যন্ত তুমি কিছুতেই ছাড়া পাবে না।”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)ঠিক ওই সময় যারা উপস্থিত ছিলো, তারা হযরত ইসা আ.কে বললো, গালিলের কিছু লোক যখন কোরবানি করছিলো, তখন তাদেরকে হত্যা করার জন্য পিলাত হুকুম দিয়েছিলেন। (২)তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের কি মনে হয় যে, ওই গালিলীয়রা এভাবে যন্ত্রণাভোগ করেছে বলে তারা অন্য সব গালিলীয়দের চেয়ে বেশি গুনাহগার ছিলো? (৩)না, আমি তোমাদের বলছি, তওবা না করলে তোমরা সবাই তাদের মতোই ধ্বংস হবে। (৪)কিংবা সিলোহের টাওয়ারটি পড়ে গিয়ে যে-আঠারোজনের মৃত্যু হয়েছিলো, তোমরা কি মনে করো যে, জেরুসালেমের বাকি জীবিত লোকদের থেকে তাদের দোষ বেশি ছিলো? (৫)আমি তোমাদের বলছি, তা নয়। কিন্তু তওবা না করলে তোমরা সবাই তাদের মতোই ধ্বংস হবে।
(৬)অতঃপর তিনি এই দৃষ্টান্ত দিলেন- “কোনো এক লোকের ফলের বাগানে একটি ডুমুরগাছ লাগানো হয়েছিলো। সে এসে ফলের খোঁজ করলো কিন্তু পেলো না। (৭)তখন সে তার কর্মচারীকে বললো, ‘দেখো, তিন বছর ধরে এই ডুমুরগাছে আমি ফলের খোঁজ করছি কিন্তু কিছুই পাচ্ছি না। তুমি গাছটি কেটে ফেলো! কেনো এটি জমি অপচয় করবে?’ (৮)সে জবাব দিলো, ‘হুজুর, আরেক বছর ওটা থাকতে দিন। আমি এর চারপাশ খুঁড়ে সার দেবো। (৯)তারপর যদি ফল ধরে তো ভালো, তা না হলে আপনি ওটা কেটে ফেলবেন।’”
(১০)এক সাব্বাতে তিনি একটি সিনাগোগে গিয়ে শিক্ষা দিচ্ছিলেন। (১১)তখনই সেখানে এক মহিলা এলো। একটি ভূত তাকে আঠারো বছর ধরে কুঁজো করে রেখেছিলো। সে একেবারেই সোজা হতে পারতো না। (১২)হযরত ইসা আ. যখন তাকে দেখলেন, তখন তিনি তাকে কাছে ডেকে বললেন, “হে মহিলা, তোমার অসুস্থতা থেকে তুমি মুক্ত।”(১৩)যখন তিনি তার ওপরে তাঁর হাত রাখলেন, তখনই সে সোজা হয়ে দাঁড়ালো এবং আল্লাহর প্রশংসা করতে লাগলো।
(১৪)কিন্তু হযরত ইসা আ. সাব্বাতে সুস্থ করেছেন বলে সিনাগোগের নেতা রাগ করে জনতার উদ্দেশে বলতে থাকলেন, “কাজ করার জন্য ছ’দিন তো আছেই, ওই দিনগুলোতে এসে সুস্থ হয়ো, সাব্বাতে নয়।”(১৫)কিন্তু উত্তরে হুজুর তাকে বললেন, “তোমরা ভন্ড! তোমরা প্রত্যেকেই কি সাব্বাতে তোমাদের বলদ বা গাধাকে গোয়াল থেকে খুলে পানি খাওয়াতে নিয়ে যাও না?
(১৬)তাহলে হযরত ইব্রাহিম আ.-র বংশধর এই মহিলা, যাকে আজ আঠারো বছর ধরে শয়তান বেঁধে রেখেছিলো, তাকে কি সাব্বাতে সেই বাঁধন থেকে মুক্ত করা উচিত নয়?”
(১৭)তিনি একথা বলার পর যারা তাঁর বিরুদ্ধে ছিলো, তারা সবাই লজ্জা পেলো। কিন্তু সমগ্র জনতা তাঁর এসব মহান কাজ দেখে আনন্দিত হলো।
(১৮)অতঃপর তিনি বললেন, “আল্লাহর রাজ্য কীসের মতো? কীসের সাথে আমি এর তুলনা করবো? (১৯)এটি একটি সরিষার মতো, যা এক লোক নিয়ে গিয়ে তার বাগানে ফেলে দিলো। পরে চারা বেড়ে উঠে একটি গাছ হয়ে উঠলো এবং পাখিরা এসে তার ডালপালায় বাসা বাঁধলো।”
(২০)তিনি আবার বললেন, “কীসের সাথে আমি আল্লাহর রাজ্যের তুলনা করবো? এটি খামির মতো, যা (২১)এক মহিলা নিয়ে গিয়ে তিন পাল্লা ময়দার সাথে মেশালো। শেষে গোটা ময়দাই ফেঁপে উঠলো।”
(২২)হযরত ইসা আ. গ্রামে গ্রামে ও শহরে শহরে শিক্ষা দিতে দিতে জেরুসালেমের দিকে এগিয়ে চললেন। (২৩)এক লোক তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, “মালিক, নাজাত কি কেবল অল্প লোকই পাবে?” (২৪)তিনি তাদের বললেন, “সরু দরজা দিয়ে ঢুকতে আপ্রাণ চেষ্টা করো। আমি তোমাদের বলছি, অনেকেই ঢুকতে চেষ্টা করবে কিন্তু পারবে না। (২৫)ঘরের মালিক উঠে যখন দরজা বন্ধ করে দেবে, তখন তোমরা বাইরে দাঁড়িয়ে দরজার কড়া নাড়তে নাড়তে বলবে, ‘মালিক, আমাদের জন্য দরজা খুলে দিন।’ সে তোমাদের জবাব দেবে, ‘আমি জানি না, তোমরা কোথা থেকে এসেছো।’(২৬)তখন তোমরা বলবে, ‘আমরা আপনার সাথে খাওয়া-দাওয়া করেছি এবং আপনি আমাদের রাস্তায় রাস্তায় শিক্ষা দিতেন।’(২৭)কিন্তু সে বলবে, ‘তোমরা কোথা থেকে এসেছো আমি জানি না। দুষ্ট লোকেরা, তোমরা আমার কাছ থেকে দূর হও! ’
(২৮)তোমরা যখন দেখবে, হযরত ইব্রাহিম আ., হযরত ইসহাক আ., হযরত ইয়াকুব আ. ও নবিরা সবাই আল্লাহর রাজ্যে আছেন এবং তোমাদের নিজেদেরই বাইরে ফেলে দেয়া হয়েছে, তখন তোমরা কান্নাকাটি করবে ও যন্ত্রণায় দাঁতে দাঁত ঘষতে থাকবে। (২৯)তখন পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ থেকে লোকেরা এসে আল্লাহর রাজ্যে খেতে বসবে। (৩০)যদিও যারা শেষে আছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রথম হবে; আর যারা প্রথমে আছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ শেষে পড়বে।”
(৩১)ঠিক সেই সময়ে কয়েকজন ফরিসি তাঁর কাছে এসে বললেন, “এখান থেকে চলে যান, কারণ হেরোদ আপনাকে হত্যা করতে চাইছেন।”(৩২)তিনি তাদের বললেন, “তোমরা গিয়ে সেই শিয়ালটাকে বলো, ‘আজ ও আগামীকাল আমি ভূত ছাড়াবো এবং রোগীদের সুস্থ করবো আর তৃতীয় দিনে আমার কাজ শেষ করবো। (৩৩)যা-ই হোক, আজ, কাল ও পরশু আমাকে আমার পথে চলতে হবে; কারণ জেরুসালেমের বাইরে কোথাও কোনো নবিকে হত্যা করা অসম্ভব।’
(৩৪)“জেরুসালেম, জেরুসালেম! তুমি নবিদেরকে হত্যা করে থাকো এবং তোমার কাছে যাদের পাঠানো হয়, তাদের পাথর মেরে হত্যা করে থাকো! মুরগি যেমন নিজের বাচ্চাদের তার ডানার নিচে জড়ো করে, ঠিক তেমনি আমি কতোবার তোমার সন্তানদের একত্রে জড়ো করতে চেয়েছি কিন্তু তোমরা রাজি হওনি।
(৩৫)দেখো, তোমাদের বাড়ি তোমাদের সামনে খালি পড়ে রইলো। আমি তোমাদের বলছি, যতোদিন না তোমরা বলবে, ‘যিনি আল্লাহর নামে আসছেন, তাঁর প্রশংসা হোক,’ ততোদিন তোমরা আর আমাকে দেখতে পাবে না।”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)এক সাব্বাতে হযরত ইসা আ. ফরিসিদের এক নেতার বাড়িতে খেতে গেলেন। তারা গভীরভাবে তাঁকে লক্ষ্য করছিলেন। (২)ঠিক ওই সময় তাঁর সামনে এক লোক বসে ছিলো, যার ছিলো শোত রোগ। (৩)হযরত ইসা আ. আলিমদের ও ফরিসিদের জিজ্ঞেস করলেন, “সাব্বাতে কাউকে সুস্থ করা কি শরিয়ত-সম্মত, নাকি শরিয়ত-সম্মত নয়?” (৪)কিন্তু তারা চুপ করে রইলেন। তখন হযরত ইসা আ. লোকটির গায়ে হাত দিয়ে তাকে ধরলেন এবং সুস্থ করলেন ও তাকে বিদায় করে দিলেন। (৫)তারপর তিনি তাদের বললেন, “তোমাদের কারো ছেলে বা বলদ যদি সাব্বাতে কুয়োয় পড়ে যায়, তাহলে তোমরা কি তাকে তখনই তোলো না?” (৬)তারা কোনো জবাব দিতে পারলেন না।
(৭)তিনি যখন দেখলেন যে, মেহমানরা কীভাবে সম্মানের জায়গাগুলো বেছে নিচ্ছে, তখন তিনি তাদের একটি দৃষ্টান্ত দিলেন- (৮)“কেউ যখন তোমাকে বিয়েভোজে দাওয়াত করে, তখন সম্মানের জায়গায় গিয়ে বসবে না। হয়তো তোমার থেকেও সম্মানিত কাউকে দাওয়াত করা হয়েছে। (৯)তাহলে যে তোমাকে ও তাকে দাওয়াত করেছে, সে এসে তোমাকে বলবে, ‘এই জায়গাটি ওনাকে ছেড়ে দাও।’তখন তো তুমি লজ্জা পেয়ে সবচেয়ে নীচু জায়গায় বসতে যাবে। (১০)কিন্তু তুমি যখন দাওয়াত পাবে, তখন বরং সবচেয়ে কম সম্মানের জায়গায় গিয়ে বসবে; তাহলে যে দাওয়াত করেছে, সে এসে তোমাকে বলবে, ‘বন্ধু, সামনে এসে বসো।’
তখন অন্য সব মেহমানদের সামনে তুমি সম্মান পাবে। (১১)কারণ যে নিজেকে উঁচু করে, তাকে নীচু করা হবে; আর যে নিজেকে নীচু করে, তাকে উঁচু করা হবে।”
(১২)যিনি তাঁকে দাওয়াত করেছিলেন, তাকে তিনি বললেন, “যখন তুমি দুপুর কিংবা রাতে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করবে, তখন তোমার বন্ধুবান্ধব, ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজন বা ধনী প্রতিবেশীদের দাওয়াত করবে না। হয়তো পরে তারাও এর বদলে তোমাকে দাওয়াত করবে আর এভাবেই তোমার দাওয়াত শোধ হয়ে যাবে। (১৩)কিন্তু তুমি যখন বিশেষ খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করবে, তখন গরিব, নুলা, খোঁড়া এবং অন্ধদের দাওয়াত করো।
(১৪)এতে তুমি রহমত পাবে। কারণ তারা তোমার সেই দাওয়াত শোধ করতে পারবে না। কেয়ামতের দিন দীনদারদের সাথে তুমি এর পুরস্কার পাবে।”
(১৫)যারা খেতে বসেছিলো, তাদের মধ্যে একজন একথা শুনে তাঁকে বললো, “ভাগ্যবান তিনি, যিনি আল্লাহর রাজ্যে খেতে বসবেন।”(১৬)তখন হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “কোনো এক লোক বিরাট এক খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করলো এবং অনেককে দাওয়াত দিলো।
(১৭)খাওয়ার সময় হলে সে তার গোলামকে দিয়ে মেহমানদের বলে পাঠালো, ‘আসুন, এখন সবই প্রস্তুত।’(১৮)কিন্তু তারা সবাই একজনের পর একজন অজুহাত দেখাতে লাগলো। প্রথমজন তাকে বললো, “আমি কিছু জমি কিনেছি, আমাকে গিয়ে তা দেখতে হবে; আমাকে ক্ষমা করো।’(১৯)আরেকজন বললো, ‘আমি পাঁচ জোড়া বলদ কিনেছি, সেগুলো পরীক্ষা করতে যাচ্ছি; আমাকে ক্ষমা করো।’(২০)অন্য আরেকজন বললো, ‘আমি সবেমাত্র বিয়ে করেছি, তাই যেতে পারছি না’। (২১)সেই গোলাম ফিরে গিয়ে তার মালিককে এসব জানালো। তাতে বাড়ির মালিক রাগ করে তার গোলামকে বললো, ‘তুমি তাড়াতাড়ি শহরের রাস্তায় রাস্তায় ও অলিগলিতে যাও এবং গরিব, নুলা, অন্ধ ও খোঁড়াদের নিয়ে এসো।’(২২)পরে সেই গোলাম বললো, ‘হুজুর, আপনার হুকুম অনুসারেই কাজ করা হয়েছে কিন্তু এখনো জায়গা রয়ে গেছে।’(২৩)এতে মালিক গোলামকে বললো, ‘শহরের বাইরে রাস্তায় রাস্তায় ও অলিগলিতে যাও এবং লোকদের ধরে নিয়ে এসো, যেনো আমার বাড়ি ভরে যায়। (২৪)আমি তোমাদের বলছি, যাদের দাওয়াত করা হয়েছিলো, তাদের কেউই আমার এই খাবারের স্বাদ পাবে না।’”
(২৫)একবার এক বিশাল জনতা তাঁর সাথে সাথে যাচ্ছিলো। পেছন ফিরে তিনি তাদের বললেন, (২৬)“যে আমার কাছে আসবে, সে যদি নিজের বাবা-মা, স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, ভাইবোন, এমনকি নিজের জীবনকে পর্যন্ত আমার চেয়ে কম প্রিয় মনে না করে, তাহলে সে আমার উম্মত হতে পারে না। (২৭)যে নিজের সলিব বয়ে নিয়ে আমার পেছনে না আসে, সে আমার উম্মত হতে পারে না।
(২৮)মনে করো তোমাদের মধ্যে কেউ একটি বড়ো দালান তৈরি করতে চায়, তাহলে সে কি প্রথমে বসে খরচের হিসেব করে না, যেনো ওটা শেষ করার জন্য তার যথেষ্ট টাকা আছে কিনা তা সে দেখতে পারে? (২৯)তা না হলে ভিত্তি গাঁথার পরে যদি সে বাড়ির কাজ শেষ করতে না পারে, তাহলে যারা দেখবে, তারা সবাই তাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে। (৩০)তারা বলবে, ‘লোকটি গাঁথতে শুরু করেছিলো কিন্তু শেষ করতে পারলো না।’
(৩১)অথবা এক বাদশা যদি আরেক বাদশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যান, তাহলে তিনি প্রথমে বসে চিন্তা করবেন, ‘বিশ হাজার সৈন্য নিয়ে যিনি আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসছেন, মাত্র দশ হাজার সৈন্য নিয়ে আমি তাকে বাধা দিতে পারবো কি?’ (৩২)যদি না পারেন, তাহলে সেই বাদশা দূরে থাকতেই তিনি লোক পাঠিয়ে শান্তির প্রস্তাব দেবেন। (৩৩)অতএব, তোমরা যদি তোমাদের সবকিছু ছেড়ে না আসো, তাহলে তোমাদের মধ্যে কেউই আমার উম্মত হতে পারবে না।
(৩৪)লবণ ভালো জিনিস কিন্তু লবণের স্বাদ যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে কেমন করে তা আবার নোনতা করা যাবে? (৩৫)তখন তা না জমির, না সারের গাদার জন্য উপযুক্ত হয়; লোকে তা ফেলে দেয়। যার শোনার কান আছে সে শুনুক!”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)সমস্ত কর-আদায়কারী ও গুনাহগাররা যখন তাঁর কথা শোনার জন্য তাঁর কাছে আসছিলো, (২)তখন ফরিসিরা ও আলিমরা বিরক্তি প্রকাশ করে বলতে লাগলেন, “এই লোকটি গুনাহগারদের সাথে মেলামেশা ও খাওয়া-দাওয়া করে।”
(৩)তখন তিনি তাদের এই দৃষ্টান্ত দিলেন-
(৪)“মনে করো তোমাদের মধ্যে কোনো একজনের একশটি ভেড়া আছে এবং তাদের মধ্য থেকে একটি যদি হারিয়ে যায়, তাহলে কি সে নিরানব্বইটি মাঠে রেখে সেই একটিকে না পাওয়া পর্যন্ত খুঁজতে থাকে না? (৫)সেটি খুঁজে পাবার পর সে খুশি হয়ে তাকে কাঁধে তুলে নেয়। (৬)এবং পরে বাড়ি ফিরে গিয়ে তার বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের একত্রে ডেকে বলে, ‘আমার সাথে আনন্দ করো, কারণ আমার হারানো ভেড়াটি আমি খুঁজে পেয়েছি।’(৭)আমি আপনাদের বলছি, ঠিক সেভাবে, তওবা করার প্রয়োজন নেই, এমন নিরানব্বইজন ধার্মিকের চেয়ে বরং একজন গুনাহগার তওবা করলে বেহেস্তে আরো বেশি আনন্দ হয়।
(৮)অথবা এক মহিলার দশটি রূপার টাকা আছে, সে যদি তার ভেতর থেকে একটি হারিয়ে ফেলে, তাহলে বাতি জ্বেলে ঘর ঝাড় দিয়ে না পাওয়া পর্যন্ত সে কি তা সতর্কতার সাথে খুঁজতে থাকে না? (৯)যখন সে তা খুঁজে পায়, তখন তার বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের একত্রে ডেকে বলে, ‘আমার সাথে আনন্দ করো, কারণ আমার হারানো টাকাটি আমি খুঁজে পেয়েছি।’(১০)আমি আপনাদের বলছি, ঠিক সেভাবে, একজন গুনাহগার তওবা করলে আল্লাহর ফেরেস্তাদের মধ্যে আনন্দ হয়।”
(১১)অতঃপর হযরত ইসা আ. বললেন, “এক লোকের দুই ছেলে ছিলো। (১২)ছোটো ছেলেটি তার বাবাকে বললো, ‘বাবা, তোমার স¤পত্তিতে আমার যে অংশ আছে তা আমাকে দাও।’ তাতে সে তার দুই ছেলের মধ্যে তার সম্পত্তি ভাগ করে দিলো। (১৩)কিছুদিন পর ছোটো ছেলেটি তার সম্পত্তি বিক্রি করে টাকাপয়সা নিয়ে দূর দেশে চলে গেলো। সেখানে সে খারাপ পথে জীবন কাটিয়ে তার সব টাকাপয়সা উড়িয়ে দিলো। (১৪)যখন সে তার সবকিছু খরচ করে ফেললো, তখন সেই দেশের সব জায়গায় ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো এবং সে খুব কষ্টে পড়লো। (১৫)তখন সে গিয়ে সেই দেশের এক লোকের কাছে চাকরি চাইলো। লোকটি তাকে তার শূকর চরাতে মাঠে পাঠিয়ে দিলো। (১৬)শূকরে যে গুড়োগাড়া খেতো, সে তাই খেয়ে পেট ভরাতে চাইতো কিন্তু কেউ তাকে কিছুই দিতো না।
(১৭)তার চেতনা হলে সে মনে মনে বললো, ‘আমার বাবার কতো মজুর কতো বেশি খাবার পাচ্ছে অথচ আমি এখানে না খেয়ে মরছি!
(১৮)আমি আমার বাবার কাছে গিয়ে বলবো, “বাবা, আমি আল্লাহ ও তোমার বিরুদ্ধে গুনাহ করেছি। (১৯)তোমার ছেলে বলে পরিচয় দেবার যোগ্য আমি নই। তোমার মজুরদের মতো করে আমাকে রাখো।”(২০)সুতরাং সে উঠে তার বাবার কাছে গেলো। সে দূরে থাকতেই তাকে দেখে তার বাবার খুব মমতা হলো।
(২১)তিনি দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিলেন। তখন ছেলেটি বললো, ‘বাবা, আমি আল্লাহ ও তোমার বিরুদ্ধে গুনাহ করেছি। আমি তোমার ছেলে বলে পরিচয় দেবার যোগ্য নই।’(২২)কিন্তু তার বাবা তার গোলামদের বললেন, ‘তাড়াতাড়ি করে সবচেয়ে ভালো জুব্বাটি এনে ওকে পরিয়ে দাও। ওর হাতে আংটি ও পায়ে জুতা দাও, (২৩)আর মোটাসোটা বাছুরটি এনে জবাই করো। এসো, আমরা খাওয়া-দাওয়া করে আনন্দ করি। (২৪)কারণ আমার এই ছেলেটি মারা গিয়েছিলো কিন্তু আবার বেঁচে উঠেছে। হারিয়ে গিয়েছিলো, পাওয়া গেছে!’ এবং তারা আমোদ-প্রমোদ করতে লাগলো।
(২৫)সেই সময় তার বড়ো ছেলেটি মাঠে ছিলো। বাড়ির কাছে এসে সে নাচ ও গান-বাজনার শব্দ শুনতে পেলো। (২৬)সে একজন গোলামকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এসব কী হচ্ছে?’ (২৭)সে জবাব দিলো, ‘আপনার ভাই এসেছে এবং আপনার বাবা তাকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেয়েছেন বলে মোটাসোটা বাছুরটি জবাই করেছেন।’(২৮)তখন সে রাগ করে ভেতরে যেতে চাইলো না। তার বাবা বেরিয়ে এসে তাকে সাধাসাধি করতে লাগলো। (২৯)কিন্তু সে তার বাবাকে বললো, ‘দেখো, এতো বছর ধরে আমি গোলামদের মতো তোমার কাজ করে আসছি, একবারও আমি তোমার আদেশের অবাধ্য হইনি। তবুও আমার বন্ধুদের সাথে আমোদ-প্রমোদ করার জন্য তুমি কখনো আমাকে একটি ছাগলের বাচ্চাও দাওনি। (৩০)কিন্তু তোমার এই ছেলে, যে পতিতাদের পেছনে তোমার টাকা-পয়সা উড়িয়ে দিয়েছে, সে যখন ফিরে এসেছে, তখন তার জন্য তুমি মোটাসোটা বাছুরটি জবাই করেছো!’ (৩১)তার বাবা তাকে বললেন, ‘বাবা, তুমি তো সব সময়ই আমার সাথে সাথে আছো। আমার যা-কিছু আছে, সবই তো তোমার। (৩২)আমাদের অবশ্যই খুশি হয়ে আনন্দ-উল্লাস করা উচিত। কারণ তোমার ভাই মারা গিয়েছিলো, আবার বেঁচে উঠেছে; সে হারিয়ে গিয়েছিলো, আবার তাকে পাওয়া গেছে।’”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)অতঃপর তিনি সাহাবিদেরকে বললেন, “কোনো এক ধনী লোকের ম্যানেজারকে এই বলে দোষ দেয়া হলো যে, সে তার মালিকের ধন-সম্পত্তি নষ্ট করেছে। (২)তখন সে তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার সম্বন্ধে এসব কী শুনছি? তোমার কাজের হিসাব দাও; কারণ তুমি আর ম্যানেজার থাকতে পারবে না।’ (৩)তখন ম্যানেজার মনে মনে বললো, ‘আমি এখন কী করি? আমার মালিক তো আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করছেন। মাটি কাটার শক্তিও আমার নেই, আবার ভিক্ষা করতেও লজ্জা লাগে। (৪)যা হোক, বরখাস্ত হলে লোকে যাতে আমাকে তাদের বাড়িতে থাকতে দেয়, সেজন্য আমি কী করবো তা আমি জানি।’
(৫)সুতরাং যারা তার মালিকের কাছ থেকে ধার নিয়েছিলো, সে তাদেরকে এক এক করে ডাকলো। তারপর সে প্রথমজনকে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমার মালিকের কাছে তোমার ধার কতো?’ (৬)সে বললো, ‘একশো ব্যারেল অলিভ অয়েল।’সে তাকে বললো, ‘তোমার বিলটি আনো এবং তাড়াতাড়ি পঞ্চাশ ব্যারেল লেখো।’
(৭)তারপর সে আরেকজনকে বললো, ‘তোমার ধার কতো? সে বললো, ‘একশো টন গম।’সে তাকে বললো, ‘তোমার কাগজে আশি টন লেখো’। (৮)সেই ম্যানেজার অসৎ হলেও বুদ্ধি করে কাজ করলো বলে মালিক তার প্রশংসা করলো। এ-কালের লোকেরা নিজের লোকদের সাথে আচার-ব্যবহারে আলোর রাজ্যের লোকদের চেয়ে বুদ্ধিমান। (৯)আমি তোমাদের বলছি, এই খারাপ দুনিয়ার ধন দিয়ে লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করো, যেনো এই ধন ফুরিয়ে গেলে তারা তোমাদের চিরকালের থাকার জায়গায় স্বাগত জানাতে পারে।
(১০)সামান্য ব্যাপারে যে বিশ্বস্ত, সে বড়ো ব্যাপারেও বিশ্বস্ত এবং সামান্য ব্যাপারে যে অবিশ্বস্ত, বড়ো ব্যাপারেও সে অবিশ্ব¦স্ত। (১১)তোমরা যদি এই খারাপ দুনিয়ার ধন-সম্পত্তির ব্যাপারে বিশ্বস্ত না থাকো, তাহলে কে তোমাদের আসল ধন দিয়ে বিশ্বাস করবে? (১২)এবং যা-কিছু অন্যের, সে-বিষয়ে যদি তোমাদের বিশ্বাস করা না যায়, তাহলে যা তোমাদের নিজেদের তা তোমাদের কে দেবে? (১৩)কোনো গোলাম দুই মনিবের সেবা করতে পারে না।
কারণ সে একজনকে ঘৃণা করবে ও অন্যজনকে মহব্বত করবে; অথবা সে একজনের প্রতি মনোযোগ দেবে ও অন্যজনকে তুচ্ছ করবে। তোমরা একই সাথে আল্লাহ ও ধন-স¤পত্তির সেবা করতে পারো না।”
(১৪)এসব কথা শুনে ফরিসিরা তাঁকে ঠাট্টা করতে লাগলেন, কারণ তারা টাকা-পয়সা বেশি ভালোবাসতেন। (১৫)তাই তিনি তাদের বললেন, “আপনারা লোকদের সামনে নিজেদের দীনদার দেখিয়ে থাকেন কিন্তু আল্লাহ আপনাদের মনের অবস্থা জানেন। মানুষ যা সম্মানের বিষয় বলে মনে করে, আল্লাহর চোখে তা ঘৃণার যোগ্য।
(১৬)হযরত ইয়াহিয়া আ. পর্যন্ত তওরাত ও সহিফাগুলো কাজ করছিলো, আপনাদের পথ দেখাচ্ছিলো। তারপর থেকে আল্লাহর রাজ্যের সুখবর প্রচার করা হচ্ছে এবং সবাই জোর করে সেই রাজ্যে ঢুকতে চেষ্টা করছে। (১৭)কিন্তু তওরাতের সব থেকে ছোটো একটি অক্ষরের একটি বিন্দুও বাদ পড়ার চেয়ে বরং আসমান-জমিন শেষ হওয়া সহজ।
(১৮)যে নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে আরেকজনকে বিয়ে করে, সে জিনা করে এবং যে কেউ স্বামীর কাছ থেকে কোনো তালাক পাওয়া স্ত্রীকে বিয়ে করে, সেও জিনা করে।
(১৯)এক ধনী লোক ছিলো। সে বেগুনি কাপড় ও অন্যান্য দামি জামা-কাপড় পরতো এবং প্রত্যেক দিন খুব জাঁক-জমকের সাথে আমোদ-প্রমোদ করতো। (২০)তার গেইটের কাছে প্রায়ই লাসার নামে এক গরিব লোককে এনে রাখা হতো। তার সারা গায়ে ঘা ছিলো। (২১)ধনী লোকটির টেবিল থেকে যে-খাবার পড়তো তা খেয়েই সে পেট ভরাতে চাইতো; এবং কুকুর এসে তার ঘা চাটতো।
(২২)এক সময় গরিব লোকটি মারা গেলো এবং ফেরেস্তারা এসে তাকে হযরত ইব্রাহিম আ.-র কাছে নিয়ে গেলেন। সেই ধনী লোকটিও মারা গেলো এবং তাকে দাফন করা হলো।
(২৩)কবরে খুব যন্ত্রণার মধ্যে থেকে সে ওপরের দিকে তাকালো এবং দূরে হযরত ইব্রাহিম আ. ও তার পাশে লাসারকে দেখতে পেলো। (২৪)তখন সে চিৎকার করে বললো, ‘পিতা ইব্রাহিম, আমার প্রতি দয়া করুন এবং লাসারকে পাঠিয়ে দিন,
যেনো সে তার আঙ্গুলের মাথাটি পানিতে ডুবিয়ে আমার জিভ ঠাণ্ডা করে, কারণ এই আগুনের মধ্যে আমি বড়ো কষ্ট পাচ্ছি।’
(২৫)কিন্তু হযরত ইব্রাহিম আ. বললেন, ‘মনে করে দেখো, বাছা, তুমি যখন বেঁচে ছিলে, তখন কতো সুখভোগ করেছো আর লাসার কতো কষ্টভোগ করেছে। কিন্তু এখন সে এখানে সান্তনা পাচ্ছে আর তুমি কষ্ট পাচ্ছো। (২৬)এছাড়া তোমাদের ও আমাদের মাঝে একটি বিরাট ফাঁকা জায়গা রয়েছে, যাতে ইচ্ছা করলেও কেউ এখান থেকে পার হয়ে তোমাদের কাছে যেতে এবং ওখান থেকে পার হয়ে আমাদের কাছে আসতে না পারে।’(২৭)সে বললো, ‘তাহলে পিতা, দয়া করে তাকে আমার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিন- (২৮)কারণ সেখানে আমার আরো পাঁচ ভাই আছে- যেনো সে তাদেরকে সাবধান করতে পারে। তা না হলে তারাও তো এই যন্ত্রণার জায়গায় আসবে।’(২৯)হযরত ইব্রাহিম আ. জবাব দিলেন, ‘তওরাত ও সহিফাগুলো তাদের কাছেই আছে। তারা ওগুলোর প্রতি মনোযোগ দিক।’(৩০)সে বললো, ‘না, না, পিতা ইব্রাহিম; মৃতদের মধ্য থেকে কেউ যদি তাদের কাছে যায়, তাহলেই তারা তওবা করবে।’(৩১)তিনি তাকে বললেন, ‘যদি তারা তওরাত ও সহিফাগুলোর কথা না শোনে, তাহলে মৃতদের মধ্য থেকে কেউ উঠলেও তারা ইমান আনবে না।’”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)হযরত ইসা আ. তাঁর সাহাবিদের বললেন, “বাধা অবশ্যই আসবে কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই লোকের, যার মধ্য দিয়ে বাধা আসে! (২)কেউ যদি এই ছোটদের মধ্যে কারো পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তার নিজের গলায় নিজেই পাথর বেঁধে সাগরে ডুবে মরাই বরং তার জন্য ভালো।
(৩)তোমরা সাবধান হও! যদি তোমার ভাই তোমার বিরুদ্ধে অন্যায় করে, তাহলে তাকে তার দোষ দেখিয়ে দাও। (৪)যদি সে অনুতপ্ত হয়, তাহলে তাকে ক্ষমা করো। এবং যদি ওই একই লোক দিনের ভেতর সাতবার তোমার বিরুদ্ধে অন্যায় করে এবং সাতবারই এসে বলে, ‘আমি অনুতপ্ত,’ তাহলে তুমি তাকে অবশ্যই ক্ষমা করবে।
(৫)হাওয়ারিরা হুজুরকে বললেন, “আমাদের ইমান বাড়িয়ে দিন!”
(৬)তিনি উত্তর দিলেন, “একটি সরিষার মতোও ইমান যদি তোমাদের থাকে, তাহলে তোমরা এই তুঁত গাছটিকে বলতে পারবে, ‘শিকড়সহ উঠে গিয়ে নিজেকে সাগরে পুঁতে রাখো,’ তাহলে সেটা তোমাদের কথা মানবে।
(৭)তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে তার গোলাম ক্ষেত থেকে হাল বেয়ে বা ভেড়া চরিয়ে আসার সাথে সাথে তাকে বলবে, ‘তাড়াতাড়ি এখানে এসে খেতে বসো’?
(৮)বরং তোমরা কি তাকে বলবে না, ‘আমার খাওয়ার আয়োজন করো। আর আমি যতোক্ষণ খাওয়া-দাওয়া করি, ততোক্ষণ কোমরে কাপড় বেঁধে আমার সেবা করো, তারপর তুমি খাওয়া-দাওয়া করবে?’ (৯)গোলাম হুকুম পালন করছে বলে তাকে কি ধন্যবাদ জানাবে? (১০)তোমাদের যা-কিছু করতে আদেশ করা হয়েছে তা পালন করার পর তোমরাও এভাবে বলো, ‘আমরা অপদার্থ গোলাম; আমাদের যা করা উচিত ছিলো, আমরা কেবল তাই করেছি!’”
(১১)জেরুসালেমে যাবার পথে হযরত ইসা আ. সামেরিয়া ও গালিলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। (১২)তিনি যখন একটি গ্রামে ঢুকছিলেন, সেই সময় দশজন কুষ্ঠরোগী তাঁর দিকে এগিয়ে এলো। তারা দূরে দাঁড়িয়ে (১৩)চিৎকার করে বললো, “হে হযরত ইসা আ., আমাদের প্রতি দয়া করুন!” (১৪)তাদের দেখে তিনি বললেন, “ইমামদের কাছে গিয়ে নিজেদের দেখাও।” পথে যেতে যেতেই তারা পাকসাফ হয়ে গেলো।
(১৫)তাদের মধ্যে একজন যখন দেখলো যে, সে সুস্থ হয়ে গেছে, তখন সে চিৎকার করে আল্লাহর প্রশংসা করতে করতে ফিরে এলো। (১৬)সে ইসার পায়ের কাছে উবুড় হয়ে পড়ে তাঁকে শুকরিয়া জানালো। সে ছিলো একজন সামেরীয়। (১৭)তখন হযরত ইসা আ. জিজ্ঞেস করলেন, “দশজনকে কি পাকসাফ করা হয়নি? তাহলে বাকি ন’জন কোথায়? (১৮)ফিরে এসে আল্লাহর প্রশংসা করার জন্য তাদের মধ্যে এই বিদেশি ছাড়া আর কাউকেই কি পাওয়া গেলো না?” (১৯)অতঃপর তিনি তাকে বললেন, ‘ওঠো, তোমার পথে ফিরে যাও। তোমার ইমান তোমাকে সুস্থ করেছে।”
(২০)একবার ফরিসিরা হযরত ইসা আ.কে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাজ্য কখন আসবে? তিনি উত্তর দিলেন, “আল্লাহর রাজ্য এমন কোনো চিহ্নসহ আসবে না, যা দেখা যায়।
(২১)অথবা কেউই বলবে না, “দেখো, এটি এখানে!’ কিংবা ‘দেখো, এটি ওখানে!’ আসলে, আল্লাহর রাজ্য তো তোমাদেরই মাঝে রয়েছে।”
(২২)অতঃপর তিনি সাহাবিদেরকে বললেন, “এমন সময় আসছে, যখন তোমরা ইবনুল-ইনসানের সময়ের একটি দিন দেখার জন্য আগ্রহী হবে কিন্তু তা দেখতে পাবে না। (২৩)তারা তোমাদের বলবে, ‘ওখানে দেখো!’ বা ‘এখানে দেখো!’ তাদের পেছনে যেয়ো না। (২৪)বিদ্যুৎ চমকালে যেমন আকাশের এক দিক থেকে আরেক দিক পর্যন্ত আলো হয়ে যায়, তেমনি ইবনুল-ইনসানও তাঁর সময়ে সেরকমই হবেন। (২৫)কিন্তু প্রথমে তাঁকে অবশ্যই অনেক দুঃখ-কষ্টভোগ করতে হবে এবং এ-কালের লোকদের দ্বারা অগ্রাহ্য হতে হবে।
(২৬)নুহের সময়ে যেমন হয়েছিলো, ইবনুল-ইনসানের সময়েও সেরকম হবে। (২৭)নুহ জাহাজে ওঠার আগ পর্যন্ত লোকেরা খাওয়া-দাওয়া করছিলো, বিয়ে করছিলো ও বিয়ে দিচ্ছিলো। শেষে বন্যা এসে তাদের সবাইকে ধ্বংস করলো। (২৮)একইভাবে লুতের সময়ে যেমন হয়েছিলো- তারা খাওয়া-দাওয়া, বেচাকেনা, চাষাবাদ এবং ঘরবাড়ি তৈরি করছিলো। (২৯)কিন্তু যেদিন লুত সদোম ছেড়ে গেলেন, সেদিন আসমান থেকে আগুন ও গন্ধকের বৃষ্টি পড়ে লোকদের সবাইকে ধ্বংস করে দিলো। (৩০)ইবনুল-ইনসানের প্রকাশিত হওয়ার দিনও ঠিক ওরকমই হবে।
(৩১)ওই দিন যে ছাদের ওপরে থাকবে, সে ঘর থেকে জিনিসপত্র নেবার জন্য নিচে না নামুক। একইভাবে যে মাঠে থাকবে, সে ঘরে ফিরে না আসুক। (৩২)তোমরা স্মরণ করো লুতের স্ত্রীর কথা। (৩৩)যারা তাদের প্রাণ রক্ষা করতে চেষ্টা করবে, তারা তা হারাবে কিন্তু যারা তাদের প্রাণ হারাবে, তারা তা রক্ষা করবে। (৩৪)আমি তোমাদের বলছি, সেই রাতে এক বিছানায় দু’জন থাকবে। একজনকে নেয়া হবে আর অন্যজনকে ফেলে যাওয়া হবে। (৩৫)দু’মহিলা একসাথে জাঁতা ঘোরাবে। (৩৬)একজনকে নেয়া হবে, আরেকজনকে ফেলে যাওয়া হবে।”(৩৭)অতঃপর তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “হুজুর, কোথায়?” তিনি তাদের বললেন, “লাশ যেখানে থাকে, শকুন সেখানেই এসে জড়ো হবে।”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)মোনাজাতের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে হযরত ইসা আ. তাদেরকে একটি দৃষ্টান্ত দিলেন, যেনো তারা সব সময় মোনাজাত করেন এবং নিরাশ না হোন। (২)তিনি বললেন, “কোনো এক শহরে এক বিচারক ছিলো। সে আল্লাহকে ভয় করতো না এবং মানুষকে কোনো দামই দিতো না।
(৩)সেই শহরে এক বিধবা ছিলো। সে বারবার এসে তাকে বলতো, ‘আমার বিপক্ষের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার করে দিন।’ (৪)অনেকদিন সে কিছুই করলো না। কিন্তু শেষে মনে মনে বললো, ‘যদিও আমি আল্লাহকে ভয় করি না এবং মানুষকেও কোনো দাম দেই না, (৫)তবুও এই বিধবা আমাকে বিরক্ত করছে বলে আমি তার পক্ষে ন্যায়বিচার করবো। তা না হলে সে বারবার এসে আমাকে ক্লান্ত করে ছাড়বে।’”
(৬)অতঃপর হযরত ইসা আ. বললেন, “ন্যায়বিচারক না হলেও সে যা বললো তা ভেবে দেখো। (৭)তাহলে রাতদিন যারা আল্লাহকে ডাকে, তিনি কি তাঁর সেই মনোনীত বান্দাদের পক্ষে ন্যায়বিচার করবেন না? তিনি কি তাদের সাহায্য করতে দেরি করবেন? (৮)আমি তোমাদের বলছি, নিশ্চয়ই তিনি তাড়াতাড়ি তাদের পক্ষে ন্যায়বিচার করবেন। তবুও যখন ইবনুল-ইনসান আসবেন, তখন কি তিনি পৃথিবীতে ইমান খুঁজে পাবেন?”
(৯)যারা নিজেদের দীনদার ভেবে অন্যদের তুচ্ছ করতো, তাদের তিনি এই দৃষ্টান্ত দিলেন- (১০)“দু’ব্যক্তি মোনাজাত করার জন্য বায়তুল-মোকাদ্দসে গেলো। তাদের একজন ফরিসি ও অন্যজন কর-আদায়কারী। (১১)ফরিসি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের বিষয়ে এই মোনাজাত করলো, ‘হে আল্লাহ, আমি তোমাকে শুকরিয়া জানাই যে, আমি অন্য লোকদের মতো চোর, অসৎ ও জিনাকারী নই। এমনকি ওই কর-আদায়কারীর মতোও নই। (১২)আমি সপ্তায় দু’বার রোজা রাখি এবং আমার সমস্ত আয়ের দশ ভাগের এক ভাগ দিয়ে থাকি।’(১৩)কিন্তু কর-আদায়কারী সামান্য দূরে দাঁড়ালো। ওপর দিকে তাকাতেও তার সাহস হলো না। সে বুক চাপড়ে বললো, ‘হে আল্লাহ! আমি গুনাহগার; আমার ওপর রহম করুন।’
(১৪)আমি তোমাদের বলছি, ওই লোক নয়, বরং এই লোকই দীনদার হিসেবে বাড়ি ফিরে গেলো। যে নিজেকে উঁচু করে, তাকে নীচু করা হবে এবং যে নিজেকে নীচু করে, তাকে উঁচু করা হবে।”
(১৫)লোকেরা শিশুদের তাঁর কাছে নিয়ে এলো, যেনো তিনি তাদের ওপর হাত রেখে ছুঁয়ে দেন। সাহাবিরা তা দেখে লোকদের কড়াভাবে নিষেধ করতে লাগলেন। (১৬)কিন্তু হযরত ইসা আ. তাদের ডেকে বললেন, ‘ছোটো ছেলে- মেয়েদের আমার কাছে আসতে দাও, বাধা দিয়ো না, কারণ আল্লাহর রাজ্য এদের মতো লোকদেরই। (১৭)আমি তোমাদের সত্যি বলছি, যে কেউ এই ছোটো শিশুর মতো আল্লাহর রাজ্য গ্রহণ না করে, সে কোনোমতেই আল্লাহর রাজ্যে ঢুকতে পারবে না।’
(১৮)কোনো এক শাসক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে উত্তম শিক্ষক, আল্লাহর দিদার পেতে হলে আমাকে কী করতে হবে?” (১৯)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “আমাকে কেনো তুমি উত্তম বলছো? এক আল্লাহ ছাড়া আর কেউই উত্তম নয়। (২০)তুমি তো হুকুমগুলো জানো, ‘জিনা করো না, খুন করো না, চুরি করো না, মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ো না, বাবা-মাকে সম্মান করো।’” (২১)সে জবাব দিলো, “তরুণ বয়স থেকেই আমি এসব পালন করে আসছি।”
(২২)একথা শুনে হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “এখনো একটি জিনিস তোমার বাকি আছে। তোমার যা-কিছু আছে তা বিক্রি করে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দাও, তাতে তুমি বেহেস্তে ধন পাবে; তারপর এসে আমাকে অনুসরণ করো।”
(২৩)কিন্তু একথা শুনে সে খুব দুঃখিত হলো, কারণ সে খুব ধনী ছিলো। (২৪)হযরত ইসা আ. তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যাদের ধন আছে, তাদের পক্ষে আল্লাহর রাজ্যে ঢোকা কতো কঠিন! (২৫)নিশ্চয়ই ধনীর পক্ষে আল্লাহর রাজ্যে ঢোকার চেয়ে সুচের ছিদ্র দিয়ে উটের যাওয়া সহজ।”
(২৬)একথা যারা শুনলো তারা বললো, “তাহলে কে নাজাত পেতে পারে?” (২৭)তিনি উত্তর দিলেন, “মানুষের পক্ষে যা অসম্ভব, আল্লাহর পক্ষে তা সম্ভব।” (২৮)তখন হযরত পিতর রা. বললেন, “দেখুন, আমরা তো ঘরবাড়ি ছেড়ে দিয়ে আপনার অনুসারী হয়েছি।” (২৯)তিনি তাদের বললেন, “আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, এমন কেউ নেই, যে আল্লাহর রাজ্যের জন্য ঘরবাড়ি, স্ত্রী, ভাইবোন, বাবামা বা ছেলেমেয়ে ছেড়ে এসেছে, (৩০)সে এ-কালেই তার অনেক বেশি এবং আগামী যুগে আল্লাহর দিদার পাবে না।”
(৩১)অতঃপর তিনি সেই বারোজনকে একপাশে ডেকে নিয়ে বললেন, “দেখো, আমরা জেরুসালেমে যাচ্ছি এবং ইবনুল-ইনসানের বিষয়ে নবিরা যা লিখে গেছেন, তার সবই পূর্ণ হবে। (৩২)কারণ তাঁকে অইহুদিদের হাতে তুলে দেয়া হবে। তারা তাঁকে ঠাট্টা ও অপমান করবে এবং তাঁর গায়ে থুথু দেবে। (৩৩)ভীষণভাবে চাবুক মারার পরে তারা তাঁকে হত্যা করবে এবং তৃতীয় দিনে তিনি জীবিত হয়ে উঠবেন।” (৩৪)কিন্তু তারা এসবের কিছুই বুঝলেন না। তিনি যা বললেন তা তাদের কাছে গোপন রাখা হলো এবং তারা কিছুই উপলব্ধি করতে পারলেন না।
(৩৫)তিনি যখন জিরিহো শহরের কাছে এলেন, তখন সেখানে এক অন্ধ পথের পাশে বসে ভিক্ষা করছিলো। (৩৬)অনেক লোক সেই পথ দিয়ে যাচ্ছে শুনে সে কী ঘটছে তা জানতে চাইলো। (৩৭)তারা তাকে বললো, “নাসরতের হযরত ইসা আ. এই পথ দিয়ে যাচ্ছেন।” (৩৮)তখন সে চিৎকার করে বললো, “হে দাউদ-সন্তান, ইসা, আমার প্রতি রহম করুন!” (৩৯)ভিড়ের সামনে যারা ছিলো, তারা তাকে ধমক দিয়ে চুপ করতে বললো কিন্তু সে আরো জোরে চিৎকার করে বললো, “হে দাউদ-সন্তান, আমার প্রতি দয়া করুন।”
(৪০)হযরত ইসা আ. থামলেন এবং সেই অন্ধকে তাঁর কাছে আনতে বললেন। সে কাছে এলে তিনি বললেন, (৪১)“তুমি কী চাও, তোমার জন্য আমি কী করবো?” সে বললো, “হুজুর, আমি যেনো আবার দেখতে পাই।” (৪২)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “তুমি আবার দেখো। তোমার ইমান তোমাকে রক্ষা করেছে।” (৪৩)সে তখনই আবার দেখতে পেলো এবং আল্লাহর গুণগান করতে করতে তাঁর পেছনে পেছনে চললো। এসব দেখে সমস্ত লোক আল্লাহর প্রশংসা করলো।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)তিনি জিরিহোতে এসে শহরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। (২)সেখানে সক্কেয় নামে এক লোক ছিলেন। তিনি প্রধান কর-আদায়কারী এবং ধনী ছিলেন। (৩)হযরত ইসা আ. কে, তা দেখার জন্য তিনি চেষ্টা করছিলেন কিন্তু তিনি বেঁটে ছিলেন বলে ভিড়ের জন্য তাঁকে দেখতে পাচ্ছিলেন না।
(৪)সুতরাং তিনি তাঁকে দেখার জন্য সামনে দৌড়ে গিয়ে একটি ডুমুরগাছে উঠলেন, কারণ তিনি সে-পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন।
(৫)হযরত ইসা আ. সেখানে এসে ওপরের দিকে তাকালেন এবং তাকে বললেন, “সক্কেয়, তাড়াতাড়ি নেমে এসো, কারণ আমি আজ অবশ্যই তোমার বাড়িতে থাকবো।”(৬)তিনি তাড়াতাড়ি নেমে এলেন এবং আনন্দের সাথে তাঁকে স্বাগত জানালেন। (৭)এই ঘটনা দেখে সবাই বিড়বিড় করে বলতে শুরু করলো, “উনি একজন গুনাহগারের ঘরে মেহমান হতে গেলেন!” (৮)সক্কেয় সেখানে দাঁড়িয়ে হযরত ইসা আ.কে বললেন, “হুজুর, আমি আমার ধন-স¤পত্তির অর্ধেক গরিবদের দিয়ে দেবো এবং কাউকে যদি ঠকিয়ে থাকি, তাহলে তার চার গুণ ফিরিয়ে দেবো।”(৯)তখন হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “আজ এই বাড়িতে নাজাত এলো, কারণ সেও তো হযরত ইব্রাহিম আ.-র বংশধর। (১০)যারা হারিয়ে গেছে, তাদের খোঁজ করতে ও নাজাত দিতে ইবনুল-ইনসান এসেছেন।”
(১১)সবাই যখন এসব শুনছিলো, তখন তিনি একটি দৃষ্টান্ত দিলেন। কারণ তিনি ছিলেন জেরুসালেমের কাছাকাছি, আর তারা ভাবছিলো, আল্লাহর রাজ্য খুব তাড়াতাড়িই প্রকাশ পাবে। সুতরাং তিনি বললেন (১২)“উঁচু বংশের এক লোক রাজপদ নিয়ে ফিরে আসবে বলে দূর দেশে গেলো। (১৩)সে তার দশজন গোলামকে ডাকলো এবং প্রত্যেককে এক হাজার দিনার দিয়ে বললো, ‘আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত এগুলো দিয়ে ব্যবসা করো।’(১৪)কিন্তু তার দেশের লোকেরা তাকে ঘৃণা করতো। এজন্য তারা তার পেছনে লোক পাঠিয়ে জানালো, ‘আমরা চাই না লোকটি আমাদের ওপর রাজত্ব করুক।’
(১৫)সে বাদশাহি ক্ষমতা নিয়ে ফিরে এলো এবং যেসব গোলামকে দিনার দিয়ে গিয়েছিলো, তাদের ডেকে আনতে হুকুম দিলো। সে জানতে চাইলো, ব্যবসা করে তারা কে কতো লাভ করেছে।
(১৬)প্রথমজন এসে বললো, ‘হুজুর, আপনার দিনার দিয়ে আমি দশ গুণ লাভ করেছি।’(১৭)সে তাকে বললো, ‘সাবাস! উত্তম গোলাম। তুমি সামান্য বিষয়ে বিশ্বস্ত বলে আমি তোমাকে দশটি শহরের ভার দিলাম।’(১৮)দ্বিতীয়জন এসে বললো, ‘হুজুর, আপনার দিনার দিয়ে আমি পাঁচ গুণ লাভ করেছি। (১৯)সে তাকে বললো, ‘তুমি পাঁচটি শহর শাসন করো।’
(২০)অতঃপর অন্য আরেকজন এসে বললো, ‘হুজুর, দেখুন, আমি আপনার দেয়া দিনার রুমালে বেঁধে রেখে দিয়েছিলাম। (২১)আপনার সম্বন্ধে আমার ভয় ছিলো, কারণ আপনি খুব কড়া লোক। আপনি যা জমা করেননি তা নিয়ে থাকেন এবং যা বুনেননি তা কাটেন।’
(২২)সে তাকে বললো, ‘দুষ্ট গোলাম! তোমার কথা দিয়েই আমি তোমার বিচার করবো। তুমি তো জানো যে, আমি কড়া লোক। যা জমা করিনি তা নিয়ে থাকি এবং যা বুনিনি তা কাটি? (২৩)তাহলে কেনো তুমি আমার দিনারগুলো মহাজনের কাছে রাখোনি? তা করলে তো আমি এসে সুদসহ দিনারগুলো পেতাম।’(২৪)পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের সে বললো, ‘ওর কাছ থেকে দিনার নিয়ে নাও এবং যার দশ হাজার দিনার আছে, তাকে দাও।’(২৫)তারা তাকে বললো, “হুজুর, ওর তো দশ হাজার দিনার আছে!’ (২৬)‘আমি তোমাদের বলছি, যাদের আছে, তাদের আরো দেয়া হবে; কিন্তু যাদের নেই, তাদের যা আছে, তাও তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হবে। (২৭)কিন্তু আমার এই শত্রুরা, যারা চায়নি আমি তাদের ওপরে রাজত্ব করি, তাদের এখানে নিয়ে এসো এবং আমার সামনেই হত্যা করো।’”
(২৮)এসব বলার পর তিনি তাদের আগে আগে জেরুসালেমের দিকে চললেন। (২৯)তিনি যখন জৈতুন পাহাড়ের গায়ের বৈতফগি ও বেথানিয়া গ্রামের কাছে এলেন, তখন তাঁর সাহাবিদের দু’জনকে এই বলে পাঠিয়ে দিলেন, (৩০)“তোমরা সামনের গ্রামে যাও, সেখানে ঢোকার সময় দেখতে পাবে, একটি বাচ্চা-গাধা বাঁধা আছে, যার ওপরে কেউ কখনো বসেনি। ওটা খুলে এখানে নিয়ে এসো। (৩১)যদি কেউ তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করে, ‘কেনো এটি খুলছো?’ তাহলে শুধু বলো, ‘হুজুরের এটির দরকার আছে।’”(৩২)সুতরাং যাদের পাঠানো হয়েছিলো, তারা গিয়ে তিনি যেমন বলেছিলেন, তেমনি দেখতে পেলেন। (৩৩)তারা যখন বাচ্চা-গাধাটি খুলছিলেন, তখন তার মালিকরা তাদের জিজ্ঞেস করলো, “তোমরা কেনো বাচ্চা-গাধাটি খুলছো?” (৩৪)তারা বললেন, “হুজুরের এটির দরকার আছে।”
(৩৫)অতঃপর তারা সেটি হযরত ইসা আ.-র কাছে আনলেন এবং বাচ্চা-গাধাটির ওপরে তাদের গায়ের চাদর পেতে দিয়ে হযরত ইসা আ.কে বসালেন। (৩৬)তিনি যখন যাচ্ছিলেন, তখন লোকেরা পথের ওপর তাদের কাপড় বিছিয়ে দিচ্ছিলো।
(৩৭)যে-রাস্তাটি জৈতুন পাহাড় থেকে নেমে এসেছে, তিনি যখন সেই রাস্তার কাছে এলেন, তখন তাঁর সাথে যে-উম্মতেরা যাচ্ছিলেন, তারা যেসব মোজেজা দেখেছিলেন, সেগুলোর জন্য চিৎকার করে আনন্দের সাথে আল্লাহর প্রশংসা করতে করতে বলতে লাগলেন,
(৩৮)“শুভেচ্ছা, স্বাগতম, সেই বাদশাকে, যিনি আল্লাহর নামে আসছেন! বেহেস্তে শান্তি এবং জান্নাতুল ফেরদাউসে গৌরব ও মহিমা!” (৩৯)ভিড়ের মধ্য থেকে কয়েকজন ফরিসি তাঁকে বললেন, “হুজুর, আপনার অনুসারীদের চুপ করতে বলুন।” (৪০)তিনি বললেন, “আমি তোমাদের বলছি, এরা যদি চুপ করে, তাহলে পাথরগুলো চিৎকার করে উঠবে।”
(৪১)তিনি কাছে এসে শহরটি দেখে তার জন্য কাঁদলেন। (৪২)বললেন, “যা-কিছু শান্তি আনে, আজকের দিনে তুমি, কেবল তুমিই যদি তা বুঝতে পারতে! কিন্তু এখন তা তোমার চোখ থেকে লুকোনো হয়েছে।
(৪৩)নিশ্চয়ই তোমার এমন সময় আসবে, যখন তোমার শত্রুরা তোমার চারদিকে দেয়াল তুলবে এবং তোমাকে ঘিরে রাখবে ও সব দিক থেকে তোমাকে চেপে ধরবে। (৪৪)তারা তোমাকে গুঁড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে- তোমাকে ও তোমার ভেতরের তোমার সন্তানদের- এবং তারা তোমার একটি পাথরের ওপরে আরেকটি পাথর রাখবে না; কারণ আল্লাহর সাহায্য আসার সময়টি তুমি বোঝোনি।”
(৪৫)অতঃপর তিনি বায়তুল-মোকাদ্দসে ঢুকে জিনিসপত্র বিক্রেতাদের তাড়িয়ে দিতে লাগলেন। (৪৬)আর তিনি বললেন, “লেখা আছে, ‘আমার ঘর হবে এবাদতের ঘর’; কিন্তু তোমরা এটাকে ডাকাতের আড্ডাখানা করে তুলেছো!” (৪৭)প্রত্যেক দিন তিনি বায়তুল-মোকাদ্দসে গিয়ে শিক্ষা দিচ্ছিলেন। প্রধান ইমামেরা, আলিমরা এবং লোকদের নেতারা তাঁকে হত্যা করার সুযোগ খুঁজতে লাগলেন। (৪৮)কিন্তু কীভাবে তা করবেন, তার কোনো উপায় তারা খুঁজে পেলেন না। কারণ লোকেরা তাঁর প্রত্যেকটি কথা খুব মন দিয়ে শুনতো।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)একদিন তিনি যখন বায়তুল-মোকাদ্দসে লোকদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন এবং ইঞ্জিল প্রচার করছিলেন, তখন বুজুর্গদের সাথে প্রধান ইমামেরা ও আলিমরা এলেন। (২)তারা তাঁকে বললেন, “কোন অধিকারে তুমি এসব করছো, আর কে তোমাকে এ-অধিকার দিয়েছে তা আমাদের বলো?” (৩)তিনি তাদের উত্তর দিলেন, “আমিও তোমাদের একটি প্রশ্ন করবো, (৪)আমাকে বলো, হযরত ইয়াহিয়া আ.-র বায়াত আল্লাহর কাছ থেকে, নাকি মানুষের কাছ থেকে এসেছিলো?”
(৫)তারা নিজেদের মধ্যে এই বিষয়ে আলোচনা করতে লাগলেন, “যদি আমরা বলি, ‘আল্লাহর কাছ থেকে,’ তাহলে সে বলবে, ‘আপনারা তার ওপর ইমান আনেননি কেনো?’ (৬)কিন্তু যদি বলি, ‘মানুষের কাছ থেকে’, তাহলে লোকেরা আমাদের পাথর মারবে। কারণ তারা নিশ্চিত যে, হযরত ইয়াহিয়া আ. একজন নবি ছিলেন।”
(৭)এজন্য তারা উত্তর দিলেন যে, তারা জানেন না তা কোথা থেকে এসেছিলো। (৮)তখন হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “তাহলে আমিও তোমাদের বলবো না, কোন অধিকারে আমি এসব করছি।”
(৯)তিনি লোকদের এই দৃষ্টান্ত দিতে শুরু করলেন, “এক লোক একটি আঙুরক্ষেত করলেন এবং চাষীদের কাছে সেটি ইজারা দিয়ে অনেক দিনের জন্য বিদেশে চলে গেলো। (১০)পরে সময়মতো আঙুরের ভাগ নেবার জন্য তার এক গোলামকে চাষীদের কাছে পাঠিয়ে দিলো। কিন্তু চাষীরা তাকে মারধর করে, খালি হাতেই ফেরত পাঠালো। (১১)তখন সে আরেকজন গোলামকে পাঠালো। চাষীরা তাকেও মারলো ও অপমান করলো এবং খালি হাতে ফেরত পাঠিয়ে দিলো। (১২)সে তৃতীয় গোলামকে পাঠালো কিন্তু চাষীরা তাকেও ভীষণ মারধর করে বাইরে ফেলে দিলো। (১৩)তখন আঙুরক্ষেতের মালিক বললো, ‘আমি কী করবো? আমি আমার প্রিয় ছেলেকে পাঠাবো, তাহলে হয়তো তারা তাকে সম্মান করবে।’
(১৪)কিন্তু চাষীরা তাকে দেখে একে অন্যকে বললো, ‘এ-ই তো পরে স¤পত্তির মালিক হবে। এসো, আমরা ওকে মেরে ফেলি, তাহলে স¤পত্তিটি আমাদেরই হবে।’(১৫)তাই তারা তাকে ধরে ক্ষেতের বাইরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করলো। এখন আঙুরক্ষেতের মালিক তাদের কী করবে? (১৬)সে এসে তাদের হত্যা করবে এবং আঙুরক্ষেতটি অন্যদের কাছে ইজারা দেবে।” এ-দৃষ্টান্তটি শুনে তারা বললেন, “আল্লাহ এমনটি না করুন।”
(১৭)কিন্তু তিনি তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তাহলে একথার অর্থ কী- ‘রাজমিস্ত্রিরা যে-পাথরটি বাতিল করে দিয়েছিলো, সেটিই কোণের প্রধান পাথর হয়ে উঠলো? (১৮)সেই পাথরের ওপরে যে পড়বে, সে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে এবং যার ওপরে সেই পাথর পড়বে, তাকে চুরমার করে ফেলবে।”
(১৯)যখন আলিমরা ও প্রধান ইমামেরা বুঝলেন যে, তিনি এই দৃষ্টান্তটি তাদের বিরুদ্ধেই দিয়েছেন, তখনই তারা তাঁকে ধরতে চাইলেন কিন্তু তারা লোকদের ভয় পেলেন। (২০)সুতরাং তারা তাঁর ওপর নজর রাখলেন এবং গোয়েন্দাদের পাঠালেন। তারা ভালো মানুষের ভান করতো, যেনো তাঁর কথার ফাঁদে ফেলে তারা তাঁকে গভর্নরের বিচার এবং ক্ষমতার অধীনে আনতে পারে।
(২১)সুতরাং তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, “হুজুর, আমরা জানি যে, আপনি যা বলেন ও শিক্ষা দেন তা সঠিক। এবং আপনি কারো মুখ চেয়ে কথা বলেন না কিন্তু সত্যভাবেই আল্লাহর পথের বিষয়ে শিক্ষা দেন। (২২)আচ্ছা, আমাদের বলুন, আমাদের পক্ষে কাইসারকে কর দেয়া বৈধ নাকি অবৈধ?” (২৩)কিন্তু তিনি তাদের চালাকি বুঝতে পেরে তাদের বললেন, (২৪)“আমাকে একটি দিনার দেখাও। এর ওপরে কার ছবি ও কার নাম আছে?” তারা বললো, “কাইসারের।” (২৫)তিনি তাদের বললেন, “তাহলে যা কাইসারের তা কাইসারকে দাও এবং যা আল্লাহর তা আল্লাহকে দাও।” (২৬)তারা লোকদের সামনে হযরত ইসা আ.কে তাঁর কথার ফাঁদে ফেলতে পারলো না। তাঁর উত্তরে তারা আশ্চর্য হলো এবং চুপ হয়ে রইলো।
(২৭)কয়েকজন সদ্দুকি- যারা বলেন, পুনরুত্থান বলে কিছু নেই- তাঁর কাছে এলেন।
(২৮)এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “হুজুর, হযরত মুসা আ. আমাদের জন্য লিখে গেছেন, সন্তানহীন অবস্থায় যদি কোনো লোক তার স্ত্রীকে রেখে মারা যায়, তাহলে তার ভাই সেই বিধবাকে বিয়ে করে ভাইয়ের হয়ে বংশ রক্ষা করবে। (২৯)তারা ছিলো সাত ভাই। প্রথমজন বিয়ে করে সন্তানহীন অবস্থায় মারা গেলো। (৩০)পরে দ্বিতীয় ও তারপরে (৩১)তৃতীয় ভাই সেই বিধবাকে বিয়ে করলো এবং একইভাবে সাতজনই ছেলেমেয়ে না রেখে মারা গেলো। (৩২)শেষে সেই মহিলাও মারা গেলো। (৩৩)তাহলে কেয়ামতের দিন সে কার স্ত্রী হবে? সাতজনের প্রত্যেকেই তো তাকে বিয়ে করেছিলো।”
(৩৪)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “এই দুনিয়াতে লোকেরা বিয়ে করে এবং তাদের বিয়ে দেয়া হয়।
(৩৫)কিন্তু মৃতদের মধ্য থেকে যারা জীবিত হওয়ার ও বেহেস্তে যাবার যোগ্য বলে বিবেচিত, তারা সেখানে বিয়ে করবে না এবং তাদের বিয়ে দেয়াও হবে না। (৩৬)নিশ্চয়ই তারা আর মৃত্যুবরণ করতে পারে না। কারণ তারা ফেরেস্তাদের মতো, আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত ও পুনরুত্থানের অধিকারী। (৩৭)মৃতেরা যে জীবিত হয়ে উঠবে, সেটি হযরত মুসা আ. নিজেই জ্বলন্ত ঝোপের ঘটনায় দেখিয়েছেন। সেখানে তিনি আল্লাহকে হযরত ইব্রাহিম আ. এর আল্লাহ, হযরত ইসহাক আ.র আল্লাহ ও হযরত ইয়াকুব আ.র আল্লাহ বলে ডেকেছেন। (৩৮)তিনি তো মৃতদের আল্লাহ নন কিন্তু জীবিতদেরই আল্লাহ। তাঁর কাছে তারা সবাই জীবিত।” (৩৯)তখন কয়েকজন আলিম বললেন, “হুজুর, আপনি ঠিকই বলেছেন।” (৪০)তারা আর কোনোকিছু তাঁকে জিজ্ঞেস করার সাহস পেলেন না।
(৪১)তিনি তাদের বললেন, “তারা কী করে বলে যে, মসিহ হযরত দাউদ আ.-র সন্তান? (৪২)যবুরে হযরত দাউদ আ. নিজেই তো বলেছেন, ‘আল্লাহ আমার মনিবকে বললেন- (৪৩)‘যতোক্ষণ না আমি তোমার শত্রুদের তোমার পায়ের তলায় রাখি, ততোক্ষণ তুমি আমার ডান দিকে বসো।’ (৪৪)হযরত দাউদ আ.ই যখন তাঁকে মনিব বলেছেন, তখন কেমন করে তিনি তার সন্তান হতে পারেন?” (৪৫)সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে তিনি তাঁর হাওয়ারিদের বললেন, “আলিমদের বিষয়ে সাবধান হও। (৪৬)তারা লম্বা লম্বা জুব্বা পরে ঘুরে বেড়াতে এবং হাটেবাজারে সম্মান পেতে ভালোবাসে। তারা সিনাগোগে সব থেকে ভালো জায়গায় ও ভোজের সময় সম্মানের জায়গায় বসতে ভালোবাসে। (৪৭)তারা বিধবাদের সম্পত্তি দখল করে এবং লোকদেরকে দেখাবার জন্য লম্বা লম্বা মোনাজাত করে। নিশ্চয়ই তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)পরে তিনি চেয়ে দেখলেন, ধনী লোকেরা বায়তুল-মোকাদ্দসের দানবাক্সে তাদের দান রাখছে। (২)তিনি এও দেখলেন যে, এক গরিব বিধবা ছোট্ট দুটো তামার পয়সা রাখলো।
(৩)তিনি বললেন, “আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, এই গরিব বিধবা অন্য সকলের চেয়ে অনেক বেশি দান করেছে।
(৪)কারণ খরচ করার পরে যা বাকি ছিলো, তাদের সকলে তা থেকে দান করেছে কিন্তু এই মহিলার অভাব সত্ত্বেও বেঁচে থাকার জন্য তার যা ছিলো, তার সবই সে দান করেছে।”
(৫)সাহাবিদের মধ্যে কয়েকজন বায়তুল-মোকাদ্দসের বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। তারা বলছিলেন, সুন্দর সুন্দর পাথর ও আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা দান কেমন সাজানো হয়েছে।
(৬)তিনি বললেন, “তোমরা যে এসব দেখছো, এমন দিন আসবে, যখন এর একটি পাথরের ওপরে আরেকটি পাথর থাকবে না, সবই ভেঙে ফেলা হবে।”(৭)তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “হুজুর, কখন এসব ঘটবে এবং এসব ঘটার সময়ের চিহ্নই বা কী?”
(৮)তিনি বললেন, “সাবধান, কেউ যেনো তোমাদের না ঠকায়। কারণ অনেকে আমার নাম নিয়ে এসে বলবে, ‘আমিই মসিহ!’ এবং ‘সময় কাছে এসে গেছে!’ তাদের পেছনে যেয়ো না। (৯)তোমরা যখন যুদ্ধের ও বিদ্রোহের খবর শুনবে, তখন ভয় পেয়ো না। কারণ প্রথমে এসব ঘটতেই হবে কিন্তু তখনই শেষ নয়।”
(১০)তারপর তিনি তাদের বললেন, “এক জাতি আরেক জাতির বিরুদ্ধে, এক রাজ্য অন্য রাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। (১১)ভীষণ ভীষণ ভূমিকম্প হবে এবং নানা জায়গায় দুর্ভিক্ষ ও মহামারী হবে; আসমান থেকে নানা ভয়ঙ্কর লক্ষণ এবং মহৎ চিহ্ন দেখা যাবে। (১২)এসব ঘটার আগেই লোকেরা তোমাদের ধরবে এবং তোমাদের ওপরে অত্যাচার করবে। বিচারের জন্য তারা তোমাদের সিনাগোগে নিয়ে যাবে ও জেলখানায় দেবে এবং আমার নামের জন্য বাদশাদের ও গভর্নরদের সামনে তোমাদের নেয়া হবে। (১৩)সাক্ষ্য দেবার জন্য এটি তোমাদের সুযোগ করে দেবে। (১৪)অতএব, কী বলতে হবে সে-বিষয়ে আগেভাগে চিন্তা না করার জন্য মন স্থির করো। (১৫)কারণ আমি তোমাদের এমন কথা ও জ্ঞান দেবো যে, তোমাদের বিপক্ষরা জবাব দিতে পারবে না বা তোমাদের থামাতে পারবে না।
(১৬)তোমাদের বাবামা, ভাইবন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনরা তোমাদের ধরিয়ে দেবে। তোমাদের কাউকে কাউকে তারা হত্যা করবে। (১৭)আমার নামের জন্য সবাই তোমাদের ঘৃণা করবে (১৮)কিন্তু তোমাদের মাথার একটি চুলও নষ্ট হবে না। (১৯)ধৈর্য ধরে স্থির থাকলে তোমাদের জীবন রক্ষা পাবে।
(২০)তোমরা যখন দেখবে সৈন্যরা জেরুসালেমকে ঘেরাও করেছে, তখন বুঝবে যে, এর সর্বনাশ, জনমানবহীন স্থান ও ধ্বংস হওয়ার সময়, কাছে এসে গেছে। (২১)সেই সময় যারা ইহুদিয়াতে থাকবে, তারা পাহাড়ি এলাকায় পালিয়ে যাক। যারা শহরের ভেতরে থাকবে, তারা বাইরে চলে যাক। যারা গ্রামের দিকে থাকবে, তারা শহরে না ঢুকুক। (২২)কারণ ওই দিনগুলো প্রতিশোধের দিন; যা লেখা আছে তা পূর্ণ হবার দিন। (২৩)ওই দিনগুলোতে যারা গর্ভবতী আর যারা সন্তানকে দুধ খাওয়ায়, দুর্ভাগী তারা! কারণ ওই সময় দুনিয়াতে ভীষণ কষ্ট ও এই জাতির ওপরে আল্লাহর গজব নেমে আসবে। (২৪)তরবারি দিয়ে তাদের হত্যা করা হবে এবং যারা বেচে থাকবে তাদেরকে সমস্ত জাতির মধ্যে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হবে! যতোদিন না জাতিদের সময় পূর্ণ হয়, ততোদিন তারা জেরুসালেমকে পায়ে মাড়াবে।
(২৫)সূর্য, চাঁদ ও তারাগুলোর মধ্যে অনেক চিহ্ন দেখা দেবে। দুনিয়াতে সমস্ত জাতি ভীষণ কষ্ট পাবে এবং সমুদ্রের গর্জন ও ঢেউয়ের জন্য তারা বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত হবে। (২৬)দুনিয়ার ওপর কী ঘটতে যাচ্ছে, তার ভয়ে লোকেরা অজ্ঞান হয়ে যাবে, কারণ সৌরজগত দুলতে থাকবে।
(২৭)অতঃপর তারা ইবনুল-ইনসানকে ক্ষমতা ও মহাগৌরবে মেঘের মধ্যে আসতে দেখবে। (২৮)এসব ঘটনা যখন ঘটতে শুরু করবে, তখন তোমরা সোজা হয়ে ও মাথা তুলে দাঁড়াবে, কারণ তোমাদের মুক্তির সময় কাছে এসেছে।”
(২৯)তারপর তিনি তাদের একটি দৃষ্টান্ত দিলেন, “ডুমুরগাছ ও অন্যান্য গাছকে লক্ষ্য করো। (৩০)নতুন পাতা বের হতে দেখলে তোমরা নিজেরাই বুঝতে পারো যে, গরমকাল কাছে এসেছে। (৩১)সেভাবে যখন তোমরা এসব ঘটতে দেখবে, তখন বুঝবে যে, আল্লাহর রাজ্য কাছে এসে গেছে। (৩২)আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, সবকিছু না ঘটা পর্যন্ত এ-কালের লোকেরা শেষ হবে না। (৩৩)আসমান ও জমিন শেষ হয়ে যাবে কিন্তু আমার কালাম কখনো শেষ হবে না।
(৩৪)তোমরা সাবধান থেকো, যেনো তোমাদের মন ভোগবিলাসে, মাতলামিতে ও সংসারের চিন্তার ভারে নুয়ে না পড়ে। তা না হলে ফাঁদের মতো হঠাৎ সেই দিনটি তোমাদের ওপরে এসে পড়বে। (৩৫)কারণ সেই দিনটি সমস্ত দুনিয়ার মানুষের ওপরে আসবে।
(৩৬)সব সময় সজাগ থেকো এবং মোনাজাত করো, যেনো যা-কিছু ঘটবে তা এড়িয়ে যাবার শক্তি এবং ইবনুল-ইনসানের সামনে দাঁড়াবার শক্তি পাও।”
(৩৭)প্রতিদিনই তিনি বায়তুল-মোকাদ্দসে শিক্ষা দিতেন এবং রাতের বেলা বাইরে গিয়ে জৈতুন নামের পাহাড়ে থাকতেন। (৩৮)সমস্ত লোক খুব ভোরে উঠে তাঁর কথা শোনার জন্য বায়তুল-মোকাদ্দসে যেতো।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)সেই সময় ইদুল-মাত্ছ কাছে এসে গিয়েছিলো। এটিকে ইদুল-ফেসাখও বলা হয়। (২)প্রধান ইমামেরা ও আলিমরা তাঁকে হত্যা করার পথ খুঁজছিলেন, কারণ তারা লোকদের ভয় করতেন। (৩)এই সময় ইহুদা, যাকে ইস্কারিয়োত বলা হতো, তার ভেতরে শয়তান ঢুকলো। তিনি ছিলেন সেই বারোজনের মধ্যে একজন। (৪)তিনি গিয়ে প্রধান ইমামদের ও বায়তুল-মোকাদ্দসের পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে পরামর্শ করলেন কীভাবে তাঁকে তাদের হাতে তুলে দেবেন। (৫)এতে তারা খুব খুশি হয়ে তাকে টাকা দিতে রাজি হলেন। (৬)সুতরাং তিনি রাজি হলেন এবং উপযুক্ত সুযোগ খুঁজতে লাগলেন, যাতে লোকদের অনুপস্থিতিতে হযরত ইসা আ.কে ধরিয়ে দিতে পারেন।
(৭)অতঃপর এলো ইদুল-মাত্ছ, ওই দিন ইদুল-ফেসাখের ভেড়া কোরবানি করতে হতো। (৮)সুতরাং তিনি হযরত পিতর রা. ও হযরত ইউহোন্না রা.কে বলে পাঠালেন, “তোমরা গিয়ে আমাদের জন্য ইদুল-ফেসাখের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করো, যেনো আমরা তা খেতে পারি।”
(৯)তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কোথায় আমাদের এই ভোজ প্রস্তুত করতে বলেন?” (১০)তিনি তাদের বললেন, “শোনো, তোমরা যখন শহরে ঢুকবে, তখন এক লোককে এক কলস পানি নিয়ে যেতে দেখবে; তার পেছনে পেছনে গিয়ে সে যে-ঘরে ঢুকবে, তোমরা সেই ঘরেই ঢুকবে।
(১১)সেই ঘরের মালিককে বলবে, ‘হুজুর আপনার কাছে জানতে চাচ্ছেন, “সেই মেহমানখানাটি কোথায়, যেখানে আমি আমার হাওয়ারিদের সাথে ইদুল-ফেসাখের খাওয়া-দাওয়া করতে পারি?”’ (১২)সে তোমাদের ওপর তলায় একটি সাজানো বড়ো ঘর দেখিয়ে দেবে; সেখানেই সবকিছু প্রস্তুত করো।”
(১৩)তারা গেলেন ও তিনি যেভাবে তাদের বলেছিলেন, সবকিছু সেরকমই দেখতে পেলেন এবং ইদুল-ফেসাখের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করলেন। (১৪)যখন ঠিক সময় এলো, তখন তিনি তাঁর হাওয়ারিদের সাথে খেতে বসলেন। (১৫)তিনি তাদের বললেন, “আমার কষ্ট ভোগের আগে আমি তোমাদের নিয়ে ইদুল-ফেসাখের এই খাবার খাওয়ার জন্য গভীরভাবে আগ্রহী ছিলাম। (১৬)কারণ আমি তোমাদের বলছি, আমি আর এই খাবার খাবো না, যতোদিন-না আল্লাহর রাজ্যে এটি পূর্ণ হয়।” (১৭)অতঃপর তিনি একটি গ্লাস নিলেন এবং শুকরিয়া জানিয়ে বললেন, “এটি নাও এবং তোমাদের মধ্যে এটি ভাগ করে নাও। (১৮)কারণ আমি তোমাদের বলছি, এখন থেকে আল্লাহর রাজ্য না আসা পর্যন্ত আমি আর কখনো আঙুররস খাবো না।”
(১৯)তারপর তিনি রুটি নিয়ে শুকরিয়া জানিয়ে টুকরো টুকরো করে তাদের দিয়ে বললেন, “এ আমার শরীর, যা তোমাদের জন্য দেয়া হয়েছে। আমাকে স্মরণ করার জন্য এরকম করো। (২০)একইভাবে খাওয়ার পর তিনি গ্লাসটি নিয়ে বললেন, “এই গ্লাস আমার রক্তে প্রতিষ্ঠিত নতুন ওয়াদা, যে-রক্ত তোমাদের জন্য বহানো হবে।
(২১)কিন্তু দেখো, যে আমাকে ধরিয়ে দেবে, তার হাত আমার সাথে এই টেবিলের ওপরেই রয়েছে। (২২)আর ইবনুল-ইনসান তাঁর নির্ধারিত পথেই যাচ্ছেন কিন্তু দুর্ভাগা সেই লোক, যে তাঁকে তুলে দেবে!” (২৩)তখন তারা একে অন্যকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন যে, তাদের মধ্যে কে সেই লোক হতে পারে, যে এমন কাজ করতে পারে?
(২৪)তাদের মধ্যে এই তর্কাতর্কিও শুরু হলো যে, তাদের মধ্যে কে অন্যদের থেকে বড়ো। (২৫)কিন্তু তিনি তাদের বললেন, “অন্যান্য জাতির বাদশারা তাদের ওপর প্রভুত্ব করে আর তাদের শাসনকর্তাদের উপকারী নেতা বলে ডাকা হয় (২৬)কিন্তু তোমাদের মধ্যে এরকম হওয়া উচিত নয়। বরং তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড়ো, সে সবচেয়ে ছোটোর মতোই হোক; আর যে নেতা, সে খাদেমের মতো হোক। (২৭)কে বড়ো? যে খেতে বসে নাকি যে পরিবেশন করে? যে খেতে বসে সে নয় কি? কিন্তু আমি তোমাদের মধ্যে খাদেমের মতো হয়েছি।
(২৮)আমার সমস্ত বাধা-বিঘ্নের মধ্যে তোমরাই আমার সাথে রয়েছো। (২৯)আমার প্রতিপালক যেমন আমাকে একটি রাজ্য দিয়েছেন, তেমনি আমিও তোমাদের দিচ্ছি,
(৩০)যেনো তোমরা আমার রাজ্যে আমার সাথে খাওয়া-দাওয়া করো এবং সিংহাসনে বসে ইস্রাইলের বারো বংশের বিচার করো।
(৩১)সাফওয়ান, সাফওয়ান, দেখো! শয়তান তোমাদের সবাইকে গমের মতো করে চালুনি দিয়ে চালার অনুমতি চেয়েছে। (৩২)কিন্তু আমি তোমার জন্য মোনাজাত করেছি, যেনো তোমার নিজের ইমান নষ্ট না হয় এবং তুমি যখন ফিরে আসবে, তখন তোমার ভাইদের শক্তিশালী করে তোলো।” (৩৩)কিন্তু তিনি তাঁকে বললেন, “মালিক, আমি আপনার সাথে জেলে যেতে এবং মরতেও প্রস্তুত আছি!” (৩৪)হযরত ইসা আ. বললেন, “পিতর, আমি তোমাকে বলছি, “তুমি আমাকে চেনো না- একথা বলে তিনবার অস্বীকার করার আগে আজ মোরগ ডাকবে না।”
(৩৫)অতঃপর তিনি তাদের বললেন, “আমি যখন তোমাদের টাকার থলি, ঝুলি ও জুতা ছাড়া পাঠিয়েছিলাম, তখন কি তোমাদের কোনোকিছুর অভাব হয়েছিলো?” তারা বললেন, “না, একটি জিনিসেরও না।” (৩৬)তিনি তাদের বললেন, “কিন্তু এখন যার টাকার থলি বা ঝুলি আছে, সে তা নিক। যার তরবারি নেই, সে তার চাদর বিক্রি করে একটি তরবারি কিনুক। (৩৭)আমি তোমাদের বলছি, আল্লাহর এই কালাম আমার ওপর অবশ্যই পূর্ণ হবে, ‘তাঁকে গুনাহগারদের সাথে গোনা হলো।’ নিশ্চয়ই আমার বিষয়ে যা লেখা আছে তা পূর্ণ হচ্ছে।” (৩৮)তারা বললেন, “হুজুর, দেখুন, এখানে দুটো তরবারি আছে।” তিনি জবাব দিলেন, “এ-ই যথেষ্ট।”
(৩৯)তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নিজের নিয়ম অনুসারে জৈতুন পাহাড়ে গেলেন আর হাওয়ারিরা তাঁর পেছনে পেছনে গেলেন। (৪০)জায়গামতো পৌঁছে তিনি তাদের বললেন, “মোনাজাত করো, যেনো পরীক্ষায় না পড়ো।”
(৪১)তারপর তিনি তাদের কাছ থেকে কিছু দূরে গিয়ে হাঁটু পেতে এই বলে মোনাজাত করতে লাগলেন, (৪২)“হে প্রতিপালক, যদি তোমার ইচ্ছা হয়, তাহলে এই গ্লাস আমার কাছ থেকে সরিয়ে নাও। তবুও আমার ইচ্ছামতো নয় কিন্তু তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।”
(৪৩)তখন বেহেস্ত থেকে একজন ফেরেস্তা এসে তাঁকে শক্তি যোগালেন। (৪৪)মনের কষ্টে তিনি আরো আকুলভাবে মোনাজাত করলেন। তাঁর গায়ের ঘাম রক্তের ফোটার মতো হয়ে মাটিতে পড়তে লাগলো।
(৪৫)মোনাজাত থেকে উঠে তিনি তাঁর হাওয়ারিদের কাছে এলেন এবং দেখলেন, দুঃখে ক্লান্ত হয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। (৪৬)তিনি তাদের বললেন, “কেনো তোমরা ঘুমাচ্ছো? ওঠো, মোনাজাত করো, যেনো পরীক্ষায় না পড়ো।”
(৪৭)তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখনই হঠাৎ অনেক লোক সেখানে এলো এবং বারোজনের একজন- ইহুদা- তাদের নিয়ে এলেন। তিনি চুমু দেবার জন্য হযরত ইসা আ.র দিকে এগিয়ে গেলেন। (৪৮)কিন্তু হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “ইহুদা, চুমু দিয়ে কি ইবনুল-ইনসানকে ধরিয়ে দিচ্ছো?” (৪৯)যারা তাঁর চারপাশে ছিলেন, তারা বুঝলেন কী হতে যাচ্ছে। তারা জিজ্ঞেস করলেন, “মালিক, আমরা কি তরবারি দিয়ে আঘাত করবো?”
(৫০)তাদের মধ্যে একজন তরবারির আঘাতে মহাইমামের গোলামের ডান কানটি কেটে ফেললেন। (৫১)কিন্তু হযরত ইসা আ. বললেন, “এবার থামো, আর নয়!” আর তিনি তার কান ছুঁয়ে তাকে সুস্থ করলেন।
(৫২)অতঃপর যেসব প্রধান ইমাম, বায়তুল-মোকাদ্দসের পুুলিশ অফিসার এবং বুজুর্গরা তাঁকে ধরতে এসেছিলেন, তাদের তিনি বললেন, “আমি কি ডাকাত যে, তোমরা তরবারি ও লাঠি নিয়ে এসেছো? (৫৩)আমি যখন বায়তুল-মোকাদ্দসে দিনের পর দিন তোমাদের সাথে ছিলাম, তখন তোমরা আমাকে ধরোনি; কিন্তু এখন সময় তোমাদের ও অন্ধকারের ক্ষমতার।”
(৫৪)তখন তারা তাঁকে ধরে মহাইমামের বাড়ির উঠানে নিয়ে গেলেন। হযরত পিতর রা. দূরে দূরে থেকে তাদের পেছনে পেছনে যাচ্ছিলেন। (৫৫)যখন তারা উঠানের মাঝখানে আগুন জ্বেলে বসলেন, তখন হযরত পিতর রা. এসে তাদের মধ্যে বসলেন। (৫৬)তখন এক চাকরানী আগুনের আলোতে হযরত পিতর রা.কে দেখতে পেলো এবং ভালো করে তাকিয়ে দেখে বললো, “এই লোকটিও তার সাথে ছিলো।”(৫৭)কিন্তু তিনি অস্বীকার করে বললেন, “হে মহিলা, আমি তাঁকে চিনি না।” ৫৮কিছুক্ষণ পর আরেকজন তাকে দেখে বললো, “তুমিও তো ওদেরই একজন।”
কিন্তু হযরত পিতর রা. বললেন, “না, আমি নই।”(৫৯)প্রায় এক ঘন্টা পরে আরেকজন জোর দিয়ে বললো, “এই লোকটি নিশ্চয়ই তার সাথে ছিলো, কারণ সেও তো একজন গালিলীয়।”(৬০)কিন্তু হযরত পিতর রা. বললেন, “দেখো, তুমি কী বলছো, আমি বুঝতে পারছি না।”ঠিক সেই সময় হযরত পিতর রা.র কথা শেষ না হতেই একটি মোরগ ডেকে উঠলো। (৬১)তখন হযরত ইসা আ. মুখ ফিরিয়ে পিতরের দিকে তাকালেন। এতে তাঁর বলা এই কথাটি হযরত পিতরের মনে পড়লো, “আজ মোরগ ডাকার আগে তুমি তিনবার আমাকে অস্বীকার করবে।”(৬২)তখন তিনি বাইরে গিয়ে ভীষণভাবে কাঁদতে লাগলেন।
(৬৩)যারা হযরত ইসা আ.কে পাহারা দিচ্ছিলো, তারা তাঁকে ঠাট্টা করতে ও মারতে লাগলো। (৬৪)তারা হযরত ইসা আ.র চোখ বেঁধে দিয়ে বলতে থাকলো, “নবি হলে বল্ তো দেখি, কে তোকে মারলো?” (৬৫)এভাবে তারা আরো অনেক কথা বলে তাঁকে অপমান করতে থাকলো।
(৬৬)সকালে লোকদের বুজুর্গরা, প্রধান ইমামেরা এবং আলিমরা একসাথে জমায়েত হলেন এবং তারা তাদের মহাসভার সামনে তাঁকে আনলেন। (৬৭)তারা বললেন, “তুমি যদি মসিহ হও, তাহলে আমাদের বলো।”তিনি উত্তর দিলেন, “আমি যদি বলি, তবুও তোমরা বিশ্বাস করবে না,
(৬৮)এবং আমি কিছু জিজ্ঞেস করলে তোমরা জবাব দেবে না। (৬৯)কিন্তু এখন থেকে ইবনুল-ইনসান সর্বশক্তিমান আল্লাহর ডান পাশে বসে থাকবেন।”
(৭০)তারা সকলে জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে তুমি কি আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন?” তিনি তাদের বললেন, “তোমরা ঠিকই বলছো, আমিই তিনি।”(৭১)তখন তারা বললেন, “আমাদের আর সাক্ষ্যের কী দরকার? আমরা নিজেরাই তো ওর মুখ থেকে শুনলাম।”
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
(১)তখন মহাসভার সবাই উঠে হযরত ইসা আ.কে পিলাতের কাছে নিয়ে গেলেন। (২)তারা এই বলে তাঁর বিরুদ্ধে দোষ দিতে লাগলেন, “আমরা দেখেছি, এই লোকটি আমাদের লোকদের সরকারের বিরুদ্ধে নিয়ে যাচ্ছে।
সে কাইসারকে কর দিতে নিষেধ করে এবং নিজেই নিজেকে মসিহ- একজন বাদশা- বলে দাবি করে।” (৩)পিলাত তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি ইহুদিদের বাদশা?” তিনি উত্তর দিলেন, “আপনিই তা বলছেন।”(৪)তখন পিলাত প্রধান ইমামদের ও সমস্ত লোকদের বললেন, “আমি তো এই লোকটিকে দোষারোপ করার কোনো কারণ দেখতে পাচ্ছি না।” (৫)কিন্তু তারা জোর দিয়ে বলতে লাগলেন, “ইহুদিয়া প্রদেশের সব জায়গায় সে শিক্ষা দিয়ে লোকদের ক্ষেপিয়ে তুলেছে। সে শুরু করেছে গালিল প্রদেশ থেকে আর এখন এখানেও এসেছে।”
(৬)একথা শুনে পিলাত জিজ্ঞেস করলেন লোকটি গালিলের কিনা। (৭)তিনি যখন বুঝলেন যে, তিনি হেরোদের শাসনাধীন এলাকার লোক, তখন তিনি তাঁকে হেরোদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন, কারণ সেই সময় হেরোদও জেরুসালেমে ছিলেন। (৮)হযরত ইসা আ.কে দেখে হেরোদ খুব খুশি হলেন। তিনি অনেকদিন থেকে তাঁকে দেখতে চাচ্ছিলেন। কারণ তিনি তাঁর বিষয়ে শুনেছিলেন এবং তাঁর কাছ থেকে চিহ্ন হিসেবে মোজেজা দেখার আশা করছিলেন। (৯)তিনি তাঁকে অনেক প্রশ্ন করলেন কিন্তু হযরত ইসা আ. তার কোনো কথারই জবাব দিলেন না।
(১০)প্রধান ইমামেরা এবং আলিমরা সেখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে তাঁকে দোষারোপ করতে থাকলেন। (১১)হেরোদও তার সৈন্যদের নিয়ে তাঁকে অপমান ও ঠাট্টা করলেন। তারপর তিনি তাঁকে ঝলমলে একটি পোশাক পরিয়ে পিলাতের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। (১২)ওই দিন থেকে পিলাত ও হেরোদ একে অন্যের বন্ধু হয়ে গেলেন। এর আগে তাদের মধ্যে শত্রুতা ছিলো।
(১৩)পিলাত তখন প্রধান ইমামদের, নেতাদের এবং লোকদের ডেকে একত্র করে বললেন,
(১৪)“আপনারা এই লোকটিকে এই দোষে আমার কাছে এনেছেন যে, সে লোকদের নিয়ে যাচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে কিন্তু আমি আপনাদের সামনেই তাকে জেরা করেছি। আপনারা তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করছেন, তার একটিতেও সে দোষী বলে আমি প্রমাণ পাইনি। (১৫)হেরোদও তার কোনো দোষ পাননি, কারণ তিনি তাকে আমাদের কাছে ফেরত পাঠিয়েছেন। নিশ্চয়ই সে মৃত্যুদন্ডের যোগ্য কোনো দোষ করেনি। (১৬)তাই আমি তাকে শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেবো।”
(১৭)প্রত্যেক ইদুল ফেসাখের সময় একজন কয়েদিকে ছেড়ে দেবার নিয়ম প্রচলিত ছিলো।
(১৮)তখন তারা একসাথে চিৎকার করে বলতে লাগলো, “ওকে মেরে ফেলুন, আমাদের জন্য বারাব্বাকে ছেড়ে দিন।”(১৯)শহরের মধ্যে বিদ্রোহ ও খুনোখুনির জন্য এই বারাব্বাকে জেলে দেয়া হয়েছিলো।
(২০)পিলাত হযরত ইসা আ.কে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি আবার তাদের সাথে কথা বললেন। (২১)কিন্তু তারা এই বলে চিৎকার করতে থাকলো, “ওকে সলিবে দিন, সলিবে দিন।”
(২২)তৃতীয়বার তিনি তাদের বললেন, “কেনো, এ কী দোষ করেছে? আমি তো মৃত্যুদন্ড দেবার মতো তার কোনো দোষই পাইনি; এজন্য আমি তাকে অন্য শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেবো।”(২৩)কিন্তু তারা চিৎকার করে বলতে থাকলো যে, তাকে সলিবে দেয়া হোক এবং শেষে তারা চিৎকার করেই জয়ী হলো। (২৪)পিলাত তাদের দাবি মেনে নিয়ে তার রায় দিলেন। (২৫)তারা যাকে চেয়েছিলো, তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন, বিদ্রোহ ও খুনের জন্য তাকে জেলে দেয়া হয়েছিলো। এবং তিনি তাদের ইচ্ছামতোই হযরত ইসা আ.কে হত্যা করার জন্য দিয়ে দিলেন।
(২৬)তারা যখন তাঁকে নিয়ে যাচ্ছিলো, তখন সিমোন নামে কুরিনি শহরের এক লোককে তারা আটকালো। সে গ্রামের দিক থেকে আসছিলো। তারা সলিবটি তার কাঁধে তুলে দিলো এবং তাকে বাধ্য করলো হযরত ইসা আ.র পেছনে পেছনে তা বয়ে নিয়ে যেতে। (২৭)বিরাট একদল লোক তাঁর পেছনে পেছনে চললো। তাদের মধ্যে মহিলারাও ছিলেন। তারা তাঁর জন্য বুক চাপড়ে বিলাপ করছিলেন।
(২৮)কিন্তু হযরত ইসা আ. তাদের দিকে ফিরে বললেন, “জেরুসালেমের মহিলারা, আমার জন্য কেঁদো না কিন্তু তোমাদের নিজেদের ও তোমাদের সন্তানদের জন্য কাঁদো। (২৯)কারণ এমন দিন অবশ্যই আসছে, যখন তারা বলবে, ‘ভাগ্যবতী তারা, যারা বন্ধ্যা, যাদের গর্ভ সন্তান ধরেনি এবং সে, যে বুকের দুধ খাওয়ায়নি।’(৩০)তারা তখন পর্বতকে বলতে থাকবে, ‘আমাদের ওপরে পড়ো,’ আর পাহাড়কে বলবে, ‘আমাদের ঢেকে রাখো।’
(৩১)কারণ গাছ সবুজ থাকতে যদি তারা এরকম করে, তাহলে গাছ শুকিয়ে গেলে কী ঘটবে?”
(৩২)তারা অন্য দু’জন অপরাধীকেও তাঁর সাথে হত্যা করার জন্য নিয়ে চললো। (৩৩)তারা মাথারখুলি নামক জায়গায় পৌঁছে হযরত ইসা আ.কে ও সেই দুই অপরাধীকে- একজনকে তাঁর ডান দিকে ও অন্যজনকে তাঁর বাঁ দিকে- সলিবে দিলো।
(৩৪)তখন হযরত ইসা আ. বললেন, “হে প্রতিপালক, এদের মাফ করো, কারণ এরা কী করছে তা এরা জানে না।”তারা ভাগ্যপরীক্ষা করে তাঁর জামাকাপড় নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলো। (৩৫)লোকেরা কাছে দাঁড়িয়ে দেখছিলো। নেতারা তাঁকে ঠাট্টা করে বললেন, “সে তো অন্যদের রক্ষা করতো; সে যদি মসিহ হয়, তাঁর মনোনীত লোক হয়, তাহলে সে নিজেকে রক্ষা করুক!” (৩৬)সৈন্যরাও তাঁকে ঠাট্টা করতে লাগলো। তারা তাঁকে সিরকা খেতে দেবার জন্য তাঁর কাছে নিয়ে গিয়ে বললো, (৩৭)“তুমি যদি ইহুদিদের বাদশা হও, তাহলে নিজেকে রক্ষা করো!” (৩৮)সলিবে তাঁর মাথার ওপরের দিকে একটি ফলকে একথা লেখা ছিলো, “এই লোকটি ইহুদিদের বাদশা।”
(৩৯)সেখানে টাঙানো দোষীদের একজন তাঁকে টিটকারি করে বললো, “তুমি নাকি মসিহ? তাহলে নিজেকে ও আমাদের রক্ষা করো!” (৪০)তখন অন্য লোকটি তাকে ধমক দিয়ে বললো, “তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? তুমিও তো একইরকম শাস্তি পাচ্ছো। (৪১)আমরা উচিত শাস্তি পাচ্ছি। আমাদের যা পাওনা আমরা তা-ই পাচ্ছি কিন্তু এই লোকটি কোনো দোষ করেননি।”
(৪২)তারপর সে বললো, “হে ইসা, আপনি যখন আপনার রাজ্যে রাজত্ব করতে ফিরবেন, তখন আমাকে স্মরণ করবেন।”(৪৩)তিনি উত্তর দিলেন, “আমি তোমাকে সত্যি বলছি, তুমি আজই আমার সাথে জান্নাতে যাবে।”
(৪৪)তখন বেলা প্রায় বারোটা। বিকেল তিনটা পর্যন্ত সারা দেশ অন্ধকারে ছেয়ে গেলো। (৪৫)সূর্য যখন অন্ধকারে ঢেকে গেলো এবং বায়তুল-মোকাদ্দসের পর্দাটি মাঝখান দিয়ে চিরে দু’ভাগ হয়ে গেলো, (৪৬)তখন হযরত ইসা আ. জোরে চিৎকার করে বললেন, “হে প্রতিপালক, আমি তোমার হাতে আমার রুহ তুলে দিলাম।”একথা বলে তিনি ইন্তেকাল করলেন।
(৪৭)এসব দেখে রোমীয় শত সৈন্যের সেনাপতি আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন, “সত্যিই এই লোকটি দীনদার ছিলেন।”(৪৮)যে-লোকেরা সেখানে জমায়েত হয়েছিলো, তারা এই সমস্ত ঘটনা দেখে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বাড়ি ফিরে গেলো। (৪৯)যারা হযরত ইসা আ.কে চিনতেন এবং যে-মহিলারা গালিল থেকে তাঁর সাথে সাথে এসেছিলেন, তারা সবাই দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিলেন।
(৫০)ইউসুফ নামে এক সৎ ও দীনদার লোক ছিলেন। তিনি মহাসভার সদস্যও ছিলেন। (৫১)তিনি তাদের কাজ ও পরিকল্পনার সাথে একমত ছিলেন না। তিনি ইহুদিদের গ্রাম অরিমাথিয়া থেকে এসেছিলেন এবং তিনি আল্লাহর রাজ্যের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। (৫২)তিনি পিলাতের কাছে গিয়ে হযরত ইসা আ.র দেহ-মোবারক চেয়ে নিলেন।
(৫৩)তিনি তা সলিব থেকে নামিয়ে লিনেন কাপড়ের কাফনে জড়ালেন এবং পাথর কেটে তৈরি করা একটি কবরে দাফন করলেন। সেই কবরে আর কখনো কাউকে দাফন করা হয়নি।
(৫৪)এটি ছিলো সাব্বাতের প্রস্তুতির দিন এবং সাব্বাত প্রায় শুরু হয়ে গিয়েছিলো। (৫৫)যে-মহিলারা তাঁর সাথে গালিল থেকে এসেছিলেন, তারা তাঁর পেছনে পেছনে গিয়ে কবরটি দেখলেন এবং কীভাবে তাঁর দেহ-মোবারক দাফন করা হলো, তাও দেখলেন। (৫৬)তারপর তারা ফিরে গিয়ে তাঁর দেহ-মোবারকের জন্য সুগন্ধি মসলা এবং সুগন্ধি তেল তৈরি করলেন। সাব্বাতে তারা শরিয়ত অনুসারে বিশ্রাম করলেন।
রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
