(২)হযরত ইসাইয়া নবির কিতাবে লেখা আছে- “দেখো, তোমার আগে আমি আমার নবিকে পাঠাচ্ছি; সে তোমার পথ প্রস্তুত করবে। (৩)মরুপ্রান্তরে একজনের কণ্ঠস্বর ঘোষণা করছে, ‘তোমরা মালিকের পথ প্রস্তুত করো, তাঁর রাস্তা সোজা করো’।”
(৪)হযরত ইয়াহিয়া আ. মরুপ্রান্তরে আবির্ভূত হয়ে বায়াত দিতে এবং গুনাহর ক্ষমা পাবার জন্য তওবার বায়াত প্রচার করতে লাগলেন। (৫)সমগ্র ইহুদিয়া প্রদেশ ও জেরুসালেমের সকলে তার কাছে এসে গুনাহ স্বীকার করলো এবং তিনি তাদের জর্দান নদীতে বায়াত দিলেন। (৬)হযরত ইয়াহিয়া আ. উটের লোমের কাপড় পরতেন। তার কোমরে থাকতো চামড়ার কোমরবন্ধ। (৭)তিনি ফড়িং এবং বনমধু খেতেন। তিনি এই বলে প্রচার করতেন, “আমার পরে একজন আসছেন, তিনি আমার চেয়ে মহান। নত হয়ে তাঁর জুতার ফিতা খোলার যোগ্যও আমি নই। (৮)আমি তোমাদের পানিতে বায়াত দিচ্ছি কিন্তু তিনি তোমাদের আল্লাহর রুহে বায়াত দেবেন।”
(৯)সেই সময়ে হযরত ইসা আ. গালিলের নাসরত থেকে এলেন এবং হযরত ইয়াহিয়া আ. তাঁকে জর্দান নদীতে বায়াত দিলেন। (১০)পানি থেকে উঠে আসার সাথে সাথেই তিনি দেখলেন, আসমান খুলে গেছে এবং আল্লাহর রুহ্ কবুতরের মতো হয়ে তাঁর ওপর নেমে আসছেন। (১১)আর বেহেস্ত থেকে এই কণ্ঠস্বর শোনা গেলো, “তুমিই আমার একান্ত প্রিয় মনোনীতজন, তোমার ওপর আমি খুবই সন্তুষ্ট।”
(১২)তখনই আল্লাহর রুহের পরিচালনায় তাঁকে মরুপ্রান্তরে যেতে হলো (১৩)এবং চল্লিশ দিন ধরে শয়তান তাঁকে লোভ দেখিয়ে পরীক্ষা করলো। সেখানে তিনি অনেক বন্য জন্তু-জানোয়ারের মধ্যে ছিলেন আর ফেরেস্তারা তাঁর সেবাযত্ন করতেন।
(১৪)হযরত ইয়াহিয়া আ. জেলখানায় বন্দি হওয়ার পর হযরত ইসা আ. গালিলে এলেন এবং (১৫)এই বলে আল্লাহর দেয়া ইঞ্জিল প্রচার করতে লাগলেন, “সময় পূর্ণ হয়েছে এবং আল্লাহর রাজ্য কাছে এসেছে, তওবা করো এবং ইঞ্জিলের ওপর ইমান আনো।”
(১৬)হযরত ইসা আ. গালিল লেকের পাড় দিয়ে যাবার সময় দেখতে পেলেন, হযরত সাফওয়ান রা. ও তার ভাই হযরত আন্দ্রিয়ান রা. লেকে জাল ফেলছেন, কারণ তারা ছিলেন জেলে। (১৭)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “আমাকে অনুসরণ করো, আমি তোমাদের মানুষ ধরা জেলে করবো।” (১৮)আর তখনই তারা জাল ফেলে রেখে তাঁকে অনুসরণ করলেন।
(১৯)সেই জায়গা থেকে কিছু দূর গেলে পর তিনি হযরত ইয়াকুব ইবনে জাবিদি ও তার ভাই হযরত ইউহোন্না রা.-কে দেখতে পেলেন। তারা তাদের নৌকায় বসে জাল মেরামত করছিলেন। (২০)তখনই তিনি তাদের ডাক দিলেন আর তারা তাদের পিতা জাবিদিকে মজুরদের সাথে নৌকায় রেখে তাঁকে অনুসরণ করলেন।
(২১)অতঃপর হযরত ইসা আ. ও তাঁর উম্মতেরা কফরনাহুম শহরে গেলেন এবং সাব্বাতে সিনাগোগে গিয়ে তিনি শিক্ষা দিতে লাগলেন। (২২)লোকেরা তাঁর শিক্ষায় আশ্চর্য হয়ে গেলো, কারণ তিনি আলিমদের মতো শিক্ষা না দিয়ে বরং অধিকার আছে এমন একজনের মতো শিক্ষা দিচ্ছিলেন।
(২৩)তখন তাদের সিনাগোগে ভূতে পাওয়া এক লোক ছিলো। (২৪)সে চিৎকার করে বললো, “হে নাসরতের ইসা, আমাদের সাথে আপনার কী? আপনি কি আমাদের ধ্বংস করতে এসেছেন? আমি জানি আপনি কে- আপনিই তো আল্লাহর সেই পবিত্রজন!” (২৫)হযরত ইসা আ. তাকে ধমক দিয়ে বললেন, “চুপ করো, এর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসো!” (২৬)সেই ভূত তখন তাকে মুচড়ে ধরলো এবং চিৎকার করে তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। (২৭)এতে প্রত্যেকে এমন আশ্চর্য হলো যে, তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলো, “এসব কী হচ্ছে! কেমন ক্ষমতাপূর্ণ নতুন শিক্ষা! ভূতদেরও তিনি হুকুম দেন আর তারা তাঁর বাধ্য হয়!” (২৮)তখনই গালিল প্রদেশের সব জায়গায় তাঁর কথা ছড়িয়ে পড়লো।
(২৯)তারা সিনাগোগ থেকে বেরিয়ে তখনই হযরত সাফওয়ান রা. ও হযরত আন্দ্রিয়ান রা.-র বাড়িতে গেলেন। হযরত ইয়াকুব রা. এবং হযরত ইউহোন্না রা.ও তাদের সাথে ছিলেন। (৩০)হযরত সাফওয়ান রা.-র শাশুড়ির জ্বর হয়েছিলো বলে তিনি শুয়ে ছিলেন। তখনই তারা তার কথা হযরত ইসা আ.কে জানালেন। (৩১)তিনি এলেন এবং তাকে হাত ধরে তুললেন। এতে জ্বর তাকে ছেড়ে গেলো এবং তিনি তাদের মেহমানদারি করতে লাগলেন।
(৩২)সেদিন সূর্য ডুবে গেলে সন্ধ্যাবেলায় লোকেরা সেই এলাকার সমস্ত রোগী ও ভূতে পাওয়া লোকদেরকে তাঁর কাছে নিয়ে এলো (৩৩)এবং শহরের সমস্ত লোক দরজার কাছে জড়ো হলো। (৩৪)তিনি নানা রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীকে সুস্থ করলেন এবং অনেক ভূত ছাড়ালেন; তিনি ভূতদের কথা বলতে দিলেন না, কারণ তারা তাঁকে চিনতো।
(৩৫)ফজরে অন্ধকার থাকতেই তিনি উঠলেন এবং ঘর ছেড়ে একটি নির্জন জায়গায় গিয়ে মোনাজাত করতে লাগলেন। (৩৬)এদিকে হযরত সাফওয়ান রা. ও তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে খুঁজছিলেন। (৩৭)অতঃপর তারা তাঁকে পেয়ে বললেন, “সকলে আপনাকে খুঁজছে।” (৩৮)তিনি তাদের বললেন, “চলো, আমরা আশেপাশের গ্রামগুলোতে যাই, যেনো আমি সেখানেও প্রচার করতে পারি; কারণ সেজন্যই আমি বের হয়ে এসেছি।” (৩৯)পরে তিনি গালিলের সমস্ত জায়গায় গিয়ে তাদের সিনাগোগগুলোতে প্রচার করতে এবং ভূত ছাড়াতে লাগলেন।
(৪০)একজন কুষ্ঠরোগী তাঁর কাছে এসে হাঁটু গেড়ে কাকুতি-মিনতি করে বললো, “আপনি ইচ্ছা করলেই আমাকে পাকসাফ করতে পারেন।” (৪১)লোকটির ওপর হযরত ইসা আ.-র খুব মমতা হলো। তিনি হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁয়ে বললেন, “আমি তা-ই চাই, তুমি পাকসাফ হও।”
(৪২)তখনই কুষ্ঠরোগ তাকে ছেড়ে গেলো এবং সে পাকসাফ হলো। (৪৩)তিনি তাকে কঠোর-ভাবে সতর্ক করে তখনই বিদায় করলেন
(৪৪)এবং বললেন, “দেখো, কাউকে কিছুই বলো না। তুমি বরং ইমামের কাছে গিয়ে নিজেকে দেখাও আর তাদের কাছে সাক্ষ্য দেবার জন্য ও পাকসাফ হবার জন্য হযরত মুসা আ. যে-কোরবানির হুকুম দিয়েছেন তা আদায় করো।” (৪৫)কিন্তু লোকটি বাইরে গিয়ে সব জায়গায় অনেক কিছু বলতে এবং এই খবর ছড়াতে লাগলো। ফলে হযরত ইসা আ. খোলাখুলি-ভাবে আর কোনো শহরে যেতে পারলেন না, তাঁকে বাইরে নির্জন জায়গায় থাকতে হলো; আর লোকেরা চারদিক থেকে তাঁর কাছে আসতে লাগলো।
(১)কিছুদিন পর তিনি আবার কফরনাহুমে এলেন। শোনা গেলো যে, তিনি ঘরে আছেন। (২)তখন এতো লোক সেখানে জড়ো হলো যে, ঘর তো দূরের কথা, দরজার বাইরেও কোনো জায়গা রইলো না। আর তিনি তাদের কাছে কালাম প্রচার করতে লাগলেন। (৩)এমন সময় কিছু লোক চার ব্যক্তিকে দিয়ে এক অবশরোগীকে তাঁর কাছে নিয়ে আসছিলো। (৪)কিন্তু ভিড়ের কারণে তারা যখন তাকে হযরত ইসা আ.-র কাছে নিয়ে যেতে পারলো না, তখন তিনি যেখানে ছিলেন, ঠিক তার ওপরের ছাদের কিছু অংশ তারা সরিয়ে ফেললো। অতঃপর সেই খোলা জায়গা দিয়ে বিছানাসহ সেই অবশরোগীকে নিচে নামিয়ে দিলো।
(৫)হযরত ইসা আ. তাদের ইমান দেখে সেই অবশরোগীকে বললেন, “বাছা, তোমার গুনাহ মাফ করা হলো।” (৬)সেখানে কয়েকজন আলিম বসে ছিলেন। তারা মনে মনে ভাবছিলেন, (৭)“লোকটি এরকম কথা বলছে কেনো? সে তো কুফরি করছে! এক আল্লাহ ছাড়া আর কে গুনাহ মাফ করতে পারে?”
(৮)তারা যে এসব কথা ভাবছেন তা হযরত ইসা আ. নিজের অন্তরে তখনই বুঝতে পারলেন এবং তাদের বললেন, “কেনো তোমরা মনে মনে ওসব কথা ভাবছো? (৯)এই অবশরোগীকে কোনটি বলা সহজ, ‘তোমার গুনাহ মাফ করা হলো,’ নাকি ‘ওঠো, তোমার বিছানা তুলে নিয়ে হেঁটে বেড়াও’? (১০)কিন্তু তোমরা যেনো জানতে পারো যে, দুনিয়াতে গুনাহ মাফ করার ক্ষমতা ইবনুল-ইনসানের আছে।”- এই পর্যন্ত বলে তিনি সেই অবশরোগীকে বললেন, (১১)“আমি তোমাকে বলছি, ওঠো, তোমার বিছানা তুলে নিয়ে বাড়ি চলে যাও।” (১২)সে উঠলো এবং তখনই তার বিছানা তুলে নিয়ে সকলের সামনে দিয়ে বাইরে চলে গেলো। এতে সকলে অবাক হয়ে বললো, ‘‘সুবহান আল্লাহ, আমরা কখনো এরকম দেখিনি!”
(১৩)অতঃপর হযরত ইসা আ. আবার লেকের পাড়ে গেলেন। তখন অনেক লোক তাঁর কাছে এলো আর তিনি তাদের শিক্ষা দিলেন।
(১৪)তিনি যেতে যেতে দেখলেন, হযরত লেবি ইবনে আলফিয়াস কর আদায় করার ঘরে বসে আছেন। তিনি তাকে বললেন, “আমাকে অনুসরণ করো।” এতে তিনি উঠে তাঁকে অনুসরণ করলেন।
(১৫)তারপর তিনি যখন হযরত লেবি রা.-র বাড়িতে খেতে বসলেন, তখন অনেক কর-আদায়কারী এবং গুনাহগারও হযরত ইসা আ. ও তাঁর উম্মতদের সাথে বসলেন, কারণ তারা ছিলেন অনেক এবং তারা তাঁর পেছনে পেছনে যাচ্ছিলেন। (১৬)ফরিসিদের আলিমরা যখন দেখলেন, তিনি কর-আদায়কারী ও গুনাহগারদের সাথে খাচ্ছেন, তখন তারা তাঁর উম্মতদেরকে বললেন, “উনি কর-আদায়কারী ও গুনাহগারদের সাথে খাওয়া-দাওয়া করেন কেনো?”
(১৭)একথা শুনে হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “সুস্থদের জন্য ডাক্তারের দরকার নেই কিন্তু অসুস্থদের জন্য দরকার আছে; আমি দীনদারদের নয় কিন্তু গুনাহগারদের ডাকতে এসেছি।”
(১৮)হযরত ইয়াহিয় আ. এর সাহাবি ও ফরিসিরা রোজা রেখেছিলেন। লোকেরা তাঁর কাছে এসে বললো, “হযরত ইয়াহিয় আ. এর সাহাবি ও ফরিসিদের অনুসারীরা রোজা রাখেন কিন্তু আপনার উম্মতেরা রাখেন না কেনো?” (১৯)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “বর সাথে থাকতে বিয়েতে আমন্ত্রিত লোকেরা রোজা রাখতে পারে কি? যতোদিন বর সাথে থাকে ততোদিন তারা রোজা রাখতে পারে না। (২০)কিন্তু সময় আসছে, যখন তাদের কাছ থেকে বরকে নিয়ে যাওয়া হবে আর তখন তারা রোজা রাখবে।
(২১)কেউ পুরোনো কাপড়ে নতুন কাপড়ের তালি দেয় না; যদি দেয় তাহলে সেই পুরোনো কাপড় থেকে নতুন তালিটি ছিঁড়ে আসে, তাতে সেই ছেঁড়া আরো বড়ো হয়। (২২)পুরোনো চামড়ার থলিতে কেউ টাটকা আঙুররস রাখে না; যদি রাখে, তাহলে টাটকা রসের দরুন থলি ফেটে গিয়ে রস ও থলি দুটোই নষ্ট হয় কিন্তু টাটকা রস নতুন থলিতেই রাখা হয়।”
(২৩)এক সাব্বাতে তিনি ফসলের মাঠ দিয়ে যাচ্ছিলেন। যেতে যেতে তাঁর উম্মতেরা শিষ ছিঁড়তে লাগলেন। (২৪)এতে ফরিসিরা তাঁকে বললেন, “দেখুন, সাব্বাতে যা করা উচিত নয়, ওরা তা করছে কেনো?” (২৫)তিনি তাদের বললেন, “যখন হযরত দাউদ আ. ও তার সঙ্গীরা ক্ষুধার্ত ছিলেন এবং তাদের খাবারের প্রয়োজন ছিলো, তখন হযরত দাউদ আ. যা করেছিলেন তা কি তোমরা কখনো পড়োনি? (২৬)প্রধান ইমাম হযরত অবিয়াথরের সময়ে তিনি আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করে আল্লাহর উদ্দেশে দান করা রুটি, যা ইমামদের ছাড়া অন্য কারো জন্য খাওয়া ঠিক নয়, তা খেয়েছিলেন এবং সঙ্গীদেরও দিয়েছিলেন।” (২৭)তিনি তাদের আরো বললেন, “মানুষের জন্যই সাব্বাতের সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু সাব্বাতের জন্য মানুষের সৃষ্টি হয়নি। (২৮)সুতরাং ইবনুল-ইনসান সাব্বাতেরও মালিক।”
(১)তিনি আবার সিনাগোগে গেলেন। সেখানে এক লোক ছিলো, যার একটি হাত শুকিয়ে গিয়েছিলো।
(২)সাব্বাতে তিনি লোকটিকে সুস্থ করেন কিনা তা দেখার জন্য ফরিসিরা তাঁর ওপর ভালো করে নজর রাখতে লাগলেন, যেনো তারা তাঁকে দোষ দিতে পারেন। (৩)তখন তিনি যার হাত শুকিয়ে গিয়েছিলো, সেই লোকটিকে বললেন, “সামনে এসো।”
(৪)অতঃপর তিনি তাদের বললেন, “শরিয়ত অনুসারে সাব্বাতে ভালো কাজ না খারাপ কাজ করা উচিত? প্রাণ রক্ষা করা না নষ্ট করা উচিত?” (৫)কিন্তু তারা চুপ করে থাকলেন। তখন তাদের অন্তরের কঠিনতার জন্য তিনি গভীরভাবে দুঃখিত হলেন এবং রাগের সাথে তাদের দিকে তাকিয়ে দেখলেন ও সেই লোকটিকে বললেন, “তোমার হাত বাড়িয়ে দাও।” (৬)সে হাত বাড়িয়ে দিলো এবং তার হাত সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেলো। ফরিসিরা বেরিয়ে গেলেন এবং কীভাবে তাঁকে ধ্বংস করা যায়, সে-বিষয়ে তখনই হেরোদের লোকদের সাথে পরামর্শ করতে লাগলেন।
(৭)হযরত ইসা আ. তাদের ছেড়ে সাহাবিদেরকে সাথে নিয়ে লেকের পাড়ে চলে গেলেন। গালিলের বিরাট একদল লোক তাঁর পেছনে পেছনে চললো। (৮)তিনি যা-কিছু করছিলেন তার সবকিছু শুনে ইহুদিয়া, জেরুসালেম, ইদোম, জর্দানের ওপার এবং টায়ার ও সিডন শহরের চারদিক থেকে অনেক লোক তাঁর কাছে এলো। (৯)তিনি সাহাবিদেরকে তাঁর জন্য একটি নৌকা প্রস্তুত রাখতে বললেন, যেনো ভিড়ের জন্য লোকেরা চাপাচাপি করে তাঁর ওপর না পড়ে। (১০)তিনি অনেক লোককে সুস্থ করেছিলেন বলে রোগীরা তাঁকে ছোঁয়ার জন্য ঠেলাঠেলি করে তাঁর গায়ের ওপর পড়ছিলো। (১১)ভূতেরা যখনই তাঁকে দেখতো, তখনই তাঁর সামনে মাটিতে পড়ে চিৎকার করে বলতো, “আপনিই আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন।” (১২)কিন্তু তিনি খুব কড়াভাবে তাদের হুকুম দিতেন, যেনো তারা তাঁর পরিচয় না দেয়।
(১৩)তিনি পাহাড়ের ওপর উঠলেন এবং নিজের ইচ্ছামতো কিছু লোককে তাঁর কাছে ডাকলেন। এতে তারা তাঁর কাছে এলেন। (১৪)অতঃপর তিনি বারোজনকে হাওয়ারি পদে নিযুক্ত করলেন, যেনো তারা তাঁর সাথে সাথে থাকেন ও (১৫)ভূত ছাড়ানোর ক্ষমতা পান এবং তিনি তাদের প্রচার করতে পাঠাতে পারেন। (১৬)যে-বারোজনকে তিনি নিযুক্ত করেছিলেন, তারা হলেন- হযরত সাফওয়ান রা., যার নাম তিনি দিলেন পিতর; (১৭)হযরত ইয়াকুব ইবনে জাবিদি রা. ও তার ভাই হযরত ইউহোন্না রা.- এদের নাম তিনি দিলেন বোয়ানের্গেস অর্থাৎ বাজের শব্দের পুত্রেরা- (১৮)হযরত আন্দ্রিয়ান রা., হযরত ফিলিপ রা., হযরত বর্থলময় রা., হযরত মথি রা., হযরত থোমা রা., হযরত ইয়াকুব ইবনে আলফিয়াস রা., হযরত থদ্দেয় রা., দেশপ্রেমিক হযরত সিমোন রা. এবং (১৯)হযরত ইহুদা ইস্কারিয়োত রা.- যিনি হযরত ইসা আ. এর সাথে বেইমানি করেছিলেন।
(২০)পরে হযরত ইসা আ. একটি ঘরে গেলে আবার এতো লোক একত্রিত হলো যে, তারা কিছু খেতেও পারলেন না। (২১)যখন তাঁর পরিবারের লোকেরা এ-খবর শুনলেন, তখন তারা তাঁকে নিয়ে যেতে এলেন; কারণ তারা বললেন, “ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।” (২২)আর জেরুসালেম থেকে যে-আলিমরা এসেছিলেন, তারা বললেন, “ওকে বেলসবুলে পেয়েছে, আর ভূতদের রাজার সাহায্যেই ও ভূত ছাড়ায়।”
(২৩)তিনি সেই আলিমদের নিজের কাছে ডাকলেন এবং দৃষ্টান্তের মাধ্যমে তাদের বললেন, “শয়তান কেমন করে শয়তানকে তাড়াতে পারে? (২৪)কোনো রাজ্য যদি নিজের বিরুদ্ধে ভাগ হয়ে যায়, তাহলে তা আর টিকে থাকতে পারে না;
(২৫)এবং কোনো পরিবার যদি নিজের বিরুদ্ধে ভাগ হয়ে যায়, তাহলে সেই পরিবারও টিকতে পারে না। (২৬)একইভাবে শয়তানও যদি নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় ও ভাগ হয়ে যায়, তাহলে সেও টিকতে পারে না এবং সেখানেই তার শেষ হয়। (২৭)একজন বলবানকে প্রথমে বেঁধে না রেখে কেউই তার ঘরে ঢুকে জিনিসপত্র লুট করতে পারে না; তাকে বাঁধার পর সে তার ঘর লুট করতে পারবে।
(২৮)আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, মানুষের সব গুনা এবং কুফরি ক্ষমা করা হবে (২৯)কিন্তু আল্লাহর রুহের বিরুদ্ধে কুফরি কখনোই ক্ষমা করা হবে না; নিশ্চয়ই সে জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত।” (৩০)কারণ তারা বলেছিলেন, “ওকে ভূতে পেয়েছে।”
(৩১)তাঁর মা ও ভাইয়েরা সেখানে এলেন এবং বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁকে ডেকে পাঠালেন। (৩২)তাঁর চারপাশে তখন অনেক লোক বসে ছিলো। তারা তাঁকে বললো, “আপনার মা, ভাইয়েরা এবং বোনেরা বাইরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।” (৩৩)তিনি তাদের বললেন, “কে আমার মা আর কারা আমার ভাই?” (৩৪)যারা তাঁকে ঘিরে বসে ছিলো, তিনি তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই তো আমার মা ও ভাইয়েরা! (৩৫)যারা আল্লাহর ইচ্ছা পালন করে তারাই আমার ভাই, বোন ও মা।”
(১)তিনি আবার গালিল লেকের ধারে লোকদের শিক্ষা দিতে লাগলেন। তাঁর চারদিকে অনেক লোকের ভিড় হলো। সেজন্য তিনি লেকে ভাসমান একটি নৌকায় উঠে বসলেন আর লোকেরা পাড়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
(২)তিনি দৃষ্টান্তের মধ্যদিয়ে অনেক বিষয়ে তাদের শিক্ষা দিতে লাগলেন। তিনি তাঁর শিক্ষায় বললেন, (৩)“কোনো এক চাষী বীজ বুনতে গেলো। (৪)বীজ বোনার সময় কতকগুলো বীজ পথের পাশে পড়লো আর পাখিরা এসে তা খেয়ে ফেললো। (৫)কতকগুলো বীজ পাথুরে জমিতে পড়লো। সেখানে বেশি মাটি ছিলো না। মাটি গভীর ছিলো না বলে তাড়াতাড়ি চারা গজিয়ে উঠলো। (৬)সূর্য ওঠার পর সেগুলো পুড়ে গেলো এবং শেকড় ভালো করে বসেনি বলে শুকিয়ে গেলো। (৭)কতকগুলো বীজ কাঁটাবনের মধ্যে পড়লো। কাঁটাগাছ বেড়ে উঠে চারাগুলো চেপে রাখলো। সেজন্য তাতে ফল ধরলো না। (৮)অন্যগুলো ভালো জমিতে পড়লো এবং চারা গজিয়ে বেড়ে উঠলো ও ফল দিলো- কোনোটিতে তিরিশ গুণ, কোনোটিতে ষাট গুণ আবার কোনোটিতে একশো গুণ।” (৯)অতঃপর তিনি বললেন, “যার শোনার কান আছে, সে শুনুক।”
(১০)যখন তিনি একা ছিলেন, তখন সেই বারোজনের সাথে তাঁর চারপাশের লোকেরা তাঁর কাছে এই দৃষ্টান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলেন।
(১১)তিনি তাদের বললেন, “আল্লাহর রাজ্যের গোপন সত্য তোমাদেরই জানতে দেয়া হয়েছে কিন্তু বাইরের লোকদের কাছে দৃষ্টান্তের মধ্যদিয়ে সমস্ত কথা বলা হয়; (১২)এজন্য যে, ‘যেনো তারা তাকিয়েও দেখতে না পায় এবং শুনেও বুঝতে না পারে; তা না হলে হয়তো তারা আল্লাহর দিকে ফিরবে এবং ক্ষমা পাবে।’”
(১৩)তিনি তাদের আরো বললেন, “তোমরা কি এই দৃষ্টান্তের মানে বুঝলে না? তাহলে কেমন করে অন্য সমস্ত দৃষ্টান্তের মানে বুঝবে? (১৪)চাষী কালাম বোনে। (১৫)পথের পাশে পড়া বীজের মধ্যদিয়ে তাদের সম্বন্ধেই বলা হয়েছে, যারা সেই কালাম শোনে কিন্তু শয়তান তখনই এসে তাদের অন্তরে যে-কালাম বোনা হয়েছিলো তা নিয়ে যায়। (১৬)পাথুরে জমিতে পড়া বীজের মধ্যদিয়ে তাদের সম্বন্ধেই বলা হয়েছে, যারা সেই কালাম শুনে তখনই আনন্দের সাথে গ্রহণ করে। (১৭)কিন্তু তাদের মধ্যে শেকড় ভালো করে বসে না বলে অল্পদিনের জন্য তারা স্থির থাকে। পরে কালামের জন্য যখন কষ্ট এবং অত্যাচার আসে, তখনই তারা পিছিয়ে যায়। (১৮)কাঁটাবনের মধ্যে পড়া বীজের মধ্যদিয়ে তাদের সম্বন্ধেই বলা হয়েছে, যারা সেই কালাম শোনে (১৯)কিন্তু সংসারের চিন্তা-ভাবনা, ধন-সম্পত্তির মায়া এবং অন্যান্য জিনিসের লোভ এসে সেই কালামকে চেপে রাখে, সেজন্য তাতে কোনো ফল ধরে না। (২০)আর ভালো জমিতে বোনা বীজের মধ্যদিয়ে তাদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে, যারা সেই কালাম শোনে ও গ্রহণ করে এবং ফল দেয়- কোনোটি দেয় তিরিশ গুণ, কোনোটি দেয় ষাট গুণ আবার কোনোটি দেয় একশো গুণ।”
(২১)তিনি তাদের বললেন, “কেউ কি বাতি নিয়ে ঝুড়ি বা খাটের নিচে রাখে? সে কি তা বাতিদানির ওপর রাখে না? (২২)কোনো জিনিস যদি লুকোনো থাকে, তাহলে তা প্রকাশিত হবার জন্যই; আবার কোনো জিনিস যদি ঢাকা থাকে, তাহলে তা খোলার জন্যই। (২৩)যার শোনার কান আছে, সে শুনুক।” (২৪)তিনি তাদের আরো বললেন, “তোমরা যা শুনছো, সে-বিষয়ে মনোযোগ দাও। তোমরা যেভাবে মেপে দাও, তোমাদের জন্য সেভাবেই মাপা হবে; এমনকি বেশি করেই মাপা হবে। (২৫)যার আছে, তাকে আরো দেয়া হবে; কিন্তু যার নেই, তার যা আছে, তাও তার কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হবে।”
(২৬)তিনি আরো বললেন, “আল্লাহর রাজ্য এরকম- এক লোক জমিতে বীজ বুনলো। (২৭)পরে সে রাতদিন ঘুমোলো ও জাগলো। এর মধ্যে সেই বীজ থেকে চারা গজিয়ে বড়ো হলো। কীভাবে হলো তা সে জানলো না। (২৮)জমি নিজে নিজেই ফল জন্মালো- প্রথমে চারা, পরে শিষ এবং শিষের মাথায় পরিপূর্ণ দানা। (২৯)কিন্তু ফসল পাকলেই সে কাস্তে লাগালো, কারণ ফসল কাটার সময় হয়েছে।”
(৩০)তিনি আরো বললেন, “কীসের সাথে আমরা আল্লাহর রাজ্যের তুলনা করবো? বা কোন দৃষ্টান্তের মধ্যদিয়ে তা বোঝাবো? (৩১)এটি একটি সরিষার মতো; জমিতে বোনার সময় দেখা যায় যে, তা পৃথিবীর সমস্ত বীজের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো।
(৩২)কিন্তু বোনার পরে যখন গজায় ও বেড়ে ওঠে, তখন সমস্ত শাক-সবজির মধ্যে ওটা সবচেয়ে বড়ো হয়। আর এমন বড়ো বড়ো ডাল বের হয় যে, পাখিরাও তার ছায়ায় বাসা বাঁধে।”
(৩৩)তাদের শোনার শক্তি অনুসারে এরকম আরো অনেক দৃষ্টান্তের মধ্যদিয়ে তিনি তাদের কাছে কালাম বলতেন। (৩৪)দৃষ্টান্ত ছাড়া তিনি তাদের সাথে কথা বলতেন না কিন্তু হাওয়ারিরা যখন তাঁর সাথে একা থাকতেন, তখন তিনি সবকিছু তাদের বুঝিয়ে দিতেন।
(৩৫)ওই দিন সন্ধ্যাবেলায় তিনি তাদের বললেন, “চলো, আমরা লেকের ওপারে যাই।” (৩৬)এবং তারা লোকদের ছেড়ে, তিনি যে-নৌকায় ছিলেন, সেই নৌকায় করে, তাঁকে নিয়ে চললেন। (৩৭)অবশ্য তাদের সাথে আরো নৌকা ছিলো। তখন একটি ভীষণ ঝড় উঠলো এবং ঢেউগুলো নৌকার ওপর এমনভাবে আছড়ে পড়লো যে, নৌকা পানিতে ভরে উঠতে লাগলো। (৩৮)কিন্তু তিনি নৌকার পেছন দিকে একটি বালিশের ওপর মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিলেন। তারা তাঁকে জাগিয়ে বললেন, “হুজুর, আমরা যে মারা পড়ছি, সেদিকে কি আপনার খেয়াল নেই?” (৩৯)তিনি উঠে বাতাসকে ধমক দিলেন এবং লেকের পানিকে বললেন, “থামো, শান্ত হও!” তাতে বাতাস থেমে গেলো ও সবকিছু খুব শান্ত হয়ে গেলো। (৪০)তিনি তাদের বললেন, “তোমরা কেনো ভয় পাও? এখনো কি তোমাদের ইমান নেই?” (৪১)এতে তারা ভীষণ ভয় পেলেন এবং নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন, “ইনি কে যে, বাতাস এবং লেকও তাঁর কথা মানে?””
(১)তারা লেক পার হয়ে গেরাসেনিদের এলাকায় গেলেন। (২)তিনি নৌকা থেকে নামার সাথে সাথেই ভূতে পাওয়া এক লোক গোরস্থান থেকে বের হয়ে তাঁর সামনে এলো। (৩)লোকটি গোরস্থানেই থাকতো এবং কেউ তাকে শেকল দিয়েও বেঁধে রাখতে পারতো না। (৪)তাকে প্রায়ই শেকল ও বেড়ি দিয়ে বাঁধা হতো কিন্তু সে শেকল ছিঁড়ে ফেলতো এবং বেড়ি ভেঙে ফেলতো। তাকে সামলানোর ক্ষমতা কারো ছিলো না। (৫)সে রাতদিন কবরে কবরে ও পাহাড়ে পাহাড়ে চিৎকার করে বেড়াতো এবং পাথর দিয়ে নিজেই নিজেকে আঘাত করতো।
(৬)হযরত ইসা আ.-কে দূর থেকে দেখে সে দৌঁড়ে এসে তাঁর পায়ের ওপর উবুড় হয়ে পড়লো আর চিৎকার করে বললো, (৭)“হে ইসা, সর্বশক্তিমান আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন! আমার সাথে আপনার কী? আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আপনি আমাকে কষ্ট দেবেন না।”
(৮)সে একথা বললো, কারণ তিনি তাকে বলেছিলেন, “ভূত, এই লোকটির ভেতর থেকে বেরিয়ে যাও!” (৯)অতঃপর হযরত ইসা আ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী?” (১০)সে বললো, “আমার নাম ‘বাহিনী’, কারণ আমরা অনেকে আছি।” এরপর সে তাঁকে বারবার কাকুতি-মিনতি করে বললো, যেনো তিনি ওই এলাকা থেকে তাদের তাড়িয়ে না দেন।
(১১)ওই সময় সেই জায়গায় পাহাড়ের গায়ে খুব বড়ো একপাল শূকর চরছিলো।
(১২)ভূতেরা তাঁকে কাকুতি-মিনতি করে বললো, “ওই শূকরপালের মধ্যে আমাদের পাঠিয়ে দিন, যেনো আমরা ওদের ভেতর ঢুকতে পারি।” (১৩)সুতরাং তিনি তাদের অনুমতি দিলেন এবং ভূতেরা বের হয়ে শূকরগুলোর মধ্যে ঢুকে গেলো। এতে সমস্ত শূকর ঢালু পাড় দিয়ে জোরে দৌড়ে গিয়ে লেকে পড়ে ডুবে মরলো। সেই পালে প্রায় দু’হাজার শূকর ছিলো।
(১৪)যারা শূকর চরাচ্ছিলো, তারা তখন দৌঁড়ে গিয়ে গ্রামে এবং খামারগুলোয় এ-খবর দিলো। তখন লোকেরা কী হয়েছে তা দেখতে এলো।
(১৫)তারা হযরত ইসা আ.-র কাছে এসে দেখলো, যে-লোকটিকে অনেকগুলো ভূতে পেয়েছিলো, সে কাপড়-চোপড় পরে সুস্থ মনে বসে আছে। এটি দেখে তারা ভয় পেলো।
(১৬)এ-ঘটনা যারা দেখেছিলো, তারা সেই ভূতে পাওয়া লোকটির ও সেই শূকরগুলোর বিষয়ে লোকদের জানালো। ১৭অতঃপর তারা হযরত ইসা আ.-কে অনুরোধ করতে লাগলো, যেনো তিনি তাদের এলাকা ছেড়ে চলে যান।
(১৮)তিনি যখন নৌকায় উঠছিলেন, যাকে ভূতে পেয়েছিলো, সেই লোকটি তখন তাঁর সাথে যাবার জন্য কাকুতি-মিনতি করতে লাগলো। (১৯)কিন্তু হযরত ইসা আ. তাকে একথা বলে বিদায় করলেন, “তুমি তোমার বাড়িতে আপনজনদের কাছে ফিরে যাও এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তোমার জন্য যে-মহৎ কাজ ও তোমার প্রতি যে-রহমত করেছেন তা তাদের জানাও।” (২০)সে তখন চলে গেলো এবং হযরত ইসা আ. তার জন্য যা-কিছু করেছেন তা দিকাপলি এলাকায় বলে বেড়াতে লাগলো। এতে সকলে আশ্চর্য হলো।
(২১)হযরত ইসা আ. যখন নৌকায় করে আবার লেকের অন্য পাড়ে গেলেন, তখন অনেক লোক এসে তাঁর চারপাশে ভিড় করলো। তিনি তখনো লেকের পাড়ে ছিলেন। (২২)সেই সময় জায়ির নামে সিনাগোগের এক নেতা সেখানে এলেন। তাঁকে দেখে তিনি তাঁর পায়ের ওপর উবুড় হয়ে পড়লেন এবং (২৩)অনেক কাকুতি-মিনতি করে বললেন, “আমার মেয়েটি মারা যাবার মতো হয়েছে। আপনি এসে তার ওপর আপনার হাত রাখুন, তাহলে সে সুস্থ হয়ে উঠবে এবং বাঁচবে।”
(২৪)সুতরাং তিনি তার সাথে চললেন। অনেক লোক তাঁর সাথে সাথে যাচ্ছিলো এবং তাঁর চারপাশে ঠেলাঠেলি করছিলো। (২৫)সেই ভিড়ের মধ্যে এক মহিলা ছিলো, যে বারো বছর ধরে রক্তস্রাবে ভুগছিলো। (২৬)অনেক ডাক্তারের হাতে সে অনেক কষ্ট পেয়েছিলো আর তার যা-কিছু ছিলো, সবই সে খরচ করেছিলো; কিন্তু ভালো হওয়ার বদলে দিন দিন তার অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছিলো।
(২৭)হযরত ইসা আ. এর বিষয়ে শুনে সে ভিড়ের মধ্যেই তাঁর ঠিক পেছনে এসে তাঁর চাদরটি ছুঁলো। (২৮)কারণ সে বলছিলো,“যদি আমি তাঁর চাদরও ছুঁতে পারি, তাহলেই আমি সুস্থ হয়ে যাবো।” (২৯)সাথে সাথেই তার রক্তস্রাব বন্ধ হলো এবং সে তার নিজের শরীরের মধ্যেই বুঝতে পারলো যে, তার অসুখ ভালো হয়ে গেছে।
(৩০)হযরত ইসা আ. তখনই বুঝলেন যে, তাঁর ভেতর থেকে শক্তি বের হয়েছে। সুতরাং তিনি ভিড়ের চারদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কে আমার চাদর ছুঁলো?”
(৩১)তাঁর হাওয়ারিরা তাঁকে বললেন, “আপনি তো দেখছেন, লোকেরা আপনার চারপাশে ঠেলাঠেলি করছে, তবুও আপনি বলছেন, ‘কে আমাকে ছুঁলো’?” (৩২)একাজ কে করেছে তা দেখার জন্য তবুও তিনি চারদিকে তাকাতে লাগলেন। (৩৩)সেই মহিলা তার যা হয়েছে তা বুঝতে পেরে কাঁপতে কাঁপতে এসে তাঁর পায়ে পড়লো এবং সমস্ত সত্য ঘটনা জানালো। (৩৪)তিনি তাকে বললেন, “শোনো মা, তোমার ইমান তোমাকে সুস্থ করেছে, শান্তিতে চলে যাও এবং এই রোগ থেকে মুক্ত থাকো।”
(৩৫)তখনো তিনি কথা বলছেন, এমন সময় সেই নেতার বাড়ি থেকে লোকেরা এসে বললো, “আপনার মেয়েটি মারা গেছে। হুজুরকে আর কেনো কষ্ট দিচ্ছেন?” (৩৬)তাদের কথা শুনে হযরত ইসা আ. সিনাগোগের নেতাকে বললেন, “ভয় করো না, কেবল বিশ্বাস করো।” (৩৭)তিনি কেবল হযরত পিতর রা., হযরত ইয়াকুব রা. ও হযরত ইয়াকুব রা.-র ভাই হযরত ইউহোন্না রা.কে তাঁর সাথে নিলেন। অতঃপর সিনাগোগের নেতার বাড়িতে এসে তিনি দেখলেন, খুব কোলাহল হচ্ছে। (৩৮)লোকেরা জোরে জোরে কান্নাকাটি ও মাতম করছে।
(৩৯)ভেতরে গিয়ে তিনি তাদের বললেন, “তোমরা কেনো কোলাহল ও কান্নাকাটি করছো? মেয়েটি মরেনি, ঘুমাচ্ছে।” (৪০)একথা শুনে তারা হাসাহাসি করতে লাগলো। তিনি তাদের সবাইকে বের করে দিলেন এবং মেয়েটির বাবা-মা ও তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে মেয়েটির ঘরে ঢুকলেন। (৪১)তিনি তার হাত ধরে বললেন, “টালিথা কুম!” অর্থাৎ “খুকি, ওঠো!” (৪২)আর তখনই মেয়েটি উঠে হেঁটে বেড়াতে লাগলো। এতে সবাই খুবই আশ্চর্য হলো। মেয়েটির বয়স ছিলো বারো বছর। (৪৩)তিনি তাদের কড়া হুকুম দিলেন, কেউ যেনো এটি না জানে এবং মেয়েটিকে কিছু খেতে দিতে বললেন।
(১)তিনি সেই জায়গা ছেড়ে নিজের গ্রামে গেলেন এবং তাঁর সাহাবিরাও তাঁর সাথে গেলেন। (২)সাব্বাতে তিনি সিনাগোগে গিয়ে শিক্ষা দিতে লাগলেন। অনেক লোক তাঁর কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে বলতে লাগলো, “এই লোক কোথা থেকে এসব শিক্ষা পেলো? এই যে-জ্ঞান তাকে দেয়া হয়েছে তা-ই বা কী? সে মোজেজাও দেখাচ্ছে! (৩)এ কি সেই কাঠমিস্ত্রি, মরিয়মের ছেলে, নয়? হযরত ইয়াকুব র., হযরত জোসি র., হযরত ইহুদা র. ও হযরত সিমোন র. এর ভাই নয়? তার বোনেরা কি এখানে আমাদের মধ্যে নেই?” এভাবেই তাঁকে নিয়ে লোকেরা বাধা পেলো।
(৪)তখন হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “নিজের গ্রাম, নিজের আত্মীয়-স্বজন ও নিজের বাড়ি ছাড়া আর সব জায়গাতেই নবিরা সম্মান পান।” (৫)তিনি সেখানে কয়েকজন অসুস্থের ওপর হাত রেখে তাদের সুস্থ করা ছাড়া আর কোনো মোজেজা দেখাতে পারলেন না। (৬)লোকেরা তাঁর ওপর ইমান আনলো না দেখে তিনি খুব আশ্চর্য হলেন এবং গ্রামে গ্রামে গিয়ে শিক্ষা দিতে লাগলেন।
(৭)অতঃপর তিনি সেই বারোজনকে নিজের কাছে ডাকলেন এবং প্রচার করার জন্য দু’জন দু’জন করে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি তাদের ক্ষমতা দিলেন ভূতদের ওপর। (৮)তিনি তাদের এই হুকুম দিলেন, তারা যেনো যাত্রাপথের জন্য একটি লাঠি ছাড়া আর কিছুই না নেন; এমনকি রুটি, থলি, টাকা-পয়সাও না। (৯)তিনি তাদের জুতা পরতে বললেন বটে কিন্তু একটির বেশি দুটো জামা পরতে নিষেধ করলেন। (১০)তিনি তাদের বললেন, “তোমরা যেখানে যে-বাড়িতে ঢুকবে, সেই জায়গা ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত সেই বাড়িতেই থেকো। (১১)কোনো জায়গায় লোকেরা যদি তোমাদের গ্রহণ না করে এবং তোমাদের কথা না শোনে, তবে সেই জায়গা ছেড়ে চলে যাবার সময় তোমাদের পায়ের ধুলো ঝেড়ে ফেলো, যেনো সেটিই তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়।”
(১২)সুতরাং তারা গিয়ে প্রচার করতে লাগলেন যেনো লোকেরা তওবা করে। (১৩)তারা অনেক ভূত ছাড়ালেন এবং অনেক অসুস্থ লোকের মাথায় তেল দিয়ে সুস্থ করলেন।
(১৪)হযরত ইসা আ. এর সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো বলে বাদশা হেরোদও তাঁর কথা শুনতে পেলেন। কোনো কোনো লোক বলছিলো, “উনিই সেই নবি হযরত ইয়াহিয়া আ.। তিনি মৃত থেকে জীবিত হয়ে উঠেছেন বলেই এসব মোজেজা দেখাচ্ছেন।” (১৫)কিন্তু অন্যরা বলছিলো, “উনি হযরত ইলিয়াস আ.” এবং কেউ কেউ বলছিলো, “অনেকদিন আগেকার নবিদের মতো উনিও একজন নবি।”
(১৬)এসব কথা শুনে হেরোদ বললেন, “আমি যে-ইয়াহিয়ার মাথা কেটে ফেলেছিলাম, তিনি আবার বেঁচে উঠেছেন।” (১৭)হেরোদ লোক পাঠিয়ে হযরত ইয়াহিয়া আ.কে বন্দি করেছিলেন এবং তাকে বেঁধে জেলে রেখেছিলেন। (১৮)তিনি তার ভাই ফিলিপের স্ত্রী হেরোদিয়ার জন্যই এটি করেছিলেন, কারণ তিনি হেরোদিয়াকে বিয়ে করেছিলেন। হযরত ইয়াহিয়া আ. হেরোদকে বলতেন, “আপনার ভাইয়ের স্ত্রীকে বিয়ে করা শরিয়ত-সম্মত হয়নি।” (১৯)এজন্য হযরত ইয়াহিয়া আ.-র ওপর হেরোদিয়ার খুব রাগ ছিলো। তিনি তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন কিন্তু পারছিলেন না। (২০)হযরত ইয়াহিয়া আ. যে একজন দীনদার ও পবিত্র-লোক, হেরোদ তা জানতেন বলে তাকে ভয় করতেন এবং তাকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতেন। হযরত ইয়াহিয়া আ. এর কথা শোনার সময় মনে খুব অস্বস্তি বোধ করলেও হেরোদ তার কথা শুনতে ভালোবাসতেন।
(২১)অবশেষে সেই সুযোগ এলো। হেরোদ নিজের জন্মদিনে তার বড়ো বড়ো রাজকর্মচারী, সেনাপতি ও গালিলের প্রধান প্রধান লোকদের জন্য ভোজের আয়োজন করলেন। (২২)হেরোদিয়ার মেয়ে সেই ভোজসভায় এসে নাচ দেখিয়ে হেরোদ ও তার মেহমানদের সন্তুষ্ট করলো। তখন বাদশা মেয়েটিকে বললেন, “তুমি যা চাবে, আমি তোমাকে তা-ই দেবো।” (২৩)তিনি তাকে শপথ করে বললেন, “তুমি আমার কাছে যা-কিছু চাবে, আমি তোমাকে তা-ই দেবো; এমনকি আমার রাজ্যের অর্ধেক পর্যন্ত হলেও দেবো!”
(২৪)সে বাইরে গিয়ে তার মাকে বললো, “আমি কী চাবো?” তিনি বললেন, “ইয়াহিয়ার মাথা।”
(২৫)সে তখনই গিয়ে বাদশাকে বললো, “আমার ইচ্ছা এই যে, আপনি এখনই একটি থালায় করে আমাকে ইয়াহিয়ার মাথা এনে দিন।” (২৬)বাদশা খুব দুঃখিত হলেন কিন্তু ভোজে যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের সামনে কসম খেয়েছিলেন বলে মেয়েটিকে ফিরিয়ে দিতে চাইলেন না। (২৭)বাদশা তখনই ইয়াহিয়ার মাথা কেটে আনার জন্য একজন জল্লাদকে হুকুম দিলেন। (২৮)সে জেলখানায় গিয়ে তার মাথা কেটে ফেললো এবং থালায় করে এনে মেয়েটিকে দিলো; (২৯)আর মেয়েটি তা নিয়ে গিয়ে তার মাকে দিলো। এই খবর পেয়ে তার সাহাবিরা এসে তাঁর দেহমোবারক নিয়ে গিয়ে দাফন করলেন।
(৩০)হাওয়ারিরা হযরত ইসা আ. এর কাছে ফিরে এলেন এবং তারা যা যা করেছেন ও শিক্ষা দিয়েছেন, তার সবই তাঁকে জানালেন। (৩১)সেই সময় অনেক লোক সেখানে আসা-যাওয়া করছিলো বলে তারা কিছু খাবার সুযোগ পেলেন না। সেজন্য তিনি তাদের বললেন, “তোমরা কোনো একটি নির্জন জায়গায় এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করো।”
(৩২)তখন তারা নৌকায় করে একটি নির্জন জায়গার উদ্দেশে রওনা দিলেন। (৩৩)তাদের যেতে দেখে অনেকেই তাদের চিনতে পারলো; এবং আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে দৌঁড়ে গিয়ে তাদের আগেই সেখানে উপস্থিত হলো। (৩৪)তিনি নৌকা থেকে নেমে অনেক লোক দেখতে পেলেন। তাদের জন্য তাঁর খুব মমতা হলো, কারণ তাদের অবস্থা রাখালহীন ভেড়ার মতো ছিলো। তিনি তাদের অনেক বিষয়ে শিক্ষা দিতে লাগলেন।
(৩৫)দিনের শেষে হাওয়ারিরা এসে তাঁকে বললেন, “জায়গাটি নির্জন, বেলাও প্রায় ডুবে গেছে; (৩৬)এদের বিদায় দিন, যেনো এরা আশেপাশের পাড়া ও গ্রামগুলোতে গিয়ে নিজেদের জন্য কিছু খাবার কিনতে পারে।” (৩৭)কিন্তু তিনি তাদের উত্তর দিলেন, “তোমরাই ওদের কিছু খেতে দাও।” তারা তাঁকে বললেন, “আমরা কি দুশো দিনারের রুটি কিনে এনে এদের খাওয়াবো?” (৩৮)তিনি তাদের বললেন, “তোমাদের কাছে ক’টি রুটি আছে? গিয়ে দেখো।” তারা দেখে এসে বললেন, “পাঁচটি এবং দুটো মাছ।”
(৩৯)তখন প্রত্যেককে সবুজ ঘাসের ওপর সারি সারি বসিয়ে দেবার জন্য তিনি তাদের হুকুম দিলেন। (৪০)সুতরাং লোকেরা একশো একশো ও পঞ্চাশ পঞ্চাশজন করে সারি সারি বসে গেলো। (৪১)তিনি সেই পাঁচটি রুটি আর দুটো মাছ নিয়ে আসমানের দিকে তাকিয়ে শুকরিয়া জানালেন আর লোকদের দেবার জন্য রুটি ভেঙে হাওয়ারিদের হাতে দিলেন। (৪২)তিনি সকলকে মাছ দুটোও ভাগ করে দিলেন। সকলে খেলো এবং সন্তুষ্ট হলো। (৪৩)তারা বাকি রুটি ও মাছের টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিয়ে বারোটি ঝুড়ি ভর্তি করলেন। (৪৪)যারা রুটি খেয়েছিলো, তাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ছিলো পাঁচ হাজার।
(৪৫)তখনই তিনি হাওয়ারিদেরকে তাগাদা দিলেন, যেনো তারা নৌকায় উঠে তাঁর আগে লেকের ওপারে বেতসাইদা গ্রামে যান। (৪৬)এদিকে তিনি লোকদের বিদায় করে মোনাজাত করার জন্য পাহাড়ে উঠে গেলেন।
(৪৭)সন্ধ্যায় হাওয়ারিদের নৌকাটি ছিলো লেকের মাঝখানে এবং তিনি একাই ডাঙায় ছিলেন। (৪৮)তিনি দেখলেন, হাওয়ারিরা খুব কষ্ট করে দাঁড় বাচ্ছেন, কারণ বাতাস তাদের উল্টো দিকে ছিলো। প্রায় শেষরাতের দিকে তিনি লেকের ওপর দিয়ে হেঁটে তাদের কাছে এলেন এবং তাদের ফেলে এগিয়ে যেতে চাইলেন। (৪৯)কিন্তু তারা তাঁকে পানির ওপর দিয়ে হাঁটতে দেখে ভূত মনে করে চিৎকার করে উঠলেন, (৫০)কারণ তাঁকে দেখে সকলেই ভয় পেয়েছিলেন। তখনই তিনি তাদের সাথে কথা বললেন। তিনি বললেন, “সাহস করো, এ তো আমি; ভয় করো না।” (৫১)তিনি তাদের নৌকায় ওঠার পর বাতাস থেমে গেলো। এতে তারা খুব আশ্চর্য হলেন; (৫২)কারণ রুটির ব্যাপারটি তারা বুঝতে পারেননি; তাদের মন কঠিন হয়ে ছিলো।
(৫৩)অতঃপর তারা লেক পার হয়ে গিনেসরত এলাকায় এসে নৌকা বাঁধলেন। (৫৪)নৌকা থেকে নামতেই লোকেরা তাঁকে চিনতে পারলো (৫৫)এবং এলাকার সমস্ত জায়গায় দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে লাগলো। তারপর তিনি কোথায় আছেন তা জেনে নিয়ে বিছানায় করে তাদের রোগীদের তাঁর কাছে বয়ে নিয়ে আসতে লাগলো।
(৫৬)মাঠে-ময়দানে, গ্রামে বা নগরে, যেখানেই তিনি গেলেন, সেখানকার লোকেরা রোগীদের এনে বাজারের মধ্যে জড়ো করলো। তারা তাঁকে কাকুতি-মিনতি করলো, যেনো তারা কেবল তাঁর চাদরের ঝালরটি ছুঁতে পারে। আর যারা ছুঁলো তারা সুস্থ হলো।
(১)কয়েকজন ফরিসি ও আলিম জেরুসালেম থেকে এসে তাঁর চারপাশে জড়ো হলেন। (২)তারা দেখলেন, কয়েকজন উম্মত হাত না ধুয়ে নাপাক অবস্থায় খেতে বসেছেন। (৩)ফরিসি ও ইহুদিরা বুজুর্গদের দেয়া যে-নিয়ম চলে আসছে, সেই নিয়ম অনুসারে হাত না ধুয়ে কিছুই খান না। (৪)বাজার থেকে এসে তারা গোসল না করে খান না। এবং তারা আরো অনেক নিয়ম পালন করে থাকেন, যেমন- থালাবাটি, হাঁড়িপাতিল, কড়াই, কলস, জগ, গ্লাস ইত্যাদি ধোয়া।
(৫)সেজন্য ফরিসি এবং আলিমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “বুজুর্গদের দেয়া যে-নিয়ম চলে আসছে, আপনার উম্মতেরা তা মেনে চলে না কেনো? তারা তো হাত না ধুয়েই খায়।” (৬)তিনি তাদের বললেন, “ভণ্ডের দল! আপনাদের বিষয়ে নবি হযরত ইসাইয়া আ. ঠিক কথাই বলেছেন, যেমন লেখা আছে- ‘এই লোকেরা মুখেই আমাকে সম্মান করে কিন্তু তাদের হৃদয় আমার কাছ থেকে দূরে থাকে। (৭)তারা মিথ্যাই আমার এবাদত করে। তাদের দেয়া শিক্ষা মানুষের তৈরি কতকগুলো নিয়ম মাত্র।’ (৮)আপনারা তো আল্লাহর দেয়া হুকুমগুলো বাদ দিয়ে মানুষের তৈরি নিয়ম পালন করছেন।”
(৯)অতঃপর তিনি তাদের বললেন, “আল্লাহর হুকুম বাদ দিয়ে নিজেদের চলতি নিয়ম পালন করার জন্য খুব ভালো উপায়ই আপনাদের জানা আছে! (১০)যেমন ধরুন, হযরত মুসা আ. বলেছেন, ‘বাবা-মাকে সম্মান করো’ এবং ‘যে বাবা-মাকে অভিশাপ দেয় তাকে হত্যা করা হোক’।
(১১)কিন্তু আপনারা বলে থাকেন, যদি কেউ তার মা কিংবা বাবাকে বলে, ‘আমার যে-জিনিস দিয়ে তোমার সাহায্য হতে পারতো তা কোরবান’ অর্থাৎ আল্লাহর উদ্দেশে কোরবানি করা হয়েছে, (১২)তাহলে তোমরা তাকে বাবা-মার জন্য আর কিছু করতে দাও না। (১৩)আপনারা আপনাদের তৈরি চলতি নিয়ম দিয়ে আল্লাহর কালাম বাতিল করছেন। এছাড়া আপনারা এরকম আরো অনেক কাজ করে থাকেন।”
(১৪)আবার তিনি লোকদের তাঁর কাছে ডেকে বললেন, “আপনারা সকলে আমার কথা শুনুন ও বুঝুন- (১৫)বাইরে থেকে যা মানুষের ভেতরে যায় তা মানুষকে নাপাক করতে পারে না, (১৬)বরং মানুষের ভেতর থেকে যা বেরিয়ে আসে তা-ই মানুষকে নাপাক করে।”
(১৭)তিনি যখন লোকদের ছেড়ে ঘরে ঢুকলেন, তখন হাওয়ারিরা এই দৃষ্টান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলেন। (১৮)তিনি তাদের বললেন, “তোমরাও কি এতোটা অবুঝ? তোমরা কি বোঝো না যে, বাইরে থেকে মানুষের ভেতরে যা ঢোকে তা তাকে নাপাক করতে পারে না? (১৯)কারণ তা তো তার হৃদয়ে ঢোকে না কিন্তু পেটে ঢোকে এবং পরে দেহ থেকে বেরিয়ে যায়।” এভাবে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে, সব খাবারই হালাল।
(২০)তিনি বললেন, “মানুষের ভেতর থেকে যা বেরিয়ে আসে তা-ই মানুষকে নাপাক করে। (২১)কারণ মানুষের ভেতর অর্থাৎ হৃদয় থেকেই কুচিন্তা, বেশ্যাবৃত্তি, চুরি, খুন, (২২)জিনা, লোভ, দুষ্টামি, ছলনা, লম্পটতা, কুদৃষ্টি, নিন্দা, অহঙ্কার এবং মূর্খতা বেরিয়ে আসে। ২৩এসব খারাপি মানুষের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসে এবং মানুষকে নাপাক করে।”
(২৪)অতঃপর তিনি সেই জায়গা ছেড়ে টায়ার এলাকায় গেলেন। তিনি একটি ঘরে ঢুকলেন। তিনি চেয়েছিলেন কেউ যেনো না জানে কিন্তু তিনি গোপন থাকতে পারলেন না।
(২৫)এক মহিলার মেয়েকে ভূতে পেয়েছিলো। সে তাঁর বিষয়ে শুনতে পেয়ে তখনই এসে তাঁর পায়ে পড়লো। মহিলাটি ছিলো গ্রিক এবং জন্মসূত্রে সুরফৈনিকি। (২৬)সে তাঁর কাছে কাকুতি-মিনতি করতে লাগলো, যেনো তিনি তার মেয়েটির ভূত ছাড়িয়ে দেন।
(২৭)তিনি তাকে বললেন, “আগে ছেলে-মেয়েরা পেট ভরে খাক; কেননা ছেলে-মেয়েদের খাবার নিয়ে কুকুরের সামনে ফেলা ভালো নয়।” (২৮)কিন্তু সেই মহিলা উত্তর দিলো, “হুজুর, ছেলে-মেয়েদের খাবারের যেসব টুকরো টেবিলের নিচে পড়ে তা তো কুকুরেই খায়।” (২৯)তিনি তাকে বললেন, “একথার জন্য, এখন যাও; ভূত তোমার মেয়েকে ছেড়ে গেছে।” (৩০)সে বাড়িতে ফিরে গিয়ে দেখলো যে, তার মেয়েটি বিছানায় শুয়ে আছে এবং ভূত তাকে ছেড়ে গেছে।
(৩১)অতঃপর তিনি টায়ার এলাকা ছেড়ে সিডনের মধ্য দিয়ে দিকাপলির গালিল লেকের কাছে এলেন। (৩২)লোকেরা এক কালা ও বোবা লোককে তাঁর কাছে নিয়ে এলো এবং কাকুতি-মিনতি করতে লাগলো, যেনো তিনি সেই লোকটির ওপর হাত রাখেন। (৩৩)তিনি ভিড়ের মধ্য থেকে তাকে একপাশে নিয়ে গিয়ে তার দুই কানের মধ্যে তাঁর আঙুল দিলেন এবং থুথু ফেলে তার জিহ্বা ছুঁলেন।
(৩৪)অতঃপর আসমানের দিকে তাকিয়ে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে বললেন, “ইপ্ফাথা” অর্থাৎ খুলে যাক। (৩৫)তখনই তার কান খুলে গেলো ও জিহ্বার জড়তা কেটে গেলো এবং সে স্পষ্টভাবে কথা বলতে লাগলো।
(৩৬)তখন হযরত ইসা আ. তাদের আদেশ দিলেন, যেনো তারা এ-বিষয়ে কাউকেই না বলে; কিন্তু তিনি যতোই তাদের নিষেধ করলেন, ততোই তারা অধিক উৎসাহের সাথে এ-বিষয়ে প্রচার করতে লাগলো। (৩৭)লোকেরা খুবই আশ্চর্য হয়ে বললো, “ইনি সমস্ত কাজ কতো নিখুঁতভাবে করেন; এমনকি ইনি কালাদের শোনার ও বোবাদের কথা বলার শক্তি দেন।”
(১)ওই দিনগুলোতে আবার অনেক লোকের ভিড় হলো। এই লোকদের কাছে কোনো খাবার ছিলো না বলে তিনি তাঁর হাওয়ারিদেরকে ডেকে বললেন- (২)“এই লোকদের জন্য আমার মমতা হচ্ছে, কারণ আজ তিন দিন এরা আমার সাথে সাথে আছে আর এদের কাছে কোনো খাবার নেই। (৩)যদি আমি ক্ষুধার্ত অবস্থায় এদের বাড়ি পাঠিয়ে দেই, তাহলে এরা পথেই অজ্ঞান হয়ে পড়বে; এদের মধ্যে অনেকেই অনেক দূর থেকে এসেছে।”
(৪)হাওয়ারিরা তাঁকে বললেন, “এই নির্জন জায়গায় কে কোথা থেকে এতো রুটি দিয়ে এই লোকদের খাওয়াবে?” (৫)তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের কাছে ক’টি রুটি আছে?” তারা বললেন, “সাতটি।” (৬)তখন তিনি লোকদের মাটির ওপর বসতে হুকুম দিলেন। তারপর সেই সাতটি রুটি নিয়ে শুকরিয়া জানিয়ে ভাংলেন এবং লোকদের দেবার জন্য তাঁর উম্মতদের হাতে দিলেন আর তারা তা লোকদের ভাগ করে দিলেন।
(৭)তাদের কাছে কয়েকটি ছোটো মাছও ছিলো। তিনি আল্লাহকে শুকরিয়া জানিয়ে তা লোকদের মাঝে ভাগ করে দিতে বললেন। (৮)তারা খেয়ে তৃপ্ত হলো। তারা পড়ে থাকা ভাঙা টুকরোগুলো দিয়ে সাতটি ঝুড়ি পূর্ণ করলেন। (৯)সেখানে প্রায় চার হাজার লোক ছিলো। তিনি তাদের বিদায় দিলেন এবং (১০)তখনই হাওয়ারিদের সাথে একটি নৌকায় উঠে দল্মনুথা এলাকায় গেলেন।
(১১)ফরিসিরা বেরিয়ে এসে তাঁর সাথে তর্ক করতে লাগলেন এবং তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য তাঁর কাছে বেহেস্ত থেকে একটি মোজেজা দেখতে চাইলেন। (১২)তিনি আত্মায় গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এ-কালের লোকেরা কেনো চিহ্ন হিসেবে মোজেজার খোঁজ করে? আমি আপনাদের সত্যিই বলছি, কোনো চিহ্ন বা মোজেজাই এদের দেখানো হবে না।”
(১৩)তিনি তাদের ছেড়ে আবার নৌকায় উঠে লেকের অন্য পাড়ে গেলেন। (১৪)আর তারা সাথে করে রুটি নিতে ভুলে গিয়েছিলেন। নৌকার মধ্যে তাদের কাছে মাত্র একটি রুটি ছিলো।
(১৫)তিনি একথা বলে তাদের আদেশ করলেন, “তোমরা সতর্ক থাকো- হেরোদ ও ফরিসিদের খামি থেকে সাবধান হও।” (১৬)এতে তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন, “আমাদের কাছে রুটি নেই বলে উনি একথা বলছেন।”
(১৭)কিন্তু হযরত ইসা আ. বিষয়টি বুঝতে পেরে তাদের বললেন, “তোমরা কেনো বলছো যে, তোমাদের কাছে রুটি নেই? তোমরা কি এখনো অনুভব করতে কিংবা বুঝতে পারোনি? তোমাদের হৃদয় কি কঠিন হয়ে গেছে? চোখ থাকতেও কি তোমরা দেখতে পাও না? (১৮)কান থাকতেও কি শুনতে পাও না?
(১৯)তোমাদের কি মনে নেই? যখন আমি পাঁচ হাজার লোকের জন্য পাঁচটি রুটি ভেঙেছিলাম, তখন ভাঙা রুটির টুকরো দিয়ে তোমরা কতোটি ঝুড়ি পূর্ণ করেছিলে?” উত্তরে তারা বললেন, “বারোটি”।
(২০)“এবং যখন চার হাজার লোকের জন্য সাতটি রুটি ভেঙেছিলাম, তখন ভাঙা রুটির টুকরো দিয়ে তোমরা কতোটি ঝুড়ি পূর্ণ করেছিলে?” তারা তাঁকে বললেন, “সাতটি”। (২১)তারপর তিনি তাদের বললেন, “তাহলে তোমরা কি এখনো বুঝতে পারোনি?”
(২২)অতঃপর তারা বেতসাইদা গ্রামে গেলেন। লোকেরা একজন অন্ধকে তাঁর কাছে নিয়ে এসে কাকুতি-মিনতি করতে লাগলো, যেনো তিনি তাকে স্পর্শ করেন। (২৩)তিনি সেই অন্ধের হাত ধরে গ্রামের বাইরে নিয়ে গেলেন, তার চোখে থুথু দিলেন এবং তার গায়ে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি কিছু দেখতে পাচ্ছো?” (২৪)তাকিয়ে দেখে সে বললো, “আমি মানুষ দেখতে পাচ্ছি; তারা দেখতে গাছের মতো কিন্তু হেঁটে বেড়াচ্ছে।” (২৫)তখন হযরত ইসা আ. আবার লোকটির চোখের ওপর হাত রাখলেন। এতে তার চোখ খুলে গেলো এবং সে দেখার শক্তি ফিরে পেলো। সে পরিষ্কারভাবে সবকিছু দেখতে লাগলো। (২৬)পরে তিনি তাকে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেবার সময় বললেন, “এই গ্রামে যেয়ো না।”
(২৭)হযরত ইসা আ. ও তাঁর হাওয়ারিরা কৈসরিয়া-ফিলিপি শহরের আশেপাশের গ্রামগুলোতে গেলেন। যাবার পথে তিনি তাঁর হাওয়ারিদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কে, এ-ব্যাপারে লোকে কী বলে?” (২৮)তারা তাঁকে উত্তর দিলেন, “কেউ কেউ বলে, আপনি হযরত ইয়াহিয়া আ.; কেউ কেউ বলে, হযরত ইলিয়াস আ.; আবার কেউ কেউ বলে, আপনি নবিদের মধ্যে একজন।” (২৯)তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু তোমরা কী বলো, আমি কে?” হযরত সাফওয়ান রা. উত্তর দিলেন, “আপনিই সেই মসিহ।” (৩০)তিনি তাদের সাবধান করে দিলেন, যেনো তারা তাঁর সম্বন্ধে কাউকে কিছু না বলেন।
(৩১)অতঃপর তিনি তাদের শিক্ষা দিতে লাগলেন যে, ইবনুল-ইনসানকে অবশ্যই অনেক দুঃখভোগ করতে হবে। বুজুর্গরা, প্রধান ইমামেরা এবং আলিমরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবেন। তাঁকে মেরে ফেলা হবে এবং তিন দিন পর তাঁকে মৃত থেকে আবার জীবিত হয়ে উঠতে হবে। এসবকিছু তিনি স্পষ্টভাবেই বললেন।
(৩২)তখন হযরত সাফওয়ান রা. তাঁকে একপাশে নিয়ে গিয়ে অনুযোগ করতে লাগলেন। (৩৩)কিন্তু তিনি মুখ ফিরিয়ে হাওয়ারিদের দিকে তাকালেন এবং হযরত সাফওয়ান রা.কে ধমক দিয়ে বললেন, “আমার কাছ থেকে দূর হও শয়তান! আল্লাহর যা তা তুমি ভাবছো না কিন্তু মানুষের যা তা-ই তুমি ভাবছো।”
(৩৪)অতঃপর তিনি হাওয়ারিদেরসহ অন্য লোকদেরকে নিজের কাছে ডেকে বললেন, “যদি কেউ আমার অনুসারী হতে চায়, তাহলে সে নিজেকে অস্বীকার করুক এবং নিজের সলিব বহন করে আমাকে অনুসরণ করুক। (৩৫)কারণ যে-ব্যক্তি তার নিজের জীবন রক্ষা করতে চায়, সে তা হারাবে কিন্তু যে আমার জন্য এবং ইঞ্জিলের জন্য নিজের জীবন কোরবানি দেয়, তার জীবন রক্ষা পাবে। (৩৬)কেউ যদি গোটা দুনিয়া লাভ করেও তার জীবন হারায়, তাহলে তার কী লাভ হলো? (৩৭)আসলে, জীবন ফিরে পাবার জন্য মানুষ কী দিতে পারে?
(৩৮)এ-কালের জিনাকারী ও গুনাহগারদের মধ্যে কেউ যদি আমাকে ও আমার শিক্ষা নিয়ে লজ্জাবোধ করে, তাহলে ইবনুল-ইনসান যখন পবিত্র ফেরেস্তাদের সাথে নিয়ে তাঁর প্রতিপালকের মহিমায় আসবেন, তখন তিনিও সেই লোকের সম্বন্ধে লজ্জাবোধ করবেন।”
(১)তিনি তাদের বললেন, “আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, এখানে এমন কয়েকজন আছে, যাদের কাছে আল্লাহর রাজ্য মহাশক্তিতে দেখা না দেয়া পর্যন্ত তারা মরবে না।”
(২)ছ’দিন পর হযরত ইসা আ. কেবল হযরত সাফওয়ান রা., হযরত ইয়াকুব রা. ও হযরত ইউহোন্না রা.কে সাথে নিয়ে একটি উঁচু পাহাড়ে গেলেন (৩)এবং তাদের সামনে রূপান্তরিত হলেন। তাঁর কাপড়-চোপড় এমন চোখ ঝলসানো সাদা হলো যে, দুনিয়ার কোনো মানুষের পক্ষে তেমন করে কাপড় ধুয়ে উজ্জল করা সম্ভব নয়। (৪)সেখানে তাদের সামনে হযরত ইলিয়াস আ. ও হযরত মুসা আ. আবির্ভূত হলেন। তারা হযরত ইসা আ. এর সাথে কথা বলছিলেন।
(৫)তখন হযরত সাফওয়ান রা. হযরত ইসা আ.কে বললেন, “হুজুর, ভালোই হয়েছে যে, আমরা এখানে আছি। আমরা এখানে তিনটি কুঁড়েঘর তৈরি করি- একটি আপনার, একটি হযরত মুসা আ. এর ও একটি হযরত ইলিয়াস আ. এর জন্য।” (৬)তারা খুব ভয় পেয়েছিলেন, সেজন্য কি যে বলা উচিত, তিনি তা বুঝলেন না।
(৭)এ-সময় একখন্ড সাদা মেঘ এসে তাদের ঢেকে ফেললো; আর সেই মেঘ থেকে একথা শোনা গেলো, “এ-ই আমার একান্ত প্রিয় মনোনীতজন, তোমরা তার কথা শোনো।” (৮)তখনই তারা চারদিকে তাকালেন কিন্তু হযরত ইসা আ. ছাড়া আর কাউকেই তাদের সাথে দেখতে পেলেন না।
(৯)তিনি পাহাড় থেকে নেমে আসার সময় তাদের হুকুম দিলেন, ইবনুল-ইনসান মৃত থেকে জীবিত হয়ে না ওঠা পর্যন্ত তারা যা দেখেছেন তা যেনো কাউকেই না বলেন।
(১০)সুতরাং তারা বিষয়টি নিজেদের মধ্যে রাখলেন; আর মৃত থেকে জীবিত হয়ে ওঠার অর্থ কী, তা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগলেন।
(১১)অতঃপর তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আলিমরা কেনো বলেন, প্রথমেই হযরত ইলিয়াস আ. আসবেন?” (১২)তিনি তাদের বললেন, “প্রথমে হযরত ইলিয়াস আ. এসে সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনবেন। তবে ইবনুল-ইনসানের বিষয়ে কেমন করেই-বা লেখা আছে যে, তাঁকে খুব কষ্টভোগ করতে হবে এবং লোকে তাঁকে অগ্রাহ্য করবে? (১৩)কিন্তু আমি তোমাদের বলছি, হযরত ইলিয়াস আ. এর বিষয়ে যেভাবে লেখা আছে, সেভাবেই তিনি এসেছিলেন এবং তারা তার প্রতি যা ইচ্ছা তাই করেছে।”
(১৪)অতঃপর তারা অন্য হাওয়ারিদের কাছে ফিরে এসে দেখলেন, তাদের চারপাশে অনেক লোক জড়ো হয়েছে এবং কয়েকজন আলিম তাদের সাথে তর্ক করছেন।
(১৫)সমগ্র জনতা তাঁকে দেখার সাথে সাথে সশ্রদ্ধ ভয়ে ভীত হলো এবং তারা দৌড়ে গিয়ে তাঁকে সালাম জানালো। (১৬)তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা ওদের সাথে কী নিয়ে তর্ক করছো?”
(১৭)ভিড়ের মধ্য থেকে একজন উত্তর দিলো, “হুজুর, আমার ছেলেকে আপনার কাছে এনেছিলাম। তাকে ভূতে পেয়েছে। সে তাকে কথা বলতে দেয় না। (১৮)এবং সে যখনই তাকে ধরে, তখনই আছাড় দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। তার মুখ থেকে ফেনা বের হয় আর সে দাঁতে দাঁত ঘষে এবং শক্ত হয়ে যায়। আমি আপনার হাওয়ারিদেরকে বললাম তাকে ছাড়িয়ে দিতে কিন্তু তারা যথেষ্ট ক্ষমতা সম্পন্ন নন।”
(১৯)জবাবে তিনি তাদের বললেন, “অবিশ্বাসীর দল! আর কতোদিন আমি তোমাদের সাথে থাকবো? আর কতোদিন তোমাদের সহ্য করবো? তাকে আমার কাছে আনো।” (২০)তারা ছেলেটিকে তাঁর কাছে আনলেন। তাঁকে দেখেই সেই ভূত ছেলেটিকে খুব জোরে মুচড়ে ধরলো। ছেলেটি মুখ থেকে ফেনা বের করতে করতে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগলো।
(২১)হযরত ইসা আ. তার পিতাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কতোদিন হলো এর এরকম হয়েছে?” (২২)সে বললো, “ছোটোবেলা থেকেই। এই ভূত তাকে ধ্বংস করার জন্য প্রায়ই আগুন আর পানিতে ফেলে দেয়। তবে আপনি যদি কোনো কিছু করতে পারেন, তাহলে দয়া করে আমাদের উপকার করুন।” (২৩)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “‘যদি করতে পারেন!’ যে বিশ্বাস করে তার জন্য সবকিছুই করা সম্ভব।” (২৪)তখনই ছেলেটির পিতা চিৎকার করে কেঁদে উঠে বললো, “আমি ইমান এনেছি; আমার অবিশ্বাস দূর করুন।”
(২৫)অনেক লোক দৌঁড়ে আসছে দেখে হযরত ইসা আ. নোংরা-ভূতকে ধমক দিয়ে বললেন, “কালা ও বোবা-ভূত, আমি তোমাকে হুকুম দিচ্ছি, এর ভেতর থেকে বেরিয়ে যাও এবং আর কখনো এর মধ্যে ঢুকবে না।”
(২৬)তখন সেই ভূত চিৎকার করে ছেলেটিকে জোরে মুচড়ে ধরলো এবং তার ভেতর থেকে বেরিয়ে গেলো। তাতে ছেলেটি মরার মতো পড়ে রইলো দেখে অনেকে বললো, “সে মারা গেছে।” (২৭)কিন্তু হযরত ইসা আ. তাকে হাত ধরে তুললেন আর তাতে সে উঠে দাঁড়ালো।
(২৮)যখন তিনি একটি ঘরের ভেতরে গেলেন, তখন তাঁর হাওয়ারিরা গোপনে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা ভূতকে ছাড়াতে পারলাম না কেনো?” (২৯)তিনি তাদের বললেন, “মোনাজাত ছাড়া আর কোনোভাবেই এরকম ভূত ছাড়ানো যায় না।”
(৩০)তারা সেই জায়গা ছেড়ে গালিলের মধ্য দিয়ে চলে গেলেন। তিনি চেয়েছিলেন যেনো কেউ তা জানতে না পারে। (৩১)কারণ তিনি তাঁর হাওয়ারিদেরকে শিক্ষা দিচ্ছিলেন। তিনি তাদের বলছিলেন, “ইবনুল-ইনসানকে মানুষের হাতে তুলে দেয়া হবে। তারা তাঁকে মেরে ফেলবে এবং তিন দিন পর তিনি আবার জীবিত হয়ে উঠবেন।” (৩২)কিন্তু তারা একথার অর্থ বুঝতে পারলেন না এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করতেও ভয় পেলেন।
(৩৩)অতঃপর তারা কফরনাহুমে এলেন। তিনি ঘরের ভেতর গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা পথে কী নিয়ে তর্ক করছিলে?” (৩৪)তারা চুপ করে রইলেন; কারণ কে সবচেয়ে বড়ো তা নিয়ে তারা পথে তর্ক করছিলেন। (৩৫)তিনি বসলেন এবং সেই বারোজনকে ডেকে বললেন, “কেউ যদি প্রথম হতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই সকলের শেষে থাকতে হবে এবং সকলের সেবাকারী হতে হবে।”
(৩৬)তিনি একটি শিশুকে নিয়ে তাদের মধ্যে দাঁড় করালেন। তারপর তাকে কোলে নিয়ে তাদের বললেন, (৩৭)“যে কেউ আমার নামে এর মতো কোনো শিশুকে গ্রহণ করে, সে আমাকেই গ্রহণ করে; আর যে আমাকে গ্রহণ করে, সে কেবল আমাকে গ্রহণ করে না কিন্তু যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তাঁকেই গ্রহণ করে।”
(৩৮)হযরত ইউহোন্না রা. তাঁকে বললেন, “হুজুর, আমরা একজনকে আপনার নামে ভূত ছাড়াতে দেখে তাকে নিষেধ করেছি, কারণ সে আমাদের অনুসরণ করছিলো না।” (৩৯)কিন্তু হযরত ইসা আ. বললেন, “তাকে নিষেধ করো না।
কারণ আমার নামে আশ্চর্য কাজ করার পরে কেউ ফিরে আমার নিন্দা করতে পারে না। (৪০)যে আমাদের বিপক্ষে থাকে না, সে তো আমাদের পক্ষে। (৪১)তোমরা মসিহের লোক বলে যে কেউ তোমাদের এক গ্লাস পানি পান করতে দেয়, আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, সে কোনো মতে তার পুরস্কার হারাবে না। (৪২)কেউ যদি আমার ওপর বিশ্বাসী এই ছোটোদের মধ্যে কারো পথে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে নিজের গলায় নিজে পাথর বেঁধে সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হওয়াই বরং তার জন্য ভালো।
(৪৩,৪৪)তোমার হাত যদি তোমার বাধার কারণ হয়, তাহলে তা কেটে ফেলে দাও। দু’হাত নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার চেয়ে বরং নুলা হয়ে বেহেস্তে ঢোকা তোমার পক্ষে উত্তম। সেই জাহান্নামের আগুন কখনো নেভে না।
(৪৫,৪৬)তোমার পা যদি তোমার বাধার কারণ হয়, তাহলে তা কেটে ফেলে দাও। দু’পা নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার চেয়ে বরং খোঁড়া হয়ে বেহেস্তে ঢোকা তোমার পক্ষে উত্তম।
(৪৭)তোমার চোখ যদি তোমার বাধার কারণ হয়, তাহলে তা তুলে ফেলো। দু’চোখ নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার চেয়ে বরং এক চোখ নিয়ে আল্লাহর রাজ্যে ঢোকা তোমার পক্ষে উত্তম। (৪৮)সেই জাহান্নামের পোকা কখনো মরে না আর সেখানকার আগুন কখনো নেভে না। (৪৯)লবণ দেবার মতো প্রত্যেকের ওপর আগুন দেয়া হবে।
(৫০)লবণ ভালো জিনিস কিন্তু যদি লবণের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তা কেমন করে আবার নোনতা করবে? তোমাদের হৃদয়ের মাঝে লবণ রাখো এবং তোমরা একজন অন্যজনের সাথে শান্তিতে থাকো।”
(১)সেই জায়গা ছেড়ে তিনি ইহুদিয়া ও জর্দান নদীর অন্য পারে গেলেন এবং অনেক লোক তাঁর কাছে এসে জড়ো হলো। তখন তিনি তাঁর নিয়ম অনুসারে তাদের শিক্ষা দিতে লাগলেন।
(২)কয়েকজন ফরিসি এসে তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য জিজ্ঞেস করলেন, “স্ত্রীকে তালাক দেয়া কি শরিয়ত-সম্মত?” (৩)তিনি তাদের উত্তর দিলেন, “হযরত মুসা আ. আপনাদের কী আদেশ দিয়েছেন?” (৪)তারা বললেন, “ হযরত মুসা আ. তালাকনামা লিখে স্ত্রীকে তালাক দেবার অনুমতি দিয়েছেন।” (৫)কিন্তু হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “আপনাদের হৃদয় কঠিন বলেই তিনি আপনাদের জন্য এ-আদেশ লিখেছিলেন। (৬)কিন্তু সৃষ্টির শুরুতে ‘আল্লাহ তাদের নারী ও পুরুষ করে সৃষ্টি করেছেন। (৭)এজন্যই মানুষ তার পিতা-মাতাকে ছেড়ে নিজের স্ত্রীর সাথে যুক্ত হবে আর তারা দু’জন একদেহ হবে।’ ৮তাই তারা আর দুই নয় কিন্তু একদেহ। ৯সুতরাং আল্লাহ যা যুক্ত করেছেন, মানুষ তা আলাদা না করুক।” (১০)অতঃপর হাওয়ারিরা ঘরের ভেতরে তাঁকে আবার এ-বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। (১১)তিনি তাদের বললেন, “যে কেউ নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে অন্যকে বিয়ে করে, সে তার সাথে জিনা করে। (১২)আবার স্ত্রী যদি স্বামীকে তালাক দিয়ে অন্যকে বিয়ে করে, তাহলে সেও জিনা করে।”
(১৩)লোকেরা কয়েকটি শিশুকে তাঁর কাছে নিয়ে এলো, যেনো তিনি তাদের স্পর্শ করেন; কিন্তু হাওয়ারিরা তাদের তিরস্কার করতে লাগলেন। (১৪)হযরত ইসা আ. তা দেখে অসন্তুষ্ট হলেন এবং তাদের বললেন, “শিশুদেরকে আমার কাছে আসতে দাও, বাধা দিয়ো না; কারণ আল্লাহর রাজ্য এদের মতো লোকদেরই। (১৫)আমি তোমাদের সত্যি বলছি, শিশুদের মতো আল্লাহর রাজ্য গ্রহণ না করলে কেউ কোনোভাবেই তাতে ঢুকতে পারবে না।” (১৬)তিনি সেই শিশুদেরকে কোলে নিলেন ও তাদের মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন।
(১৭)তিনি আবার যখন পথে বের হলেন, তখন এক লোক দৌঁড়ে এসে তাঁর সামনে নতজানু হয়ে বললো, “হে মহান ওস্তাদ, আল্লাহর দিদার পেতে হলে আমাকে কী করতে হবে?”
(১৮)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “আমাকে কেনো তুমি মহান বলছো? এক আল্লাহ ছাড়া আর কেউই মহান নয়। (১৯)তুমি তো হুকুমগুলো জানো, ‘খুন করো না, জিনা করো না, চুরি করো না, মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ো না, অন্যকে ঠকিয়ো না, বাবা-মাকে সম্মান করো।’” (২০)লোকটি তাঁকে বললো, “হুজুর, তরুণ বয়স থেকে আমি এসব পালন করে আসছি।”
(২১)হযরত ইসা আ. তার দিকে তাকালেন এবং মমতায় পূর্ণ হয়ে বললেন, “একটি জিনিস তোমার বাকি আছে। যাও, তোমার যা-কিছু আছে তা বিক্রি করে গরিবদের দান করে দাও। তাতে তুমি বেহেস্তে ধন পাবে। তারপর এসে আমাকে অনুসরণ কারো।” (২২)একথা শুনে লোকটির মুখ কালো হয়ে গেলো। তার অনেক ধন-স¤পত্তি ছিলো বলে সে দুঃখিত হয়ে চলে গেলো। (২৩)তখন হযরত ইসা আ. চারদিকে তাকিয়ে তাঁর হাওয়ারিদের বললেন, “ধনীদের পক্ষে আল্লাহর রাজ্যে ঢোকা কতোই-না কঠিন!” (২৪)তাঁর কথা শুনে হাওয়ারিরা আশ্চর্য হলেন। হযরত ইসা আ. আবার তাদের বললেন, “সন্তানেরা, আল্লাহর রাজ্যে ঢোকা কতোই-না কঠিন!
(২৫)কোনো ধনীর পক্ষে আল্লাহর রাজ্যে ঢোকার চেয়ে সুচের ছিদ্র দিয়ে উটের চলে যাওয়া সহজ।” (২৬)তারা আরো অবাক হয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন, “তাহলে কে নাজাত পাবে?” (২৭)তাদের দিকে তাকিয়ে হযরত ইসা আ. বললেন, “মানুষের পক্ষে এটি অসম্ভব হলেও আল্লাহর কাছে অসম্ভব নয়- তাঁর পক্ষে সবই সম্ভব।”
(২৮)হযরত সাফওয়ান রা. তাঁকে বললেন, “দেখুন, আমরা তো সবকিছু ছেড়ে দিয়ে আপনার পেছনে এসেছি।” (২৯)হযরত ইসা আ. বললেন, “আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, যে কেউ আমার ও ইঞ্জিলের জন্য বাড়িঘর, ভাইবোন, বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে ও জায়গা জমি ছেড়ে দিয়েছে, (৩০)সে এ-যুগেই তার একশো গুণ বেশি বাড়িঘর, ভাইবোন, বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে ও জায়গা-জমি পাবে এবং সাথে সাথে অত্যাচারও ভোগ করবে আর পরকালে আল্লাহর দিদার লাভ করবে। (৩১)কিন্তু যারা প্রথমে আছে, তাদের মধ্যে অনেকে শেষে পড়বে আর যারা শেষে আছে, তারা প্রথম হবে।”
(৩২)অতঃপর তারা জেরুসালেমের পথে রওনা দিলেন। হযরত ইসা আ. তাদের আগে আগে যাচ্ছিলেন। তারা অবাক হলেন এবং যে-লোকেরা পেছনে পেছনে আসছিলো, তারা ভয় পেলো। তিনি আবার সেই বারোজনকে কাছে ডেকে নিজের ওপর কী হতে যাচ্ছে তা বলতে লাগলেন। বললেন, “দেখো, আমরা জেরুসালেমে যাচ্ছি। (৩৩)সেখানে ইবনুল-ইনসানকে প্রধান ইমামদের ও আলিমদের হাতে তুলে দেয়া হবে। তারা তাঁকে মৃত্যুর উপযুক্ত বলে দোষী করবে, তারপর তাঁকে অ-ইহুদিদের হাতে তুলে দেবে। (৩৪)তারা তাঁকে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করবে, তাঁর মুখে থুথু দেবে, তাঁকে চাবুক মারবে এবং হত্যা করবে। আর তিন দিন পর তিনি আবার জীবিত হয়ে উঠবেন।”
(৩৫)হযরত ইয়াকুব রা. ও হযরত ইউহোন্না ইবনে জাবিদি তাঁর কাছে এসে বললেন, “হুজুর, আমাদের ইচ্ছা এই যে, আমরা যা চাবো, আপনি আমাদের জন্য তাই করবেন।” (৩৬)তিনি তাদের বললেন, “তোমরা কী চাও? আমি তোমাদের জন্য কী করবো?”
(৩৭)তারা তাঁকে বললেন, “আমাদের এই বর দিন, আপনি মহিমাপ্রাপ্ত হলে আমরা যেনো একজন আপনার ডান পাশে ও অন্যজন বাঁ পাশে বসতে পারি।”
(৩৮)কিন্তু হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “তোমরা যা চাচ্ছো তা তোমরা জানো না। যে-গ্লাসে আমি পান করতে যাচ্ছি তাতে কি তোমরা পান করতে পারো? কিংবা যে-বায়াত আমি গ্রহণ করতে যাচ্ছি তা কি তোমরা গ্রহণ করতে পারো?” (৩৯)তারা তাঁকে বললেন, “হ্যাঁ, আমরা পারি।” তখন হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “যে-গ্লাসে আমি পান করবো, তোমরা অবশ্যই তাতে পান করবে; আর যে-বায়াত আমি গ্রহণ করবো তা তোমরাও গ্রহণ করবে; (৪০)কিন্তু যাদের জন্য স্থান প্রস্তুত করা হয়েছে, তাদের ছাড়া অন্য কাউকেই আমার ডান কিংবা বাঁ পাশে বসতে দেবার অধিকার আমার নেই।”
(৪১)বাকি দশজন এসব কথা শুনে হযরত ইয়াকুব রা. ও হযরত ইউহোন্না রা.র ওপর বিরক্ত হলেন। (৪২)তখন হযরত ইসা আ. তাদেরকে কাছে ডেকে বললেন, “তোমরা জানো যে, অ-ইহুদিদের শাসনকর্তারা তাদের ওপর প্রভু হয় এবং তাদের নেতারা তাদের ওপর হুকুম চালায়। (৪৩)তোমাদের সে রকম হওয়া উচিত নয়। তোমাদের মধ্যে যে বড়ো হতে চায়, তাকে অবশ্যই তোমাদের সেবাকারী হতে হবে (৪৪)আর তোমাদের মধ্যে যে মহান হতে চায়, তাকে অবশ্যই সকলের গোলাম হতে হবে। (৪৫)বস্তুত ইবনুল-ইনসান সেবা পেতে আসেননি বরং সেবা করতে এবং অনেক লোকের গুনাহের নাজাতের মূল্য হিসেবে নিজের প্রাণ দিতে এসেছেন।”
(৪৬)পরে তারা জিরিহোতে এলেন। যখন তিনি হাওয়ারিদের ও অনেক লোকের সাথে জিরিহো থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন বরতিময় নামে এক অন্ধ ভিখারি পথের পাশে বসে ছিলো। (৪৭)“নাসরত গ্রামের হযরত ইসা আ. আসছেন”- একথা শুনে সে চিৎকার করে বলতে লাগলো, “দাউদের বংশধর হযরত ইসা আ, আমার প্রতি রহম করুন।” (৪৮)এতে অনেকে তাকে ধমক দিলো, যেনো সে চুপ করে কিন্তু সে আরো চিৎকার করে বললো, “দাউদের বংশধর, আমার প্রতি রহম করুন।”
(৪৯)হযরত ইসা আ. থেমে বললেন, “ওকে ডাকো।” তারা অন্ধ লোকটিকে ডেকে বললো, “সাহস করো, ওঠো; উনি তোমাকে ডাকছেন।” (৫০)তখন সে তার গায়ের চাদরটি ফেলে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো এবং হযরত ইসা আ. এর কাছে গেলো। (৫১)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “তুমি কী চাও? আমি তোমার জন্য কী করবো?” অন্ধ লোকটি তাঁকে বললো, “হুজুর, আমি যেনো আবার দেখতে পাই।” (৫২)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “যাও, তোমার ইমান তোমাকে সুস্থ করেছে।” তাতে তখনই লোকটি আবার দেখতে পেলো এবং পথ দিয়ে তাঁর পেছনে পেছনে চলতে লাগলো।
(১)তারা জেরুসালেম যাবার পথে জৈতুন পাহাড়ের গায়ের বৈতফগি ও বেথানিয়া গ্রামের কাছে এলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি তাঁর দু’জন হাওয়ারিকে এই বলে পাঠিয়ে দিলেন, “তোমরা সামনের গ্রামে যাও। (২)সেখানে ঢোকার সাথে সাথে তোমরা একটি বাচ্চা-গাধা বাঁধা অবস্থায় দেখতে পাবে। তার ওপর কখনো কোনো মানুষ বসেনি। ওটা খুলে নিয়ে এসো। (৩)যদি কেউ তোমাদের বলে, ‘কেনো তোমরা এটি খুলছো?’ তবে শুধু বলো, ‘হুজুরের এটি দরকার আছে এবং তাড়াতাড়ি এটি ফিরিয়ে দেবেন’।”
(৪)তারা গিয়ে দেখলেন, বাচ্চা-গাধাটি দরজার কাছে রাস্তার পাশে বাঁধা আছে। (৫)তারা যখন ওটার বাঁধন খুলছিলেন, তখন যারা সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো, তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের বললো, তোমরা কী করছো? ওটাকে খুলছো কেনো?” (৬)হযরত ইসা আ. তাদের যা বলতে বলেছিলেন, তারা তাদের তাই বললেন। তাতে তারা গাধাটি নিয়ে যেতে দিলো।
(৭)তারা সেটিকে হযরত ইসা আ. এর কাছে আনলেন এবং তাদের গায়ের চাদর তার ওপর পেতে দিলেন। অতঃপর তিনি তার ওপর বসলেন। (৮)অনেকে তাদের গায়ের চাদর রাস্তার ওপর বিছিয়ে দিলো; অন্যেরা মাঠের গাছপালা থেকে পাতাসহ ডাল কেটে এনে পথের ওপর বিছিয়ে দিলো।
(৯)যারা সামনে ও পেছনে যাচ্ছিলো, তারা চিৎকার করে বলতে লাগলো “হোশান্না! আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নামে যিনি আসছেন, তাঁর প্রশংসা হোক! (১০)আমাদের পিতা হযরত দাউদ আ. এর যে-রাজ্য আসছে, তার প্রশংসা হোক! বেহেস্তেও হোশান্না!”
(১১)অতঃপর তিনি জেরুসালেমে গিয়ে বায়তুল-মোকাদ্দসে ঢুকলেন এবং চারদিকের সবকিছু লক্ষ্য করলেন কিন্তু বেলা পড়ে যাওয়ায় সেই বারোজনকে নিয়ে বেথানিয়াতে চলে গেলেন।
(১২)পরদিন তারা যখন বেথানিয়া ছেড়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর খিদে পেলো। (১৩)তিনি দূর থেকে পাতায় ঢাকা একটি ডুমুরগাছ দেখতে পেলেন এবং তাতে কোনোকিছু পাওয়া যায় কিনা তা দেখার জন্য কাছে গেলেন। কিন্তু কাছে গিয়ে তাতে পাতা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলেন না; কারণ তখন ডুমুরের মৌসুম ছিলো না। (১৪)তিনি গাছটিকে বললেন, “আর কখনো কেউ যেনো তোমার ফল না খায়।” হাওয়ারিরা একথা শুনতে পেলেন।
(১৫)অতঃপর তারা জেরুসালেমে পৌঁছলে তিনি বায়তুল-মোকাদ্দসে ঢুকলেন এবং সেখানে যারা কেনাবেচা করছিলো, তাদের তাড়িয়ে দিলেন। তিনি টাকা বদল করে দেবার লোকদের টেবিল ও যারা কবুতর বিক্রি করছিলো, তাদের টেবিল উল্টে ফেললেন। (১৬)বায়তুল-মোকাদ্দসের ভেতর দিয়ে তিনি কাউকে কিছুই নিয়ে যেতে দিলেন না।
(১৭)শিক্ষা দেবার সময় তিনি বললেন, “একথা কি লেখা নেই যে, ‘আমার ঘরকে দুনিয়ার সব জাতির এবাদতখানা বলা হবে’? কিন্তু তোমরা এটিকে ডাকাতের আড্ডাখানা করে তুলেছো!”
(১৮)প্রধান ইমামেরা ও আলিমরা একথা শুনে তাঁকে মেরে ফেলার উপায় খুঁজতে লাগলেন; কেননা তারা তাঁকে ভয় করতেন, কারণ লোকেরা তাঁর শিক্ষায় আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলো। (১৯)সন্ধ্যার পর হযরত ইসা আ. এবং তাঁর হাওয়ারিরা শহরের বাইরে চলে গেলেন।
(২০)সকালে সে-পথ দিয়ে যাবার সময় তারা দেখলেন, ডুমুর গাছটি শিকড়সহ শুকিয়ে গেছে। (২১)তখন ওই কথা স্মরণ করে হযরত সাফওয়ান পিতর রা তাঁকে বললেন, “হুজুর, দেখুন, যে ডুমুর গাছটিকে আপনি অভিশাপ দিয়েছিলেন তা শুকিয়ে গেছে!” (২২)উত্তরে হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “আল্লাহর ওপর ইমান রাখো। (২৩)আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, যদি কেউ অন্তরে কোনো সন্দেহ না রেখে এই পাহাড়টিকে বলে, ‘উঠে সাগরে গিয়ে পড়ো’ আর বিশ্বাস করে যে, সে যা বললো তাই হবে, তাহলে তার জন্য তা-ই করা হবে।
(২৪)সেজন্য আমি তোমাদের বলছি, মোনাজাতে তোমরা যা-কিছু চাও, বিশ্বাস করো যে, তোমরা তা পেয়েছো, তাহলে তোমাদের জন্য তা-ই করা হবে। (২৫,২৬)তোমরা যখন ইবাদত করো, তখন কারো বিরুদ্ধে যদি তোমাদের কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে তাকে ক্ষমা করো, যেনো তোমাদের প্রতিপালক যিনি বেহেস্তে থাকেন তোমাদের গুনাহ মাফ করেন।”
(২৭)অতঃপর তারা জেরুসালেমে পৌঁছলেন। তিনি বায়তুল-মোকাদ্দসে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, এমন সময় প্রধান ইমামেরা, আলিমরা ও বুজুর্গরা তাঁর কাছে এসে (২৮)জিজ্ঞেস করলেন, “কোন অধিকারে তুমি এসব করছো? কে তোমাকে এ-অধিকার দিয়েছে?”
(২৯)উত্তরে হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “আমি তোমাদের একটি প্রশ্ন করবো। আমাকে উত্তর দাও, তাহলে আমিও তোমাদের বলবো, আমি কোন অধিকারে এসব করছি। (৩০)বলোতো, হযরত ইয়াহিয়া আ. বায়াত দেবার অধিকার পেয়েছিলেন আল্লাহ নাকি মানুষের কাছ থেকে?” (৩১)তারা নিজেদের মধ্যে এই আলোচনা করলেন, “যদি আমরা বলি, ‘আল্লাহর কাছ থেকে,’ তাহলে সে বলবে, ‘তবে আপনারা তার ওপর ইমান আনেননি কেনো?’ (৩২)আবার যদি বলি, ‘মানুষের কাছ থেকে’, তাহলে?” তারা লোকদের ভয় করতেন, কারণ সকলে হযরত ইয়াহিয়া আ.কে একজন সত্যিকারের নবি বলেই মানতো। (৩৩)সুতরাং তারা হযরত ইসা আ.কে উত্তর দিলেন, “আমরা জানি না।” তখন হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “তাহলে আমিও আপনাদের বলবো না, কোন অধিকারে আমি এসব করছি।”
(১)অতঃপর তিনি দৃষ্টান্তের মধ্য দিয়ে তাদের সাথে কথা বলতে লাগলেন- “এক লোক একটি আঙুরক্ষেত করে তার চারদিকে বেড়া দিলো। আঙুর থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য একটি গর্ত খুঁড়লো এবং একটি উঁচু পাহারাঘর তৈরি করলো। তারপর চাষীদের কাছে ক্ষেতটি বর্গা দিয়ে বিদেশে চলে গেলো।
(২)ফসল তোলার মৌসুমে সে আঙুরের ভাগ নিয়ে আসার জন্য একজন গোলামকে সেই চাষীদের কাছে পাঠিয়ে দিলো; (৩)কিন্তু তারা তাকে ধরে মারলো এবং খালি হাতে ফেরত পাঠালো। (৪)তারপর সে আরেকজন গোলামকে পাঠালো; কিন্তু তারা তার মাথায় আঘাত করলো এবং তাকে অপমান করলো। (৫)তারপর সে আরেকজনকে পাঠালো। তারা তাকে হত্যা করলো। পরে সে আরো অনেককে পাঠালো কিন্তু তারা তাদের মধ্যে কয়েকজনকে মারধর করলো আর অন্যদের হত্যা করলো।
(৬)সেখানে পাঠাতে তার আর মাত্র একজন বাকি ছিলো- সে ছিলো তার প্রিয় পুত্র। শেষে সে তাকেই তাদের কাছে পাঠিয়ে দিলো। ভাবলো, ‘তারা অন্তত আমার ছেলেকে সম্মান করবে।’ (৭)কিন্তু সেই চাষীরা এই বলে পরামর্শ করতে লাগলো, ‘এ-ই তো উত্তরাধিকারী। চলো, আমরা ওকে হত্যা করি, তাহলে আমরাই সম্পত্তির মালিক হবো।’ (৮)সুতরাং তারা তাকে ধরে হত্যা করলো এবং আঙুরক্ষেতের বাইরে ফেলে দিলো।
(৯)তাহলে আঙুরক্ষেতের মালিক কী করবে? সে আসবে ও বর্গা চাষীদের ধ্বংস করবে এবং আঙুরক্ষেতটি অন্যদের হাতে দেবে। (১০)তোমরা কি পাককিতাবে পড়োনি: ‘রাজমিস্ত্রিরা যে-পাথরটি বাতিল করে দিয়েছিলো, সেটিই কোণের প্রধান পাথর হয়ে উঠলো; (১১)এটি ছিলো আল্লাহর কাজ আর তা আমাদের চোখে খুব আশ্চর্য লাগে?” (১২)যখন তারা বুঝতে পারলেন যে, তিনি তাদেরই বিরুদ্ধে এই দৃষ্টান্ত দিয়েছেন, তখন তারা তাঁকে ধরতে চাইলেন; কিন্তু তারা জনতার ভয়ে ভীত ছিলেন। সুতরাং তারা তাঁকে ছেড়ে চলে গেলেন।
(১৩)পরে তারা তাঁকে তাঁর কথার ফাঁদে ফেলার জন্য কয়েকজন ফরিসি ও হেরোদীয়কে পাঠিয়ে দিলেন। (১৪)তারা তাঁর কাছে এসে বললেন, “হুজুর, আমরা জানি, আপনি একজন সৎলোক। লোকে কি মনে করবে বা না করবে, তাতে আপনার কিছু যায় আসে না; কারণ আপনি কারো মুখ চেয়ে কিছু করেন না। আপনি সত্যভাবে আল্লাহর পথের বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। আমাদের বলুন, কাইসারকে কর দেয়া কি ঠিক? (১৫)আমরা তাকে কর দেবো নাকি দেবো না?” কিন্তু তিনি তাদের ভ-ামি বুঝতে পেরে বললেন, “তোমরা কেনো আমাকে পরীক্ষা করছো? আমাকে একটি দিনার এনে দেখাও।” (১৬)তারা একটি দিনার আনলে পর তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “এর ওপর এই ছবি ও নাম কার?” তারা বললেন, “কাইসারের।”
(১৭)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “যা কাইসারের তা কাইসারকে দাও আর যা আল্লাহর তা আল্লাহকে দাও।” এতে তারা তাঁর বিষয়ে খুবই আশ্চর্য হলেন।
(১৮)সদ্দুকিরা- যারা বলেন, পুনরুত্থান বলে কিছু নেই- তাঁর কাছে এলেন (১৯)এবং তাঁকে প্রশ্ন করে বললেন, “হুজুর, হযরত মুসা আ. আমাদের জন্য একথা লিখে গেছেন, ‘যদি কারো ভাই সন্তানহীন অবস্থায় স্ত্রী রেখে মারা যায়, তাহলে তার ভাই তার স্ত্রীকে বিয়ে করবে এবং সে ভাইয়ের হয়ে তার বংশ রক্ষা করবে।’ (২০)তারা ছিলো সাত ভাই। প্রথমজন বিয়ে করে সন্তানহীন অবস্থায় মারা গেলো।
(২১)দ্বিতীয়জন তাকে বিয়ে করলো কিন্তু সেও সন্তানহীন অবস্থায় মারা গেলো। (২২)তৃতীয়জনের অবস্থাও তা-ই হলো। এভাবে সাতজনের কারোরই ছেলে-মেয়ে হলো না। শেষে সেই মহিলাও মারা গেলো। (২৩)কেয়ামতের দিন যখন তারা জীবিত হয়ে উঠবে, তখন সে কার স্ত্রী হবে? কারণ সাতজনের প্রত্যেকেই তো তাকে বিয়ে করেছিলো।”
(২৪)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “একারণেই কি তোমরা ভুল করছো না? কারণ তোমরা পাক-কিতাবও জানো না এবং আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কেও জানো না। (২৫)মৃতেরা যখন জীবিত হয়ে উঠবে, তখন তারা বিয়েও করবে না এবং তাদের বিয়ে দেয়াও হবে না; তখন তারা হবে বেহেস্তের ফেরেস্তাদের মতো।
(২৬)মৃতদের জীবিত হয়ে ওঠার বিষয়ে হযরত মুসা আ.-র কিতাবে লেখা জ্বলন্ত ঝোপের কথা কি তোমরা পড়োনি? আল্লাহ কীভাবে তাকে বলেছিলেন, ‘আমি হযরত ইব্রাহিম আ. এর আল্লাহ, হযরত ইসহাক আ. এর আল্লাহ ও হযরত ইয়াকুব আ. এর আল্লাহ?’ (২৭)তিনি তো মৃতদের আল্লাহ নন, তিনি জীবিতদেরই আল্লাহ। তোমরা ভীষণ ভুল করছো।”
(২৮)একজন আলিম কাছে এসে তাদের তর্কাতর্কি শুনলেন। তিনি যে তাদের উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন তা লক্ষ্য করে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হুকুমগুলোর মধ্যে কোনটি প্রথম?”
(২৯)হযরত ইসা আ. উত্তর দিলেন, “প্রথমটি এই- ‘হে ইস্রাইল, শোনো, যিনি আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, তিনি একজনই; (৩০)আর তুমি তোমার সম্পূর্ণ হৃদয়, মন, প্রাণ এবং সামর্থ্য দিয়ে তোমার প্রতিপালক আল্লাহকে মহব্বত করবে’। (৩১)এবং দ্বিতীয়টি এই- ‘তুমি তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতো মহব্বত করবে’। এই দুটোর চেয়ে উত্তম আর কোনো হুকুম নেই।”
(৩২)তখন সেই আলিম তাঁকে বললেন, “হুজুর, খুব ভালো কথা। আপনি সত্য কথাই বলেছেন যে, তিনি এক এবং অদ্বিতীয়, তাঁর শরিক নেই। (৩৩)আর সম্পূর্ণ হৃদয়, বুদ্ধি ও সামর্থ্য দিয়ে তাঁকে মহব্বত করা এবং প্রতিবেশীকে নিজের মতো মহব্বত করা সবরকমের দান ও কোরবানির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।” (৩৪)হযরত ইসা আ. যখন দেখলেন যে, তিনি বুদ্ধিমানের মতো উত্তর দিয়েছেন, তখন তাকে বললেন, “আল্লাহর রাজ্য থেকে তুমি বেশি দূরে নও।” এরপর থেকে তাঁকে আর কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে কারো সাহস হলো না।
(৩৫)বায়তুল-মোকাদ্দসে শিক্ষা দেবার সময় হযরত ইসা আ. জিজ্ঞেস করলেন, “আলিমরা কেমন করে বলে যে, মসিহ হযরত দাউদ আ.-র সন্তান? (৩৬)হযরত দাউদ আ. নিজেই তো আল্লাহর রুহের পরিচালনায় বলেছেন- ‘আল্লাহ আমার মনিবকে বললেন, যতোক্ষণ না আমি তোমার শত্রুদের তোমার পায়ের তলায় রাখি, ততোক্ষণ তুমি আমার ডান দিকে বসো।’ (৩৭)হযরত দাউদ আ. নিজেই যখন তাঁকে মুনিব বলেছেন, তখন কেমন করে মসিহ তার সন্তান হতে পারেন?” অনেক লোক আনন্দের সাথে তাঁর কথা শুনছিলো।
(৩৮)তাঁর শিক্ষার ভেতর তিনি বললেন, “আলিমদের সম্বন্ধে সাবধান হও। তারা লম্বা লম্বা জুব্বা পরে বেড়াতে, হাটবাজারে সালাম পেতে
(৩৯)এবং সিনাগোগের প্রধান আসনে ও ভোজসভায় সম্মানের জায়গায় বসতে চায়। (৪০)একদিকে তারা বিধবাদের ঘরবাড়ি দখল করে, অন্যদিকে দেখাবার জন্য লম্বা লম্বা মোনাজাত করে। নিশ্চয়ই এরা কঠিন শাস্তির অন্তর্ভুক্ত।”
(৪১)তিনি দানবাক্সের কাছে বসে লোকদের টাকাপয়সা দান করা লক্ষ্য করছিলেন। (৪২)অনেক ধনীলোক প্রচুর টাকা দান করলো। এক গরিব বিধবা এসে মাত্র দুটো তামার মুদ্রা রাখলো- যার মূল্য দু’আনার মতো। (৪৩)তখন তিনি হাওয়ারিদেরকে ডেকে বললেন, “আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, এই গরিব বিধবা অন্য সকলের চেয়ে অনেক বেশি দান করেছে। (৪৪)কেননা খরচ করার পরে যা বাকি ছিলো লোকেরা তা থেকে দান করেছে; কিন্তু এই মহিলার অভাব থাকা সত্ত্বেও বেঁচে থাকার জন্য তার যা ছিলো, সবই দান করেছে।”
(১)বায়তুল-মোকাদ্দস থেকে বেরিয়ে যাবার সময় হাওয়ারিদের মধ্যে একজন তাঁকে বললেন, “হুজুর, দেখুন, কেমন বাছাই করা পাথর আর কি অপূর্ব সুন্দর দালানগুলো!” (২)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “তুমি কি এই মস্ত বড় দালানগুলো দেখছো? কিন্তু এর একটি পাথরও আরেকটি পাথরের ওপর থাকবে না; সবই ভেঙে ফেলা হবে।”
(৩)অতঃপর তিনি বায়তুল-মোকাদ্দসের বিপরীত দিকের জৈতুন পাহাড়ের ওপর বসলে হযরত সাফওয়ান রা., হযরত ইয়াকুব রা., হযরত ইউহোন্না রা. ও হযরত আন্দ্রিয়ান রা. তাঁকে গোপনে জিজ্ঞেস করলেন- (৪)“আমাদের বলুন, কখন এসব ঘটবে? এসব সম্পন্ন হওয়ার চিহ্নই-বা কী হবে?”
(৫)তখন হযরত ইসা আ. তাদের বলতে লাগলেন, “সাবধান, কেউ যেনো তোমাদের না ঠকায়। (৬)অনেকেই আমার নাম নিয়ে এসে বলবে, ‘আমিই তিনি’ এবং তারা অনেককে বিপথে নিয়ে যাবে। (৭)যখন তোমরা যুদ্ধের আওয়াজ ও যুদ্ধের গুজব শুনবে, তখন ভয় পেয়ো না। এসব ঘটবেই কিন্তু তখনই শেষ নয়। (৮)জাতির বিরুদ্ধে জাতি, রাজ্যের বিরুদ্ধে রাজ্য দাঁড়াবে। জায়গায় জায়গায় ভূমিকম্প ও দুর্ভিক্ষ হবে। এসব কেবল প্রসব-বেদনার আরম্ভ।
(৯)তোমরা নিজেদের বিষয়ে সতর্ক থেকো, কারণ তারা তোমাদেরকে আদালতে সমর্পণ এবং সিনাগোগের ভেতর মারধর করবে। আমার জন্য দেশের শাসনকর্তা ও রাজাদের সামনে তোমাদের দাঁড়াতে হবে। তাদের সামনে আমার বিষয়ে তোমাদের সাক্ষ্য দিতে হবে। (১০)এবং সমস্ত জাতির কাছে প্রথমে অবশ্যই ইঞ্জিল প্রচার করতে হবে।
(১১)যখন তারা তোমাদের ধরে বিচারের জন্য নিয়ে যাবে, তখন যা বলতে হবে তা আগে থেকে চিন্তা কোরো না। সেই সময়ে যেকথা তোমাদের বলে দেয়া হবে, তোমরা তাই বলবে; কারণ তোমরাই যে বলবে তা নয়, বরং আল্লাহর রুহেই কথা বলবেন।
(১২)ভাই ভাইকে, পিতা সন্তানকে মেরে ফেলার জন্য ধরিয়ে দেবে। সন্তানেরা বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাদের হত্যা করাবে। (১৩)আমার নামের জন্য তোমরা সকলের কাছে ঘৃণিত হবে কিন্তু যে শেষ পর্যন্ত স্থির থাকবে সে নাজাত পাবে।
(১৪)সর্বনাশা ঘৃণার জিনিস যেখানে থাকা উচিত নয় তোমরা যখন তা সেখানে থাকতে দেখবে- যে পড়ে সে বুঝুক- তখন যারা ইহুদিয়াতে থাকবে তারা পাহাড়ি এলাকায় পালিয়ে যাক। (১৫)যে ছাদের ওপর থাকবে সে নিচে না নামুক কিংবা কিছু নেবার জন্য তার ঘরের ভেতরে না যাক। (১৬)যে ক্ষেতের মধ্যে থাকবে সে তার গায়ের চাদর নেবার জন্য না ফিরুক। (১৭)যারা গর্ভবতী এবং যারা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ায় তাদের জন্য সেই দিনগুলো কতোই-না বেদনার!
(১৮)মোনাজাত করো এসব যেনো শীতকালে না হয়। (১৯)কারণ সেই সময় এমন কষ্ট হবে, যা আল্লাহ পাকের সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত হয়নি এবং আগামীতেও হবে না। (২০)আল্লাহ যদি সেই দিনগুলো কমিয়ে না দেন তাহলে কেউই রক্ষা পাবে না; কিন্তু তাঁর মনোনীতদের জন্য সেই দিনগুলো তিনি কমিয়ে দেবেন।
(২১)সেই সময় কেউ যদি তোমাদের বলে, ‘দেখো, মসিহ এখানে!’ বা ‘দেখো, মসিহ ওখানে!’ তাদের বিশ্বাস কোরো না। (২২)ভণ্ড মসিহেরা ও ভণ্ড নবিরা আসবে এবং অনেক আশ্চর্য কাজ ও চিহ্ন দেখাবে, যেনো সম্ভব হলে মনোনীত লোকদেরকে বিভ্রান্ত করতে পারে। (২৩)কিন্তু তোমরা সতর্ক থেকো। আমি তোমাদের আগেই সবকিছু বলে রাখলাম।
(২৪)সেই সময়ের কষ্টের ঠিক পরেই সূর্য অন্ধকার হয়ে যাবে, চাঁদ আর আলো দেবে না; (২৫)তারাগুলো আসমান থেকে খসে পড়বে এবং সৌরজগত দুলতে থাকবে। (২৬)সেই সময় তারা ইবনুল-ইনসানকে মহাশক্তি ও মহিমার সাথে মেঘে চড়ে আসতে দেখবে।
(২৭)অতঃপর তিনি ফেরেস্তাদের পাঠিয়ে আসমান-জমিনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত চারদিক থেকে তাঁর মনোনীতদের একত্র করবেন।
(২৮)ডুমুর গাছ দেখে শিক্ষা নাও। যখন তার ডালপালা নরম হয়ে তাতে পাতা গজায়, তখন তোমরা জানতে পারো যে, গরমকাল এসেছে। (২৯)সেভাবে যখন তোমরা দেখবে এসব ঘটছে, তখন বুঝতে পারবে যে, তিনি কাছে এসেছেন, এমনকি দরজায় উপস্থিত। (৩০)আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, যতোক্ষণ এসব না ঘটবে ততোক্ষণ এ-কালের লোকেরা টিকে থাকবে।
(৩১)আসমান ও জমিন শেষ হয়ে যাবে কিন্তু আমার কথা চিরদিন থাকবে। (৩২)সেই দিন ও সেই সময়ের কথা কেউই জানে না- বেহেস্তের ফেরেস্তারাও না, আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজনও না, কেবল প্রতিপালক আল্লাহই জানেন।
(৩৩)সাবধান হও, জেগে থাকো, কারণ সেই সময় কখন আসবে তা তোমরা জানো না। (৩৪)যেমন ধরো, এক লোক, যে ভ্রমণে যাচ্ছে, বাড়ি ছেড়ে যাবার আগে সে তার গোলামদের হাতে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলো। সে প্রত্যেক গোলামকে তার কাজ দিলো এবং দারোয়ানকে জেগে থাকতে বললো।
(৩৫)কাজেই তোমরা জেগে থাকো, কারণ বাড়ির মালিক সন্ধ্যায়, কি মাঝরাতে, কি মোরগ ডাকার সময়, কি সূর্য ওঠার সময় আসবে তা তোমরা জানো না। (৩৬)হঠাৎ এসে সে যেনো না দেখে যে, তোমরা ঘুমিয়ে রয়েছো। (৩৭)তোমাদের যা বলছি তা সবাইকে বলি, জেগে থাকো।”
(১)ইদুল-ফেসাখ ও ইদুল-মাত্-ছের তখন মাত্র দু’দিন বাকি। এই সময় প্রধান ইমামেরা ও আলিমরা গোপনে ইসাকে ধরে মেরে ফেলার উপায় খুঁজছিলেন। (২)কিন্তু তারা বললেন, “ইদের সময়ে নয়, তাতে লোকদের মধ্যে গোলমাল হতে পারে।”
(৩)অতঃপর তিনি বেথানিয়ার কুষ্ঠী সিমোনের বাড়িতে পৌঁছলেন। তিনি খেতে বসার পর এক মহিলা একটি সাদা পাথরের পাত্রে করে খুব দামি ও খাঁটি সুগন্ধি তেল নিয়ে এলো এবং পাত্রটি ভেঙে তা তাঁর মাথায় ঢেলে দিলো। (৪)কিন্তু উপস্থিত লোকদের মধ্যে কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে একে অন্যকে বলতে লাগলেন, “এভাবে কেনো এই সুগন্ধি তেল অপচয় করা হলো? (৫)এটি বিক্রি করলে তো তিনশো দিনারেরও বেশি হতো এবং তা গরিবদের দেয়া যেতো।” তারা তাকে দোষারোপ করতে লাগলেন।
(৬)কিন্তু হযরত ইসা আ. বললেন, “থামো, কেনো তোমরা তাকে দুঃখ দিচ্ছো? সে তো আমার জন্য উত্তম কাজই করেছে। (৭)গরিবরা সব সময়ই তোমাদের মধ্যে আছে আর যখন ইচ্ছা তখনই তোমরা তাদের দয়া দেখাতে পারো; কিন্তু আমাকে তোমরা সব সময় পাবে না। (৮)তার যা করণীয় ছিলো সে তা-ই করেছে; সময়ের আগেই সে আমার শরীরকে অভিষিক্ত করে দাফনের জন্য প্রস্তুত করেছে। (৯)আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, দুনিয়ার যে-জায়গায় ইঞ্জিল প্রচার করা হবে, সেখানে এই মহিলার কথা মনে করিয়ে দেবার জন্য তার এই কাজের কথাও বলা হবে।”
(১০)এর পরে হযরত ইহুদা ইস্কারিয়োত রা.- সেই বারোজনের মধ্যে একজন- প্রধান ইমামদের কাছে গেলেন, যেনো তাঁকে তাদের হাতে তুলে দিতে পারেন। (১১)তারা তার কথা শুনে আনন্দিত হলেন এবং তাকে টাকা দেবেন বলে ওয়াদা করলেন। সুতরাং তিনি তাঁকে তুলে দেবার জন্য সুযোগ খুঁজতে লাগলেন।
(১২)ইদুল-মাত্ছের প্রথম দিনে ইদুল-ফেসাখের ভোজের জন্য বাচ্চা-ভেড়া কোরবানি করা হতো। তাঁর হাওয়ারিরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার জন্য আমরা কোথায় গিয়ে ইদুল-ফেসাখের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করবো, যেনো আপনি গিয়ে খেতে পারেন?”
(১৩)তখন তিনি তাঁর দু’জন সাহাবিকে এই বলে পাঠিয়ে দিলেন, “তোমরা শহরে যাও। সেখানে এমন এক লোকের দেখা পাবে, যে একটি কলসে করে পানি নিয়ে যাচ্ছে। তার পেছনে পেছনে যেয়ো। (১৪)সে যে-বাড়িতে ঢুকবে, সেই বাড়ির মালিককে বলো, ‘হুজুর বলছেন, আমার হাওয়ারিদের নিয়ে ইদুল-ফেসাখের খাওয়া-দাওয়া করার জন্য আমার সেই মেহমানখানা কোথায়?’
(১৫)সে তোমাদের ওপরতলার একটি সাজানো বড়ো রুম দেখিয়ে দেবে। সেখানেই আমাদের জন্য সবকিছু প্রস্তুত করো।” (১৬)সুতরাং হাওয়ারিরা গিয়ে শহরে ঢুকলেন; আর তিনি যেমন বলেছিলেন, তারা সবকিছু তেমনই দেখতে পেলেন এবং তারা ইদুল-ফেসাখের আয়োজন করলেন।
(১৭)সন্ধ্যায় তিনি সেই বারোজনকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। (১৮)তারা যখন বসে খাচ্ছিলেন, তখন হযরত ইসা আ. বললেন, “আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, তোমাদের মধ্যে একজন আমার সাথে বেইমানি করবে, আর সে আমার সাথে খাচ্ছে।” (১৯)তারা দুঃখিত হলেন এবং একজনের পর একজন বলতে লাগলেন, “নিশ্চয়ই আমি না?” (২০)তিনি তাদের বললেন, “সে এই বারোজনের মধ্যে একজন, যে আমার সাথে বাটির মধ্যে রুটি ডোবাচ্ছে।
(২১)ইবনুল-ইনসানের বিষয়ে যেভাবে লেখা আছে, তিনি সেভাবেই যাচ্ছেন কিন্তু আফসোস সেই লোকের জন্য, যে তাঁকে তুলে দেবে! তার জন্ম না হলেই বরং তার জন্য ভালো হতো।”
(২২)খাওয়া-দাওয়া চলছে, এমন সময় তিনি রুটি নিয়ে শুকরিয়া জানালেন এবং তা ভেঙে হাওয়ারিদের হাতে দিয়ে বললেন, “নাও, এটি আমার শরীর।” (২৩)তারপর তিনি গ্লাস নিয়ে শুকরিয়া জানালেন এবং তাদের দিলেন। তারা সকলে সেই গ্লাস থেকে পান করলেন।
(২৪)তিনি তাদের বললেন, “এ আমার ওয়াদা-চুক্তির রক্ত, যা অনেকের জন্যই দেয়া হবে। (২৫)আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, আল্লাহর রাজ্যে নতুনভাবে আঙুররস পানের আগে আর কখনোই আমি তা পান করবো না।”
(২৬)অতঃপর তারা একটি হামদ গেয়ে জৈতুন পাহাড়ে গেলেন। (২৭)হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “তোমরা প্রত্যেকে বাধা পাবে; কারণ লেখা আছে, ‘আমি রাখালকে আঘাত করবো এবং ভেড়াগুলো ছড়িয়ে পড়বে।’ (২৮)কিন্তু মৃত থেকে জীবিত হওয়ার পর আমি তোমাদের আগেই গালিলে যাবো।”
(২৯)হযরত সাফওয়ান রা. তাঁকে বললেন, “সবাই আপনাকে ছেড়ে গেলেও আমি যাবো না।” (৩০)হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “আমি তোমাকে সত্যিই বলছি, আজ রাতে মোরগ দু’বার ডাকার আগেই তুমি আমাকে তিনবার অস্বীকার করবে। (৩১)কিন্তু তিনি আরো নিশ্চয়তার সাথে বললেন, “যদি আমাকে আপনার সাথে মরতেও হয়, তবুও আমি আপনাকে অস্বীকার করবো না!” এবং তারা সকলে একই কথা বললেন।
(৩২)অতঃপর তারা গেতসিমানি নামে একটি জায়গায় এলেন এবং তিনি তাঁর হাওয়ারিদেরকে বললেন, “আমি যতোক্ষণ মোনাজাত করি, ততোক্ষণ তোমরা এখানে বসে থাকো।” (৩৩)তিনি হযরত সাফওয়ান রা., হযরত ইয়াকুব রা. ও হযরত ইউহোন্না রা.-কে নিজের সাথে নিলেন এবং মনে গভীর দুঃখ ও অশান্তিবোধ করতে লাগলেন। (৩৪)তিনি তাদের বললেন, “দুঃখে যেনো আমার প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। তোমরা এখানে থাকো এবং জেগে থাকো।”
(৩৫)অতঃপর তিনি কিছুটা দূরে গিয়ে মাটিতে সেজদায় পড়ে মোনাজাত করলেন যে, সম্ভব হলে এই সময়টি যেনো তার কাছ থেকে সরে যায়।
(৩৬)তিনি বললেন, “হে আমার আল্লাহ্, আমার প্রতিপালক, তোমার পক্ষে সবই সম্ভব; এই গ্লাস আমার কাছ থেকে সরিয়ে নাও; তবু আমার ইচ্ছামতো না হোক কিন্তু তোমার ইচ্ছামতোই হোক।”
(৩৭)তিনি ফিরে এসে দেখলেন তারা ঘুমোচ্ছেন। তিনি হযরত সাফওয়ান রা.-কে বললেন, “হযরত সাফওয়ান রা., তুমি কি ঘুমাচ্ছো? তুমি কি এক ঘন্টাও জেগে থাকতে পারলে না? (৩৮)জেগে থাকো ও মোনাজাত করো, যেনো পরীক্ষায় না পড়ো। রুহে ইচ্ছা আছে বটে কিন্তু দেহ দুর্বল।”
(৩৯)আবার তিনি ফিরে গিয়ে সেই একই মোনাজাত করলেন (৪০)এবং ফিরে এসে দেখলেন তারা ঘুমাচ্ছেন, কারণ তাদের চোখ ভারি হয়ে এসেছিলো; আর তারা বুঝতে পারলেন না যে, তাঁকে তারা কী উত্তর দেবেন।
(৪১)তৃতীয়বার ফিরে এসে তিনি তাদের বললেন, “এখনো তোমরা ঘুমাচ্ছো আর বিশ্রাম করছো? যথেষ্ট হয়েছে। সময় এসে পড়েছে। দেখো, ইবনুল-ইনসানকে গুনাহগারদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। (৪২)ওঠো, চলো, আমরা যাই। যে আমাকে শত্রুদের হাতে তুলে দেবে, সে এসে পড়েছে।”
(৪৩)তিনি যখন কথা বলছেন, তখনই ইহুদা- সেই বারোজনের একজন- সেখানে এলেন। তার সাথে অনেক লোক তরবারি ও লাঠি নিয়ে এলো। প্রধান ইমামেরা, আলিমরা ও বুজুর্গরা এই লোকদের পাঠিয়েছিলেন। (৪৪)যিনি তাঁকে তুলে দিয়েছিলেন, তিনি ওই লোকদের সাথে একটি চিহ্ন ঠিক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “যাঁকে আমি চুমু দেবো, তিনিই সেই লোক। তোমরা তাঁকে ধরে পাহারা দিয়ে নিয়ে যেয়ো।” (৪৫)ইহুদা তখনই তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, “হুজুর!” এবং তাঁকে চুমু দিলেন।
(৪৬)অতঃপর তাঁর ওপর হাত বাড়িয়ে তারা তাঁকে ধরলো। (৪৭)কিন্তু যারা হযরত ইসা আ.-র কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাদের একজন তার তরবারি বের করলেন এবং মহাইমামের গোলামকে আঘাত করে তার একটি কান কেটে ফেললেন।
(৪৮)তখন হযরত ইসা আ. তাদের বললেন, “চোর ধরার মতো করে তোমরা কি তরবারি ও লাঠি নিয়ে আমাকে ধরতে এসেছো? (৪৯)আমি প্রত্যেক দিনই বায়তুল-মোকাদ্দসে তোমাদের মাঝে শিক্ষা দিয়েছি কিন্তু তোমরা আমাকে ধরোনি। অবশ্য পাককিতাবের কথা পূর্ণ হতে হবে। (৫০)তারা সবাই তাঁকে ছেড়ে পালিয়ে গেলেন।
(৫১)কোনো এক যুবক গায়ে শুধু লিনেন কাপড়ের চাদর জড়িয়ে তাঁর পেছনে পেছনে যাচ্ছিলো। (৫২)তারা তাকে ধরলো কিন্তু সে চাদরটি ফেলে দিয়ে উলঙ্গ অবস্থায় পালিয়ে গেলো।
(৫৩)তারা হযরত ইসা আ.কে মহাইমামের কাছে নিয়ে গেলো। সেখানে বুজুর্গরা, আলিমরা ও প্রধান ইমামেরা একত্রিত হলেন। (৫৪)হযরত সাফওয়ান রা. দূরে দূরে থেকে তাঁর পেছনে পেছনে মহা-ইমামের উঠোনে গিয়ে ঢুকলেন এবং পাহারাদারদের সাথে বসে আগুন পোহাতে লাগলেন।
(৫৫)প্রধান ইমামেরা এবং মহাসভার সবাই হযরত ইসা আ.কে মেরে ফেলার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষীর খোঁজ করছিলেন; কিন্তু তারা কাউকেই পেলেন না। (৫৬)অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিলো কিন্তু তাদের সাক্ষ্য মিললো না।
(৫৭)তখন কয়েকজন উঠে তাঁর বিরুদ্ধে এই মিথ্যা সাক্ষ্য দিলো- (৫৮)“আমরা ওকে একথা বলতে শুনেছি, ‘আমি মানুষের তৈরি এই বায়তুল-মোকাদ্দস ভেঙে ফেলবো এবং তিন দিনের মধ্যে আমি আরেকটি গড়বো, যা মানুষের তৈরি নয়’।” (৫৯)তবুও তাদের সাক্ষ্য মিললো না।
(৬০)তখন মহাইমাম মাঝখানে দাঁড়িয়ে হযরত ইসা আ.কে জিজ্ঞেস করলেন, “এসব লোক তোমার বিরুদ্ধে যেসব সাক্ষ্য দিচ্ছে, তুমি কি তার কোনো উত্তরই দেবে না?” (৬১)কিন্তু তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করেই রইলেন। মহাইমাম আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি মসিহ, সর্বশক্তিমান আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন?”
(৬২)হযরত ইসা আ. বললেন, “আমিই তিনি। আপনারা ইবনুল-ইনসানকে সর্বশক্তিমানের ডান দিকে বসে থাকতে এবং আসমানের মেঘের সাথে আসতে দেখবেন।” (৬৩)মহাইমাম তার কাপড় ছিঁড়ে বললেন, “আমাদের আর সাক্ষীর কী দরকার? (৬৪)আপনারা তো শুনলেন যে, সে কুফরি করলো! আপনাদের সিদ্ধান্ত কী?” (৬৫)তারা সকলে তাঁকে মৃত্যুর উপযুক্ত বলে স্থির করলেন। কয়েকজন তাঁর গায়ে থুথু দিলো এবং কাপড় দিয়ে তাঁর চোখ বেঁধে ঘুষি মেরে বললো, “ভবিষ্যদ্বাণী বলো দেখি!” পাহারাদাররাও তাঁকে মারতে মারতে নিজেদের জিম্মায় নিলো।
(৬৬)হযরত সাফওয়ান রা. যখন আদালতের উঠোনের নিচের দিকে ছিলেন, তখন মহা-ইমামের এক চাকরানী সেখানে এলো।
(৬৭)সে হযরত সাফওয়ান আ.কে আগুন পোহাতে দেখলো এবং একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো, “আপনিও তো ওই নাসরতের হযরত ইসা আ.র সাথে ছিলেন।” (৬৮)কিন্তু তিনি অস্বীকার করে বললেন, “তুমি যা বলছো তা আমি জানিও না, বুঝিও না।” অতঃপর তিনি বাইরের দরজার কাছে গেলেন আর একটি মোরগ ডেকে উঠলো। (৬৯)চাকরানী তাকে আবার দেখতে পেলো এবং যারা সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো তাদের বলতে লাগলো, “এই লোকটি ওদেরই একজন।”
(৭০)কিন্তু তিনি আবার অস্বীকার করলেন। যারা কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো, তারাও কিছুক্ষণ পর হযরত পিতর রা.কে বললো, “নিশ্চয়ই তুমি ওদের একজন, কারণ তুমি তো গালিলের লোক।” (৭১)কিন্তু তিনি নিজেকে অভিশাপ দিলেন এবং কসম খেয়ে বললেন, “তোমরা যাঁর কথা বলছো, আমি তাঁকে চিনি না!” (৭২)আর তখনই দ্বিতীয়বার মোরগ ডেকে উঠলো। হযরত ইসা আ. যে বলেছিলেন, “মোরগ দু’বার ডাকার আগেই তুমি আমাকে তিনবার অস্বীকার করবে,”- সেকথা তখন হযরত সাফওয়ান রা.র মনে পড়লো এবং তাতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
(১)ফজরের পরেই প্রধান ইমামেরা বুজুর্গ, আলেম ও মহাসভার সমস্ত লোকের সাথে পরামর্শ করলেন। তারা হযরত ইসা আ.কে বেঁধে নিয়ে পিলাতের হাতে দিলেন। (২)পিলাত তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি ইহুদিদের বাদশা?” তিনি তাকে উত্তর দিলেন, “আপনিই বললেন।”
(৩)তখন প্রধান ইমামেরা তাঁকে অনেক দোষ দিলেন। (৪)পিলাত আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি কোনো উত্তর দেবে না? দেখো, তারা তোমাকে কতো দোষ দিচ্ছেন।” (৫)কিন্তু হযরত ইসা আ. আর কোনো উত্তর দিলেন না। এতে পিলাত আশ্চর্য হলেন।
(৬)ইদের সময় লোকেরা যে-কয়েদিকে চাইতো, তিনি তাকে ছেড়ে দিতেন। (৭)সেই সময় বারাব্বা নামে এক লোক বিদ্রোহীদের সাথে জেলখানায় বন্দি ছিলো। বিদ্রোহের সময় সে হত্যা করেছিলো। (৮)সুতরাং লোকেরা পিলাতের কাছে এসে সাধারণত তিনি যা করে থাকেন, তাদের জন্য তাই করতে বললো।
(৯)অতঃপর তিনি তাদের বললেন, “তোমরা কি চাও যে, আমি ইহুদিদের বাদশাকে তোমাদের জন্য ছেড়ে দেই?” (১০)প্রধান ইমামেরা যে হিংসা করেই তাঁকে তার হাতে দিয়েছেন, তিনি তা বুঝতে পেরেছিলেন। (১১)কিন্তু প্রধান ইমামেরা লোকদের উসকে দিলেন, যেনো তাঁর পরিবর্তে বারাব্বাকে তিনি তাদের কাছে মুক্তি দেন।
(১২)পিলাত আবার তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে তোমরা যাকে ইহুদিদের বাদশা বলো, তাকে আমি কী করবো?” (১৩)তারা আবার চেঁচিয়ে বললো, “ওকে সলিবে দিন!” (১৪)পিলাত তাদের বললেন, “কেনো, সে কী দোষ করেছে?” কিন্তু তারা আরো জোরে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো, “ওকে সলিবে দিন!”
(১৫)সুতরাং পিলাত জনতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য তখন বারাব্বাকে তাদের কাছে ছেড়ে দিলেন আর হযরত ইসা আ.কে চাবুক মেরে সলিবে দেবার জন্য দিয়ে দিলেন। (১৬)তারপর সৈন্যরা তাঁকে প্রাসাদের উঠোনে- যা ছিলো প্রধান শাসনকর্তার কার্যালয়- নিয়ে গেলো। সেখানে তারা অন্যসব সৈন্যকে একত্রিত করলো। (১৭)তারা তাঁকে বেগুনি রঙের কাপড় পরালো আর কাঁটার মুকুট গেঁথে তাঁর মাথায় পরিয়ে দিলো (১৮)এবং তাঁকে স্বাগত জানিয়ে বলতে লাগলো, “খোশ আমদেদ, ইহুদিরাজ!”
(১৯)তারা একটি লাঠি দিয়ে তাঁর মাথায় বারবার আঘাত করতে লাগলো এবং তাঁর গায়ে থুথু দিলো আর হাঁটু গেড়ে তাঁকে সম্মান দেখাবার ভান করলো। (২০)এভাবে তাঁকে ঠাট্টা-তামাসা করার পর তারা ওই বেগুনি রঙের কাপড় খুলে তাঁকে তাঁর নিজের কাপড় পরিয়ে দিলো এবং সলিবে দিয়ে হত্যা করার জন্য নিয়ে চললো।
(২১)সিমোন নামে কুরিনীয় এক লোক গ্রামের দিক থেকে এসে সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলো। সে ছিলো আলেকজান্ডার ও রুফের বাবা। তাকেই তারা হযরত ইসা আ.র সলিব বহন করতে বাধ্য করলো। (২২)তারা হযরত ইসা আ.কে ‘গল্গথা’ অর্থাৎ ‘মাথার খুলির স্থান’ নামে একটি জায়গায় নিয়ে গেলো (২৩)এবং তাঁকে গন্ধরস মেশানো আঙুররস খেতে দিলো কিন্তু তিনি তা খেলেন না।
(২৪)অতঃপর তারা তাঁকে সলিবে দিলো। তাঁর কাপড়-চোপড় ভাগ করে নিলো এবং কার ভাগে কী পড়ে তা ঠিক করার জন্য ভাগ্য পরীক্ষা করলো।
(২৫)সকাল ন’টায় তারা তাঁকে সলিবে দিলো। (২৬)তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগনামায় লেখা হলো, “এ ইহুদিদের মনোনীত বাদশা”। (২৭,২৮)তারা দু’জন ডাকাতকেও তাঁর সাথে সলিবে দিলো- একজনকে ডান দিকে ও অন্যজনকে বাঁ দিকে।
(২৯)যারা সে-পথ দিয়ে যাচ্ছিলো, তারা মাথা নেড়ে তাঁকে ঠাট্টা করে বললো, “এই যে, তুমি না বায়তুল-মোকাদ্দস ভেঙে আবার তিন দিনের ভেতর তা তৈরি করতে পারো! (৩০)এখন সলিব থেকে নেমে এসে নিজেকে রক্ষা করো।” (৩১)একইভাবে প্রধান ইমামেরা ও আলিমরা তাঁকে ঠাট্টা করার উদ্দেশ্যে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন, “সে অন্যদের রক্ষা করতো কিন্তু নিজেকে রক্ষা করতে পারে না! (৩২)ওই যে মসিহ, ইস্রাইলের বাদশা! সলিব থেকে সে নেমে আসুক, যেনো আমরা দেখে ইমান আনতে পারি।” তাঁর সাথে যাদের সলিবে দেয়া হয়েছিলো, তারাও তাঁকে বিদ্রুপ করলো।
(৩৩)দুপুর বারোটা থেকে বেলা তিনটে পর্যন্ত গোটা দেশ অন্ধকার হয়ে রইলো। (৩৪)বেলা তিনটের সময় ইসা চিৎকার করে বললেন, “এলোই, এলোই, লেমা সাবাক্তানি?” অর্থাৎ “আল্লাহ আমার, আল্লাহ আমার, কেনো তুমি আমাকে ত্যাগ করেছো?” (৩৫)যারা কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো, তাদের কয়েকজন একথা শুনে বললো, “শোনো, শোনো, ও হযরত ইলিয়াসকে ডাকছে।” (৩৬)এক লোক দৌড়ে গিয়ে একটি স্পঞ্জ তেতো আঙুররসে ভেজালো এবং তা একটি লাঠির মাথায় লাগিয়ে তাঁকে পান করতে দিলো। বললো, “থাক, দেখি, ইলিয়াস ওকে নামিয়ে নিতে আসেন কিনা।”
(৩৭)অতঃপর হযরত ইসা আ. চিৎকার করে ইন্তেকাল করলেন। (৩৮)তখন বায়তুল-মোকাদ্দসের পর্দাটি ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত চিরে দু’ভাগ হয়ে গেলো। (৩৯)যে লেফটেন্যান্ট তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি তাঁকে এভাবে ইন্তেকাল করতে দেখে বললেন, “নিশ্চয়ই ইনি আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন ছিলেন।”
(৪০)সেখানে কয়েকজন মহিলা দূরে দাঁড়িয়ে এসব দেখছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মগ্দলিনি মরিয়ম, ছোটো-ইয়াকুব ও জোসির মা মরিয়ম আর সালোমি।
(৪১)তিনি যখন গালিলে ছিলেন, তখন এরা তাঁর সাথে সব জায়গায় যেতেন এবং তাঁর সেবা করতেন। আরো অনেক মহিলা সেখানে ছিলেন, এরা তাঁর সাথে সাথে জেরুসালেমে এসেছিলেন।
(৪২)এটি ছিলো প্রস্তুতির দিন অর্থাৎ সাব্বাতের আগের দিন।
(৪৩)সন্ধ্যার দিকে অরিমাথিয়া গ্রামের হযরত ইউসুফ র.- যিনি মহাসভার একজন সম্মানিত সদস্য ছিলেন এবং আল্লাহর রাজ্যের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন- সাহসের সাথে পিলাতের কাছে গিয়ে হযরত ইসা আ.র দেহমোবারক চাইলেন।
(৪৪)তিনি যে এতো তাড়াতাড়ি ইন্তেকাল করেছেন, এতে পিলাত আশ্চর্য হলেন। সত্যি সত্যি তিনি ইন্তেকাল করেছেন কিনা তা লেফটেন্যান্টকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন। (৪৫)তার কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে তিনি দেহমোবারক হযরত ইউসুফ র.-কে দিলেন। (৪৬)হযরত ইউসুফ র. গিয়ে লিনেন কাপড় কিনে আনলেন এবং দেহমোবারক নামিয়ে সেই কাফনে জড়ালেন আর পাহাড় কেটে তৈরি করা একটি কবরে সেই দেহমোবারক দাফন করলেন। অতঃপর তিনি কবরের মুখে একটি পাথর গড়িয়ে দিলেন। (৪৭)দেহমোবারক কোথায় দাফন করা হলো তা মগ্দলিনি মরিয়ম ও জোসির মা মরিয়ম দেখলেন।
(১)সাব্বাত পার হয়ে গেলে মগ্দলিনি মরিয়ম, হযরত ইয়াকুব আ.র মা মরিয়ম এবং সালোমি হযরত ইসা আ.-র দেহমোবারকে মাখানোর জন্য সুগন্ধিদ্রব্য কিনে আনলেন; (২)এবং সপ্তাহের প্রথম দিনের ফজরে সূর্য ওঠার সাথে সাথে কবরের কাছে এলেন। (৩)তারা একে অন্যকে জিজ্ঞেস করছিলেন, “আমাদের হয়ে কবরের মুখ থেকে কে ওই পাথরটি সরিয়ে দেবে?”
(৪)এমন সময় তারা চেয়ে দেখলেন যে, পাথরটি সরানো হয়েছে- এটি ছিলো খুবই বড়ো। (৫)কবরের ভেতরে ঢুকে তারা দেখলেন, সাদা কাপড় পরা এক যুবক ডান দিকে বসে আছেন। এতে তারা খুব আশ্চর্য হলেন। (৬)তিনি তাদের বললেন, “আশ্চর্য হয়ো না; তোমরা তো খুঁজছো নাসরতের হযরত ইসা আ.কে, যাঁকে সলিবে দেয়া হয়েছিলো। তিনি জীবিত হয়ে উঠেছেন; তিনি এখানে নেই। দেখো, এখানেই তারা তাঁকে দাফন করেছিলো। (৭)কিন্তু তোমরা গিয়ে তাঁর হাওয়ারিদেরকে ও হযরত সাফওয়ান রা.কে একথা বলো যে, তিনি তোমাদের আগে গালিলে যাচ্ছেন; তিনি যেমন বলেছিলেন, তেমনই তোমরা তাঁকে সেখানে দেখতে পাবে।”
(৮)তখন তারা কবর থেকে বেরিয়ে দ্রুত পালিয়ে গেলেন, কারণ তারা ভয়ে-বিস্ময়ে কাঁপছিলেন। তারা এতো ভয় পেয়েছিলেন যে, কাউকেই কিছু বললেন না।
(৯)সপ্তাহের প্রথম দিনে ভোরে মৃত্যু থেকে জীবিত হয়ে উঠার পর তিনি প্রথমে মºলিনি মারিয়াম কে দেখা দিলেন। এই মরিয়মের ভেতর থেকে তিনি সাতটি ভূত ছাড়িয়েছিলেন। (১০)তিনি গিয়ে যারা তাঁর সাথে থাকতেন, তাদেরকে খবর দিলেন। সে সময় তারা দুঃখ করছিলেন ও কাঁদছিলেন। (১১)কিন্তু তিনি জীবিত হয়েছেন ও তাকে দেখা দিয়েছেন, একথা তারা বিশ্বাস করলেন না।
(১২)অতঃপর তাদের মধ্যে দু’জন যখন হেঁটে গ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি অন্যরকম চেহারায় তাদের দেখা দিলেন। তারা ফিরে গিয়ে বাকি সবাইকে সে-খবর দিলেন, (১৩)কিন্তু তাদেরকেও তারা বিশ্বাস করলেন না।
(১৪)এরপর সেই এগারোজন খেতে বসলে তিনি তাদের দেখা দিলেন। ইমানের অভার ও হৃদয়ের কঠিনতার জন্য তিনি তাদের তিরস্কার করলেন। কারণ তিনি জীবিত হয়ে উঠার পর যারা তাঁকে দেখেছিলেন, তাদের তারা বিশ্বাস করেননি।
(১৫)অতঃপর তিনি তাদের বললেন, “তোমরা দুনিয়ার সমস্ত জায়গায় যাও এবং সমস্ত সৃষ্টির কাছে ইঞ্জিল প্রচার করো। যে ইমান আনে এবং বায়াত গ্রহন করে, সে নাজাত পাবে, কিন্তু যে ইমান আনবে না নিশ্চয়ই সে জাহান্নামিদের অর্ন্তভুক্ত। ইমানদারদের মধ্যে এই চিহ্নগুলো দেখা যাবে- আমার নাতে তারা ভুত ছাড়াবে। তারা নতুন নতুন ভাষায় কথা বলবে। তারা হাতেকরে সাপ তুলে ধরবে। যদি তারা ভীষণ বিষাক্ত কিছু খায়. তাতে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না।”
(১৬)তাদের কাছে এসব কথা বলার পর হযরত ইসা আ. -কে বেহেস্তে তুলে নেয়া হলো। সেখানে তিনি আল্লাহর ডান পাশে বসলেন। অতঃপর তারা ফিরে গিয়ে সব জায়গায় ইঞ্জিল প্রচার করতে লাগলেন এবং আল্লাহ তাদের মধ্য দিয়ে কাজ করতে ও তাদের আশ্চর্য কাজ দ্বারা কালামের সত্যতা প্রমান করতে থাকলেন।