হাওয়ারিনামা

263092
Total
Visitors

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১,২)মাননীয় থিয়ফিল, হযরত ইসা আ.কে বেহেস্তে তুলে নেবার আগ পর্যন্ত তিনি যা করেছিলেন ও শিক্ষা দিয়েছিলেন, তার সমস্তই আমি আগের কিতাবে লিখেছি। যে হাওয়ারিদের তিনি বেছে নিয়েছিলেন, তাঁকে তুলে নেবার আগে তিনি তাদের আল্লাহর রুহের মধ্য দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন। (৩)তাঁর দুঃখভোগের পরে তাদের কাছে তিনি দেখা দিয়েছিলেন এবং তিনি যে জীবিত আছেন, তার অনেক বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিয়েছিলেন। চল্লিশ দিন পর্যন্ত তিনি তাঁদের দেখা দিয়ে আল্লাহর রাজ্যের বিষয়ে বলেছিলেন। (৪)সেই সময় যখন তিনি তাদের সংগে ছিলেন, তখন তাদের এই হুকুম দিয়েছিলেন, যেনো তারা জেরুসালেম ছেড়ে না-যান, বরং আল্লাহর ওয়াদা করা দানের জন্য অপেক্ষা করেন।

(৫)তিনি বলেছিলেন, “তোমরা আমার কাছে শুনেছো যে, যদিও হযরত ইয়াহিয়া আ. পানিতে বায়াত দিতেন; কিন্তু আর বেশি দিন দেরি নেই, আল্লাহর রুহে তোমাদের বায়াত দেয়া হবে।” (৬)তাই পরে যখন তাঁরা এক সংগে মিলিত হলেন, তখন তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “হুজুর, এই সময় কি আপনি বনি-ইস্রায়েলের হাতে রাজ্য ফিরিয়ে দেবেন?” (৭)উত্তরে তিনি বললেন, “যেদিন বা সময় প্রতিপালক নিজের অধিকারে রেখেছেন, তা তোমাদের জানার বিষয় নয়। (৮)কিন্তু আল্লাহর রুহ তোমাদের ওপর এলে পর তোমরা শক্তি পাবে; আর জেরুসালেম, সমগ্র ইহুদিয়া ও সামেরিয়া প্রদেশ এবং দুনিয়ার শেষ সীমা পর্যন্ত তোমরা আমার সাক্ষী হবে।”

(৯)একথা বলার পরে তাঁদের চোখের সামনেই তাঁকে তুলে নেয়া হলো এবং একখন্ড মেঘ তাঁকে তাদের চোখের আড়াল করে দিলো। (১০)তিনি যখন উপরে উঠে যাচ্ছিলেন এবং তারা একদৃষ্টে আসমানের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তখনই সাদা কাপড় পরা দু’জন লোক তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, (১১)“হে গালিলের লোকেরা, এখানে দাঁড়িয়ে আসমানের দিকে তাকিয়ে রয়েছো কেনো? এই হযরত ইসা আ., যাঁকে তোমাদের কাছ থেকে তুলে নেয়া হলো, তাঁকে যেভাবে তোমরা বেহেস্তে যেতে দেখলে, সেভাবেই তিনি আবার আসবেন।”

(১২)তখন তাঁরা জৈতুন পাহাড় থেকে নেমে জেরুসালেমে ফিরে এলেন। এই পাহাড়টি জেরুসালেম শহরের কাছে, এক সাব্বাত দিনের যাত্রার সমান দূরে অবস্থিত।

(১৩)শহরে পৌঁছে তাঁরা ওপরের তলার যে-ঘরে থাকতেন, সেখানে গেলেন। হযরত পিতর রা., হযরত ইউহোন্না রা., হযরত ইয়াকুব রা., হযরত আন্দ্রিয়ান রা., হযরত ফিলিপ রা., হযরত থোমা রা., হযরত বরথলময় রা., হযরত মথি রা., হযরত ইয়াকুব ইবনে আলফিয়াস রা. ও দেশপ্রেমিক হযরত সিমোন রা. এবং হযরত ইহুদা ইবনে ইয়াকুব রা.।

(১৪)তারা সবাই বিশেষ কয়েকজন মহিলাসহ হযরত ইসা আ. এর মা হযরত মরিয়ম আ. ও তাঁর ভাইদের সংগে সব সময় একমত হয়ে মোনাজাত করতেন।

(১৫)সেই সময় এক দিন হযরত পিতর রা. মসিহের ওপর ইমানদার প্রায় একশো কুড়িজন উম্মতের মধ্যে দাঁড়িয়ে বললেন, (১৬)“ভাইয়েরা, আল্লাহর রুহ হযরত দাউদ আ. এর মুখ দিয়ে ইহুদার বিষয়ে যা বলেছিলেন, আল্লাহর সেই কালাম পূর্ণ হবার দরকার ছিলো। (১৭)কারণ যারা হযরত ইসা মসিহকে ধরে ছিলো, সে-ই তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। সে আমাদেরই একজন ছিলো এবং আমাদের সংগে কাজ করার জন্য তাকে বেছে নেয়া হয়েছিলো। (১৮)তার খারাপ কাজের টাকা দিয়ে সে একখন্ড জমি কিনে ছিলো। আর সেখানে পড়ে গিয়ে তার পেট ফেটে গেলো এবং নাড়ি ভুঁড়ি বের হয়ে পড়লো। জেরুসালেমের সবাই সে-কথা শুনেছিলো। (১৯)এ-জন্য তাদের ভাষায় ওই জমিকে তারা হাকেল্দামা বা রক্তের ক্ষেত বলে।

(২০)কারণ জবুর শরীফে এ-কথা লেখা আছে, তার বাড়ি খালি থাকুক; সেখানে কেউ বাস না করুক।’ এবং ‘তার উঁচু পদ অন্য লোক নিয়ে যাক।’ (২১)এ-জন্য হযরত ইসা মসিহ যে মৃত থেকে জীবিত হয়ে উঠেছেন, আমাদের সংগে তার সাক্ষী হবার জন্য আরেকজনকে আমাদের দলে নিতে হবে।

(২২)তাই হযরত ইয়াহিয়া আ. এর বায়াত দেয়া থেকে আরম্ভ করে তাঁকে আমাদের কাছ থেকে তুলে না-নেয়া পর্যন্ত, তিনি যতদিন আমাদের সংগে চলাফেরা করেছিলেন, ততদিন যে-লোকেরা আমাদের দলে ছিলো, সে যেনো তাদের মধ্যে একজন হয়।” (২৩)তাই তারা হযরত ইউসুফ রা., যাকে বারসাবা বলা হতো, এবং হযরত মাত্তিয়াস রা.- এই দু’জনের নাম প্রস্তাব করলেন।

(২৪-২৫)অতঃপর তারা এই বলে মোনাজাত করলেন, “ইয়া আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন, তুমি সকলের অন্তর জানো। যে-ইহুদা তার পাওনা শাস্তি পাবার জন্য হাওয়ারি পদের কাজ ছেড়ে দিয়েছে, তার জায়গায় এই দু’জনের মধ্যে যাকে তুমি বেছে নিয়েছো, তাকে আমাদের দেখিয়ে দাও।” (২৬)এবং তারা ভাগ্য পরীক্ষা করলে মাত্তিয়াসের নাম উঠলো এবং তিনি এগারোজনের সংগে যোগ দিলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)পঞ্চাশতম দিনের ইদে যখন তারা সবাই এক জায়গায় মিলিত হলেন, (২)তখন হঠাৎ আসমান থেকে জোর বাতাসের শব্দের মতো একটি শব্দ এলো এবং যে-ঘরে তারা ছিলেন, সেই শব্দে সেই ঘরটা পূর্ণ হয়ে গেলো। (৩)তারা দেখলেন, আগুনের জিভের মতো কি যেনো ছড়িয়ে গেলো এবং সেগুলো তাদের প্রত্যেকের ওপরে এসে বসলো। (৪)তাতে তারা সবাই আল্লাহর রুহে পূর্ণ হলেন এবং সেই রুহ যাকে যেমন কথা বলার শক্তি দিলেন, সেই অনুসারে তারা ভিন্ন-ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে লাগলেন।

(৫)সেই সময় দুনিয়ার নানা দেশ থেকে এসে আল্লাহভক্ত ইহুদিরা জেরুসালেমে বাস করছিলো। (৬)সেই শব্দ শুনে বিশৃঙ্খল জনতা সেখানে জমায়েত হলো। তারা নিজের নিজের ভাষায় তাদেরকে কথা বলতে শুনে সবাই বুদ্ধিহারা হয়ে গেলো।

(৭)তারা খুব আশ্চর্য হয়ে বললো, “এই যে লোকেরা কথা বলছে, এরা সবাই কি গালিলের লোক নয়? (৮)তাহলে কীভাবে আমরা প্রত্যেকে নিজ-নিজ মাতৃভাষা ওদের মুখে শুনছি? (৯)পার্থীয়, মাডীয়, এলমীয় এবং মেসোপটেমিয়া, ইহুদিয়া, কাব্বাদুকিয়া, পন্ত, এশিয়া, (১০)ফরুগিয়া, পামফুলিয়া, মিসর, কুরিনির কাছাকাছি লিবিয়ার কয়েকটা জায়গায় বাসকারী লোকেরা, এবং রোম শহর থেকে আসা ইহুদিরা, ইহুদি ধর্মে ইমান আনা অ-ইহুদিরা সবাই, (১১)ক্রিট দ্বীপের লোকেরা ও আরবীয়রা; আমরা সকলেই তো আমাদের নিজ-নিজ ভাষায় আল্লাহর মহৎ কাজের কথা ওদের বলতে শুনছি।”

(১২)তারা আশ্চর্য ও বুদ্ধিহারা হয়ে একে অন্যকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো, “এর মানে কী?” (১৩)কিন্তু অন্যরা ঠাট্টা করে বললো, “ওরা নতুন মদ খেয়ে মাতাল হয়েছে।”

(১৪)তখন হযরত পিতর রা. সেই এগারোজনের সংগে দাঁড়িয়ে জোরে ওই সব লোকদের বললেন, “ইহুদি লোকেরা আর আপনারা যারা জেরুসালেমে বসবাস করছেন, আপনারা জেনে রাখুন এবং মন দিয়ে আমার কথা শুনুন। (১৫)আপনারা মনে করছেন এরা মাতাল হয়েছে। কিন্তু তা নয়, কারণ এখন তো মাত্র সকাল ন’টা। (১৬)না, এটা তো সেই কথা, যা নবি হযরত যোয়েল আ. এর মাধ্যমে বলা হয়েছিলো- আল্লাহ পাক এ-কথা বলেন, (১৭)‘শেষকালে আমি সব লোকের ওপরে আমার রুহ ঢেলে দেবো, এবং তোমাদের ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যদ্বাণী বলবে। তোমাদের যুবকরা দর্শন পাবে। তোমাদের মুরব্বিরা স্বপ্ন দেখবে।       

(১৮)এমনকি সেই সময় আমার গোলাম ও বাঁদীদের ওপরে আমি আমার রুহ ঢেলে দেবো আর তারা ভবিষ্যদ্বাণী বলবে। (১৯)আমি ওপরে আসমানে আশ্চর্য-আশ্চর্য ঘটনা দেখাবো এবং নিচে জমিনে নানা রকম চিহ্ন দেখাবো। অর্থাৎ রক্ত, আগুন ও প্রচুর ধোঁয়া দেখাবো।

(২০)আল্লাহর সেই মহৎ ও মহিমাপূর্ণ দিন আসার আগে সূর্য অন্ধকার হয়ে যাবে ও চাঁদ রক্তের মতো হবে। (২১)তখন যারা আল্লাহর নামে ডাকবে, তারা রক্ষা পাবে। ’

(২২)বনি-ইস্রাইলরা, আমার কথা শুনুন। নাসরতের হযরত ইসা আ. একজন মানুষ, যাঁকে আল্লাহ্ তাঁর মহৎ ও আশ্চর্য কাজের ক্ষমতাসহ আপনাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন এবং অনেক আশ্চর্য কাজ তাঁর মাধ্যমে করেছিলেন, যা আপনারা জানেন। (২৩)আল্লাহর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও আগে প্রকাশ করা কালাম অনুসারে তিনি তাঁকে আপনাদের হাতে দিয়েছিলেন। আপনারা শরিয়তের বাইরের লোকদের দ্বারা তাঁকে সলিবের ওপরে হত্যা করিয়েছিলেন। (২৪)কিন্তু আল্লাহ্ তাঁকে মৃত্যুর ক্ষমতা থেকে মুক্ত করে জীবিত করে তুলেছেন। কারণ তার নিজের ক্ষমতায় তাঁকে ধরে রাখা অসম্ভব ছিলো।

(২৫)কারণ হযরত দাউদ আ. তাঁর বিষয়ে বলেছেন, ‘আমি আমার মনিবকে সব সময় আমার সামনে দেখছি। কারণ তিনি আমার ডানপাশে আছেন, যেনো আমি অস্থির না হই।

(২৬)এ জন্য আমার মন আনন্দে ভরা এবং আমার জিভ তাঁর প্রশংসা করছে। তাঁর ওপর আমার শরীরও আশা নিয়ে বাঁচবে। (২৭)কারণ তুমি আমার রুহকে ধ্বংস হওয়ার জন্য আমাকে ত্যাগ করবে না, অথবা তোমার পবিত্রজনকে তুমি নষ্ট হতে দেবে না। (২৮)জীবনের পথ তুমি আমাকে জানিয়েছো। তোমার উপস্থিতি দিয়ে তুমি আমার আনন্দ পূর্ণ করবে।’

(২৯)আপনারা যারা শুনছেন, আমি আপনাদের নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি যে, আমাদের পূর্বপুরুষ হযরত দাউদ আ. ইন্তেকাল করেছেন। তাকে দাফন করা হয়েছে। তাঁর রওজা-মোবারক আজও আমাদের এখানে রয়েছে। (৩০)তিনি একজন নবি ছিলেন এবং তিনি জানতেন যে, আল্লাহ্ কসম খেয়ে তাঁর কাছে ওয়াদা করেছেন যে, তাঁর সিংহাসনে তাঁরই একজন বংশধরকে বসাবেন ।

(৩১)পরে কী হবে তা দেখতে পেয়ে হযরত দাউদ আ. মসিহের পুনরুত্থানের বিষয়ে বলেছিলেন যে, তাঁকে কবরে পরিত্যাগ করা হয়নি এবং তাঁর শরীরও নষ্ট হয়নি। (৩২)আল্লাহ্ সেই হযরত ইসা আ.কেই জীবিত করে তুলেছেন আর আমরা সবাই তার সাক্ষী। (৩৩)আল্লাহর ডানদিকে বসার গৌরব তাঁকেই দান করা হয়েছে এবং ওয়াদা করা আল্লাহর রুহ, তিনিই প্রতিপালকের কাছ থেকে পেয়েছেন। আর এখন আপনারা যা দেখছেন ও শুনছেন, তা তিনিই দিয়েছেন।

(৩৪-৩৫)হযরত দাউদ আ. নিজে বেহেস্তে যাননি কিন্তু তিনি বলেছেন, “আল্লাহ্ আমার মনিবকে বললেন- ‘যতক্ষণ না আমি তোমার শত্রুদের তোমার পায়ের তলায় রাখি, ততক্ষণ তুমি আমার ডানদিকে বসো।’” (৩৬)এ জন্য ইস্রায়েল জাতি এ কথা নিশ্চিতভাবে জানুন যে, আল্লাহ যাঁকে মুনিব ও মসিহ করে তুলেছেন, তিনি হলেন সেই হযরত ইসা আ., যাঁকে আপনারা সলিবের ওপরে হত্যা করেছিলেন।”

(৩৭)এ কথা শুনে লোকেরা মনে আঘাত পেলো এবং হযরত পিতর রা. ও অন্য হাওয়ারিদের জিজ্ঞেস করলো, “ভাইয়েরা, আমরা এখন কী করবো?” (৩৮)হযরত পিতর রা. তাদের বললেন, “আপনারা প্রত্যেকে তওবা করুন এবং হযরত ইসা মসিহের নামে বায়াত গ্রহণ করুন, যেনো গুনাহের ক্ষমা পেতে পারেন; এবং আপনারা আল্লাহর রুহকে দান হিসাবে পাবেন। (৩৯)এই ওয়াদা আপনাদের, আপনাদের ছেলে-মেয়েদের, যারা দূরে আছে এবং আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্ যাদের তাঁর কাছে ডেকেছেন, তাদের সকলেরই জন্য।”

(৪০)আরো অনেক কথা বলে তিনি সাক্ষ্য দিতে লাগলেন। তিনি তাদের এই বলে বোঝাতে চেষ্টা করলেন, “এই যুগের বিবেকহীন লোকদের থেকে নিজেদের রক্ষা করুন।” (৪১)তাই সেদিন যারা তার কথায় ইমান আনলো, তারা বায়াত গ্রহণ করলো। সেইদিন কমবেশি তিন হাজার লোক তাদের সংগে যুক্ত হলো। (৪২)তারা হাওয়ারিদের শিক্ষায়, সহভাগিতায়, মোনাজাতে এবং এক সংগে মসিহের মেজবানিতে নিজেদের নিয়োজিত রাখলেন।

(৪৩)তাদের ওপর ভয় হাজির হলো, কারণ হাওয়ারিরা অনেক অলৌকিক কাজও চিহ্ন-কাজ করতে লাগলেন। (৪৪)যারা ইমান এনেছিলেন, তারা সবাই তাদের নিজেদের বিষয়-স¤পত্তি বিক্রি করে সবকিছু এক সংগে রাখতেন। (৪৫)এবং যার যেমন দরকার, সেভাবে ভাগ করে নিতেন।

(৪৬)তারা প্রতিদিন বায়তুল-মোকাদ্দসে এক সংগে মিলিত হতেন। আর বাড়িতে আনন্দের সংগে ও সরল মনে হযরত ইসা আ. এর মেজবানি ও এক সংগে খাওয়া-দাওয়া করতেন। (৪৭)তারা আল্লাহর প্রশংসায় ও মানুষের ভালোবাসায় থাকতেন। আল্লাহ্ প্রতিদিনই নাজাত পাওয়া লোকদের তাদের সংগে যুক্ত করতে থাকলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)এক দিন বিকেল তিনটার এবাদতের সময় হযরত সাফওয়ান রা. ও হযরত ইউহোন্না রা. বায়তুল-মোকাদ্দসে যাচ্ছিলেন। এবং জন্ম থেকেই খোঁড়া এক লোককে সেখানে বয়ে আনা হলো। (২)লোকেরা প্রতিদিন তাকে বয়ে এনে বায়তুল-মোকাদ্দসের সুন্দর নামের দরজার কাছে রাখতো, যেনো যারা বায়তুল-মোকাদ্দসে যেতো, সে তাদের কাছে ভিক্ষা চাইতে পারে।

(৩)হযরত সাফওয়ান রা. ও হযরত ইউহোন্না রা.-কে বায়তুল-মোকাদ্দসে ঢুকতে দেখে সে তাদের কাছে ভিক্ষা চাইলো। (৪)কিন্তু তাঁরা সোজা তার দিকে তাকালেন এবং বললেন, “আমাদের দিকে তাকাও।”(৫)সে তাদের কাছ থেকে কিছু পাবার আশায় তাদের দিকে তাকালো।

 

(৬)কিন্তু হযরত সাফওয়ান রা. বললেন, “আমার কাছে সোনা বা রুপা কিছুই নেই কিন্তু যা আছে, তা-ই আমি তোমাকে দিচ্ছি। (৭)নাসরতের হযরত ইসা মসিহের নামে উঠে দাঁড়াও ও হাঁটো।” এবং তিনি তার ডান হাত ধরে তাকে তুললেন আর তখনই তার পা ও গোড়ালি শক্ত হলো।

(৮)সে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো এবং হাঁটতে লাগলো। (৯-১০)আর হাঁটতে-হাঁটতে, লাফাতে-লাফাতে এবং আল্লাহর প্রশংসা করতে-করতে তাদের সংগে বায়তুল-মোকাদ্দসে ঢুকলো। সব মানুষ তাকে হাঁটতে ও আল্লাহর প্রশংসা করতে দেখলো। তারা তাকে চিনতে পারলো যে, এ সেই লোক, যে বায়তুল-মোকাদ্দসের সুন্দর নামের দরজার কাছে বসে ভিক্ষা করতো। এবং যা ঘটেছিলো তাতে লোকেরা খুব আশ্চর্য হয়ে গেলো।

(১১)যখন সে হযরত সাফওয়ান রা. ও হযরত ইউহোন্না রা. এর পিছু ছাড়ছিলো না, (১২)তখন সমস্ত লোক দৌঁড়ে হযরত সোলায়মান আ. এর বারান্দায় তাঁদের কাছে এলো কারণ তারা খুবই আশ্চর্য হয়েছিলো। এই অবস্থা দেখে হযরত সাফওয়ান রা. লোকদের বললেন, “বনি-ইস্রায়েলরা, এতে আপনারা অবাক হচ্ছেন কেনো, অথবা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন কেনো? যেনো আমরা নিজেদের শক্তিতে বা আল্লাহর প্রতি আমাদের ভক্তির কারণে একে চলার শক্তি দিয়েছি?

(১৩)হযরত ইব্রাহিম আ., হযরত ইসহাক আ. ও হযরত ইয়াকুব আ. এর আল্লাহ্, অর্থাৎ আমাদের পূর্ব-পুরুষদের আল্লাহ্ তাঁর গোলাম হযরত ইসা আ.-কে মহিমান্বিত করেছেন, যাঁকে আপনারা অস্বীকার করেছিলেন ও পিলাতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, যদিও পিলাত তাঁকে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন ।

(১৪)কিন্তু আপনারা পবিত্র ও ন্যায়বান ব্যক্তিকে অস্বীকার করে একজন খুনিকে আপনাদের দিয়ে দিতে বলেছিলেন। (১৫)আপনারা জীবনের সেই মালিককে হত্যা করেছেন, যাঁকে আল্লাহ মৃত থেকে জীবিত করে তুলেছেন। আর আমরা তার সাক্ষী।

(১৬)এই যে লোকটিকে আপনারা দেখছেন এবং তাকে আপনারা চেনেন, হযরত ইসা আ. এর ওপর ইমান ও তাঁর নামের গুণে সে শক্তি লাভ করেছে, এবং আপনাদের সামনে কেবল তাঁরই নামে সে স¤পূর্ণভাবে সুস্থ ও সুন্দর স্বাস্থ্য লাভ করেছে। (১৭)এখন ভাইয়েরা, আমি জানি, আপনারা আপনাদের নেতাদের মতো না-বুঝেই এ-কাজ করেছেন। (১৮)এভাবে আল্লাহ্ অনেক দিন আগে নবিদের মধ্যদিয়ে যা বলেছিলেন, তা পূর্ণ করেছেন যে, তাঁর মসিহকে কষ্টভোগ করতে হবে। (১৯)তাই তওবা করুন এবং আল্লাহর দিকে ফিরুন, যেনো আপনাদের গুনাহ্ মুছে ফেলা হয়। (২০)আর এতে যেনো আল্লাহ্ সেই মসিহকে, অর্থাৎ হযরত ইসা আ. কে পাঠিয়ে দিয়ে আপনাদের সজীব করে তুলতে পারেন। আপনাদের জন্য তাঁকেই নিযুক্ত করা হয়েছে।

(২১)আল্লাহ্ সবকিছু যে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনবেন, তা অনেক দিন আগেই পবিত্র নবিদের মধ্যদিয়ে বলেছিলেন। তিনি যতদিন না তাঁর সেই কথা পূর্ণ করেন, ততদিন পর্যন্ত হযরত ইসা আ. কে বেহেস্তেই থাকতে হবে।

(২২)হযরত মুসা আ. বলেছিলেন, ‘তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্ তোমাদের ভাইদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য আমার মতো একজন নবি উঠাবেন। তিনি তোমাদের যা বলবেন, তা তোমরা অবশ্যই মানবে। (২৩)যারা সেই নবির কথা মানবে না, তাদের প্রত্যেককে তার লোকদের মধ্য থেকে একেবারে ধ্বংস করা হবে।’(২৪)এবং হযরত সামুয়েল আ. থেকে আরম্ভ করে যত নবি কথা বলেছেন, তারা এই দিনের কথাই বলেছেন।

(২৫)আপনারা নবিদের বংশধর এবং আপনাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহিম আ. এর সংগে আল্লাহ্ ওয়াদার ব্যবস্থা স্থাপন করেছিলেন, ‘তোমার বংশের মধ্যদিয়ে দুনিয়ার সমস্ত জাতিই রহমত পাবে।’(২৬)যখন আল্লাহ্ তাঁর গোলামকে পাঠালেন, তখন তিনি প্রথমে তাঁকে আপনাদের কাছে পাঠালেন, যেনো আপনাদেরকে খারাপ পথ থেকে ফিরিয়ে রহমত করতে পারেন।”

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)হযরত সাফওয়ান রা. ও হযরত ইউহোন্না রা. যখন লোকদের সংগে কথা বলছিলেন, তখন ইমামেরা, বায়তুল-মোকাদ্দসের প্রধান কর্মচারী ও সদ্দুকিরা তাদের কাছে এলেন। (২)তারা খুবই বিরক্ত হয়েছিলেন; কারণ তাঁরা লোকদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন এবং হযরত ইসা আ. এর মধ্য দিয়ে মৃতদের পুনরুত্থানের কথা ঘোষণা করছিলেন। (৩)তাই তারা তাঁদের গ্রেফতার করে পরদিন পর্যন্ত হাজতে রাখলেন, কারণ তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো।

(৪)কিন্তু যারা কালাম শুনছিলো, তারা অনেকেই ইমান আনলো। এতে তাদের সংখ্যা বেড়ে কমবেশি পাঁচ হাজারে দাঁড়ালো।

(৫)পরদিন তাদের প্রধান ইমামেরা, বুজুর্গরা এবং আলিমরা জেরুসালেমে এক সংগে মিলিত হলেন। ৬সেখানে মহা-ইমাম আনানিয়াস, কাইয়াফা, ইউহোন্না, আলেকজান্ডার আর মহা-ইমামের পরিবারের অন্যান্য লোকেরাও উপস্থিত ছিলেন। (৭)তারা বন্দিদেরকে তাদের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কীসের শক্তিতে বা কার নামে এসব করেছো?”

(৮)তখন হযরত সাফওয়ান রা. আল্লাহর রুহে পূর্ণ হয়ে তাদের বললেন, “জনতার শাসকেরা ও বুজুর্গরা, (৯)যদি একজন অসুস্থ লোকের উপকার করার কারণে আজ আমাদের জেরা ও প্রশ্ন করা হয় যে, লোকটি কেমন করে সুস্থ হলো;

(১০)তাহলে আপনারা প্রত্যেকে ও সমস্ত বনি-ইস্রায়েল এ-কথা জেনে রাখুন যে, নাসরতের হযরত ইসা মসিহ, যাঁকে আপনারা সলিবে দিয়ে হত্যা করেছিলেন এবং আল্লাহ্ যাঁকে মৃত থেকে জীবিত করে তুলেছেন, তাঁরই নামে সে সুস্বাস্থ্য পেয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

(১১)এই হযরত ইসা আ.-ই ‘সেই পাথর, যাঁকে আপনারা, রাজ-মিস্ত্রিরা বাদ দিয়েছিলেন, আর সেটাই কোনের প্রধান পাথর হয়ে উঠেছে।’ (১২)নাজাত আর কারো কাছে নেই। কারণ আকাশের নিচে, মানুষের মধ্যে, এমন কোনো নাম নেই, যার নামে আমরা নাজাত পেতে পারি।”

(১৩)যখন তারা হযরত সাফওয়ান রা. ও হযরত ইউহোন্না রা. এর সাহস দেখলেন এবং বুঝলেন যে, এঁরা অশিক্ষিত ও সাধারণ লোক, তখন আশ্চর্য হয়ে গেলেন; আর এঁরা যে হযরত ইসা আ. এর সঙ্গী ছিলেন, তাও বুঝতে পারলেন। (১৪)যে-লোকটি সুস্থ হয়েছিলো, তাকে হযরত সাফওয়ান রা. ও হযরত ইউহোন্না রা. এর সংগে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তারা তাঁদের বিরুদ্ধে আর কিছুই বলতে পারলেন না। (১৫)তাই তারা তাঁদেরকে মহাসভা থেকে বাইরে যেতে হুকুম দিলেন, যেনো তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করতে পারেন।

(১৬)তারা বললেন, “এই লোকদের নিয়ে আমরা কী করবো? যারা জেরুসালেমে বাস করে তারা সবাই জানে যে, এরা একটি বিশেষ মোজেজা দেখিয়েছে, আর আমরা তা অস্বীকারও করতে পারি না। (১৭)কিন্তু মানুষের মধ্যে যেনো কথাটা আরো না ছড়ায়, সে জন্য এদের ভয় দেখাতে হবে, যেনো তারা এই নামে কারো সংগে কথা না বলে।” তাই তারা তাঁদের ডাকলেন এবং হুকুম দিলেন, যেনো তাঁরা হযরত ইসা আ. এর নামে আর কোনো কথা না বলেন বা শিক্ষা না দেন।

(১৮)কিন্তু হযরত সাফওয়ান রা. ও হযরত ইউহোন্না রা. উত্তর দিলেন, “আপনারাই বলুন, আল্লাহর চোখে কোনটা ঠিক- (১৯)আপনাদের হুকুম পালন করা, না-কি আল্লাহর হুকুম পালন করা? (২০)কারণ আমরা যা দেখেছি ও শুনেছি তা না বলে থাকতে পারবো না।”

(২১)তখন তারা তাঁদের আবারো ভয় দেখিয়ে ছেড়ে দিলেন। লোকদের ভয়ে তারা তাঁদের শাস্তি দেবার পথ পেলেন না। কারণ যা ঘটেছিলো, তার জন্য সবাই আল্লাহর প্রশংসা করছিলো। (২২)যে লোকটি আশ্চর্যভাবে সুস্থ হয়েছিলো, তার বয়স ছিলো চল্লিশ বছরেরও বেশি।

(২৩)তাঁরা ছাড়া পেয়ে তাঁদের বন্ধুদের কাছে গেলেন এবং ইমামেরা ও বুজুর্গরা তাঁদের যা-যা বলেছিলেন, তার সবই তাদের জানালেন।

(২৪)এসব কথা শুনে তাঁরা সবাই এক সংগে জোরে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করে বললেন, “হে জগতের মালিক, তুমিই আসমান, জমিন, সমুদ্র এবং এর মধ্যে যা-কিছু আছে, তার সবই সৃষ্টি করেছো । (২৫)তুমি তোমার রুহের মধ্য দিয়ে তোমার বান্দা, আমাদের পূর্বপুরুষ হযরত দাউদ আ. এর মুখ দিয়ে বলেছো, ‘কেনো বিধর্মীরা অস্থির হয়ে চেঁচামেচি করছে? কেনোইবা লোকেরা অর্থহীন ষড়যন্ত্র করছে?

(২৬)দুনিয়ার বাদশাহরা ও শাসকরা এক হয়েছে দুনিয়ার মালিক ও তাঁর মসিহের বিরুদ্ধে!  (২৭)আর এই শহরেও হেরোদ ও পন্তীয় পিলাত, ইস্রায়েল ও বিধর্মী লোকেরা এক হয়েছে তোমার বান্দা হযরত ইসা আ. এর বিরুদ্ধে, যাঁকে তুমি অভিষেক করেছো, (২৮)যেনো তোমার পরিকল্পনা অনুসারে যা ঘটার কথা তা ঘটতে পারে। (২৯)আর এখন, হে আল্লাহ্, এদের অন্তর তুমি দেখো। তোমার বান্দাদের এমন শক্তি দাও, যেনো সাহসের সংগে তোমার কালাম বলতে পারি। (৩০)এবং তোমার পবিত্র বান্দা হযরত ইসা আ. এর নামে লোকদের সুস্থ করতে ও মোজেজা দেখাতে পারি।”

(৩১)যে-জায়গায় তারা মিলিত হয়ে মোনাজাত করছিলেন, মোনাজাতের পর সেই জায়গাটা কেঁপে উঠলো। এবং তাঁরা সবাই আল্লাহর রুহে পূর্ণ হয়ে সাহসের সংগে আল্লাহর কালাম বলতে লাগলেন।

(৩২)ইমানদারেরা সবাই মনে-প্রাণে এক ছিলেন এবং কোনো কিছুই তাঁরা নিজের বলে দাবি করতেন না। বরং সবকিছুই এক সংগে রাখা হতো এবং যাঁর যাঁর দরকার মতো তাঁরা ব্যবহার করতেন। (৩৩)হযরত ইসা আ. এর পুনরুত্থানের বিষয়ে হাওয়ারিরা মহা-শক্তিতে সাক্ষ্য দিতে থাকলেন, আর তাঁদের সকলের ওপর অশেষ রহমত ছিলো। (৩৪-৩৫)তাঁদের মধ্যে কোনো অভাবী লোক ছিলো না। কারণ যাদের জমি কিংবা বাড়ি ছিলো, তাঁরা সেগুলো বিক্রি করে টাকা-পয়সা এনে হাওয়ারিদের পায়ের কাছে রাখতেন এবং যাঁর যেমন দরকার, সেভাবে তাঁকে দেয়া হতো।

(৩৬)সেখানে হযরত ইউসুফ র. নামে লেবিয় বংশের এক লোক ছিলেন, তিনি ছিলেন সাইপ্রাস-দ্বীপের বাসিন্দা। (৩৭)হাওয়ারিরা তাকে বার্নবাস, অর্থাৎ উৎসাহদাতা বলে ডাকতেন। তার কিছু জমি ছিলো। তিনি সেটা বিক্রি করে টাকা এনে হাওয়ারিদের পায়ের কাছে রাখলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)হযরত আনানিয়াস র. নামে এক লোক ও তার স্ত্রী হযরত সাফিরা র. একটি সম্পত্তি বিক্রি করলেন। (২)তার স্ত্রীর জানা মতেই বিক্রির কিছু টাকা সে নিজের জন্য রেখে বাকি টাকা হাওয়ারিদের পায়ের কাছে রাখলেন।

(৩)হযরত সাফওয়ান রা. জিজ্ঞেস করলেন, “আনানিয়াস, কেনো শয়তান তোমার মন দখল করলো যে, তুমি আল্লাহর রুহের কাছে মিথ্যা কথা বলছো, এবং জমি বিক্রির টাকা থেকে কিছু টাকা নিজের জন্য রেখে দিয়েছো?

(৪)বিক্রি করার আগে জমিটা কি তোমারই ছিলো না? এবং বিক্রির পরেও কি টাকাগুলো তোমারই ছিলো না? তাহলে তুমি কেনো এমন কাজ করবে বলে ঠিক করলে? তুমি মানুষের কাছে নয়, বরং আল্লাহর কাছেই মিথ্যা বলেছো।”(৫)এ-কথা শোনামাত্র হযরত আনানিয়াস র. মাটিতে পড়ে মারা গেলেন এবং যারা এই ঘটনার কথা শুনলেন, তারা সবাই ভীষণ ভয় পেলেন। (৬)যুবকরা এসে তার গায়ে কাফন জড়ালো এবং বাইরে নিয়ে গিয়ে তাকে দাফন করলো।

(৭)এর প্রায় তিন ঘন্টা পর তার স্ত্রী সেখানে এলো কিন্তু কী ঘটেছে, সে তা জানতো না। (৮)তখন হযরত সাফওয়ান রা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমাকে বলো, তুমি ও তোমার স্বামী সেই জমিটা কি এতো টাকায় বিক্রি করেছিলে?” সে বললো, “হ্যাঁ, এতো টাকাতেই।”

(৯)তখন হযরত সাফওয়ান রা তাকে বললেন, “তোমরা কেমন করে আল্লাহর রুহকে পরীক্ষা করার জন্য একমত হলে? দেখো, যারা তোমার স্বামীকে দাফন করেছে, তারা দরজার কাছে এসে পৌঁছেছে, আর তারা তোমাকেও বাইরে বয়ে নিয়ে যাবে।”(১০)তখনই সে তার পায়ের কাছে পড়ে মারা গেলো। যুবকরা ভেতরে এসে তাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পেলো। তাই তারা তাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে তার স্বামীর পাশে দাফন করলো।

(১১)ফলে এক মহাভয় এই কওমের সব লোককে এবং অন্য যারা এসব কথা শুনলো, তাদের সবাইকে ঘিরে ধরলো। (১২)হাওয়ারিরা মানুষের মধ্যে অনেক আশ্চর্য কাজ করলেন ও মোজেজা দেখালেন। তারা সবাই হযরত সোলায়মান আ. এর বারান্দায় এক সংগে মিলিত হতেন। (১৩) আর কেউই তাদের সংগে যোগ দিতে সাহস করলো না, কিন্তু লোকেরা তাদের খুব সম্মান করতো। (১৪) তবুও আগের যে-কোনো সময়ের থেকে অনেক বেশি পুরুষ ও মহিলা মসিহের ওপর ইমান এনে ইমানদারদের সংগে যুক্ত হলো।

(১৫)এমনকি তারা খাটের ওপরে ও মাদুরের ওপরে করে রোগীদের এনে পথে পথে রাখতে লাগলো, যেনো পথ দিয়ে যাবার সময় হযরত সাফওয়ান রা. এর ছায়াটুকু অন্তত তাদের কারো-কারো ওপরে পড়ে। (১৬)জেরুসালেমের আশে পাশের এলাকা থেকে অনেক লোক তাদের রোগীদের এবং ভূতের হাতে কষ্ট পাওয়া লোকদের এনে ভিড় করতে লাগলো, আর তারা সবাই সুস্থ হতে থাকলো।

(১৭)তখন মহা-ইমাম এই কাজ করলেন; তিনি ও তার সংগের সদ্দুকিরা হিংসায় জ্বলে উঠলেন। তারা হাওয়ারিদেরকে ধরে সরকারি জেলে ঢুকিয়ে দিলেন। (১৮,১৯)কিন্তু রাতের বেলায় আল্লাহর এক ফেরেস্তা জেলের দরজাগুলো খুলে তাদের বাইরে এনে বললেন- (২০)“যাও, বায়তুল-মোকাদ্দসে দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে জীবন সম্বন্ধে সমস্ত কালাম বলো।”

(২১)যখন তারা এ-কথা শুনলেন, তখন খুব ভোরে বায়তুল-মোকাদ্দসে গিয়ে শিক্ষা দিতে লাগলেন। এদিকে মহাইমাম ও তার সংগের সদ্দুকিরা, উচ্চ পরিষদ এবং ইস্রাইলের সমস্ত বুজুর্গদের কমিটি এক যৌথসভা ডাকলেন এবং তাঁদের আনার জন্য কর্মচারীদের জেলখানায় পাঠালেন। (২২)কিন্তু বায়তুল-মোকাদ্দসের পুলিশরা জেলখানায় গিয়ে তাঁদের পেলেন না, (২৩)এবং ফিরে এসে রিপোর্ট করলেন যে, “আমরা দেখলাম, জেলের দরজায় শক্ত করেই তালা দেয়া আছে এবং দরজায়-দরজায় পাহারাদার দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে কাউকে পেলাম না।”

(২৪)এ-কথা শুনে বায়তুল-মোকাদ্দসের প্রধান কর্মচারী ও প্রধান ইমামেরা বুদ্ধি হারা হয়ে ভাবতে লাগলেন যে, কী হতে যাচ্ছে। (২৫)তখন কোনো এক লোক এসে বললো, “দেখুন, যে লোকদের আপনারা জেলে দিয়ে ছিলেন, তারা বায়তুল-মোকাদ্দসে দাঁড়িয়ে লোকদের শিক্ষা দিচ্ছেন।”

(২৬)তখন বায়তুল-মোকাদ্দসের পুলিশ প্রধান, পুলিশদের সংগে নিয়ে গিয়ে তাঁদের ধরে আনলেন। কিন্তু কোনো জোর-জবরদস্তি করলেন না। কারণ তাদের ভয় ছিলো যে, হয়তো সাধারণ মানুষ তাদের পাথর মারবে। (২৭)তারা তাঁদের এনে উচ্চ পরিষদের যৌথসভার সামনে দাঁড় করালেন। প্রধান ইমাম তাঁদের বললেন, (২৮)“এই নামে শিক্ষা না-দেবার জন্য আমরা তোমাদের কড়া হুকুম দিয়েছিলাম, কিন্তু তোমরা তোমাদের শিক্ষায় জেরুসালেম পূর্ণ করেছো এবং এই লোকের রক্তের দায় আমাদের ওপরে চাপাতে চাচ্ছো।”

(২৯)কিন্তু হযরত সাফওয়ান রা এবং হাওয়ারিরা জবাব দিলেন, “মানুষের হুকুম পালন করার চেয়ে বরং আল্লাহর হুকুমই আমাদের পালন করতে হবে। (৩০)যাঁকে আপনারা গাছে টাঙিয়ে হত্যা করেছিলেন, আমাদের পূর্বপুরুষদের আল্লাহ্ সেই হযরত ইসা আ.কেই জীবিত করে তুলেছেন। (৩১)আল্লাহ্ তাঁকেই বাদশাহ ও নাজাতদাতা হিসেবে নিজের ডান পাশে বসার গৌরব দান করেছেন, যাতে তিনি বনি-ইস্রায়েলকে তওবা করার সুযোগ দিতে ও তাদের গুনাহ্ মাফ করতে পারেন। (৩২)আমরা এসবের সাক্ষী এবং আল্লাহর রুহও সাক্ষী, যাকে আল্লাহ্ তাদেরই দিয়েছেন, যারা তাঁর বাধ্য হয়।”

(৩৩)এ-কথা শুনে সেই নেতারা রেগে আগুন হয়ে তাদের হত্যা করতে চাইলেন, (৩৪)কিন্তু গমলিয়েল নামে একজন ফরিসি-তিনি ছিলেন শরিয়তের শিক্ষক এবং সবাই তাকে সম্মান করতো, তিনি উচ্চ পরিষদের যৌথসভা উঠে দাঁড়ালেন এবং কিছু সময়ের জন্য তাঁদের বাইরে রাখতে হুকুম দিলেন। (৩৫)তারপর তিনি তাদের বললেন, “বনি-ইস্রাইল, এই লোকদের ওপরে তোমরা যা করতে চাচ্ছো, সে-বিষয়ে ভালোভাবে চিন্তা করে দেখো। (৩৬)এই তো কিছুদিন আগে থুদা নামে এক লোক এসে নিজেকে বিশেষ কেউ বলে দাবি করেছিলো। আর কমবেশি চারশো লোক তার সংগে যোগ দিয়েছিলো। তাকে হত্যা করা হয়েছে এবং তার সঙ্গীরা সব হারিয়ে গেছে। এতে তার সবকিছুই বিফল হয়েছে। (৩৭)তারপর আদম শুমারির সময় গালিলের ইহুদা এসে এক দল লোককে বিদ্রোহী করে তুলেছিলো। সেও মারা গেছে, আর তার সঙ্গীরাও সবাই ছড়িয়ে পড়েছে।

 (৩৮)সে জন্য বর্তমান অবস্থায় আমি তোমাদের বলছি, তোমরা এই লোকদের ওপর কিছু করো না; এদের ছেড়ে দাও। কারণ এসব যদি মানুষ থেকে হয়ে থাকে, তাহলে তা ব্যর্থ হবে। (৩৯)কিন্তু যদি এসব আল্লাহ্ থেকে হয়ে থাকে, তাহলে তোমরা এদের থামাতে পারবে না। এমনকি হয়তো দেখবে যে, তোমরা আল্লাহর বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করছো।”

 

(৪০)তারা তার কথায় সন্তুষ্ট হলেন। এবং হাওয়ারিদেরকে ভেতরে ডেকে এনে বেত মারতে হুকুম দিলেন। তারপর তাঁদের ছেড়ে দিলেন। আর হুকুম দিলেন, যেনো তাঁরা হযরত ইসা আ. এর নামে কোনো কথা না-বলেন। (৪১)তারা যে তাঁর নামের জন্য অত্যাচার ভোগ করার যোগ্য হয়েছেন, এ-জন্য আনন্দ করতে-করতে উচ্চ পরিষদের যৌথসভা ছেড়ে চলে গেলেন। (৪২)তাঁরা প্রত্যেক দিন বায়তুল-মোকাদ্দসে এবং বাড়িতে বাড়িতে হযরত ইসা আ.-ই যে মসিহ, এ-কথা শিক্ষা দেয়া ও প্রচার করা থেকে বিরত হলেন না।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)ওই দিনগুলোতে যখন উম্মতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিলো, তখন গ্রীকরা ইহুদিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো যে, প্রতিদিন খাবার বিতরণের সময় তাদের বিধবাদের অবহেলা করা হচ্ছে। (২)তখন উম্মতদের সবাইকে এক জায়গায় ডেকে সেই বারোজন বললেন, “আল্লাহর কালাম প্রচার করা ছেড়ে খাবার বিতরণে ব্যস্ত থাকা আমাদের জন্য ঠিক নয়। (৩-৪)সুতরাং, ভাইয়েরা, তোমাদের মধ্য থেকে এমন সাতজনকে তোমরা বেছে নাও, যাদেরকে সবাই সম্মান করে এবং যারা আল্লাহর রুহে ও জ্ঞানে পূর্ণ, যেনো তাদেরকে এই কাজে নিয়োগ করে আমরা মোনাজাত ও আল্লাহর কালাম প্রচারে মন দিতে পারি।”

(৫)তাদের এ-কথা সমাজের সকলেরই ভালো লাগলো। তারা হযরত স্তিফান র., যিনি ইমানে ও আল্লাহর রুহে পূর্ণ তাঁকে বেছে নিলেন। সেই সংগে হযরত ফিলিপ র., হযরত প্রখর র., হযরত নিকানর র., হযরত তিমোন র., হযরত পার্মিনা র. ও আন্তিয়খিয়া শহরের হযরত নিকলায় র.-কে বেছে নিলেন। ইনি ইহুদি না-হয়েও ইহুদি ধর্ম পালন করতেন।

(৬)তারা এই লোকদেরকে হাওয়ারিদের কাছে নিয়ে গেলেন। এবং তাঁরা তাদের ওপর হাত রেখে মোনাজাত করে তাদের নিয়োগ করলেন।

(৭)আল্লাহর কালাম ছড়িয়ে পড়তে থাকলো। আর জেরুসালেমে হযরত ইসা আ.-এর অনুসারীদের সংখ্যা অনেক বেশী বাড়তে লাগলো, এবং ইমামদের মধ্যে অনেকে ইমান আনলেন । (৮)হযরত স্তিফান র. আল্লাহর রহমত ও শক্তিতে পূর্ণ হয়ে লোকদের মধ্যে অনেক আশ্চর্য ও অলৌকিক কাজ দেখাতে লাগলেন।

(৯)তখন স্বাধীন সিনাগোগের কিছু লোক, যারা কুরিনীয় এবং আলেকজান্দ্রিয়া, কিলিকিয়া ও এশিয়া প্রদেশের কিছু লোক উঠে দাঁড়িয়ে হযরত স্তিফান র. সংগে তর্ক করতে লাগলো। (১০)কিন্তু তিনি জ্ঞানে ও রুহে কথা বলছিলেন বলে তারা তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছিলো না।

(১১)তখন তারা গোপনে কয়েকজনকে ঠিক করলো, যারা এ-কথা বলবে যে, “আমরা তাকে হযরত মুসা আ. এর ও আল্লাহর নিন্দা করতে শুনেছি।”

(১২)তারা জনসাধারণকে, বুজুর্গদের ও আলিমদের উত্তেজিত করে তুললো এবং হঠাৎ হযরত স্তিফান র. ওপর চড়াও হয়ে তাকে ধরে উচ্চ পরিষদের সামনে নিয়ে গেলো।

(১৩)তারা মিথ্যা সাক্ষী দাঁড় করালো, যারা বললো, “এই লোকটা সব সময় এই পবিত্র জায়গা ও শরিয়তের বিরুদ্ধে কথা বলে। (১৪)আমরা তাকে এ-কথা বলতে শুনেছি যে, “নাসরতের হযরত ইসা আ. এই জায়গা ভেঙে ফেলবে এবং হযরত মুসা আ. আমাদের যে নিয়ম-কানুন দিয়ে গেছেন, সেগুলোও বদলে ফেলবে।”(১৫)যারা সেই সভায় বসেছিলেন, তারা সবাই হযরত স্তিফান র. দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তাঁর মুখ ফেরেস্তার মুখের মতো উজ্জ্বল হয়ে গেছে।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)তখন প্রধান ইমাম হযরত স্তিফান র.-কে জিজ্ঞেস করলেন, “এসব কি সত্যি?” (২)হযরত স্তিফান র. উত্তর দিলেন, “হে আমার ভাইয়েরা ও আমার মুরব্বিরা, আমার কথা শুনুন। আমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহিম আ. হারনে বসবাস করার আগে যখন মেসোপটেমিয়ায় ছিলেন, তখন গৌরবময় আল্লাহ্ তাকে দেখা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, (৩)‘তুমি তোমার দেশ ও আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে সেই দেশে যাও, যে-দেশ আমি তোমাকে দেখাবো’।

(৪)তখন তিনি কলদীয়দের দেশ ছেড়ে হারন শহরে বাস করতে লাগলেন। তার বাবার ইন্তেকালের পর আল্লাহ্ তাঁকে এই দেশে নিয়ে এলেন, যেখানে এখন আপনারা বাস করছেন। (৫)নিজের অধিকারের জন্য তিনি তাঁকে কিছুই দিলেন না, একটি পা রাখার মতো জমিও না। কিন্তু তিনি তাঁর কাছে ওয়াদা করলেন যে, তাঁকে ও তাঁরপরে তাঁর বংশধরদের অধিকার হিসেবে তিনি এই দেশ দেবেন, যদিও তাঁর কোনো সন্তান ছিলো না ।

(৬)আল্লাহ্ তাঁকে বললেন, ‘তোমার বংশধরেরা বিদেশে বসবাস করবে। মানুষ তাদের গোলাম করে রাখবে এবং চারশ বছর ধরে তাদের ওপর জুলুম করবে।’ (৭)আল্লাহ্ আরও বললেন, ‘কিন্তু যে-জাতি তাদের গোলাম করবে, সেই জাতিকে আমি শাস্তি দেবো, এবং এরপর তারা বের হয়ে এসে এই জায়গায় আমার ইবাদত করবে।’

(৮)তারপর তিনি তাঁর ওয়াদার চিহ্ন হিসাবে খত্‌না করার নিয়ম দিলেন। পরে হযরত ইব্রাহিম আ. এর ছেলে হযরত ইসহাক আ. এর জন্ম হলো এবং আট দিনের দিন তিনি তার খত্‌না করালেন। হযরত ইসহাক আ. হলেন হযরত ইয়াকুব আ. এর পিতা এবং হযরত ইয়াকুব আ. সেই বারো গোষ্ঠীর পিতা হলেন।

(৯)সেই গোষ্ঠী-পিতারা হিংসা করে হযরত ইউসুফ আ.-কে গোলাম হিসেবে মিসর দেশে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ্ তার সংগে থেকে সমস্ত রকম কষ্ট ও বিপদ থেকে তাঁকে রক্ষা করলেন। (১০)তিনি তাঁকে মিসরের বাদশাহ ফেরাউনের সুনজরে আনলেন এবং জ্ঞান দান করলেন। তিনি তাঁকে মিসরের শাসনকর্তা ও নিজের বাড়ির সকলের কর্তা করলেন।

(১১)পরে সারা মিসর ও কেনান দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো। তাতে মানুষ খুব কষ্ট পড়ে গেলো এবং আমাদের পূর্বপুরুষদেরও খাবারের অভাব হলো। (১২)কিন্তু মিসরে খাবার আছে শুনে হযরত ইয়াকুব আ. আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রথমবার সেখানে পাঠালেন।

(১৩)দ্বিতীয়বারে হযরত ইউসুফ তাঁর ভাইদের কাছে নিজের পরিচয় দিলেন এবং ফেরাউন হযরত ইউসুফ আ. এর পরিবারের বিষয়ে জানতে পারলেন। (১৪)এরপর হযরত ইউসুফ আ. তাঁর পিতা হযরত ইয়াকুব আ. ও পরিবারের অন্য সবাইকে ডেকে পাঠালেন। তাদের সংখ্যা ছিলো মোট পঁচাত্তরজন।

(১৫)সুতরাং, হযরত ইয়াকুব আ. মিসরে গেলেন আর সেখানে তিনি ও আমাদের পূর্বপুরুষেরা ইন্তেকাল করলেন । (১৬)তাঁদের মৃতদেহ শিখিমে এনে দাফন করা হলো। এই জমিটা হযরত ইব্রাহিম আ. শিখিম শহরের ইফ্রয়িমের ছেলেদের কাছ থেকে রুপা দিয়ে কিনেছিলেন ।

(১৭)হযরত ইব্রাহিম আ. এর কাছে আল্লাহ্ যে-ওয়াদা করেছিলেন, তা পূর্ণ হওয়ার সময় এলো। মিসরে আমাদের লোকসংখ্যা খুব বেড়ে গেলো। (১৮)পরে মিসরে আরেকজন বাদশাহ হলেন, যিনি হযরত ইউসুফ আ. সম্পর্কে জানতেন না। (১৯)তিনি আমাদের লোকদের ঠকাতেন ও জুলুম করতেন এবং আমাদের পূর্বপুরুষদের বাধ্য করতেন, যেনো তারা তাদের শিশুদের ফেলে দেয়, যাতে তারা মারা যায়।

(২০)সেই সময় হযরত মুসা আ. এর জন্ম হলো। তিনি আল্লাহর কাছে সুন্দর ছিলেন। তিনমাস পর্যন্ত তিনি তাঁর বাবার বাড়িতেই লালিত-পালিত হলেন। (২১)আর যখন তাকে ফেলে দেয়া হলো, তখন ফেরাউনের মেয়ে তাকে নিয়ে গিয়ে নিজের ছেলের মতোই মানুষ করে তুললেন। (২২)সুতরাং, হযরত মুসা আ. মিসরীয়দের সমস্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠলেন। তিনি কথায় ও কাজে শক্তিশালী হয়ে উঠলেন।

(২৩)তার বয়স যখন চল্লিশ বছর, তখন তিনি তার ইস্রায়েলীয় আত্মীয়-স্বজনদের সংগে দেখা করতে চাইলেন।

(২৪)একজন মিসরীয়কে একজন ইস্রায়েলীয়ের প্রতি খারাপ ব্যবহার করতে দেখে, তিনি সেই ইস্রায়েলীয়কে সাহায্য করতে গেলেন এবং মিসরীয়কে হত্যা করে তার শোধ নিলেন। (২৫)তিনি মনে করেছিলেন, তার নিজের লোকেরা বুঝতে পারবে, আল্লাহ্ তার দ্বারাই তাদের উদ্ধার করবেন, কিন্তু তারা তা বুঝতে পারলো না।

(২৬)পরদিন তিনি দু’জন ইস্রায়েলীয়কে মারামারি করতে দেখে তাদের মিলিয়ে দেবার জন্য বললেন, ‘তোমরা তো ভাই ভাই, তাহলে একে অন্যের সংগে কেনো ঝগড়া করছো?’ (২৭)কিন্তু যে-লোকটি তার প্রতিবেশীর সংগে ঝগড়া করছিলো, সে হযরত মুসা আ.কে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে বললো, ‘আমাদের ওপর কে তোমাকে শাসনকর্তা ও বিচারক নিয়োগ করেছে? (২৮)গতকাল তুমি যেভাবে এক মিসরীয়কে হত্যা করেছো, সেভাবে কি আমাকেও হত্যা করতে চাও?’

(২৯)এ-কথা শুনে হযরত মুসা আ. পালিয়ে গিয়ে মিদিয়নিয়দের দেশে বাস করতে লাগলেন। সেখানেই তাঁর দুইটি ছেলের জন্ম হলো। (৩০)অতঃপর চল্লিশ বছর পরে তুর পাহাড়ে এক জ্বলন্ত ঝোপের মধ্যে এক ফেরেস্তা তাকে দেখা দিলেন। (৩১)এটা দেখে হযরত মুসা আ. আশ্চর্য হয়ে গেলেন। ভালো করে দেখার জন্য কাছে গেলে তিনি আল্লাহর রব শুনতে পেলেন, আল্লাহ্ বললেন-

(৩২)‘আমি তোমার পূর্বপুরুষদের আল্লাহ্, ইব্রাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুবের আল্লাহ্।’ এই কথাগুলো শুনে হযরত মুসা আ. ভয়ে কাঁপতে লাগলেন; তাঁর তাকিয়ে দেখার সাহস হলো না। (৩৩)তখন আল্লাহ্ তাঁকে বললেন, ‘তোমার পায়ের জুতা খুলে ফেলো, কারণ যে-জায়গায় তুমি দাঁড়িয়ে আছো, সেটা পবিত্র জমি। (৩৪)মিসরে আমার বান্দাদের ওপর যে জুলুম হচ্ছে, তা আমি অবশ্যই দেখেছি। আমি তাদের কান্না শুনেছি এবং তাদের উদ্ধার করার জন্য নেমে এসেছি। এখন এসো, আমি তোমাকে মিসরে পাঠাবো।’

(৩৫)ইনি সেই হযরত মুসা আ., যাকে তারা এই বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলো, ‘কে তোমাকে আমাদের ওপরে শাসনকর্তা ও বিচারক নিয়োগ করেছে?’ যে-ফেরেস্তা ঝোপের মধ্যে তাঁকে দেখা দিয়েছিলেন, তার মাধ্যমেই আল্লাহ্ তাঁকে শাসনকর্তা ও উদ্ধারকর্তা হিসাবে পাঠিয়েছিলেন। (৩৬)তিনিই মিসরে অনেক আশ্চর্য কাজ করে ও মোজেজা দেখিয়ে তাদের বের করে এনেছিলেন এবং লোহিত সাগর পর্যন্ত ও মরু-প্রান্তরে চল্লিশ বছর ধরে তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

(৩৭)ইনি সেই হযরত মুসা আ., যিনি বনি-ইস্রায়েলদের বলেছিলেন, ‘আল্লাহ্ তোমাদের নিজের লোকদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য একজন নবি মনোনীত করবেন, যেভাবে তিনি আমাকে করেছেন।’ (৩৮)এই হযরত মুসা আ.-ই মরু-প্রান্তরে বনি-ইস্রায়েলদের সেই দলের মধ্যে, আমাদের পূর্বপুরুষদের সংগে ছিলেন। তার সংগেই ‘তুর’পাহাড়ে ফেরেস্তা কথা বলেছিলেন। তিনিই আমাদের জন্য জীবন্ত কালাম গ্রহণ করেছিলেন।

(৩৯)আমাদের পূর্বপুরুষেরা তার বাধ্য হতে চাইলেন না। তার বদলে তারা তাকে (৪০)অগ্রাহ্য করে মিসরের দিকে মন ফিরিয়ে হারুনকে বললেন, ‘আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য দেবদেবী তৈরি করুন, কারণ যে- হযরত মুসা আ. মিসর থেকে আমাদের বের করে এনেছেন, তাঁর কী হয়েছে আমরা জানি না।’

(৪১)সেই সময়েই তারা বাছুরের মূর্তি তৈরি করেছিলেন। সেই মূর্তির কাছে কোরবানি করেছিলেন এবং নিজেদের হাতের কাজে আনন্দ-উৎসব করেছিলেন। ৪২কিন্তু আল্লাহ্ তাঁদের দিক থেকে মুখ ফেরালেন এবং আসমানের চাঁদ, সূর্য, তারার পূজাতেই তাদের ফেলে রাখলেন।

(৪২)যেভাবে নবিদের কিতাবে লেখা আছে- ‘হে ইস্রায়েলের লোকেরা, মরু-প্রান্তরে সেই চল্লিশ বছর তোমরা কি আমার উদ্দেশে কোনো পশু বা অন্য জিনিস কোরবানি দিয়েছিলে? (৪৩)না, বরং পূজা করার জন্য যে-মূর্র্তি তোমরা তৈরি করেছিলে, সেই ‘মোলকের তাঁবু’ আর তোমাদের ‘রিফন দেবতার তারা’ তোমরা বয়ে নিয়ে গিয়েছিলে। কাজেই আমি ব্যবিলন দেশের ওপাশে তোমাদের পাঠিয়ে দেবো।’

(৪৪)মরু-প্রান্তরে আমাদের পূর্বপুরুষদের সংগে শাহাদাত-তাঁবুটি ছিলো। আল্লাহ্ হযরত মুসা আ.কে যেভাবে হুকুম দিয়েছিলেন এবং তিনি যে-নমুনা দেখেছিলেন, সেভাবেই এই তাঁবু তৈরি হয়েছিলো। (৪৫)আমাদের পূর্বপুরুষরা সেই তাঁবু পেয়ে তাঁদের নেতা হযরত ইউসা আ. এর অধীনে তা নিজেদের সংগে আমাদের এই দেশে এনেছিলেন। আল্লাহ্ সেই সময় তাঁদের সামনে থেকে অন্য জাতিদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং তাঁরা এই দেশ অধিকার করেছিলেন।

(৪৬)হযরত দাউদ আ. এর সময় পর্যন্ত সেই তাঁবু এই দেশেই ছিলো। হযরত দাউদ আ. আল্লাহর রহমত পেয়ে হযরত ইয়াকুব আ. এর আল্লাহর থাকার ঘর তৈরি করার জন্য অনুমতি চেয়েছিলেন। (৪৭)কিন্তু হযরত সোলায়মান আ.-ই তার জন্য ঘর তৈরি করেছিলেন ।

(৪৮)আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামিন মানুষের তৈরি ঘরে থাকেন না। যেমন নবি বলেছেন যে, আল্লাহ্ বলেন, (৪৯)‘বেহেস্ত আমার সিংহাসন। দুনিয়া আমার পা রাখার জায়গা। আমার জন্য তুমি কেমন ঘর তৈরি করবে? আমার বিশ্রামের স্থান কোথায় হবে? (৫০)এসব জিনিস কি আমার হাত তৈরি করেনি?

(৫১)হে একগুঁয়ে জাতি! খতনা-বিহীনদের মতোই আপনাদের কান ও অন্তর। আপনারা ঠিক আপনাদের পূর্বপুরুষদের মতোই আল্লাহর রুহকে বাধা দিয়ে থাকেন। (৫২)এমন কোনো নবি কি আছেন, যাঁর ওপর আপনাদের পূর্বপুরুষেরা জুলুম করেননি? এমনকি সেই দীনদার ব্যক্তির আসার কথা যারা বলেছেন, তাঁদেরও তারা হত্যা করেছেন। আর এখন আপনারা তাঁকেই শত্রুদের হাতে তুলে দিয়ে, হত্যা করিয়ে নিজেরা খুনি হয়েছেন। (৫৩)ফেরেস্তাদের মধ্য দিয়ে আপনারাই শরিয়ত গ্রহণ করেছিলেন এবং আপনারাই তা পালন করেননি।”

(৫৪)এসব কথা শুনে তারা রেগে আগুন হয়ে গেলেন এবং হযরত স্তিফান র. এর বিরুদ্ধে দাঁতে দাঁত ঘষতে লাগলেন। (৫৫)কিন্তু তিনি আল্লাহর রুহে পূর্ণ হয়ে আসমানের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর মহিমা দেখতে পেলেন এবং হযরত ইসা আ.কে আল্লাহর ডানপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। তিনি বললেন- (৫৬)“দেখুন, আমি দেখতে পাচ্ছি, বেহেস্ত খোলা আছে এবং ইবনুল-ইনসান আল্লাহর ডানদিকে দাঁড়িয়ে আছেন।”

(৫৭)কিন্তু একথা শুনে তারা কানে আঙুল দিলেন এবং খুব জোরে চিৎকার করে এক সংগে দৌড়ে হযরত স্তিফান র. ওপর ঝাপিয়ে পড়লেন। (৫৮)পরে তারা তাঁকে টেনে-হেঁচড়ে শহরের বাইরে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে পাথর মারতে লাগলেন। (৫৯)আর সাক্ষীরা তাদের কোট খুলে শৌল নামে এক যুবকের পায়ের কাছে রাখলো। যখন তারা স্তিফানকে পাথর মারছিলেন, তখন তিনি মোনাজাত করে বললেন, “হযরত ইসা আ. আমার রুহকে গ্রহণ করো।”(৬০)পরে তিনি হাঁটু পেতে চেঁচিয়ে বললেন, “হে আল্লাহ, এই গুনাহ্ এদের বিরুদ্ধে ধরো না।”এ-কথা বলে তিনি ইন্তেকাল করলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)শৌল তাঁকে হত্যার অনুমোদন দিচ্ছিলেন। সেদিন জেরুসালেমে হযরত ইসা আ. এর অনুসারীদের ওপরে ভীষণ জুলুম শুরু হলো। তাতে হাওয়ারিরা ছাড়া বাকি সবাই ইহুদিয়া ও সামেরিয়া প্রদেশের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়লেন। (২)কওমের লোকেরা হযরত স্তিফান র-কে দাফন করলেন এবং তাঁর জন্য খুব বিলাপ করলেন।

(৩)কিন্তু শৌল সেই দলের লোকদের ধ্বংস করার চেষ্টায় ঘরে-ঘরে গিয়ে পুরুষ ও মহিলাদের ধরে টেনে এনে জেলে দিতে লাগলেন। (৪)যারা ছড়িয়ে পড়েছিলেন, তারা চারদিকে গিয়ে কালাম প্রচার করতে লাগলেন। (৫)হযরত ফিলিপ র. সামেরিয়াতে গিয়ে হযরত ইসা মসিহকে প্রচার করতে লাগলেন। (৬)লোকেরা একমনে তাঁর কথা শুনছিলো এবং তিনি যে-সব আশ্চর্য কাজ করছিলেন, তা দেখে তাঁর কথা তারা মন দিয়ে শুনলো। (৭)অনেকের ভেতর থেকে ভূতেরা চিৎকার করে বের হয়ে গেলো এবং অনেক অবশ রোগী ও খোঁড়ারা সুস্থ হলো। (৮)ফলে শহরে মহা-আনন্দ হলো।

(৯)সেই শহরে সিমোন নামে এক লোক অনেকদিন থেকে জাদু দেখাচ্ছিলো। (১০)এতে সামেরিয়ার লোকেরা আশ্চর্য হয়েছিলো এবং সে নিজেকে একজন বিশেষ লোক বলে দাবি করতো। ছোটো থেকে বড়ো, আর ধনী-গরিব সবাই তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতো। তারা বলতো, “আল্লাহর যে-শক্তিকে মহৎ শক্তি বলা হয়, এই লোকটিই সেই শক্তি।”(১১)তারা মন দিয়ে তার কথা শুনতো। কারণ অনেক দিন ধরে সে তার জাদু দিয়ে তাদের বশ করে রেখেছিলো।

(১২)হযরত ফিলিপ র. আল্লাহর রাজ্য ও হযরত ইসা মসিহের নাম সম্পর্কে সুখবর প্রচার করছিলেন। যখন তারা তাঁর কথায় ইমান আনলো, তখন তাদের পুরুষ ও মহিলারা বায়াত গ্রহণ করলো। (১৩)এমন কি সিমোনও ইমান এনে বায়াত গ্রহণ করলো। সে সব-সময় হযরত ফিলিপ র. সংগে থাকলো এবং তার চিহ্ন-কাজ ও আশ্চর্য কাজ দেখে অবাক হলো।

(১৪)জেরুসালেমের হাওয়ারিরা যখন শুনলেন যে, সামেরিয়ার লোকেরা আল্লাহর কালামের ওপর ইমান এনেছে। (১৫)তখন তারা হযরত পিতর রা. ও হযরত ইউহোন্না রা.-কে তাদের কাছে পাঠালেন। তারা দু’জন গেলেন এবং তাদের জন্য মোনাজাত করলেন, যেনো তাঁরা আল্লাহর রুহকে পেতে পারেন। (১৬)কারণ তখনো তাঁদের ওপরে আল্লাহর রুহ আসেননি।

তাঁরা কেবল হযরত ইসা মসিহের নামে বায়াত গ্রহণ করেছিলেন। (১৭)হযরত পিতর রা. ও হযরত ইউহোন্না রা. তাঁদের ওপর হাত রাখলেন, আর তাঁরা আল্লাহর রুহকে পেলেন।

(১৮)যখন সিমোন দেখলো যে, হাওয়ারিদের হাত রাখার মধ্য দিয়ে আল্লাহর রুহকে দেয়া হলো, তখন সে তাদের কাছে টাকা এনে বললো, (১৯)“আমাকেও এই শক্তি দিন, যেনো আমি কারো ওপরে হাত রাখলে সেও আল্লাহর রুহকে পায়। (২০)কিন্তু হযরত পিতর রা. তাকে বললেন, “তোমার টাকা তোমার সংগেই ধ্বংস হোক। কারণ তুমি মনে করেছো, টাকা দিয়ে আল্লাহর দান কিনতে পারবে। (২১)এর মধ্যে তোমার কোনো অংশ বা অধিকার নেই। কারণ আল্লাহর সামনে তোমার অন্তর ঠিক নয়।

(২২)তাই তোমার এই খারাপি থেকে তওবা করো ও আল্লাহর কাছে মোনাজাত করো, যেনো সম্ভব হলে তোমার মনের এই খারাপ চিন্তা তিনি মাফ করতে পারেন। (২৩)আমি দেখতে পাচ্ছি, তোমার মন লোভে ভরা এবং তুমি মন্দতার কাছে বন্দি হয়ে আছো।”(২৪)সিমোন বললো, “আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেনো আপনারা যা বললেন, তার কিছুই আমার ওপর না ঘটে।” (২৫)তারপর হযরত পিতর রা. ও হযরত ইউহোন্না রা. সেখানে সাক্ষ্য দিয়ে ও আল্লাহর কালাম প্রচার শেষ করে সামেরিয়ার বিভিন্ন গ্রামে সুখবর প্রচার করতে করতে জেরুসালেমে ফিরে গেলেন।

(২৬)সেই সময় আল্লাহর এক ফেরেস্তা হযরত ফিলিপ র.-কে বললেন, “ওঠো, দক্ষিণ দিকের যে পথ জেরুসালেম থেকে গাজা শহরের দিকে গেছে, সেই পথে যাও।”পথটা ছিলো মরু-প্রান্তরের মধ্যদিয়ে। (২৭)সুতরাং, তিনি উঠে সেই দিকে গেলেন। পথে ইথিয়পিয়ার একজন বিশেষ রাজকর্মচারীর সংগে তার দেখা হলো। তিনি ছিলেন খোজা। ইথিয়পিয়ার কান্দাকি রানীর ধন-রত্নের দেখাশোনা করার ভার তার ওপরে ছিলো। আল্লাহর ইবাদত করার জন্য তিনি জেরুসালেমে গিয়েছিলেন।

(২৮)বাড়ি ফেরার পথে তিনি রথে বসে হযরত ইসাইয়া আ. এর সহিফা তেলাওয়াত করছিলেন। (২৯)তখন আল্লাহর রুহ হযরত ফিলিপ র.-কে বললেন, “ওই রথের কাছে যাও এবং তার সংগে-সংগে চলো।” (৩০)এতে তিনি দৌঁড়ে তার কাছে গেলেন এবং শুনতে পেলেন যে, তিনি হযরত ইসাইয়া আ. এর সহিফা তেলাওয়াত করছেন। হযরত ফিলিপ র. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি যা তেলাওয়াত করছেন, তাকি বুঝতে পারছেন?”

(৩১)তিনি উত্তর দিলেন, “কেউ বুঝিয়ে না-দিলে কেমন করে বুঝতে পারবো?” এবং তিনি হযরত ফিলিপ র.-কে রথে উঠে এসে তার কাছে বসতে অনুরোধ করলেন। (৩২)তিনি কিতাবের যে-অংশ তেলাওয়াত করছিলেন তা এই- “জবাই করার জন্য ভেড়াকে যেভাবে নেয়া হয়, তাঁকে সেভাবে নেয়া হলো এবং লোম সংগ্রহকারীর সামনে ভেড়া যেমন চুপ করে থাকে, তিনিও তেমনি মুখ খুললেন না। (৩৩)তিনি অপমানিত হলেন। তাঁর ওপর ন্যায়বিচার করা হয়নি। কে তাঁর বংশের কথা বলতে পারে? কারণ তাঁর জীবন এই দুনিয়া থেকে নিয়ে নেয়া হয়েছে।”

(৩৪)খোজা হযরত ফিলিপ র.-কে বললেন, “নবি কার বিষয়ে এ-কথা বলেছেন? নিজের বিষয়ে, না অন্য কারো বিষয়ে? (৩৫)তখন হযরত ফিলিপ র. কথা বলতে আরম্ভ করলেন। তিনি কিতাবের এই অংশ থেকে শুরু করে হযরত ইসা আ. এর বিষয়ে সুখবর তাকে বললেন। (৩৬)পথে যেতে-যেতে তারা এমন এক জায়গায় এলেন, যেখানে কিছু পানি ছিলো। (৩৭)তখন খোজা বললেন, “দেখুন, এখানে পানি আছে! আমার বায়াত নেবার কোনো বাধা আছে কি?” (৩৮)তিনি গাড়ি থামাতে বললেন এবং হযরত ফিলিপ র. ও খোজা উভয়ে পানিতে নামলেন ও তিনি তাকে বায়াত দিলেন।

(৩৯)যখন তারা পানি থেকে উঠে এলেন, তখন আল্লাহর রুহ হঠাৎ হযরত ফিলিপ র.-কে নিয়ে গেলেন। খোজা তাকে আর দেখতে পেলেন না এবং তিনি আনন্দ করতে-করতে বাড়ির পথে চলে গেলেন। হযরত ফিলিপ র. নিজেকে অস্দোদ এলাকায় দেখতে পেলেন। (৪০)তিনি কৈসরিয়াতে না-পৌঁছা পর্যন্ত গ্রামে-গ্রামে সুখবর প্রচার করতে থাকলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১-২)এদিকে শৌল. হযরত ইসা মসিহের উম্মতদের হত্যা করার ভয় দেখাচ্ছিলেন। তিনি মহা-ইমামের কাছে গিয়ে দামেস্ক শহরের সিনাগোগগুলোতে দেবার জন্য চিঠি চাইলেন, যেনো যত লোক এই পথে চলে, তাঁরা পুরুষ বা মহিলা যে-ই হোক, তাঁদেরকে বেঁধে জেরুসালেমে আনতে পারেন।

(৩)পথে যেতে-যেতে তিনি যখন দামেস্কের কাছে এলেন, তখন হঠাৎ আসমান থেকে তাঁর চারদিকে উজ্জ্বল আলো পড়লো। (৪)তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন এবং শুনতে পেলেন একটি কণ্ঠস্বর তাঁকে বলছেন, “শৌল, শৌল, কেনো তুমি আমার ওপরে জুলুম করছো?” (৫)তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “মালিক, আপনি কে?”

(৬)উত্তর এলো, “আমি ইসা, যাঁর ওপরে তুমি জুলুম করছো। এখন উঠে শহরে যাও এবং কী করতে হবে, তা তোমাকে বলা হবে।” (৭)যে-লোকেরা শৌলের সংগে যাচ্ছিলেন, তারা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কারণ তারা কথা শুনছিলেন কিন্তু কাউকে দেখতে পাননি। (৮)হযরত শৌল রা. মাটি থেকে উঠলেন। তাঁর চোখ খোলা থাকলেও তিনি কিছুই দেখতে পেলেন না। তাই তাঁর সঙ্গীরা হাত ধরে তাকে দামেস্কে নিয়ে গেলেন। (৯)তিন দিন পর্যন্ত তিনি কিছুই দেখতে পেলেন না এবং কিছুই খেলেন না বা পান করলেন না।

(১০)দামেস্ক শহরে হযরত অননিয় রা. নামে একজন উম্মত ছিলেন। মসিহ তাঁকে দর্শনের মধ্য দিয়ে বললেন, “অননিয়।” জবাবে তিনি বললেন, “মালিক, এই যে আমি।” (১১-১২)মসিহ তাঁকে বললেন, “সোজা নামে যে-রাস্তাটা আছে, সেই রাস্তায় যাও এবং ইহুদার বাড়িতে গিয়ে তার্সো শহরের শৌল নামের এক লোকের খোঁজ করো। এই মুহূর্তে সে মোনাজাত করছে এবং দর্শনে দেখেছে যে, অননিয় নামে এক লোক এসে তাঁর ওপরে হাত রেখেছে, যেনো সে আবার দেখতে পায়।”

(১৩)কিন্তু হযরত অননিয় রা. উত্তর দিলেন, “মালিক, আমি অনেকের মুখে এই লোকের বিষয়ে শুনেছি যে, জেরুসালেমে সে তোমার কামেলদের ওপর কতো জুলুমই না করেছে। (১৪)এবং প্রধান ইমামদের কাছ থেকে অধিকার নিয়ে সে এখানে এসেছে, যেনো যারা তোমার নামে মোনাজাত করে, তাঁদের ধরে নিয়ে যেতে পারে।”

(১৫)কিন্তু মসিহ তাকে বললেন, “তুমি যাও, কারণ অ-ইহুদিদের ও বাদশাহদের এবং বনি-ইস্রায়েলীয়দের কাছে আমার বিষয়ে প্রচার করার জন্য আমি তাকে বেছে নিয়েছি। (১৬)আমার জন্য তাকে কতো কষ্ট যে পেতে হবে, তা আমি নিজে তাকে দেখাবো।”

(১৭)তখন হযরত অননিয় র. গিয়ে সেই বাড়িতে ঢুকলেন এবং শৌলের ওপর হাত রেখে বললেন, “ভাই শৌল, হযরত ইসা আ., যিনি এখানে আসার পথে তোমাকে দেখা দিয়েছিলেন, তিনিই আমাকে পাঠিয়েছেন, যেনো তুমি তোমার চোখের দৃষ্টি ফিরে পাও এবং আল্লাহর রুহে পূর্ণ হও।”

(১৮-১৯)তখনই তাঁর চোখ থেকে আঁশের মতো কিছু একটা পড়ে গেলো এবং তিনি আবার দেখতে পেলেন। অতঃপর তিনি উঠে বায়াত নিলেন এবং খাওয়া-দাওয়া করে শক্তি ফিরে পেলেন। (২০)তিনি দামেস্কে উম্মতদের সংগে কয়েকদিন থাকলেন। তখন তিনি সিনাগোগগুলোতে এই কথা বলে হযরত ইসা আ. এর বিষয়ে প্রচার করতে লাগলেন যে, তিনিই আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন।

(২১)যারা তাঁর কথা শুনলো, তারা আশ্চর্য হলো এবং বললো, “এ কি সেই লোক নয়, যে জেরুসালেমে যারা হযরত ইসা আ. এর নামে মোনাজাত করে, তাঁদের জুলুম করতো? এবং এখানেও যাঁরা তা করে, তাঁদের বেঁধে প্রধান ইমামদের কাছে নিয়ে যাবার জন্যই কি সে এখানে আসেনি?”

(২২)হযরত শৌল রা. আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে লাগলেন এবং হযরত ইসা আ.-ই যে মসিহ, তা দামেস্কের ইহুদিদের কাছে প্রমাণ করে তাদের বুদ্ধি হারা করে দিলেন। (২৩-২৪)এর কয়েকদিন পর ইহুদিরা তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করতে লাগলো, কিন্তু হযরত শৌল রা. তাদের ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পারলেন। তাঁকে হত্যা করার জন্য তারা শহরের দরজাগুলো দিনরাত পাহারা দিতে লাগলো। (২৫)কিন্তু একদিন রাতের বেলা তাঁর সাগরেদরা একটি ঝুড়িতে করে, দেয়ালের একটি জানালার মধ্য দিয়ে, তাঁকে নিচে নামিয়ে দিলেন।

(২৬)যখন তিনি জেরুসালেমে এলেন, তখন হাওয়ারিদের সংগে যোগ দিতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁরা সবাই তাঁকে ভয় করতে লাগলেন। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করলেন না যে, তিনিও একজন উম্মত হয়েছেন। (২৭)কিন্তু হযরত বার্নবাস রা. তাঁকে সংগে করে হাওয়ারিদের কাছে নিয়ে গিয়ে তাঁদের জানালেন, কীভাবে দামেস্কের পথে তিনি হযরত ইসা আ.কে দেখতে পেয়েছিলেন। এবং তিনি তাঁর সংগে কীভাবে কথা বলেছিলেন, আর দামেস্কে তিনি হযরত ইসা আ. এর বিষয়ে কীভাবে সাহসের সংগে প্রচার করেছিলেন।

(২৮)অতঃপর তিনি জেরুসালেমে তাঁদের সংগে চলাফেরা করতে লাগলেন এবং সাহসের সংগে হযরত ইসা আ. এর বিষয়ে কথা বলতে লাগলেন। (২৯)তিনি সাহসের সংগে গ্রীকদের সংগে কথা বলতেন ও তর্ক করতেন। কিন্তু তারা তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করতে লাগলো। (৩০)ইমানদার ভাইয়েরা এ-কথা শুনে তাঁকে কৈসরিয়া শহরে নিয়ে এলেন এবং পরে তাঁকে তার্র্সো শহরে পাঠিয়ে দিলেন।

(৩১)এই সময় ইহুদিয়া, গালিল ও সামেরিয়া প্রদেশের কওমরা সংগঠিত হয়ে উঠছিলেন ও তাঁদের মধ্যে শান্তি ছিলো। আল্লাহর প্রতি ভয়ে ও আল্লাহর রুহের উৎসাহে তাঁদের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছিলো।

(৩২)হযরত পিতর রা. সব জায়গার ইমানদারদের মধ্যে ঘুরতে-ঘুরতে লুদ্দা গ্রামে বসবাসকারী একজন কামেলের কাছে এলেন। (৩৩)সেখানে তিনি আনিয়াস নামে একজনের দেখা পেলেন। সে অবশরোগে আট বছর ধরে বিছানায় পড়েছিলো। (৩৪)হযরত পিতর রা. তাঁকে বললেন, “আনিয়াস, হযরত ইসা মসিহ তোমাকে সুস্থ করছেন। ওঠো, তোমার বিছানা তুলে নাও।”এবং তখনই সে উঠে দাঁড়ালো। (৩৫)এতে লুদ্দা ও সারোনের সমস্ত লোক তাকে দেখলো এবং আল্লাহর দিকে ফিরলো।

(৩৬)জাফা শহরে টাবিথা নামে একজন উম্মত ছিলেন। গ্রীক ভাষায় এই নামের অর্থ দর্কাস্। তিনি সব সময় ভালো কাজ করতেন ও গরিবদের সাহায্য করতেন। (৩৭)সেই সময় তিনি অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন। আর তারা তাকে গোসল করিয়ে ওপরের কামরায় রেখেছিলো। (৩৮)যেহেতু জাফা ছিলো লুদ্দার কাছে, তাই কওমের লোকেরা যখন শুনলেন যে, হযরত পিতর রা. সেখানে আছেন, তখন তারা দু’ব্যক্তিকে তার কাছে পাঠিয়ে তাকে এই অনুরোধ জানালেন, “দয়া করে তাড়াতাড়ি আমাদের কাছে আসুন।”

(৩৯)সুতরাং, হযরত পিতর রা. তাঁদের সংগে গেলেন। তিনি সেখানে পৌঁছালে তাঁকে ওপরের কামরায় নিয়ে যাওয়া হলো। বিধবারা সবাই তার চারদিকে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন এবং দর্কা বেঁচে থাকতে যে-সব কোর্তা ও অন্যান্য কাপড়-চোপড় তৈরি করেছিলেন, তা তাঁকে দেখাতে লাগলেন। (৪০)তিনি তাদের সবাইকে ঘর থেকে বের করে দিলেন এবং হাঁটু পেতে মোনাজাত করলেন। তিনি মৃত দেহের দিকে ফিরে বললেন, “টাবিথা, উঠো।” তিনি তখন চোখ খুললেন এবং হযরত পিতর রা.-কে দেখে উঠে বসলেন, এবং (৪১)তিনি তার হাত ধরে তাকে উঠতে সাহায্য করলেন। তারপর তিনি কামেল ও বিধবাদের ডেকে দেখালেন যে, তিনি বেঁচে উঠেছেন। (৪২)এ-কথা জাফার সবাই জানতে পারলো এবং অনেকেই হযরত ইসা আ. এর ওপর ইমান আনলো। (৪৩)সেই সময় তিনি জাফাতে সিমোন নামের এক চামড়া-ব্যবসায়ীর বাড়িতে বেশ কিছুদিন থাকলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)কৈসরিয়া শহরে কর্নেলিয়াস নামে একজন লোক ইতালিয় সৈন্যদলের লেফটেন্যান্ট ছিলেন। (২)তিনি আল্লাহ্ভক্ত ছিলেন এবং তিনি ও তার পরিবারের সবাই আল্লাহর এবাদত করতেন। তিনি খুশি মনে গরিবদের দান করতেন এবং সব সময় আল্লাহর কাছে মোনাজাত করতেন।

(৩)এক দিন বেলা তিনটার সময় তিনি একটি দর্শন পেলেন। তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন যে, আল্লাহর এক ফেরেস্তা এসে তাকে ডাকছেন, “কর্নেলিয়াস।”

(৪)তিনি ভয়ে ভয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইয়া আল্লাহ, এ কী?” তিনি উত্তর দিলেন, “তোমার মোনাজাত ও তোমার দানের কথা বেহেস্তে পৌঁছেছে এবং আল্লাহ তা মনে রেখেছেন। (৫)এখন জাফাতে লোক পাঠাও আর সাফওয়ান, যাকে পিতর নামে ডাকা হয়, তাকে ডেকে আনো। (৬)সমুদ্রের ধারে চামড়া-ব্যবসায়ী সিমোনের বাড়িতে সে আছে।”(৭)যে-ফেরেস্তা তার সংগে কথা বলছিলেন, তিনি চলে গেলে পর কর্নেলিয়াস তার দু’জন গোলাম ও একজন সাহায্যকারী সৈন্যকে ডাকলেন। (৮)এবং সমস্ত কথা বুঝিয়ে বলার পর তিনি তাঁদের জাফাতে পাঠালেন।

(৯)পরদিন যখন সেই লোকেরা জাফা শহরের দিকে আসছিলো, তখন বেলা প্রায় দুপুর। হযরত পিতর রা. মোনাজাত করার জন্য সেই সময় ছাদে উঠলেন। (১০)তখন তাঁর খুব ক্ষুধা পেলো এবং তিনি কিছু খেতে চাইলেন। যখন খাবার তৈরি হচ্ছিলো, তখন তিনি প্রায় ঘুমিয়ে পড়লেন।

(১১)সেই অবস্থায় তিনি দেখলেন, আসমান খুলে গেছে এবং বড়ো চাদরের মতো কোনো একটি জিনিসকে চার কোণা ধরে দুনিয়াতে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। (১২)এর মধ্যে সব রকমের চার পা ওয়ালা পশু, বুকে হাঁটা প্রাণী এবং বিভিন্ন পাখি রয়েছে। (১৩)তারপর তিনি একটি কণ্ঠস্বর শুনলেন, তাঁকে বলছেন, “হে পিতর, ওঠো, মেরে খাও।”

(১৪)কিন্তু হযরত পিতর রা.বললেন, “না, না, মালিক, কিছুতেই না। আমি কখনো হারাম কোনো কিছু খাইনি। (১৫)কণ্ঠস্বর তাঁকে আবার বললেন, “আল্লাহ যা হালাল করেছেন, তাকে তুমি হারাম বলো না।” (১৬)তিনবার এরকম হলো এবং হঠাৎ করে সেগুলো আসমানে তুলে নেয়া হলো।

(১৭)হযরত পিতর রা.যখন তার দেখা দর্শনের অর্থ কী হতে পারে, তা নিয়ে মনে-মনে ভাবছিলেন, তখনই কর্নেলিয়াসের পাঠানো লোকেরা এসে দরজায় উপস্থিত হলো। (১৮)তারা সিমোনের বাড়ির খোঁজ করছিলো। তারা ডেকে জিজ্ঞেস করলো, “সিমোন, যাকে পিতরও বলা হয়, তিনি কি এখানে আছেন?”

(১৯)হযরত পিতর রা. তখনো দর্শনের কথা ভাবছিলেন, এ-সময় আল্লাহর রুহ তাঁকে বললেন, “দেখো, তিনজন লোক তোমার খোঁজ করছে। (২০)ওঠো, নিচে যাও। কোনো সন্দেহ না-করে তাদের সংগে যাও, কারণ আমিই তাদের পাঠিয়েছি।”

(২১)তখন তিনি নিচে নেমে এসে সেই লোকদের বললেন, “তোমরা যার খোঁজ করছো, আমিই সেই লোক। তোমরা কেনো এসেছো?” (২২)তারা উত্তর দিলো, “লেফটেন্যান্ট কর্নেলিয়াস আমাদের পাঠিয়েছেন। তিনি একজন দীনদার লোক এবং আল্লাহকে ভয় করেন। গোটা ইহুদি জাতি তার সুনাম করে। একজন পবিত্র ফেরেস্তা তাকে হুকুম দিয়েছেন, (২৩)যেনো তিনি আপনাকে তার বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে আপনার কথা শোনেন।” তখন হযরত পিতর রা. তাদের ভেতরে নিয়ে এলেন এবং তাদের থাকার ও খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। পরদিন তিনি উঠে তাদের সংগে রওনা হলেন এবং জাফা শহরের কয়েকজন ইমানদার ভাইও তাদের সংগে গেলেন।

(২৪)এর পরদিন তারা কৈসরিয়াতে পৌঁছলেন। কর্নেলিয়াস তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

তিনি তার আত্মীয়-স্বজন ও বিশেষ বন্ধুদেরও ডেকেছিলেন। (২৫)হযরত পিতর রা. যখন ঘরে ঢুকলেন, তখন কর্নেলিয়াস তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর পায়ের ওপর উবুড় হয়ে পড়ে তাঁকে সেজদা করলেন। (২৬)কিন্তু হযরত পিতর রা. তাকে উঠিয়ে বললেন, “উঠুন, আমি নিজেও তো একজন মানুষ মাত্র।”

(২৭)তিনি তার সংগে কথা বলতে-বলতে ভেতরে গিয়ে দেখলেন, সেখানে অনেক লোক জমায়েত হয়েছেন। (২৮)তিনি তাদের বললেন, “আপনারা তো জানেন যে, একজন ইহুদির পক্ষে একজন অ-ইহুদির সংগে মেলামেশা করা বা তার সংগে দেখা করা শরিয়ত-বিরুদ্ধ কাজ। কিন্তু আল্লাহ্ আমাকে দেখিয়েছেন যে, আমি যেনো কাউকে অপবিত্র বা নাপাক না-বলি। (২৯)তাই যখন আপনারা আমাকে ডেকে পাঠালেন, তখন কোনো আপত্তি না-করেই আমি এসেছি। এখন আমি কি জিজ্ঞেস করতে পারি, কেনো আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন?”

(৩০)কর্নেলিয়াস বললেন, “চারদিন আগে ঠিক এই সময়, বেলা তিনটায়, আমি আমার ঘরে মোনাজাত করছিলাম, তখন হঠাৎ উজ্জ্বল কাপড় পরা এক লোক আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, (৩১)‘কর্নেলিয়াস, আল্লাহ্ তোমার মোনাজাত শুনেছেন এবং তোমার দানের কথা তিনি মনে রেখেছেন। (৩২)জাফাতে লোক পাঠাও আর সাফওয়ান, যাকে পিতরও বলা হয়, তাকে ডেকে আনো। সে সমুদ্রের ধারের চামড়া-ব্যবসায়ী সিমোনের বাড়িতে আছে।’

(৩৩)এ-জন্য আমি তখনই আপনাকে আনার জন্য লোক পাঠিয়ে দিলাম এবং আপনি দয়া করে এসেছেন। এখানে আমরা সবাই এখন আল্লাহর সামনে আছি। তিনি আপনাকে আমাদের কাছে যা বলতে হুকুম দিয়েছেন, আমরা তার সবই শুনবো।”

(৩৪)তখন হযরত সাফওয়ান রা. বলতে আরম্ভ করলেন, “আমি এখন সত্যিই বুঝতে পারলাম, আল্লাহ্ পক্ষপাতিত্ব করেন না। (৩৫)প্রত্যেক জাতির মধ্যে যারা তাঁকে ভয় করে এবং তাঁর চোখে যা ঠিক তা-ই করে, তিনি তাদের গ্রহণ করেন।

(৩৬)আপনারা জানেন যে, বনি-ইস্রায়েলের কাছে তিনি এই কালাম পাঠিয়ে ছিলেন, হযরত ইসা মসিহের মাধ্যমেই শান্তি প্রচারিত হচ্ছে। তিনি সব মানুষের বাদশাহ।

(৩৭)হযরত ইয়াহিয়া আ. তাঁর বায়াতের কথা ঘোষণা করার পর গালিল থেকে আরম্ভ করে ইহুদিয়ার সব জায়গায় এই সংবাদ প্রচারিত হয়েছে- (৩৮)কীভাবে আল্লাহ্ নাসরতের হযরত ইসা আ.কে আল্লাহর রুহ্ ও শক্তি দিয়ে অভিষেক করেছিলেন, কীভাবে তিনি ভালো কাজ করে বেড়াতেন এবং ইবলিসের হাতে যারা কষ্ট পেতো তাদের সবাইকে সুস্থ করতেন, কারণ আল্লাহ্ তাঁর সংগে ছিলেন।

(৩৯)ইহুদিয়ায় এবং জেরুসালেমে তিনি যা-যা করেছিলেন, আমরা সে-সবের সাক্ষী। তারা তাঁকে সলিবে টাঙিয়ে হত্যা করেছিলো। (৪০)কিন্তু আল্লাহ্ তৃতীয় দিনে তাঁকে জীবিত করে তুললেন, এবং মানুষকে দেখা দিতে দিলেন-

(৪১)সবাইকে নয়, কিন্তু আল্লাহ্ যাদের সাক্ষী হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন এবং মৃত থেকে জীবিত হয়ে ওঠার পরে আমরা যারা তাঁর সংগে খাওয়া-দাওয়া করেছি, সেই আমাদেরকেই। (৪২)তিনি আমাদের হুকুম দিয়েছেন, যেনো আমরা লোকদের কাছে প্রচার করি এবং সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ্ তাঁকেই জীবিত ও মৃতদের বিচারকর্তা হিসাবে নিযুক্ত করেছেন।

(৪৩)সব নবিই তাঁর বিষয়ে এই সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, যারা তাঁর ওপর ইমান আনে, তারা প্রত্যেকে তাঁর নামে গুনাহের ক্ষমা পায়।”

(৪৪)হযরত সাফওয়ান রা. তখনো কথা বলছেন, এমন সময় যারা সে-কথা শুনছিলো, তাদের সকলের ওপর আল্লাহর রুহ নেমে এলেন। (৪৫)যে খতনা করা ইমানদারেরা হযরত সাফওয়ান রা. সংগে এসেছিলেন, তারা এটা দেখে আশ্চর্য হলেন যে, অইহুদিদের ওপরেও আল্লাহর রুহের দান ঢেলে দেয়া হলো। (৪৬)কারণ তাঁরা তাদের ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে ও আল্লাহর প্রশংসা করতে শুনলেন।

(৪৭)তখন হযরত সাফওয়ান রা. বললেন, “পানিতে বায়াত নিতে কি এই লোকদের কেউ বাধা দিতে পারে? তারা তো আমাদের মতোই আল্লাহর রুহকে পেয়েছেন।”(৪৮)তখন তিনি তাদের সবাইকে হযরত ইসা মসিহের নামে বায়াত নেবার হুকুম দিলেন। পরে তারা তাঁকে তাদের কাছে কয়েকদিন থাকতে অনুরোধ করলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)অ-ইহুদিরাও যে আল্লাহর কালামের ওপর ইমান এনেছেন, সে-কথা হাওয়ারিরা এবং সমস্ত ইহুদিয়ার ইমানদার ভাইয়েরা শুনলেন। (২)এ-জন্য হযরত সাফওয়ান রা. যখন জেরুসালেমে ফিরে এলেন, তখন খতনা করানো ইমানদারেরা তাঁকে দোষ দিয়ে বললেন, (৩)“আপনি কেনো খতনা না-করানো লোকদের ঘরে গিয়েছেন এবং তাদের সংগে খাওয়া-দাওয়া করেছেন?”

(৪)তখন হযরত সাফওয়ান রা. এক-এক করে সমস্ত ঘটনা তাদের বুঝিয়ে বললেন- (৫)“আমি জাফা শহরে মোনাজাত করছিলাম। এমন সময় তন্দ্রার মতো অবস্থায় পড়ে একটি দর্শন পেলাম। (৬)আমি দেখলাম, বড়ো চাদরের মতো কি একটি জিনিস চার কোণা ধরে আসমান থেকে আমার কাছে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমি ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম তার মধ্যে নানা রকম পশু, বুনো জানোয়ার, বুকে হাঁটা প্রাণী এবং পাখি আছে।

(৭)আমি শুনতে পেলাম একটি কণ্ঠস্বর আমাকে বলছেন, ‘সাফওয়ান, উঠো; মেরে খাও।’ (৮)কিন্তু আমি বললাম, “না, না, মালিক, কিছুতেই না; হারাম কোনো কিছু কখনো আমি মুখে দেইনি।’ (৯)কিন্তু আসমান থেকে সেই কণ্ঠস্বর দ্বিতীয় বার বললেন, ‘আল্লাহ্ যা হালাল করেছেন, তাকে তুমি হারাম বলো না।’ (১০)এরকম তিন বার হলো, তারপর সবকিছু আবার আসমানে তুলে নেয়া হলো।

(১১)এর প্রায় সংগে-সংগে আমি যে-বাড়িতে ছিলাম, সেই বাড়িতে তিন জন লোক এসে উপস্থিত হলো। কৈসরিয়া থেকে তাদের পাঠানো হয়েছিলো।

(১২)আল্লাহর রুহ আমাকে বললেন, যেনো কোনো সন্দেহ না-করে আমি তাদের সংগে যাই এবং তাদের ও আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য না-করি। এই ছয় ভাইও আমার সংগে গিয়েছিলেন এবং আমরা সেই লোকের বাড়িতে ঢুকলাম।

(১৩)তিনি আমাদের বললেন, কীভাবে একজন ফেরেস্তাকে তার ঘরে দেখলেন এবং তার কথা শুনলেন- ‘সাফওয়ান, যাকে পিতরও বলা হয়, তাকে ডেকে আনতে তুমি জাফা শহরে লোক পাঠাও। (১৪)সে তোমাকে একটি সংবাদ দেবে এবং এতে তুমি ও তোমার গোটা পরিবার নাজাত পাবে।’ (১৫)এবং আমি কথা বলতে শুরু করলে আল্লাহর রুহ তাদের ওপরে নেমে এলেন, ঠিক যেভাবে প্রথমে আমাদের ওপরে এসেছিলেন।

(১৬)তখন হযরত ইসা আ. যা বলেছিলেন, সে-কথা আমার মনে পড়লো- ‘ইয়াহিয়া পানিতে বায়াত দিতেন কিন্তু তোমরা আল্লাহর রুহে বায়াত পাবে।’ (১৭)যদি আল্লাহ্ তাদের একই দান দেন, যে-দান হযরত ইসা মসিহের ওপর ইমান আনার পর আমাদের দেয়া হয়েছিলো, তাহলে আমি কে যে, আল্লাহকে বাধা দিতে পারি?” (১৮)এ-কথা শুনে তাঁরা শান্ত হলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন, “তাহলে আল্লাহ্ অ-ইহুদিদেরও তওবা করার সুযোগ দিলেন, যা তাদেরকে নাজাতে নিয়ে যাবে।”

(১৯)হযরত স্তিফান র.-কে কেন্দ্র করে ইমানদারদের ওপর জুলুমের কারণে যারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন, তাঁরা ফিনিসিয়া, সাইপ্রাস ও আন্তিয়খিয়া পর্যন্ত গিয়ে কেবল ইহুদিদের কাছেই আল্লাহর কালাম প্রচার করেছিলেন। (২০)কিন্তু তাঁদের মধ্যে সাইপ্রাস ও সাইরিনির কয়েকজন আন্তিয়খিয়াতে গিয়ে গ্রীকদের কাছে হযরত ইসা মসিহের বিষয়ে প্রচার করতে লাগলেন। (২১)আল্লাহর রহমতের হাত তাঁদের ওপর ছিলো, এবং অনেক লোক হযরত ইসা মসিহের ওপর ইমান এনে তাঁর দিকে ফিরলো।

(২২)এই খবর জেরুসালেমের কওমের লোকদের কানে গেলে তাঁরা হযরত বার্নবাস র.-কে আন্তিয়খিয়াতে পাঠিয়ে দিলেন। ২৩তিনি সেখানে গিয়ে লোকদের প্রতি আল্লাহর রহমত দেখে আনন্দিত হলেন এবং আল্লাহর শুকরিয়া জানালেন। (২৪)হযরত ইসা আ. এর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে ও ইবাদতে মনোযোগী হতে তিনি তাদের উৎসাহ দিলেন। কারণ তিনি একজন ভালো লোক ছিলেন এবং ইমানে ও আল্লাহর রুহে পূর্ণ ছিলেন। অনেক মানুষকেই তিনি হযরত ইসা আ. এর কাছে নিয়ে এসেছিলেন।

(২৫,২৬)এরপর হযরত বার্নবাস র. হযরত শৌল রা.-র খোঁজে তার্সো শহরে গেলেন। আর তাঁকে খুঁজে পেয়ে আন্তিয়খিয়াতে নিয়ে এলেন। তাঁরা প্রায় এক বছর পর্যন্ত কওমের সংগে মিলিত হয়ে অনেক লোককে শিক্ষা দিলেন। এবং এই আন্তিয়খিয়াতেই প্রথম সেখানকার অনুসারীদের তাদের ভাষায় খ্রীষ্টিয়ানুস্ নামে ডাকা হয়।

(২৭,২৮)সেই সময় জেরুসালেম থেকে বিশেষ কয়েকজন ইমানদার ব্যক্তি আন্তিয়খিয়াতে এলেন। তাদের মধ্যে আগাব নামে একজন উঠে দাঁড়িয়ে রুহের পরিচালনায় বললেন যে, সারা দুনিয়ায় ভীষণ এক দুর্ভিক্ষ হবে।

এবং ক্লডিয়াসের রাজত্বের সময়ে সে-কথা পূর্ণ হয়েছিলো। (২৯)তখন কওমের লোকের ঠিক করলেন যে, তারা প্রত্যেকে নিজ-নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ইহুদিয়ার ইমানদার ভাইদের জন্য সাহায্য পাঠাবেন। (৩০)তারা হযরত বার্নবাস র. ও হযরত শৌল রা.-র হাত দিয়ে জেরুসালেমে বুজুর্গদের কাছে তা পাঠিয়ে ছিলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)সেই সময় বাদশাহ হেরোদ জুলুম করার জন্য কওমের কয়েকজনকে ধরে এনেছিলেন। (২)তিনি হযরত ইউহোন্না রা.-র ভাই হযরত ইয়াকুব রা.-কে তরবারি দিয়ে হত্যা করিয়ে ছিলেন। (৩)যখন তিনি দেখলেন ইহুদিরা তাতে খুশি হয়েছে, তখন তিনি হযরত সাফওয়ান রা.-কে ধরতে গেলেন। (৪)এই ঘটনা ইদুল-মাত্-ছের সময় হয়েছিলো। তিনি হযরত সাফওয়ান রা.-কে ধরে জেলে দিলেন। চারজন-চারজন করে চার দল সৈন্যের ওপর তাকে পাহারা দেবার ভার দেয়া হলো। তিনি ঠিক করলেন, ইদুল-ফেসাখের পরে বিচার করার জন্য তাঁকে লোকদের সামনে আনবেন।

(৫)হযরত সাফওয়ান রা. জেলখানায় বন্দি থাকা অবস্থায় কওমের লোকেরা তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে আকুলভাবে মোনাজাত করছিলেন। (৬)যেদিন হেরোদ বিচারের জন্য হযরত সাফওয়ান রা.-কে বের করে আনবেন, তার আগের রাতে দু’জন সৈন্যের মাঝখানে তিনি দু’টো শেকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় ঘুমাচ্ছিলেন। এবং পাহারাদাররা দরজায় পাহারা দিচ্ছিলো।

(৭)এমন সময় হঠাৎ আল্লাহর এক ফেরেস্তা সেখানে উপস্থিত হলেন এবং জেলখানার সেই কামরাটা আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তিনি হযরত সাফওয়ান রা. গায়ে জোরে ঠেলা দিয়ে তাঁকে জাগিয়ে বললেন, “তাড়াতাড়ি ওঠো।” এতে তাঁর দু’হাত থেকে শেকল খুলে পড়ে গেলো। (৮)তখন ফেরেস্তা তাঁকে বললেন, “তোমার কোমরে কোমর-বাঁধনি লাগাও, পায়ে জুতা পরো।” তিনি তা-ই করলেন। অতঃপর তিনি তাঁকে বললেন, “তোমার চাদরখানা গায়ে জড়িয়ে আমার পেছনে-পেছনে এসো।”

(৯)হযরত সাফওয়ান রা. তাঁর পেছনে-পেছনে বাইরে এলেন, কিন্তু ফেরেস্তা যা করছিলেন তা যে সত্যি সত্যিই ঘটছে, তার কিছুই তিনি বুঝতে পারলেন না। তিনি মনে করলেন দর্শন দেখছেন।

 

(১০)তাঁরা প্রথম ও দ্বিতীয় পাহারাদারদের দল পার হয়ে শহরে ঢোকার লোহার দরজার কাছে এলেন। দরজাটা তাঁদের জন্য নিজে-নিজেই খুলে গেলো। তাঁরা তার মধ্য দিয়ে বের হয়ে একটি রাস্তা ধরে হেঁটে চললেন। এই সময় ফেরেস্তা হঠাৎ তাকে ছেড়ে চলে গেলেন।

(১১)তখন হযরত সাফওয়ান রা. যেনো চেতনা ফিরে পেলেন এবং বললেন, “এখন আমি সত্যিই বুঝতে পারলাম যে, আল্লাহ্ তাঁর ফেরেস্তাকে পাঠিয়ে হেরোদের হাত থেকে এবং ইহুদিরা যা করার ষড়যন্ত্র করছিলো, তা থেকে আমাকে রক্ষা করলেন।”

(১২)এ-কথা বুঝতে পেরে তিনি হযরত ইউহোন্না রা.-র মা মরিয়মের বাড়িতে গেলেন। এই হযরত ইউহোন্না রা.-কে মার্ক বলেও ডাকা হতো। সেখানে অনেকে এক সংগে মিলিত হয়ে মোনাজাত করছিলেন। (১৩)তিনি বাইরের দরজায় আঘাত করলে পর রোদা নামে এক দাসী দরজা খুলতে এলো। (১৪)সে হযরত সাফওয়ান রা.-র গলার আওয়াজ চিনতে পেরে এতো আনন্দিত হলো যে, দরজা না-খুলেই দৌঁড়ে ভেতরের ঘরে গিয়ে সংবাদ দিলো যে, হযরত সাফওয়ান রা. দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। (১৫)তাঁরা তাকে বললেন, “তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।” কিন্তু সে বার বার জোর দিয়ে বলাতে তারা বললেন, “তবে এ তার আত্মা।”

(১৬)এদিকে তিনি দরজায় আঘাত করতেই থাকলেন। তখন তাঁরা দরজা খুলে তাঁকে দেখে অবাক হলেন। (১৭)তিনি হাতের ইশারায় তাঁদের চুপ করতে বললেন এবং জেলখানা থেকে আল্লাহ্ তাঁকে কীভাবে বের করে এনেছেন, তা তাঁদের জানালেন। তিনি এও বললেন, “এই খবর হযরত ইয়াকুব রা. ও অন্য ভাইদেরও দিয়ো।” এ-কথা বলে তিনি বের হয়ে অন্য জায়গায় চলে গেলেন।

(১৮)সকাল হলে পর হযরত সাফওয়ান রা. কোথায় গেলেন, তা নিয়ে সৈন্যদের মধ্যে হুলস্থুল পড়ে গেলো। (১৯)হেরোদ খুব ভালো করে খোঁজাখুঁজি করলেন। কিন্তু তাঁকে না-পেয়ে পাহারাদারদের জেরা করলেন এবং পরে তাদের হত্যা করার হুকুম দিলেন। এরপর তিনি ইহুদিয়া থেকে কৈসরিয়াতে চলে গেলেন এবং সেখানেই থাকলেন।

(২০)সেই সময় হেরোদ টায়ার ও সিডন শহরের লোকদের ওপরে খুব রেগে গেলেন। তখন সেখানকার লোকেরা এক সংগে মিলে হেরোদের সংগে দেখা করতে গেলো। ব্লাস্ত নামে বাদশাহর শোবার ঘরের বিশ্বস্ত কর্মচারীকে নিজেদের পক্ষে এনে তারা বাদশাহর সংগে একটি মীমাংসা করতে চাইলো। কারণ বাদশাহ হেরোদের দেশ থেকেই তাদের দেশে খাদ্য সামগ্রী আসতো। (২১)তখন হেরোদ পূর্ব নির্ধারিত একটি দিনে রাজ-পোশাক পরে সিংহাসনে বসে সেই লোকদের কাছে কথা বলতে লাগলেন। (২২)তার কথা শুনে লোকেরা চিৎকার করে বলতে থাকলো, “এ দেবতার কণ্ঠস্বর, মানুষের কথা নয়।” (২৩)হেরোদ আল্লাহর গৌরব করেননি বলে তখনই আল্লাহর এক ফেরেস্তা তাকে আঘাত করলেন। আর কৃমি তাকে খেলো এবং তিনি মারা গেলেন।

(২৪)কিন্তু আল্লাহর কালাম ছড়িয়ে পড়তে থাকলো এবং অনেক লোক তাঁর ওপর ইমান আনতে লাগলো। (২৫)এদিকে হযরত বার্নবাস রা. ও হযরত শৌল রা. তাঁদের কাজ শেষ করে হযরত ইউহোন্না র.-কে সংগে নিয়ে জেরুসালেমে ফিরে গেলেন। এই ইউহোন্নাকে মার্ক নামেও ডাকা হতো।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)আন্তিয়খিয়ার অনুসারীদের মধ্যে কয়েকজন ওলি ও শিক্ষক ছিলেন। তাদের নাম হযরত বার্নবাস র., হযরত নিগের র. নামে পরিচিত সিমোন, সাইরিনীয় হযরত লুকিয়াস র., শাসনকর্তা হেরোদের রাজ সভার হযরত মানায়েন র. এবং হযরত শৌল রা.। (২)তারা যখন রোজা রাখছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদত করছিলেন, তখন আল্লাহর রুহ তাদের বললেন, “বার্নবাস আর শৌলকে আমি যে-কাজের জন্য ডেকেছি, তার জন্য তাদের আলাদা করে দাও।”

(৩)তখন তাঁরা রোজা রেখে ও মোনাজাত করে সেই দু’জনের ওপর হাত রাখলেন এবং তাঁদের পাঠিয়ে দিলেন। (৪)আল্লাহর রুহের দ্বারা প্রেরিত হয়ে হযরত বার্নবাস র. ও হযরত শৌল রা. সেলেউকিয়াতে গেলেন। (৫)পরে সেখান থেকে জাহাজে করে সাইপ্রাসে গেলেন। সালামিতে পৌঁছে তাঁরা ইহুদিদের সিনাগোগে আল্লাহর কালাম প্রচার করলেন এবং হযরত ইউহোন্না র. ও সাহায্যকারী হিসাবে তাদের সংগে ছিলেন।

(৬)গোটাদ্বীপ ঘোরা শেষে তাঁরা পাফোতে এলেন এবং সেখানে বার-ইসা নামে একজন ইহুদি জাদুকর ও ভন্ড-নবির দেখা পেলেন। (৭,৮)সেই ভন্ড-নবিকে ইলুমা, অর্থাৎ জাদুকর বলা হতো। সেই জাদুকর সের্গিয়-পৌলের একজন বন্ধু আর তিনি ছিলেন একজন বুদ্ধিমান লোক। সের্গিয়-পৌল আল্লাহর কালাম শোনার জন্য হযরত বার্নবাস র. ও হযরত শৌল রা.-কে ডেকে পাঠালেন। কিন্তু ইলুমা তাদের বাধা দিতে চেষ্টা করলো।

(৯)কিন্তু শৌল, যাকে হযরত পৌল রা. বলেও ডাকা হতো, তিনি আল্লাহর রুহে পূর্ণ হয়ে সোজা ইলুমার দিকে তাকালেন, এবং বললেন “তুমি ইবলিসের সন্তান ও দীনদারির শত্রু (১০)সব রকম ছলনা ও ঠকামিতে পূর্ণ। তুমি কি আল্লাহর সোজা পথকে বাঁকা করার কাজ কখনো থামাবে না? এখন শোনো, আল্লাহর হাত তোমার বিরুদ্ধে উঠেছে। (১১)তুমি অন্ধ হয়ে যাবে এবং কিছুদিন সূর্যের আলো দেখতে পাবে না।” তখনই কুয়াসা আর অন্ধকার তাকে ঢেকে ফেললো এবং কেউ যেনো তাকে হাত ধরে সাহায্য করতে পারে, এ-জন্য তখন সে হাতড়ে বেড়াতে লাগলো।

(১২)এসব দেখে সেই শাসনকর্তা ইমান আনলেন। কারণ আল্লাহর বিষয়ে যে-শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন, তাতে আশ্চর্য হয়েছিলেন। (১৩)এরপর হযরত পৌল রা. ও তার সঙ্গীরা পাফো থেকে জাহাজে করে পাম্ফুলিয়ার পের্গায় এলেন।

(১৪)তবে হযরত ইউহোন্না র. তাদের ছেড়ে জেরুসালেমে ফিরে গেলেন। তারা পের্গা থেকে পিসিদিয়া প্রদেশের আন্তিয়খিয়া শহরে গেলেন এবং সাব্বাতে সিনাগোগে গিয়ে বসলেন।

(১৫)তওরাত ও সহিফাগুলো থেকে তেলাওয়াত করা শেষ হলে সিনাগোগের নেতারা তাঁদের বললেন, “ভাইয়েরা, লোকদের উৎসাহ দেবার জন্য যদি কোনো কথা আপনাদের থাকে, তবে বলুন।” (১৬)তখন হযরত পৌল রা. উঠে দাঁড়ালেন এবং হাত তুলে বললেন, “হে বনি-ইস্রায়েলীয়রা ও আল্লাহ্ভক্ত অ-ইহুদিরা, শুনুন-

(১৭-১৮)এই ইস্্রায়েল জাতির আল্লাহ্ আমাদের পূর্বপুরুষদের বেছে নিয়েছিলেন। যখন তাঁরা মিসরে ছিলেন, তখন তাঁদের অনেক বড়ো জাতিতে পরিণত করেছিলেন। তাঁর মহা-ক্ষমতায় সেই দেশ থেকে তাঁদের বের করে এনেছিলেন।

প্রায় চল্লিশ বছর ধরে মরু-প্রান্তরের মধ্যে তাঁদের অন্যায় ব্যবহার সহ্য করেছিলেন। (১৯)তারপর তিনি কেনান দেশের সাতটি জাতিকে ধ্বংস করে সেই দেশের ওপর তাঁদের অধিকার দিয়েছিলেন।

(২০)এসব ঘটনা ঘটতে প্রায় চারশ-পঞ্চাশ বছর লেগেছিলো। এরপর হযরত সামুয়েল আ. এর সময় পর্যন্ত তাঁদের শাসন করার জন্য আল্লাহ তাঁদের কয়েকজন কাজি দিয়েছিলেন। (২১)পরে তাঁরা একজন বাদশাহ চাইলো। তখন আল্লাহ্ তাঁদের বিন্ইয়ামিন বংশের কিশ্-এর ছেলে তালুতকে দিয়েছিলেন।

(২২)তিনি চল্লিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন। তারপর তিনি তাঁকে সরিয়ে হযরত দাউদ আ. কে বাদশাহ করলেন। তাঁর বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ইয়াচ্ছার ছেলে দাউদের মধ্যে আমার মনের মতো লোকের খোঁজ পেয়েছি। সে আমার সমস্ত ইচ্ছাপূর্ণ করবে।’ (২৩)তিনি তাঁর ওয়াদা অনুসারে এই লোকের বংশধরদের মধ্য থেকে বনি-ইস্্রাইলের কাছে নাজাতদাতা হযরত ইসা আ.-কে পাঠিয়েছেন।

(২৪)তাঁর আসার আগে হযরত ইয়াহিয়া আ. বনি-ইস্রায়েলের কাছে তওবার বায়াত প্রচার করেছেন। (২৫)তিনি তাঁর কাজ শেষ করার সময় বলেছিলেন, ‘আমি কে, তোমরা কী মনে করো? আমি তিনি নই, কিন্তু যিনি আমার পরে আসছেন, আমি তাঁর জুতার ফিতা খোলারও যোগ্য নই।’

(২৬)ভাইয়েরা, হে হযরত ইব্রাহিম আ. এর বংশধরেরা ও আল্লাহ্ভক্ত অ-ইহুদিরা, নাজাতের এই যে কালাম, তা আমাদের কাছেই পাঠানো হয়েছে। (২৭)কারণ জেরুসালেমের লোকেরা ও তাঁদের নেতারা তাঁকে চেনেনি। এছাড়া নবিদের যে-কথা প্রত্যেক সাব্বাতে তেলাওয়াত করা হয়, তাও তাঁরা বুঝতে পারেনি। তাঁরা তাঁকে দোষী করে সেই কথাগুলো পূর্ণ করেছেন।

(২৮)যদিও মৃত্যুর শাস্তি দেবার মতো কোনো কারণ তারা পায়নি, তবুও পিলাতকে তারা বলেছেন, যেনো তাঁকে হত্যা করা হয়। (২৯)তাঁর বিষয়ে লেখা সবকিছু পূর্ণ করার পর তারা তাঁকে গাছ থেকে নামিয়ে দাফন করেছিলো। (৩০)কিন্তু আল্লাহ্ তাঁকে মৃত থেকে জীবিত করে তুলেছেন। (৩১)এবং গালিল থেকে যাঁরা তাঁর সংগে জেরুসালেমে এসেছিলেন, তিনি অনেকদিন পর্যন্ত তাঁদের দেখা দিয়েছিলেন। এখন তাঁরাই লোকদের কাছে তাঁর সাক্ষী।

(৩২)আমরা আপনাদের কাছে এই সুখবর দিচ্ছি যে, আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে আল্লাহ্ যে-ওয়াদা করেছিলেন, (৩৩)তিনি তাঁদের বংশধরদের জন্য হযরত ইসা আ. কে জীবিত করে তুলে তা পূর্ণ করেছেন। এই বিষয়ে জবুর শরীফের দ্বিতীয় রুকুতে এ-কথা লেখা আছে- ‘তুমিই আমার একান্ত প্রিয়মনোনীত জন, আজই আমি তোমার প্রতি পালক হয়েছি।’

(৩৪)তিনি যে তাঁকে মৃত থেকে জীবিত করে তুলেছেন এবং তাঁর শরীর যে আর কখনো নষ্ট হবে না,

(৩৫)সে-বিষয়ে তিনি এই কথাগুলো বলেছেন, ‘দাউদের কাছে করা আমার পবিত্র ওয়াদা আমি তোমাকে দেবো।’ এ-বিষয়ে জবুর শরীফের আরেক জায়গায় তিনি বলেছেন- ‘তোমার পবিত্র ভক্তের শরীরকে তুমি নষ্ট হতে দেবে না।’

(৩৬)কারণ হযরত দাউদ আ.তাঁর সময়ের লোকদের মধ্যে আল্লাহর উদ্দেশ্য পূর্ণ করার পরে ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর পূর্বপুরুষদের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়েছে এবং তাঁর শরীর মাটিতে মিশে গেছে। (৩৭)কিন্তু আল্লাহ যাঁকে জীবিত করেছিলেন, তাঁর শরীর নষ্ট হয়নি।

(৩৮)এ-জন্য আমার ভাইয়েরা, আপনাদের জানা দরকার যে, তাঁর নামের মাধ্যমেই নাজাত পাবার কথা আপনাদের কাছে প্রচার করা হচ্ছে। (৩৯)আপনারা হযরত মুসা আ. এর শরিয়তের দ্বারা নাজাত পাননি, কিন্তু যে-কেউ হযরত ইসা মসিহের ওপর ইমান আনে, সে তার সমস্ত গুনাহ্ থেকে নাজাত পায়।

(৪০)এ-জন্য আপনারা সাবধান হোন, যেনো নবিরা যা বলেছেন, তা আপনাদের ওপর না-ঘটে- (৪১)‘হে তামাসাকারীরা, তোমরা শোনো, তোমরা হতভম্ব হও ও ধ্বংস হও। কারণ তোমাদের সময়কালেই আমি একটি কাজ করছি। এমন কাজ, যা তোমরা কখনো বিশ্বাস করবে না; এমনকি কেউ বললেও না।’” (৪২)হযরত পৌল রা. আর হযরত বার্নবাস র. যখন বের হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন লোকেরা তাঁদের অনুরোধ করলো, যেনো তাঁরা পরের সাব্বাতে এ-বিষয়ে আরো কিছু বলেন।

(৪৩)সিনাগোগের সভা শেষ হলে পর অনেক ইহুদি ও ইহুদি ধর্ম গ্রহণকারী আল্লাহ্ ভক্ত অ-ইহুদিরা হযরত পৌল রা. আর হযরত বার্নবাস র.-র সংগে গেলেন। তাঁরা এই লোকদের উৎসাহ দিলেন, যেনো তাঁরা আল্লাহর রহমতের মধ্যে স্থির থাকেন।

(৪৪)পরের সাব্বাতে শহরের প্রায় সব লোক আল্লাহর কালাম শোনার জন্য এক সংগে মিলিত হলো। (৪৫)কিন্তু এতো লোকের ভিড় দেখে ইহুদিরা হিংসায় জ্বলে উঠলেন এবং হযরত পৌল রা.র সংগে তর্কাতর্কি ও তাঁর নিন্দা করতে লাগলেন। (৪৬)তখন হযরত পৌল রা. আর হযরত বার্নবাসর. সাহসের সংগে তাদের বললেন, “আল্লাহর কালাম প্রথমে আপনাদের কাছে বলা দরকার ছিলো কিন্তু আপনারা যখন তা অগ্রাহ্য করছেন এবং আল্লাহর দীনে দাখিলের যোগ্য বলে নিজেদের মনে করছেন না, তখন আমরা অ-ইহুদিদের কাছে যাচ্ছি।

(৪৭)কারণ হযরত ইসা মসিহ আমাদেরকে এই হুকুম দিয়েছেন, ‘আমি তোমাকে অন্য জাতির কাছে আলোর মতো করেছি, যেনো তুমি দুনিয়ার শেষ সীমা পর্যন্ত নাজাত পৌঁছাতে পারো।’ (৪৮)অ-ইহুদিরা এ-কথা শুনে খুশি হলো এবং আল্লাহর কালামের গৌরব করলো। আর দীনে দাখিল হওয়ার জন্য আল্লাহ্ যাদের ঠিক করে রেখেছিলেন, তারা ইমান আনলো।

(৪৯,৫০)আল্লাহর কালাম সেই এলাকার সমস্ত জায়গায় ছড়িয়ে পড়লো। কিন্তু ইহুদিরা আল্লাহর ইবাদতকারী ভদ্র মহিলাদের এবং শহরের প্রধান-প্রধান লোকদের উসকে দিলো। এভাবে তাঁরা হযরত পৌল রা. আর হযরত বার্নবাস রা.  এর ওপর জুলুম করে সেই এলাকা থেকে তাঁদের তাড়িয়ে দিলো।

(৫১)তখন হযরত পৌল রা. আর হযরত বার্নবাস র. সেই লোকদের বিরুদ্ধে তাঁদের পায়ের ধুলো ঝেড়ে ফেলে ইকোনিয়ম শহরে চলে গেলেন। (৫২)এবং সেখানকার উম্মতেরা আনন্দে ও আল্লাহর রুহে পূর্ণ হলো।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)ইকোনিয়ম শহরেও একই ঘটনা ঘটলো। সেখানে হযরত পৌল রা. ও হযরত বার্নবাস রা. ইহুদিদের সিনাগোগে গিয়ে এমনভাবে কথা বললেন যে, অনেক ইহুদি ও আল্লাহ্ ভক্ত অ-ইহুদি ইমান আনলো। (২)কিন্তু অ-বিশ্বাসী ইহুদিরা অ-ইহুদিদের উসকে দিয়ে ইমানদার ভাইদের বিরুদ্ধে তাদের মন  বিষিয়ে তুললো।

(৩)তাই তাঁরা বেশ কিছুদিন সেখানে রইলেন এবং সাহসের সংগে আল্লাহর কথা বলতে থাকলেন। তাঁরা তাঁর দয়ার কালাম প্রচার করলেন এবং সে-সব কথা যে বিশ্বাসযোগ্য, তার প্রমাণ হিসাবে তাঁরা আশ্চর্য কাজও করলেন। (৪)তবুও শহরের লোকেরা দু’ভাগ হয়ে গেলো। কেউ-কেউ ইহুদিদের পক্ষে, আবার কেউ-কেউ হাওয়ারিদের পক্ষে গেলো।

(৫)যখন অ-ইহুদি ও ইহুদি এই দু’দলই তাদের নেতাদের সংগে মিলে হাওয়ারিদেরকে অত্যাচার করার ও পাথর মারার ষড়যন্ত্র করলো, (৬)তখন হাওয়ারিরা তা জানতে পেরে লুকাওনিয়া প্রদেশের লুস্ত্রা ও দেব্রা শহরে এবং তার আশেপাশের জায়গায় পালিয়ে গেলেন। (৭) এবং সে-সব জায়গায় তাঁরা সুখবর প্রচার করতে থাকলেন।

(৮)লুস্ত্রায় এমন এক লোক ছিলো, যে তার পা ব্যবহার করতে পারতো না। সে কখনো হাঁটেনি। সে জন্ম থেকেই খোঁড়া ছিলো। (৯-১০)হযরত পৌল রা. যখন কথা বলছিলেন, তখন সে শুনছিলো। তিনি সোজা তার দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে, সুস্থ হবার মতো ইমান তার আছে। এতে তিনি জোরে বললেন, “তোমার পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াও।”তখন লোকটি লাফ দিয়ে উঠে হাঁটতে লাগলো।

(১১)হযরত পৌল রা. যা করলেন তা দেখে লোকেরা লুকাওনীয় ভাষায় চিৎকার করে বললো, “দেবতারা মানুষ হয়ে আমাদের কাছে নেমে এসেছেন।”(১২)তারা হযরত বার্নবাস র. নাম দিলো জিউস এবং হযরত পৌল রা. প্রধান বক্তা হওয়ায় তার নাম দিলো হার্মিস। (১৩)জিউস দেবতার মন্দিরটা ছিলো শহরের বাইরে। মন্দিরের পুরোহিত ষাঁড় ও মালা নিয়ে এলো। কারণ সে এবং সমস্ত লোকেরা পশু উৎসর্গ করতে চাইলো।

(১৪)হযরত বার্নবাস র. ও হযরত পৌল রা. সে-কথা শুনতে পেয়ে নিজেদের কাপড় ছিঁড়ে দৌড়ে লোকদের মধ্যে গেলেন এবং চিৎকার করে বললেন, (১৫)“বন্ধুরা, আপনারা কেনো এসব করছেন? আমরা তো কেবল আপনাদের মতো মানুষ। আমরা আপনাদের কাছে সুখবর এনেছি, যেনো আপনারা এসব অসার জিনিস ছেড়ে জীবন্ত আল্লাহর দিকে ফেরেন। তিনিই আসমান, জমিন, সমুদ্র এবং সেগুলোর মধ্যে যা আছে, তার সবকিছুই সৃষ্টি করেছেন।

(১৬)আগেকার দিনে সব জাতিকেই তিনি তাদের ইচ্ছামতো চলতে দিয়েছেন।

(১৭)তবুও তিনি সব সময় ভালো কাজের দ্বারা নিজের বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি আসমান থেকে বৃষ্টি দিয়ে এবং সময় মতো ফসল দান করে, প্রচুর খাবার দিয়ে, আপনাদের মনকে আনন্দে পূর্ণ করেছেন।”(১৮)এসব কথা বলে অনেক কষ্টে তারা পশু উৎসর্গ করা থেকে তাদেরকে থামালেন।

(১৯)পরে যখন আন্তিয়খিয়া ও ইকোনিয়ম থেকে আসা কয়েকজন ইহুদি, লোকদের উসকে দিলো, তখন তারা হযরত পৌল রা.-কে পাথর মারলো এবং তিনি ইন্তেকাল করেছেন মনে করে তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে শহরের বাইরে ফেলে রাখলো। (২০)কিন্তু পরে ইমানদারেরা তার চারপাশে জমায়েত হলে তিনি উঠে শহরে ফিরে গেলেন। পরদিন তিনি হযরত বার্নবাস র. সংগে দেব্রা শহরে চলে গেলেন।

(২১-২২)দেব্রাতে ইঞ্জিল প্রচার করায় সেখানে অনেকে ইমান আনলে পর তাঁরা লুস্ত্রা, ইকোনিয়ম ও আন্তিয়খিয়াতে ফিরে গেলেন। সেখানকার উম্মতদের ইমান বাড়িয়ে তাঁদের শক্তিশালী করলেন এবং ইমানে স্থির থাকতে উৎসাহ দিলেন। তাঁরা বললেন, “অনেক জুলুম সহ্য করার মধ্য দিয়ে আমরা অবশ্যই আল্লাহর রাজ্যে ঢুকবো।”

(২৩)এরপর তাঁরা প্রত্যেক ইমানদার দলে বুজুর্গদের নিয়োগ করলেন এবং যে হযরত ইসা আ. এর ওপর তাঁরা ইমান এনেছিলেন, মোনাজাত ও রোজা রেখে সেই হযরত ইসা আ. এর হাতেই তাদের তুলে দিলেন। (২৪)এরপর তাঁরা পিসিদিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়ে পাম্‌ফুলিয়ায় পৌঁছলেন। (২৫)পের্গায় আল্লাহর কালাম প্রচার করার পর তাঁরা অত্তালিয়ায় গেলেন। (২৬)সেখান থেকে তাঁরা জাহাজে করে আন্তিয়খিয়ায় ফিরে এলেন। যে-কাজ তাঁরা শেষ করেছিলেন, তার জন্য এখানেই তাঁদেরকে আল্লাহর রহমতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিলো।

(২৭)এখানে পৌঁছে তাঁরা ইমানদার দলের সবাইকে এক জায়গায় জমায়েত করলেন এবং আল্লাহ্ তাঁদের মধ্যদিয়ে যা করেছেন, তার সবই তাঁদের জানালেন; এবং কীভাবে অ-ইহুদিদের জন্য ইমানের দরজা খুলে দেয়া হয়েছে, তাও বললেন। (২৮)অতঃপর তাঁরা কিছুদিন উম্মতদের সংগে থাকলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)সেই সময় ইহুদিয়া থেকে কয়েকজন লোক এলেন এবং ভাইদের এই শিক্ষা দিতে লাগলেন যে, “হযরত মুসা আ. এর শরিয়ত মতে তোমাদের খতনা করানো না-হলে তোমরা কোনো মতেই নাজাত পাবে না।” (২)তাতে হযরত পৌল রা. ও হযরত বার্নবাস রা. এর সংগে এই লোকদের ভীষণ কথা কাটাকাটি হলো। পরে ঠিক হলো যে, হযরত পৌল রা. ও হযরত বার্নবাস রা. এবং আরো কয়েকজন জেরুসালেমে যাবেন এবং হাওয়ারিদের ও বুজুর্গদের সংগে এই বিষয়ে আলোচনা করবেন।

(৩)তাই কওমের লোকেরা তাঁদের যাবার ব্যবস্থা করে দিলেন। ফিনিসিয়া আর সামেরিয়া প্রদেশের মধ্য দিয়ে যাবার সময় তাঁরা অ-ইহুদিদের ইমান আনার কথা জানালেন এবং সমস্ত ইমানদারদের আনন্দ বাড়িয়ে তুললেন।

(৪)যখন তাঁরা জেরুসালেমে পৌঁছলেন, তখন সেখানকার কওমের লোকেরা, বুজুর্গরা ও হাওয়ারিরা আগ্রহের সংগে তাঁদের গ্রহণ করলেন এবং আল্লাহ্ তাঁদের মধ্যদিয়ে যা করেছেন, তা তাঁদের জানালেন। (৫)ফরিসি দলের কয়েকজন ইমানদার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “তাঁদের খতনা করানো অবশ্যই দরকার এবং তাঁরা যেনো হযরত মুসা আ. এর শরিয়ত পালন করে, সে-জন্য তাদের হুকুম দেয়া দরকার।”

(৬)এই বিষয়ে আলোচনা করার জন্য বুজুর্গরা ও হাওয়ারিরা একত্রে মিলিত হলেন। (৭)অনেক আলোচনার পর হযরত সাফওয়ান রা. উঠে দাঁড়িয়ে তাঁদের বললেন, “ভাইয়েরা, আপনারা তো জানেন যে, অনেকদিন আগে আপনাদের মধ্য থেকে আল্লাহ্ আমাকে বেছে নিয়েছিলেন, যাতে অ-ইহুদিরা আমার মুখ থেকে সুখবর শুনে ইমান আনে। (৮)সকলের অন্তর্যামী আল্লাহ্ আমাদের যেভাবে তাঁর রুহকে দিয়েছেন, সেই একইভাবে তাঁদেরও তা দান করে তাঁদের কাছে সাক্ষ্য দিয়েছেন। (৯)এবং ইমানের দ্বারা তাঁদের অন্তরকে পরিষ্কার করে, তাঁদের ও আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখেননি। (১০)তাহলে কেনো আপনারা এই ইমানদারদের ঘাড়ে জোয়াল চাপিয়ে আল্লাহকে পরীক্ষা করতে চাচ্ছেন, যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা বা আমরা বহন করতে পারিনি? (১১)অন্যদিকে আমরা বিশ্বাস করি যে, আমরাও তাঁদের মতো হযরত ইসা আ. এর দয়ায় নাজাত পাবো।”

(১২)সভার সবাই চুপ হয়ে গেলেন, এবং হযরত পৌল রা. ও হযরত বার্নবাস রা. মধ্য দিয়ে আল্লাহ্ অইহুদিদের মধ্যে যে-সব আশ্চর্য কাজ করেছিলেন, তা তাঁদের কাছ থেকে শুনলেন। (১৩)তাঁদের কথা শেষ হলে পর হযরত ইয়াকুব রা. বললেন, “ভাইয়েরা, আমার কথা শুনুন- (১৪)হযরত সাফওয়ান রা. দেখিয়েছেন, কীভাবে আল্লাহ্ প্রথমে অ-ইহুদিদের প্রতি দয়া দেখিয়েছেন, যেনো তাদের মধ্য থেকে এক দল লোককে তাঁর নামের জন্য বেছে নেন। (১৫)এ কথার সংগে নবিদের কথারও মিল রয়েছে। কারণ লেখা আছে- (১৬)‘এরপর আমি ফিরে আসবো এবং দাউদের ঘর আবার তৈরি করবো। যা ধ্বংস হয়ে গেছে, তার ধ্বংসস্তুপ থেকে আবার তা গাঁথবো এবং আমি আবার তা ঠিক করবো, (১৭)যেনো অন্যসব লোকেরা আল্লাহর খোঁজ করে। এমনকি সমস্ত অ-ইহুদিও, যাদেরকে আমার নামে ডাকা হয়েছে। (১৮)এ-কথা বলছেন আল্লাহ্, যিনি প্রাচীনকাল থেকে এ সব কিছু জানিয়ে আসছেন।’

(১৯)তাই আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, যে অ-ইহুদিরা আল্লাহর দিকে ফিরছে, তাদের কষ্ট দেয়া উচিত নয়। (২০)কিন্তু আমাদের উচিত তাদের কাছে এ-কথা লিখে পাঠানো যে, তারা যেনো প্রতিমার সংগে যুক্ত সবকিছু থেকে এবং সব রকম জিনা থেকে দূরে থাকে; আর রক্ত এবং গলাটিপে মারা পশুর মাংস না-খায়। (২১)কারণ হযরত মুসা আ. যা বলেছেন, তা প্রত্যেক শহরে, যুগ-যুগ ধরে, অনেক আগে থেকে প্রচার করা হচ্ছে। এবং তিনি যা লিখে গেছেন, তা প্রত্যেক সাব্বাতে সিনাগোগগুলোতে জোরে-জোরে তেলাওয়াত করা হচ্ছে।”

(২২)তখন হাওয়ারিরা ও বুজুর্গরা কওমের সকলের সাথে ঠিক করলেন যে, তাঁরা নিজেদের কয়েকজন লোককে বেছে নিয়ে হযরত পৌল রা. ও হযরত বার্নবাস রা. সংগে আন্তিয়খিয়াতে পাঠাবেন। (২৩)তাঁরা হাওয়ারিদের ও বুজুর্গদের মধ্য থেকে যে-ইহুদাকে হযরত বারসাব্বা র. বলা হতো, তাকে ও হযরত সিল র.-কে বেছেনিলেন। তাঁদের সংগে এই চিঠি পাঠালেন- “আন্তিয়খিয়া, সিরিয়া ও কিলিকিয়ার অ-ইহুদি ইমানদার ভাইদের কাছে আমরা, হাওয়ারিরা ও কওমের বুজুর্গরা, এই চিঠি লিখছি, আমাদের সালাম গ্রহণ করুন।

(২৪)আমরা শুনতে পেলাম যে, আমাদের মধ্য থেকে কয়েকজন গিয়ে অনেক কথা বলে আপনাদের মন অস্থির করে তুলে কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু আমরা তাঁদের এমন কাজ করতে বলিনি। (২৫)এ-জন্য আমরা সবাই একমত হয়ে কয়েকজনকে বেছে নিয়ে, আমাদের প্রিয়বন্ধু হযরত পৌল রা. ও হযরত বার্নবাস রা. সংগে আপনাদের কাছে পাঠালাম।

(২৬)এই দু’জন আমাদের হযরত ইসা মসিহের জন্য মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন।

(২৭)আমরা হযরত ইহুদা রা. ও হযরত সিল র.-কে পাঠালাম, যেনো আমরা যা লিখছি, তা তাঁরা আপনাদের কাছে মুখেও বলেন। (২৮)আল্লাহর রুহ এবং আমরা এটাই ভালো মনে করলাম যে, এই দরকারি বিষয়গুলো ছাড়া আর কোনো কিছুর দ্বারা আপনাদের ওপর যেনো বোঝা চাপানো না-হয়।

(২৯)সেই দরকারি বিষয়গুলো হলো- আপনারা প্রতিমার কাছে উৎসর্গ করা খাবার খাবেন না। রক্ত খাবেন না। গলাটিপে মারা পশুর মাংস খাবেন না এবং কোনো রকম জিনা করবেন না। এসব থেকে দূরে থাকলে আপনারা ভালো করবেন। আল্লাহ আপনাদের সহায় হোন।”

(৩০)হযরত পৌল রা.ও হযরত বার্নবাস রা. ও সেই লোকদের পাঠানো হলে পর তারা আন্তিয়খিয়াতে গেলেন। সেখানে তারা সব ইমানদার লোকদের একত্র করে তাদেরকে সেই চিঠিটা দিলেন। (৩১)লোকেরা চিঠিটা পড়লো এবং তার মধ্যে যে-সান্ত্বনার কথা ছিলো, তাতে খুশি হলো। (৩২)হযরত ইহুদা র. আর হযরত সিল র. নিজেরাও ভবিষ্যদ্বাণী বলতেন। সে-জন্য তারা অনেক কথা বলে সেখানকার ভাইদের উৎসাহ দিলেন এবং তাদের ইমান বাড়িয়ে শক্তিশালী করে তুললেন। (৩৩) আন্তিয়খিয়াতে তারা কিছুদিন কাটালেন।

৩৪জেরুসালেমের যারা হযরত ইহুদা র. ও হযরত সিল র.-কে আন্তিয়খিয়াতে পাঠিয়েছিলেন, আন্তিয়খিয়ার ভাইয়েরা তাদের সালাম জানিয়ে এই দু’জনকে আবার তাদের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন।

(৩৫)হযরত পৌল রা. ও হযরত বার্নবাস র. আন্তিয়খিয়াতেই রইলেন। সেখানে তারা আরো অনেকের সংগে আল্লাহর কালাম শিক্ষা দিতে ও প্রচার করতে থাকলেন। (৩৬)কিছুদিন পর হযরত পৌল রা. হযরত বার্নবাস র.-কে বললেন, “যে-সব জায়গায় আমরা আল্লাহর কালাম প্রচার করে এসেছি, চলো, এখন সে-সব জায়গায় ফিরে গিয়ে ইমানদার ভাইদের সংগে দেখা করি এবং তারা কেমনভাবে চলছে তা দেখি।”

(৩৭)তখন হযরত বার্নবাস র. হযরত ইউহোন্না র.-কে সংগে নিতে চাইলেন। এই হযরত ইউহোন্না র.-কে হযরত মার্ক র. বলেও ডাকা হতো। (৩৮)কিন্তু হযরত পৌল রা. তাকে সংগে নেয়া ভালো মনে করলেন না। কারণ হযরত মার্ক র. পাম্ফুলিয়ায় তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন এবং তাদের সংগে আর কাজ করেননি। (৩৯)তখন হযরত পৌল রা. ও হযরত বার্নবাস র. মধ্যে এমন অমিল হলো যে, তারা একে অন্যের কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। হযরত বার্নবাস র. হযরত মার্ক র.-কে নিয়ে জাহাজে করে সাইপ্রাসদ্বীপে গেলেন আর হযরত পৌল রা. হযরত সিল র.-কে বেছে নিলেন।

(৪০)তখন আন্তিয়খিয়ার ভাইয়েরা হযরত পৌল রা. হযরত সিল র.-কে আল্লাহর রহমতের হাতে তুলে দিলে পর তাঁরা রওনা হলেন। (৪১)হযরত পৌল রা. সিরিয়া ও কিলিকিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়ে কওমের সমস্ত লোকদের ইমান বাড়িয়ে তাঁদের আরো শক্তিশালী করে তুললেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)পরে হযরত পৌল রা. দেব্রা ও লুস্ত্রা শহরে গেলেন। সেখানে হযরত তিমথী র. নামে একজন উম্মত থাকতেন। তাঁর মা ছিলেন হযরত ইসা মসিহের ওপর ইমানদার একজন ইহুদি মহিলা, কিন্তু তাঁর পিতা জাতিতে গ্রীক ছিলেন। (২)লুস্ত্রা ও ইকোনিয়মের ইমানদারেরা হযরত তিমথী র. এর খুব প্রশংসা করতেন। (৩)হযরত পৌল রা. হযরত তিমথী র.- কে সংগে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বলে তাঁর খতনা করালেন। কারণ ওসব জায়গায় যে-ইহুদিরা থাকতেন, তারা জানতেন যে, হযরত তিমথী র. এর পিতা একজন গ্রীক।

(৪)শহরগুলোর মধ্য দিয়ে যাবার সময় তাঁরা জেরুসালেমের হাওয়ারিদের ও বুজুর্গদের সিদ্ধান্তের কথা লোকদের জানালেন, আর সে-সব নিয়ম পালন করতে বললেন। (৫)এভাবে কওমের লোকেরা ইমানে সবল হয়ে উঠতে লাগলো, এবং তাঁদের সংখ্যা দিন-দিন বেড়ে যেতে লাগলো।

(৬)আল্লাহর রুহ তাঁদেরকে এশিয়ায় প্রচার করতে নিষেধ করায় তাঁরা ফরুগিয়া ও গালাতিয়া প্রদেশের মধ্য দিয়ে গেলেন। (৭)মাইসিয়ার সীমানায় এসে তাঁরা বিথুনিয়া প্রদেশে যেতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু হযরত ইসা আ. এর রুহ্ তাঁদের সেখানে যেতে দিলেন না। (৮)তাই তাঁরা মাইসিয়ার মধ্য দিয়ে ত্রোয়া শহরে চলে গেলেন।

(৯)রাতের বেলায় হযরত পৌল রা. একটি দর্শনে দেখলেন- মেসিডোনিয়ার এক লোক বিনয়ের সংগে হযরত পৌল রা. কে অনুরোধ করছেন, “মেসিডোনিয়াতে এসে আমাদের সাহায্য করুন।” (১০)তিনি এই দর্শন দেখার পর আমরা নিশ্চিত হলাম যে, আল্লাহ চান যেনো আমরা মেসিডোনিয়াতে যাই, আর আমরা তখনই সেখানে যাবার চেষ্টা করলাম। (১১)আমরা ত্রোয়া ছেড়ে জাহাজে করে সোজা সামোথ্রাকিতে গেলাম এবং পরদিন নেয়াপলিতে পৌঁছলাম, (১২)আর সেখান থেকে ফিলিপিতে। এটা রোমের শাসনাধীন এবং মেসিডোনিয়া জেলার প্রধান শহর। আমরা কিছুদিন এই শহরে থাকলাম।

(১৩)সাব্বাতে আমরা শহরের নদীর কাছের সদর দরজার বাইরে গেলাম। মনে করলাম সেখানে ইবাদত করার জায়গা আছে। সেখানে মহিলারা মিলিত হয়েছিলেন। আমরা তাদের কাছে বসে কথা বলতে লাগলাম। (১৪)লিদিয়া নামে এক মহিলা সেখানে ছিলেন। তিনি আল্লাহর ইবাদত করতেন। তিনি আমাদের কথা শুনছিলেন। তিনি থিয়াতিরা শহর থেকে এসেছিলেন এবং বেগুনি রঙের কাপড়ের ব্যবসা করতেন। আল্লাহ তার অন্তর খুলে দিলেন, যাতে তিনি হযরত পৌল রা. এর কথা মন দিয়ে শোনেন।

(১৫)যখন তিনি ও তাঁর বাড়ির সকলে বায়াত নিলেন, তখন তিনি এই বলে আমাদের অনুরোধ করতে লাগলেন, “যদি আমাকে আপনারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বস্ত বলে মনে করেন, তাহলে আমার বাড়িতে এসে থাকুন।” এবং তিনি আমাদের সাধাসাধি করে তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। (১৬)এক দিন যখন আমরা এবাদতের জায়গায় যাচ্ছিলাম, তখন এক দাসীর সংগে আমাদের দেখা হলো। তাকে একটি ভূতে পেয়েছিলো, যার ফলে সে ভবিষ্যতের কথা বলতে পারতো। এতে তার মালিকের অনেক টাকা-পয়সা লাভ হতো।

(১৭)সে হযরত পৌল রা. এবং আমাদের পেছনে যেতে-যেতে চিৎকার করে বলতো, “এই লোকেরা সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার গোলাম। তারা নাজাতের পথ সম্পর্কে আপনাদের বলছেন।” (১৮)সে অনেকদিন পর্যন্ত এরকম করতে থাকলো। কিন্তু হযরত পৌল রা. এতো বিরক্ত হলেন যে, তিনি পেছন ফিরে সেই ভূতকে বললেন, “হযরত ইসা মসিহের নামে আমি তোমাকে হুকুম দিচ্ছি, এর ভেতর থেকে বের হয়ে যাও।”আর তখনই সে বের হয়ে গেলো।

(১৯)কিন্তু তার মালিকেরা যখন দেখলো যে, তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেলো, তখন তারা হযরত পৌল রা. আর হযরত সিল র. কে ধরে বাজারে নেতাদের কাছে টেনে নিয়ে গেলো। (২০)বিচারকদের সামনে নিয়ে গিয়ে তারা বললো, “এই লোকেরা আমাদের শহরে গোলমাল বাঁধিয়েছে। (২১)এরা ইহুদি এবং এমন সব আচার-ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষা দিচ্ছে, যা রোমীয় হিসাবে আমাদের পক্ষে গ্রহণ করা বা পালন করা আইন-বিরুদ্ধ কাজ।”

(২২)জনতাও তাদের আক্রমণে যোগ দিলো। বিচারকেরা তাদের কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে ফেলে বেতমারার হুকুম দিলেন। (২৩)ভীষণভাবে বেত মারার পর তাদের জেলখানায় রাখা হলো, আর ভালোভাবে পাহারা দেবার জন্য জেল কর্মকর্তাকে হুকুম দেয়া হলো। (২৪)এই হুকুম পেয়ে তিনি তাদের একেবারে জেলের ভেতরের সেলে নিয়ে গেলেন এবং হাড়িকাঠ দিয়ে তাদের পা আটকে রাখলেন।

(২৫)প্রায় মাঝরাতে হযরত পৌল রা. ও হযরত সিল র. মোনাজাত করছিলেন এবং আল্লাহর উদ্দেশে প্রশংসা কাওয়ালি গাচ্ছিলেন, আর অন্য কয়েদিরা তা শুনছিলো। (২৬)এমন সময় হঠাৎ এক ভীষণ ভূমিকম্প হলো। ফলে জেলখানার ভিত্তি পর্যন্ত কেঁপে উঠলো। তখনই জেলের সমস্ত দরজা ও কয়েদিদের বাঁধন খুলে গেলো।

(২৭)যখন কর্মকর্তা জেগে উঠলেন এবং জেলের দরজাগুলো খোলা দেখতে পেলেন, তখন তিনি নিজের তরবারি বের করে আত্মহত্যা করতে চাইলেন। কারণ তিনি মনে করলেন যে, সমস্ত কয়েদিরা পালিয়ে গেছে। (২৮)কিন্তু হযরত পৌল রা. জোরে চিৎকার করে বললেন, “থামুন, নিজের ক্ষতি করবেন না। আমরা সবাই এখানে আছি।”

(২৯)জেল কর্মকর্তা বাতি আনতে বললেন, নিজে ছুটে ভেতরে গেলেন এবং ভয়ে কাঁপতে-কাঁপতে হযরত পৌল রা. ও হযরত সিল র. এর পায়ে পড়লেন। (৩০)এবং তিনি তাদের বাইরে নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “জনাব, নাজাত পাবার জন্য আমাকে কী করতে হবে?” (৩১)উত্তরে তাঁরা বললেন, “হযরত ইসা আ. এর ওপর ইমান আনুন, তাহলে আপনি ও আপনার পরিবার নাজাত পাবেন।”

(৩২)তাঁরা জেল কর্মকর্তা ও তার বাড়ির সকলের কাছে আল্লাহর কালাম বললেন। (৩৩)সেইরাতে তখনই তিনি তাঁদের নিয়ে গিয়ে তাঁদের শরীরের কাটা জায়গাগুলো ধুয়ে দিলেন। আর তিনি ও তার পরিবারের সবাই দেরি না-করে তখনই বায়াত নিলেন। (৩৪)তিনি তাঁদের নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খেতে দিলেন। আল্লাহর ওপরে ইমান এনেছেন বলে তিনি ও তার পরিবারের সবাই খুব আনন্দ করলেন।

(৩৫)পরদিন সকালে বিচারকরা পুলিশ দিয়ে বলে পাঠালেন যে, “ওই লোকদের ছেড়ে দাও।” (৩৬)এবং জেল কর্মকর্তা গিয়ে হযরত পৌল রা. কে বললেন, “বিচারকরা আপনাদেরকে ছেড়ে দেবার জন্য বলে পাঠিয়েছেন। আপনারা এখন বের হয়ে আসুন এবং শান্তিতে চলে যান।” (৩৭)কিন্তু হযরত পৌল রা. বললেন, “আমরা রোমীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও আমাদের বিচার না-করেই, সকলের সামনে তাঁরা আমাদেরকে বেত মেরেছেন এবং জেলে দিয়েছেন। আর এখন কি তাঁরা আমাদের গোপনে ছেড়ে দিতে চান? তা হবে না! তাঁরা নিজেরা এসে আমাদের বাইরে নিয়ে যান।”

(৩৮)তখন পুলিশ ফিরে গিয়ে বিচারকদের এ-কথা জানালো। তাঁরা যখন শুনলেন যে, এরা রোমীয় নাগরিক, তখন খুব ভয় পেলেন। (৩৯)তাই তাঁরা এসে তাঁদের কাছে মাফ চাইলেন, এবং তাঁদের জেলের বাইরে এনে শহর ছেড়ে যেতে অনুরোধ করলেন। (৪০)জেলখানা থেকে বাইরে এসে তাঁরা লিদিয়ার বাড়িতে গেলেন। সেখানে ইমানদার ভাই-বোনদের সংগে তাঁদের দেখা হলো। তাঁদের উৎসাহ দেবার পর তাঁরা সেখান থেকে চলে গেলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)হযরত পৌল রা. ও হযরত সিল র. আমফিপলি ও আপল্লো নিয়া হয়ে থিসোলোনিকিতে এসে পৌঁছলেন। সেখানে ইহুদিদের একটি সিনাগোগ ছিলো। (২)হযরত পৌল রা. তার নিয়ম মতো সেখানে গেলেন এবং পরপর তিন সাব্বাতে তাদের সংগে কালাম থেকে আলোচনা করলেন।

(৩)তিনি বোঝালেন এবং প্রমাণ করলেন যে, মসিহের কষ্টভোগ করার এবং মৃত থেকে জীবিত হয়ে ওঠার দরকার ছিলো। তিনি বললেন, “যে হযরত ইসা আ. এর কথা আমি আপনাদের বলছি, তিনিই হলেন মসিহ।” (৪)তাদের মধ্যে কয়েকজন ইমান এনে হযরত পৌল রা. ও হযরত সিল র. সংগে যোগ দিলেন। এছাড়া আল্লাহ্ভক্ত অনেক গ্রীক এবং অনেক বিশেষ-বিশেষ মহিলারাও তাঁদের সংগে যোগ দিলেন।

(৫)কিন্তু ইহুদিরা হিংসায় জ্বলে উঠলো। তারা বাজার থেকে কিছু খারাপ লোক যোগাড় করে এনে ভিড় জমালো ও শহরেরমধ্যে গোলমাল বাধিয়ে দিলো। তাঁরা হযরত পৌল রা. ও হযরত সিল র. খোঁজ করতে লাগলো, যেনো লোকদের কাছে তাঁদেরকে আনতে পারে। (৬)তারা যাসোনের বাড়ি আক্রমণ করলো। কিন্তু সেখানে তাঁদের না-পেয়ে যাসোন ও কয়েকজন ইমানদার ভাইকে টেনে নিয়ে শহর-প্রশাসকদের কাছে গেলো এবং চিৎকার করে বলতে লাগলো, “যে-লোকেরা দুনিয়া তোলপাড় করে তুলেছে, তারা এখন এখানেও এসেছে। (৭)এবং যাসোন তার নিজের বাড়িতে ওদের জায়গা দিয়েছে। ওরা সবাই সম্রাটের হুকুম অমান্য করে বলছে যে, অন্য একজন বাদশাহ আছেন, তাঁর নাম হযরত ইসা আ.।”(৮)এসব শুনে শহর-প্রশাসকরা অস্থির হলেন।

(৯)কিন্তু যাসোন ও অন্যেরা জামিনের টাকা দিলে তারা তাদের ছেড়ে দিলেন। (১০)সেইরাতেই ইমানদারেরা হযরত পৌল রা. ও হযরত সিল র.-কে বিরয়াতে পাঠিয়ে দিলেন। (১১)সেখানে পৌঁছে তাঁরা ইহুদিদের সিনাগোগে গেলেন। থিসোলোনিকির ইহুদিদের চেয়ে এখানকার ইহুদিদের মন অনেক খোলা ছিলো। তারা খুব আগ্রহের সংগে আল্লাহর কালাম শুনলো এবং তা সত্যি কি-না দেখার জন্য প্রত্যেক দিন কিতাবের মধ্যে খোঁজ করতে লাগলো। (১২)ফলে তাদের অনেকেই ইমান আনলো। এছাড়া গ্রীকদের অনেক সম্ভ্রান্ত মহিলা এবং পুরুষও ইমান আনলেন।

(১৩)কিন্তু থিসোলোনিকির ইহুদিরা যখন শুনতে পেলো যে, হযরত পৌল রা. বিরয়াতে আল্লাহর কালাম প্রচার করছেন, তখন তারা সেখানেও গেলো এবং লোকদের উত্তেজিত করে গোলমাল বাধিয়ে দিলো। (১৪)ইমানদার ভাইয়েরা তখনই হযরত পৌল রা.কে সাগরের ধারে পাঠিয়ে দিলেন, কিন্তু হযরত সিল র. আর হযরত তিমথীয় র. সেখানেই থাকলেন।

(১৫)যে-লোকেরা হযরত পৌল রা.কে সংগে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তাঁরা তাঁকে এথেন্স শহরে নিয়ে এলেন। এবং সেই লোকেরা হযরত সিল র. ও হযরত তিমথীয় র. জন্য এই হুকুম নিয়ে ফিরে গেলেন যে, তারা যেনো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হযরত পৌল রা. সংগে যোগ দেন।

(১৬)যখন হযরত পৌল রা. এথেন্স শহরে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, তখন সেই শহর প্রতিমায় পূর্ণ দেখে তাঁর মন খুব খারাপ হয়ে গেলো। (১৭)তাই তিনি সিনাগোগে গিয়ে ইহুদিদের ও আল্লাহভক্ত গ্রীকদের সংগে আলোচনা করতে লাগলেন। এছাড়া যারা বাজারে আসতো, তাদের সংগেও তিনি দিনের পর দিন আলোচনা করতে থাকলেন।

(১৮)তখন কয়েকজন এপিকিউরীয় ও স্টোয়িকীয় দার্শনিকও তার সংগে তর্ক জুড়ে দিলেন। কেউ-কেউ বললেন, “এই বাচালটা কী বলতে চাচ্ছে?” আবার অন্যেরা বললেন, “মনে হয় উনি বিদেশি দেবদেবীর প্রচারক।” কারণ তিনি হযরত ইসা আ. ও পুনরুত্থান সম্পর্কে সুখবর প্রচার করছিলেন।

(১৯)তাই তাঁরা তাকে এরিয়োপেগসের সভার সামনে উপস্থিত করলো এবং জিজ্ঞেস করলো, “যে নতুন বিষয় আপনি প্রচার করছেন, সেটা কী, তা কি আমরা জানতে পারি? (২০)কারণ এগুলো আমাদের কাছে অদ্ভুত শুনাচ্ছে। তাই আমরা এসবের অর্থ জানতে চাই।”

(২১)এথেন্সের সব লোক এবং সেই শহরে বসবাসকারী বিদেশিরা কেবল নতুন-নতুন বিষয় নিয়ে কথা বলে ও শুনে সময় কাটাতো। (২২)তখন হযরত পৌল রা. এরিয়োপেগসের সামনে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “এথেন্সের লোকেরা শুনুন, আমি দেখতে পাচ্ছি যে, আপনারা সবদিক থেকেই অসম্ভব ধর্মভীরু। (২৩)কারণ আমি শহরে ঘুরে বেড়ানোর সময় আপনাদের উপাসনার জিনিসগুলো যখন দেখছিলাম, তখন এমন একটি বেদি দেখতে পেলাম, যার ওপরে লেখা আছে, ‘অজানা দেবতার উদ্দেশে।’আপনারা না-জেনে যার উপাসনা করছেন, তাঁর সম্বন্ধেই আমি আপনাদের কাছে প্রচার করছি।

(২৪)আল্লাহ, যিনি এই দুনিয়া ও তার মধ্যে যা আছে, তার সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আসমান ও জমিনের মালিক। তিনি মানুষের হাতে তৈরি কোনো ঘরে বাস করেন না।

মানুষের হাত থেকে সেবা গ্রহণ করারও তাঁর দরকার নেই। (২৫)তাঁর কোনো অভাব নেই। কারণ তিনিই সব মানুষকে জীবন, মৃত্যু এবং সবকিছু দান করেন ।

(২৬)তিনি একজন মানুষ থেকে সমস্ত জাতির লোকদের সৃষ্টি করেছেন, যেনো তারা সারা দুনিয়া অধিকার করে। তারা কখন, কোথায় বাস করবে এবং কতো দিন বাঁচবে, তাও তিনি ঠিক করে দিয়েছেন, (২৭)যেনো তারা আল্লাহর খোঁজ করে এবং হাতড়াতে-হাতড়াতে তাঁকে পেয়ে যায়। যদিও তিনি আমাদের কারো কাছ থেকে দূরে নন। (২৮)তাঁর মধ্যেই আমরা জীবন কাটাই ও চলাফেরা করি এবং বেঁচেও আছি। আপনাদের কয়েকজন কবিও বলেছেন, ‘কারণ আমরাও তাঁর সন্তান।’

(২৯)তাহলে আমরা যখন আল্লাহর সন্তান, তখন আল্লাহকে মানুষের হাত ও চিন্তা শক্তি দিয়ে তৈরি সোনা ও রুপা বা পাথরের মূর্র্তি মনে করা আমাদের উচিত নয়। (৩০)আগেকার দিনে মানুষের অবহেলাকে আল্লাহ্ দেখেও দেখেননি। এখন তিনি সব জায়গার সব লোককে তওবা করার হুকুম দিচ্ছেন। (৩১)কারণ তিনি একটি দিন ঠিক করেছেন, যে-দিনে তাঁর নিযুক্ত লোকের দ্বারা তিনি ন্যায়ভাবে মানুষের বিচার করবেন। এবং তিনি তাঁকে মৃত থেকে জীবিত করে তুলে সবার কাছে এর নিশ্চয়তা দিয়েছেন।”

(৩২)যখন তারা মৃতদের পুনরুত্থানের কথা শুনলো, তখন কয়েকজন মুখ বাঁকালো। কিন্তু অন্যেরা বললো, “এ-বিষয়ে আমরা আবার আপনার কথা শুনবো।”(৩৩)তখন হযরত পৌল রা. তাদের ছেড়ে চলে গেলেন।

(৩৪)কিন্তু কয়েকজন লোক হযরত পৌল রা. সংগে যোগ দিলো এবং ইমান আনলো। তাদের মধ্যে দিয়নুসিয় নামে এরিয়োপেগসের সভার এক সদস্য, দামারিস নামের একজন মহিলা এবং তাদের সংগে আরো কয়েকজন ছিলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)এরপর হযরত পৌল রা. এথেন্স ছেড়ে করিন্থ শহরে গেলেন। সেখানে আকুইলা নামে এক ইহুদির সংগে তার দেখা হলো, জন্মসূত্রে তিনি ছিলেন পন্তীয়। (২)মাত্র কয়েকদিন আগেই তিনি তার স্ত্রী প্রিস্কিল্লাকে নিয়ে ইতালি থেকে এসেছিলেন।

কারণ ক্লাউডিয়াস সকল ইহুদিকে রোম ছেড়ে চলে যেতে হুকুম দিয়েছিলেন। পৌলতাদের দেখতে গেলেন। (৩)এবং তিনিও তাদের মতো তাঁবু তৈরির কাজ করতেন বলে তাদের সংগে থেকে কাজ করতে লাগলেন।

(৪)প্রত্যেক সাব্বাতে তিনি সিনাগোগে গিয়ে গ্রীক ও ইহুদিদের সংগে আলোচনা করতেন, যেনো তাদের বোঝাতে পারেন। (৫)হযরত সিল র. ও হযরত তিমথীয় র. মেসিডোনিয়া থেকে আসার পর হযরত পৌল রা. কেবল আল্লাহর কালাম প্রচারে তাঁর সমস্ত সময় কাটাতে লাগলেন। ইহুদিদের কাছে তিনি এই সাক্ষ্য দিতেন যে, হযরত ইসা আ.-ই ছিলেন মসিহ।

(৬)কিন্তু তারা যখন তাকে বাধা দিলো ও তিরস্কার করতে লাগলো, তখন তিনি তাদের বিরুদ্ধে তার কাপড় ঝেড়ে ফেললেন এবং বললেন, “আপনাদের রক্তের দায় আপনাদের নিজেদের মাথার ওপরেই থাকুক; আমি নির্দোষ। এখন থেকে আমি অ-ইহুদিদের কাছেই যাবো।”(৭)অতঃপর তিনি সিনাগোগ ছেড়ে তিতিওস-ইওস্তোস নামে এক লোকের ঘরে চলে গেলেন। সে আল্লাহর এবাদত করতো। সিনাগোগের পাশেই ছিলো তার বাড়ি। (৮)সিনাগোগের প্রধান, ক্রিসপাস ও তার বাড়ির সবাই হযরত ইসা আ.এর ওপর ইমান আনলেন। এবং করিন্থীয়দের মধ্যে অনেকেই হযরত পৌলরা কথা শুনে ইমান আনলো এবং বায়াত নিলো।

(৯)একদিন রাতের বেলা আল্লাহ্ দর্শনের মধ্যদিয়ে হযরত পৌল রা.-কে বললেন, “ভয় করো না। কথা বলতে থাকো। চুপ করে থেকো না, (১০)কারণ আমি তোমার সংগে-সংগে আছি। তোমার ক্ষতি করার জন্য কেউই তোমাকে আক্রমণ করবে না, কারণ এই শহরে আমার অনেক লোক আছে।” (১১)হযরত পৌল রা. দেড় বছর সেই শহরে থেকে লোকদের আল্লাহর কালাম শিক্ষা দিলেন।

(১২)কিন্তু গাল্লিয়ো যখন আখায়া প্রদেশের শাসনকর্তা ছিলেন, তখন সব ইহুদি এক হয়ে হযরত পৌল রা.-কে ধরে বিচারের জন্য আদালতে আনলো। (১৩)তারা বললো, “এই লোকটা এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে লোকদের উস্কে দিচ্ছে, যা শরিয়তের বিরুদ্ধে।”

(১৪)হযরত পৌল রা. কথা বলতে যাবেন, এমন সময় গাল্লিয়ো ইহুদিদের বললেন, “হে ইহুদিরা, এটা যদি কোনো অন্যায় বা ভীষণ কোনো দোষের ব্যাপার হতো, তাহলে তোমাদের অভিযোগ আমি শুনতাম।

(১৫)যেহেতু এটা বিশেষ কোনো কথার ব্যাপার, কারো নামের ব্যাপার ও তোমাদের শরিয়তের ব্যাপার, সেহেতু তোমরা নিজেরাই এর মীমাংসা করো। আমি ওসব ব্যাপারে বিচার করতে চাই না।” (১৬)এবং তিনি আদালত থেকে তাদের বের করে দিলেন।

(১৭)তখন তারা সবাই মিলে সিনাগোগের প্রধান, সোস্থিনিকে ধরে আদালতের সামনে মারধর করলো। কিন্তু গাল্লিয়ো এর কোনো কিছু চেয়েও দেখলেন না। (১৮)বেশ কিছুদিন এখানে কাটানোর পর হযরত পৌল রা. ইমানদার ভাইদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। এবং আকুইলা ও প্রিস্কিল্লাকে সংগে নিয়ে সমুদ্র পথে সিরিয়ায় গেলেন। তিনি একটি মানত করেছিলেন বলে কিংক্রিয়া বন্দরে তার মাথার চুল কেটে ফেললেন ।

(১৯)ইফিসে পৌঁছে তিনি তাঁদের সংগ ছাড়লেন। কিন্তু প্রথমে তিনি সিনাগোগে গেলেন এবং ইহুদিদের সংগে আলোচনা করলেন। (২০)যখন তাঁরা তাকে তাদের সংগে কিছুদিন থাকতে বললো, তখন তিনি রাজি হলেন না। (২১)কিন্তু সেখান থেকে চলে যাবার সময় তিনি বললেন, “ইনশা-আল্লাহ্, আমি আবার ফিরে আসবো।”তারপর তিনি ইফিস থেকে জাহাজে করে রওনা হলেন।

(২২)যখন তিনি কৈসরিয়ায় পৌঁছলেন, তখন জাহাজ থেকে নেমে জেরুসালেমে গেলেন। কওমের লোকদের সালাম জানাবার পর তিনি আন্তিয়খিয়াতে চলে গেলেন। (২৩)সেখানে কিছুদিন কাটানোর পর তিনি সেখান থেকে যাত্রা করলেন এবং গালাতিয়া ও ফরুগিয়া এলাকার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে-ঘুরে ইমানদারদের সবাইকে উৎসাহ দিয়ে শক্তিশালী করে তুললেন।

(২৪)এর মধ্যে আপল্লো নামে একজন ইহুদি ইফিসে এলেন। আলেকজান্দ্রিয়া ছিলো তার জন্মস্থান। তিনি একজন সুবক্তা ছিলেন, এবং আল্লাহর কালাম খুব ভালোভাবে জানতেন। (২৫)আল্লাহর পথের বিষয়ে তাকে বলা হয়েছিলো।

তিনি আল্লাহর রুহের প্রবল উৎসাহে কথা বলতেন এবং হযরত ইসা আ. এর বিষয়ে সঠিক শিক্ষা দিতেন। যদিও তিনি কেবল হযরত ইয়াহিয়া আ. এর বায়াতের কথা জানতেন।

(২৬)তিনি খুব সাহসের সংগে সিনাগোগে কথা বলতে আরম্ভ করলেন। কিন্তু যখন প্রিস্কিল্লা ও আকুইলা তাঁর কথা শুনলেন, তখন তাঁকে এক পাশে নিয়ে গিয়ে আল্লাহর পথের বিষয়ে সঠিকভাবে জানালেন।

(২৭)যখন তিনি আখায়াতে যেতে চাইলেন, তখন ইমানদার ভাইয়েরা তাঁকে উৎসাহ দিলেন এবং তাঁকে গ্রহণ করার জন্য সেখানকার ইমানদার ভাইদের কাছে চিঠি লিখলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি আল্লাহর রহমতে যারা ইমান এনেছিলো, তাঁদের খুব সাহায্য করলেন। (২৮)তিনি খুব জোরালো যুক্তি দিয়ে প্রকাশ্যে ইহুদিদের হারিয়ে দিলেন এবং পাক-কিতাবের মধ্য থেকে প্রমাণ করলেন যে, হযরত ইসা আ.-ই মসিহ।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)আপল্লো যখন করিন্থে ছিলেন, সেই সময় হযরত পৌল রা. সে-সব এলাকা ঘুরে ইফিসে এলেন। (২)সেখানে তিনি কয়েকজন ইমানদারের দেখা পেলেন। তিনি তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা যখন ইমান এনেছিলেন, তখন কি আল্লাহর রুহকে পেয়েছিলেন?” তাঁরা বললেন, “না, আল্লাহর রুহ্ যে আছেন, সে-কথা আমরা শুনিইনি।”

(৩)তখন তিনি বললেন, “তাহলে আপনারা কোন বায়াত পেয়েছিলেন?” তারা বললেন, “হযরত ইয়াহিয়া আ. এর বায়াত।” (৪)হযরত পৌল রা. বললেন, “হযরত ইয়াহিয়া আ. এর বায়াত ছিলো তওবার বায়াত। সেটা লোকদের বলছে- তারপরে যিনি আসছেন, তাঁর ওপরে, অর্থাৎ হযরত ইসা মসিহের ওপরে ইমান আনতে হবে।”

(৫)এ-কথা শুনে তাঁরা হযরত ইসা আ. এর নামে বায়াত গ্রহণ করলেন। (৬)তখন হযরত পৌল রা. তাদের ওপরে হাত রাখলে পর আল্লাহর রুহ তাদের ওপরে এলেন। ফলে তারা ভিন্ন-ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে ও ভবিষ্যদ্বাণী বলতে লাগলেন। (৭)সব মিলে তারা প্রায় বারোজন ছিলেন।

(৮)তিনি সিনাগোগে ঢুকলেন এবং তিনমাস পর্যন্ত খুব সাহসের সংগে কথা বললেন। তিনি আল্লাহর রাজ্য সম্বন্ধে যুক্তি তর্কের মধ্যদিয়ে বলতে থাকলেন। (৯)যখন কয়েকজনের মন কঠিন বলে ইমান আনতে অস্বীকার করলো এবং সকলের সামনে পথের বিষয়ে নিন্দা করতে লাগলো, তখন তিনি তাঁদের ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি ইমানদারদের সংগে নিয়ে তুরান্ন নামে একজন শিক্ষকের বক্তৃতা দেবার ঘরে গিয়ে প্রত্যেক দিন যুক্তি তর্কের সংগে আলোচনা করতে লাগলেন।

(১০)দু’বছর এভাবেই চললো। তাতে এশিয়ার সমস্ত অধিবাসী, ইহুদি ও গ্রীক, আল্লাহর কালাম শুনতে পেলো। (১১)আল্লাহ পৌলের মধ্যদিয়ে খুবই আশ্চর্য কাজ করলেন। (১২)তাঁর ব্যবহার করা গামছা ও গায়ের কাপড় রোগীদের কাছে নিয়ে গেলে তাদের অসুখ ভালো হয়ে যেতো এবং ভূতেরাও তাদের ছেড়ে যেতো।

(১৩)কয়েকজন ইহুদি সাইয়্যিদুনা হযরত ইসা আ. এর নাম ব্যবহার করে ভূত ছাড়াবার চেষ্টা করতে লাগলো। তারা বলতো, “পৌল যাঁর সম্পর্কে প্রচার করেন, সেই হযরত ইসা আ. এর নামে আমি তোমাদের বের হয়ে যাবার হুকুম দিচ্ছি।” (১৪)তাদের মধ্যে স্কিবা নামের এক প্রধান ইমামের সাতটি ছেলে ঐরকম করতো।

(১৫)কিন্তু ভূত তাদের বললো, “আমি ইসাকেও চিনি, পৌলকেও চিনি, কিন্তু তোমরা কারা?” (১৬)তখন ভূতে পাওয়া লোকটি তাদের ওপর লাফিয়ে পড়লো। আর তাদের সবাইকে এমনভাবে আঘাত করলো যে, তারা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে উলঙ্গ অবস্থায় সেই বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলো।

(১৭)এই খবর যখন ইফিসে বাসকারী ইহুদি ও গ্রীকরা জানতে পারলো, তখন তারা সবাই খুব ভয় পেলো এবং হযরত ইসা আ. এর নামের প্রশংসা হলো। (১৮)যারা ইমান এনেছিলো, তাদের অনেকে এসে খোলাখুলিভাবেই তাদের খারাপ কাজের বিষয় স্বীকার করলো।

(১৯)যারা জাদুর খেলা দেখাতো, তাদের মধ্যে অনেকে তাদের বই-পুস্তক এক সংগে জড়ো করে, সবার সামনেই সেগুলো পুড়িয়ে ফেললো। বইগুলোর দাম হিসাব করলে দেখা গেলো পঞ্চাশ হাজার দিনার। (২০)আল্লাহর কালাম এভাবে মহাশক্তিতে ছড়িয়ে পড়লো এবং লোকদের মনে আরো বেশি করে কাজ করতে লাগলো।

(২১)এসব ঘটার পর হযরত পৌল রা. ঠিক করলেন, তিনি মেসিডোনিয়া ও আখায়া হয়ে জেরুসালেমে যাবেন। তিনি বললেন, “সেখানে যাবার পরে আমি অবশ্যই রোম শহরেও যাবো।” (২২)তাই তিনি হযরত তিমথীয় র. ও হযরত ইরাস্তাস র. নামে তার দুই সাহায্যকারীকে মেসিডোনিয়াতে পাঠিয়ে দিলেন। আর তিনি আরো কিছুদিন এশিয়ায় রইলেন।

(২৩)সেই সময় হযরত ইসা আ. এর পথের বিষয় নিয়ে খুব গোলমাল শুরু হলো। (২৪)দিমিত্রিয় নামে একজন রৌপ্যকার দেবী আর্তেমিসের ছোট-ছোট রুপার মন্দির তৈরি করতো। এতে কারিগরদের খুব লাভ হতো। (২৫)সে তার মতো অন্যান্য কারিগরদের এক জায়গায় ডেকে বললো, “ভাইয়েরা, তোমরা তো জানো যে, এই ব্যবসা দিয়ে আমাদের অনেক আয় হয়। (২৬)তোমরা দেখতে ও শুনতে পাচ্ছো যে, পৌল নামের ঐ লোকটা আমাদের এই ইফিসে এবং বলতে গেলে প্রায় গোটা এশিয়ায় অনেক লোককে ভুলিয়ে অন্য পথে নিয়ে গেছে। সে বলে যে, হাতে তৈরি দেবদেবী আল্লাহ্ নন। (২৭)এবং এতে কেবল যে আমাদের ব্যবসার সুনাম যাবে তা নয়, কিন্তু মহান দেবী আর্তেমিসের মন্দিরও মিথ্যা হয়ে যাবে। আর গোটা এশিয়ার সমস্ত লোক, এমনকি দুনিয়ার সবাই, যে-দেবীর উপাসনা করে, তিনি নিজেও মহান থাকবেন না।”

(২৮)এ-কথা শুনে সেই লোকেরা রেগে আগুন হয়ে গেলো এবং চিৎকার করে বলতে লাগলো, “ইফিসীয়দের দেবী আর্তেমিসই মহান।”

(২৯)গোটা শহর গোলমালে পূর্ণ হয়ে গেলো। সবাই এক সংগে সভা বসার স্থানে ছুটে গেলো। এবং হযরত পৌল রা. এর দুই সঙ্গী মেসিডোনিয়ার গাইয় ও আরিস্টার্খকেও তারা ধরে নিয়ে গেলো।

(৩০)হযরত পৌল রা. ভিড়ের সামনে যেতে চাইলেন কিন্তু ইমানদারেরা তাকে যেতে দিলেন না। (৩১)এশিয়া প্রদেশের কয়েকজন রাজকর্মচারী হযরত পৌল রা. এর বন্ধু ছিলেন। তারাও তাঁকে খবর পাঠিয়ে বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন, যেনো তিনি সভাস্থলে না-যান।

(৩২)এর মধ্যে সভায় গোলমাল হতেই থাকলো। কিছু লোক এক কথা বলে চিৎকার করছিলো, আবার কিছু লোক অন্য কথা বলে চিৎকার করছিলো এবং বেশিরভাগ লোকই জানতো না যে, কেনো তারা সেই সভায় এসেছে।

(৩৩)ইহুদিরা আলেকজান্ডারকে সামনে ঠেলে দিলে পর কয়েকজন তাকে বলে দিলো কী বলতে হবে। এবং আলেকজান্ডার হাতের ইশারায় লোকদের চুপ করাতে চেষ্টা করলো, যেনো সে নিজের পক্ষে কথা বলতে পারে। (৩৪)কিন্তু তারা যখন জানতে পারলো যে, সে একজন ইহুদি, তখন সবাই এক সংগে প্রায় দু’ঘন্টা ধরে এই বলে চিৎকার করলো, “ইফিসীয়দের দেবী আর্তেমিসই মহান।”

(৩৫)শহরের একজন সরকারি কর্মচারী লোকদের চুপ করিয়ে বললেন, “ইফিসের লোকেরা, এ-কথা কে না-জানে যে, মহান আর্তেমিস দেবীর মন্দিরের এবং আকাশ থেকে পড়া তার মূর্র্তির রক্ষাকারী হলো ইফিস শহর? (৩৬)যেহেতু এ-কথা যখন অস্বীকার করা যায় না, তখন তোমাদের শান্ত হওয়া উচিত এবং তাড়াহুড়া করে কিছু করা উচিত নয়। (৩৭)তোমরা এই লোকদের এখানে এনেছো; যদিও এরা আমাদের মন্দিরগুলো থেকে চুরিও করেনি এবং আমাদের দেবীর নিন্দাও করেনি।

(৩৮)যদি দিমিত্রিয় ও তার সঙ্গী-কারিগররা কারো বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে চায়, তবে আদালত তো খোলাই আছে, আর বিচারকেরাও সেখানে আছেন। তারা সেখানে একে অন্যের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। (৩৯)যদি তোমরা এর বাইরে কিছু জানতে চাও, তাহলে নিয়মিত সাধারণ সভায় তার মীমাংসা করতে হবে। (৪০)কারণ আজকের দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধাবার জন্য আমাদেরই ওপর দোষ পড়ার ভয় আছে। যেহেতু এই গোলমালের কোনো কারণই আমরা দেখাতে পারবো না।” (৪১)এই বলে তিনি সভা ভেঙে দিলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)গোলমাল থামার পর হযরত পৌল রা. ইমানদারদের ডেকে পাঠালেন। তাঁদের উৎসাহ দেবার পর তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিনি মেসিডোনিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করলেন।

(২)সেই এলাকা দিয়ে যাবার সময় তিনি ইমানদারদের উৎসাহ দিলেন। পরে তিনি গ্রীসে এসে পৌঁছলেন এবং সেখানে তিনমাস থাকলেন।

(৩)তারপর তিনি জাহাজে করে সিরিয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে জানতে পারলেন যে, ইহুদিরা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

তখন তিনি আবার মেসিডোনিয়ার মধ্য দিয়ে ফিরে যাওয়া ঠিক করলেন। (৪)বিরয়ার পুরহের ছেলে হযরত সোপাত্রস র., থিসালোনিকির হযরত আরিস্টার্খ র. ও হযরত সিকুন্দুস র., দেব্রার হযরত গাইয় র., হযরত তিমথীয় র., এবং এশিয়ার হযরত তুখিক র. ও হযরত ত্রফিম র. তার সংগে গেলেন। (৫)এরা আগে গিয়ে ত্রোয়া শহরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

(৬)ইদুল-মাত্ছের পরে আমরা সমুদ্র পথে ফিলিপি থেকে যাত্রা করলাম এবং পাঁচদিন পর ত্রোয়ায় তাদের সংগে যোগ দিলাম। সেখানে আমরা সাতদিন থাকলাম। (৭)সপ্তাহের প্রথম দিনে মসিহের মেজবানি গ্রহণ করার জন্য আমরা এক সংগে মিলিত হলাম। তখন হযরত পৌল রা. তাদের সংগে আলোচনা করছিলেন। পরদিন তিনি চলে যেতে চাচ্ছিলেন বলে মাঝরাত পর্যন্ত কথা বলতে থাকলেন।

(৮)আমরা উপরতলার যে-ঘরে মিলিত হয়েছিলাম, সেখানে অনেকগুলো বাতি ছিলো। (৯)ইউতুখস নামে এক যুবক জানালার ওপর বসেছিলো। হযরত পৌল রা. অনেকক্ষণ ধরে কথা বলছিলেন বলে সে আস্তে আস্তে গভীর ঘুমে ডুবে গেলো। ঘুম গভীর হলে পর সে তিনতলা থেকে নিচে পড়ে গেলো এবং তাকে মৃত অবস্থায় তুলে নেয়া হলো।

(১০)তখন হযরত পৌল রা. নিচে নেমে গেলেন এবং সেই যুবকের ওপর ঝুঁকে, তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ভয় করো না। সে বেঁচে আছে।” (১১)এরপর তিনি আবার উপর তলায় গিয়ে মসিহের মেজবানি গ্রহণ করলেন এবং ফজর পর্যন্ত তাঁদের সংগে কথা বলার পর চলে গেলেন। (১২)এদিকে লোকেরা সেই যুবককে জীবিত অবস্থায় বাড়ি নিয়ে গেলো, আর এটা তাদের জন্য খুব সান্ত্বনার কারণ হলো।

(১৩)আমরা আগে গিয়ে জাহাজে উঠে আসোসের উদ্দেশে যাত্রা করলাম। সেখান থেকেই হযরত পৌল রা.-কে তুলে নেবার কথা ছিলো। তিনিই এই ব্যবস্থা করেছিলেন। কারণ তিনি হাঁটা-পথে সেখানে যেতে চেয়েছিলেন। (১৪)আসোসে আমাদের সংগে দেখা হলে পর আমরা তাঁকে জাহাজে তুলে নিয়ে মিতুলিনিতে এলাম। (১৫)আমরা সেখান থেকে যাত্রা করে পরদিন খিয়োসের উল্টো দিকে পৌঁছলাম। এর পরদিন আমরা সাগর পার হয়ে সামোসে গেলাম এবং তার পরদিন আমরা মিলেতোসে পৌঁছলাম।

(১৬)এখানে হযরত পৌল রা. সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি ইফিসে না-থেমেই চলে যাবেন, যাতে এশিয়াতে তাকে দেরি করতে না-হয়। তিনি জেরুসালেমে যাবার জন্য তাড়াহুড়ো করছিলেন, যেনো সম্ভব হলে পঞ্চাশতম দিনের ইদে সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেন। (১৭)তিনি মিলেতোস থেকে ইফিসের ইমানদার নেতাদের ডেকে পাঠালেন, যেনো তাঁরা দেখা করেন।

(১৮)তাঁরা তাঁর কাছে এলে তিনি তাঁদের বললেন, “এশিয়াতে আসার প্রথমদিন থেকে আমি কীভাবে আপনাদের সংগে সময় কাটিয়েছি, তা আপনারা নিজেরাই জানেন। আমি নম্রভাবে, চোখের পানির সংগে, আল্লাহর সেবা করেছি। অপমানিত হয়েছি। (১৯)ইহুদিদের নানা ষড়যন্ত্রের দরুন আমাকে ভীষণ পরীক্ষার মধ্যে পড়তে হয়েছে।

(২০)সাহায্য হয় এমন কোনো কিছুই করা থেকে আমি পিছু হটিনি। বরং বাইরে খোলাখুলিভাবে এবং আপনাদের ঘরে-ঘরে গিয়ে শিক্ষা দিয়েছি ও প্রচার করেছি। (২১)ইহুদি ও গ্রীক উভয়ের কাছে আমি তওবা করে আল্লাহর দিকে ফেরা এবং হযরত ইসা মসিহের ওপর ইমান আনার কথা বলেছি।

(২২)এখন আমি আল্লাহর রুহের বন্দি হয়ে জেরুসালেমে যাচ্ছি। আমি জানি না সেখানে আমার ওপর কী ঘটবে। (২৩)কেবল এই কথা জানি, আল্লাহর রুহ প্রত্যেক শহরে আমাকে এই কথা বলেছেন যে, আমার জন্য জেল ও অত্যাচার অপেক্ষা করছে। কিন্তু আমার কাছে আমার প্রাণের দাম আছে বলে মনে করি না- (২৪)যদি কেবল শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে পারি এবং আল্লাহর রহমতের সুসংবাদের বিষয়ে সাক্ষ্য দেবার যে-কাজের ভার হযরত ইসা আ. আমাকে দিয়েছেন, তা যেনো শেষ করতে পারি।

(২৫)এখন আমি এ-কথা জানি যে, যাদের কাছে গিয়ে আমি আল্লাহর রাজ্যের কথা প্রচার করেছি, সেই আপনারা কেউই আমাকে আর দেখতে পাবেন না। (২৬)এ-জন্য আজ আমি আপনাদের পরিষ্কারভাবে বলছি, আপনাদের কারো রক্তের দায়ী আমি নই। (২৭) কারণ আল্লাহর সব ইচ্ছা আপনাদের জানাতে আমি কখনো পিছপা হইনি।

(২৮)আপনারা নিজেদের বিষয়ে সতর্ক থাকুন।

আর যে-ইমানদার দলের দেখাশোনার ভার আল্লাহর রুহ আপনাদের দিয়েছেন, তাঁদের সম্বন্ধেও সতর্ক থাকুন। আল্লাহ তাঁর মসিহের রক্ত দিয়ে যাদের কিনেছেন, রাখাল হিসাবে সেই পালের দেখাশুনা করুন।

(২৯)আমি জানি যে, আমি চলে যাবার পর লোকেরা হিংস্র নেকড়ের মতো হয়ে আপনাদের মধ্যে আসবে এবং পালের ক্ষতি করবে। (৩০)এমনকি আপনাদের নিজেদের মধ্য থেকে লোকেরা উঠে আল্লাহর সত্যকে মিথ্যা বানাবার চেষ্টা করবে, যেনো ইমানদারদের নিজেদের দলে টানতে পারে।

(৩১)এ-জন্য সতর্ক থাকুন। মনে রাখবেন, তিন বছর ধরে দিন-রাত, চোখের পানির সংগে, আমি আপনাদের প্রত্যেককে সাবধান করেছি। (৩২)এখন আল্লাহ্ ও তাঁর কালামের হাতে আমি আপনাদের তুলে দিচ্ছি। এই কালাম তাঁর রহমতের বিষয়ে বলে, আর আপনাদের গড়ে তোলার ক্ষমতা তাঁর আছে। এবং তিনি তাঁর দীনদার বান্দাদের সংগে আপনাদের অংশ দেবেন।

(৩৩)আমি কারো সোনা, রুপা বা কাপড়-চোপড়ের ওপরে লোভ করিনি। (৩৪)আপনারা নিজেরাই জানেন যে, আমার ও আমার সঙ্গীদের সমস্ত প্রয়োজন মেটাবার জন্য আমি নিজের হাতে কাজ করেছি। (৩৫)এসবের দ্বারা আমি দৃষ্টান্ত হয়ে আপনাদের দেখিয়েছি যে, এরকম পরিশ্রমের দ্বারা দুর্বলদের সাহায্য করা উচিত। হযরত ইসা আ. এর এই কথা আমাদের মনে রাখা উচিত, কারণ তিনি নিজেই বলেছেন যে, ‘নেয়ার চেয়ে দেয়াতে আরো বেশি রহমত রয়েছে।’”

(৩৬,৩৭)এসব কথা বলার পর তিনি সবার সংগে হাঁটু পেতে মোনাজাত করলেন। সেখানে সবাই খুব কাঁদছিলেন। তাঁরা হযরত পৌল রা.কে জড়িয়ে ধরলেন এবং তাঁকে চুমু দিলেন। (৩৮)তাঁর মুখ আর তাঁরা দেখতে পাবেন না বলায়, তাঁরা খুব বেশি দুঃখ পেয়েছিলেন। এরপর তাঁরা তাঁকে জাহাজে নিয়ে এলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা সোজা কোস দ্বীপে গেলাম। পরদিন আমরা রোডস দ্বীপে এলাম। তারপর সেখান থেকে পাতারা গেলাম। (২)সেখানে আমরা ফৈনিকিয়া যাবার একটি জাহাজ পেলাম। তখন আমরা সেই জাহাজে উঠে রওনা হলাম।

(৩)পরে সাইপ্রাস দ্বীপ দেখতে পেয়ে তার দক্ষিণ দিক দিয়ে ঘুরে আমরা সিরিয়া দেশের টায়ার শহরে গিয়ে জাহাজ থেকে নামলাম।

(৪)কারণ সেখানে জাহাজের মালামাল নামাবার কথা ছিলো। সেখানকার ইমানদারদের খুঁজে পেয়ে আমরা তাদের সংগে সাতদিন রইলাম। আল্লাহ্র রুহের পরিচালনায় তারা হযরত পৌল রা.-কে অনুরোধ করলেন, যেনো তিনি জেরুসালেমে না-যান।

(৫)সেই দিনগুলো কেটে গেলে পর আমরা আমাদের পথে রওনা হলাম এবং তারা সবাই, তাদের স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েরা, আমাদের সংগে-সংগে শহরের বাইরে এলেন। (৬)সেখানে আমরা হাঁটু গেড়ে মোনাজাত করলাম। একে অন্যের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা জাহাজে উঠলাম এবং তারা বাড়ি ফিরে গেলেন।

(৭)টায়ার থেকে যাত্রা করে আমরা তলিমায়িতে পৌঁছলাম। সেখানে ইমানদার ভাইদের সালাম জানিয়ে তাদের সংগে এক দিন থাকলাম।

(৮)পরদিন আমরা যাত্রা করে কৈসরিয়াতে পৌঁছলাম এবং হযরত ফিলিপ র. এর বাড়িতে গিয়ে থাকলাম; ইনি ছিলেন সেই সাতজনের একজন। (৯)তার চারজন অবিবাহিতা মেয়ে ছিলো। তাদের ভবিষ্যদ্বাণী করার দান ছিলো।

(১০)আমরা সেখানে বেশ কয়েকদিন থাকার পর ইহুদিয়া থেকে হযরত আগাব র. নামে এক ওলি এলেন। (১১)তিনি আমাদের কাছে এসে হযরত পৌল রা এর কোমরের বেল্ট খুলে নিলেন এবং তা দিয়ে নিজের হাত-পা বাঁধলেন ও বললেন, ‘‘আল্লাহর রুহ বলছেন, ‘জেরুসালেমের ইহুদিরা এই বেল্টের মালিককে এভাবে বাঁধবে এবং অ-ইহুদিদের হাতে তুলে দেবে।’”

(১২)এ-কথা শুনে আমরা এবং সেখানকার লোকেরা হযরত পৌল রা.কে বিশেষভাবে অনুরোধ করলাম, যেনো তিনি জেরুসালেমে না-যান। (১৩)তখন হযরত পৌল রা. বললেন, “কেনো আপনারা কেঁদে-কেঁদে আমার মন ভেঙে দিচ্ছেন? হযরত ইসা আ. এর নামের জন্য আমি জেরুসালেমে কেবল বন্দি হতে নয়, কিন্তু মরতেও প্রস্তুত আছি।” (১৪)তাকে থামাতে না-পেরে আমরা চুপ করলাম এবং বললাম, “আল্লাহর ইচ্ছামতোই হোক।”

(১৫)ঐ দিনগুলোর পরে আমরা জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে জেরুসালেমের দিকে রওনা হলাম।

(১৬)কৈসরিয়ার কয়েকজন ইমানদার আমাদের সংগে চললেন এবং হযরত মনাসোন র. নামে সাইপ্রাসের এক লোকের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। তার বাড়িতে আমাদের থাকার কথা ছিলো। ইনি ছিলেন প্রথমদিকের সাহাবিদের মধ্যে একজন।

(১৭)জেরুসালেমে পৌঁছলে পর ইমানদার ভাইয়েরা খুশি হয়ে আমাদের গ্রহণ করলেন। (১৮)পরদিন হযরত পৌল রা. আমাদের সংগে নিয়ে হযরত ইয়াকুব রা.-কে দেখতে গেলেন এবং বুজুর্গরা সবাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। (১৯)তাদের সালাম জানাবার পর তিনি তাঁর প্রচারের মধ্য দিয়ে আল্লাহ্ কীভাবে অ-ইহুদিদের মধ্যে কাজ করেছেন, তা এক-এক করে বললেন। (২০)এসব শুনে তাঁরা আল্লাহর গৌরব করলেন। পরে তাঁরা তাঁকে বললেন, “ভাই, তুমি তো দেখছো, কতো হাজার-হাজার ইহুদি হযরত ইসা আ. এর ওপর ইমান এনেছে; আর তাঁরা সবাই হযরতর মুসা আ. এর শরিয়তের জন্য অহংকারী।

(২১)তোমার বিষয়ে তাঁদের বলা হয়েছে যে, অ-ইহুদিদের মধ্যে যে-সব ইহুদিরা থাকে, তাঁদের তুমি হযরত মুসা আ. -এর শরিয়ত বাদ দিয়ে চলতে শিক্ষা দিয়ে থাকো। অর্থাৎ তুমি তাদের ছেলেদের খতনা করাতে এবং রীতিনীতি পালন করতে নিষেধ করে থাকো। (২২)এখন কী করা যায়? তারা তো নিশ্চয়ই শুনবে যে, তুমি এসেছো।

(২৩)আমরা তোমাকে যা বলি, এখন তুমি তা-ই করো। আমাদের মধ্যে এমন চার ব্যক্তি আছে, যারা একটি মানত করেছে।

(২৪)এই লোকদের সংগে নিয়ে যাও এবং তাদের সংগে তুমি নিজেও পাকসাফ হও, আর তাদেরকে মাথার চুল কামানোর পয়সা দাও। তখন সবাই জানবে যে, তোমার সম্বন্ধে তাদের যা বলা হয়েছে, তা কিছু নয় এবং তুমি নিজে শরিয়ত পালন করো এবং রক্ষাও করো।

(২৫)কিন্তু যে-অ-ইহুদিরা ইমানদার হয়েছে, তাদের জন্য আমরা যা ঠিক করেছি, তা তাদের কাছে লিখে জানিয়েছি যে, মূর্র্তির কাছে উৎসর্গ করা খাবার, রক্ত ও গলাটিপে মারা কোনো পশুর মাংস খাবে না। আর কোনো রকম জিনা করবে না।”

(২৬)তখন হযরত পৌল রা. সেই লোকদের নিয়ে গেলেন এবং পরদিন নিজে পাকসাফ হয়ে তাদের সংগে বায়তুল-মোকাদ্দসে গেলেন। আর তাদের পাকসাফ হবার কাজ শেষে প্রত্যেকের জন্য পশু-কোরবানি দেয়া হবে বলে জানিয়ে দিলেন। (২৭)সাতদিন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এমন সময় এশিয়ার কয়েকজন ইহুদি হযরত পৌল রা.-কে বায়তুল-মোকাদ্দসে দেখলো। তারা সেখানকার সমস্ত লোককে উসকে দিলো এবং তাঁকে ধরলো।

(২৮)তারা চিৎকার করে বলতে লাগলো, “বনি-ইস্রায়েলীয়রা, সাহায্য করো! এ-ই সেই লোক, যে সব জায়গার সবাইকে আমাদের জাতি এবং আমাদের শরিয়ত ও বায়তুল-মোকাদ্দসের বিরুদ্ধে শিক্ষা দিয়ে বেড়ায়। শুধু তা-ই নয়, সে গ্রীকদের বায়তুল-মোকাদ্দসে ঢুকিয়ে এই পবিত্র জায়গা নাপাক করেছে।” (২৯)কারণ তারা আগে ইফিসীয় ত্রফিমকে তাঁর সংগে শহরে দেখেছিলো এবং তারা ভেবেছিলো যে, হযরত পৌল রা. ত্রফিমকে বায়তুল-মোকাদ্দসেও এনেছেন।

(৩০)তখন সারা শহর উত্তেজিত হয়ে উঠলো এবং লোকেরা এক সংগে দৌড়ে গেলো। তারা হযরত পৌল রা.-কে ধরে বায়তুল-মোকাদ্দস থেকে টেনে বের করে আনলো এবং সংগে-সংগেই দরজাগুলো বন্ধ করে দিলো। (৩১)যখন তারা তাকে হত্যা করার চেষ্টা করছিলো, তখন রোমীয় সৈন্যদের প্রধান সেনাপতির কাছে খবর গেলো যে, সারা জেরুসালেমে হট্টগোল বেধে গেছে।

(৩২)তখনই তিনি কয়েকজন লেফটেন্যান্ট ও সৈন্যদের নিয়ে দৌঁড়ে ভিড়ের কাছে গেলেন। লোকেরা প্রধান সেনাপতি ও সৈন্যদের দেখে হযরত পৌল রা.-কে মারা বন্ধ করলো। (৩৩)তখন প্রধান সেনাপতি এসে তাকে বন্দি করলেন এবং দু’টো শেকল দিয়ে তাঁকে বাঁধার হুকুম দিলেন। পরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “লোকটি কে? এবং সে কী করেছে?”

(৩৪)তখন লোকদের মধ্য থেকে কয়েকজন চিৎকার করে এক রকম কথা বললো, আবার কয়েকজন অন্যরকম কথা বললো। ফলে প্রধান সেনাপতি এই হট্টগোলের জন্য আসল ব্যাপার জানতে না-পেরে তাঁকে সেনানিবাসে নিয়ে যাবার হুকুম দিলেন।

(৩৫)হযরত পৌল রা. সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছলে পর লোকদের হাত থেকে তাকে বাঁচাবার জন্য সৈন্যদের তাকে বয়ে নিয়ে যেতে হলো।

(৩৬)জনতা তার পেছনে-পেছনে চিৎকার করে বলতে লাগলো, “ওকে দূর করো।” (৩৭)সৈন্যরা তাঁকে নিয়ে সেনানিবাসে ঢুকতে যাবে, এমন সময় তিনি প্রধান সেনাপতিকে বললেন, “আপনাকে কি কিছু বলতে পারি?”

(৩৮)প্রধান সেনাপতি বললেন, “তুমি কি গ্রিক জানো? মিসরের যে-লোকটা কিছুদিন আগে বিদ্রোহ শুরু করে চার হাজার বিদ্রোহীকে মরু-প্রান্তরে নিয়ে গিয়েছিলো, তুমি কি তাহলে সেই লোক নও?” (৩৯)হযরত পৌল রা. জবাব দিলেন, “আমি একজন ইহুদি। কিলিকিয়া প্রদেশের তার্সো শহরের লোক। আমি এক গুরুত্বপূর্ণ শহরের নাগরিক। দয়া করে আমাকে লোকদের কাছে কথা বলতে দিন।”

(৪০)প্রধান সেনাপতির অনুমতি পেয়ে হযরত পৌল রা. সিঁড়ির ওপর দাঁড়ালেন এবং লোকদের চুপ করার জন্য ইশারা করলেন। লোকেরা চুপ করলে পর ইব্রানী ভাষায় তাদের বললেন,

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)“ভাইয়েরা ও পিতারা, এখন নিজের পক্ষে আমার উত্তর শুনুন।” (২)তারা তাঁকে ইব্রানী ভাষায় কথা বলতে শুনে একেবারে চুপ হয়ে গেলো।

(৩)তখন তিনি বললেন, “আমি একজন ইহুদি। কিলিকিয়ার তার্সো শহরে আমার জন্ম। তবে এই শহরেই বড়ো হয়েছি। গমলিয়েলের পায়ের কাছে বসে আমি আমাদের পূর্বপুরুষদের শরিয়ত সম্পূর্ণভাবে শিক্ষা লাভ করেছি। আল্লাহ্ সম্বন্ধে আপনাদের মতো আমিও সমানভাবে অহংকারী। (৪)যারা হযরত ইসা আ.-এর পথে চলতো, আমি তাঁদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা পর্যন্ত করতাম, আর পুরুষ ও স্ত্রীলোকদের ধরে জেলখানায় দিতাম।

(৫)মহাইমাম ও মহা-সভার বুজুর্গরা সবাই এ-ব্যাপারে আমার সাক্ষী। আমি তাদের কাছ থেকে দামেস্ক শহরের ভাইদের দেবার জন্য চিঠি নিয়ে গিয়েছিলাম। এবং ঐ ধরনের লোকদের বন্দি করে জেরুসালেমে এনে শাস্তি দেবার জন্য সেখানে যাচ্ছিলাম। (৬)তখন বেলা প্রায় দুপুর। আমি দামেস্কের কাছাকাছি এলে পর হঠাৎ আসমান থেকে আমার চারদিকে একটি উজ্জ্বল আলো পড়লো। (৭)আমি মাটিতে পড়ে গেলাম এবং শুনলাম, একটি কণ্ঠস্বর আমাকে বলছেন, ‘শৌল, শৌল, তুমি কেনো আমার ওপর জুলুম করছো?’

(৮)আমি উত্তরে বললাম, ‘মালিক, আপনি কে?’

(৯)তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘আমি নাসরতের ইসা ইবনে মারিয়াম, যাঁর ওপর তুমি জুলুম করছো।’

যারা আমার সংগে ছিলো, তারা সেই আলো দেখলো কিন্তু যিনি আমার সংগে কথা বলছিলেন, তাঁর আওয়াজ শুনতে পেলো না।

(১০)আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হুজুর, আমি কী করবো?’ তিনি আমাকে বললেন, ‘ওঠো এবং দামেস্কে যাও। তোমার জন্য যা ঠিক করে রাখা হয়েছে, সেখানেই তোমাকে তা বলা হবে।’

(১১)আমার সঙ্গীরা হাত ধরে আমাকে দামেস্কে নিয়ে চললো, কারণ সেই উজ্জ্বল আলোতে আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। (১২)হযরত অননিয় র. নামে এক লোক আমার কাছে এলেন। তিনি অত্যন্ত যত্নের সংগে হযরত মুসা আ. এর শরিয়ত পালন করেন, আর সেখানকার ইহুদিরা তাঁকে খুব সম্মান করে। (১৩)তিনি এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ভাই শৌল, তোমার দেখার শক্তি ফিরে আসুক।’ আর তখনই আমি দেখার শক্তি ফিরে পেলাম ও তাঁকে দেখলাম।

(১৪)তারপর তিনি বললেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষদের আল্লাহ্ তোমাকে বেছে নিয়েছেন, যেনো তুমি তাঁর ইচ্ছা জানতে পারো, আর সেই ন্যায়বান ব্যক্তিকে দেখতে পাও এবং তাঁর মুখের কথা শুনতে পাও। (১৫)তুমি যা দেখেছো ও শুনেছো, সব মানুষের কাছে তুমি সে-সবের সাক্ষী হবে। (১৬)এখন কেনো দেরি করছো? উঠে বায়াত নাও। তাঁর নামে তোমার সব গুনাহ্ ধুয়ে ফেলো।’

(১৭)জেরুসালেমে ফিরে এসে যখন আমি বায়তুল-মোকাদ্দসে মোনাজাত করছিলাম, তখন আমি তন্দ্রার মতো অবস্থায় পড়লাম। (১৮)এবং দেখলাম যে, হযরত ইসা আ. আমাকে বলছেন- ‘তাড়াতাড়ি ওঠো। এখনই জেরুসালেম ছেড়ে চলে যাও, কারণ আমার বিষয়ে তোমার সাক্ষ্য এরা গ্রহণ করবে না।’

(১৯)আমি বললাম, ‘হুজুর, এই লোকেরা জানে যে, যারা তোমার ওপর ইমান আনতো, তাঁদের মারধর করে জেলে দেবার জন্য আমি প্রত্যেক সিনাগোগে যেতাম। (২০)যখন তোমার সাক্ষী স্তিফানকে হত্যা করা হচ্ছিলো, তখন আমি সেখানে দাঁড়িয়ে সায়-দিচ্ছিলাম; আর যারা তাঁকে হত্যা করছিলো, তাদের কাপড়-চোপড় পাহারা দিচ্ছিলাম।’ (২১)তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি যাও, কারণ আমি তোমাকে দূরে, অইহুদিদের কাছে পাঠাবো।’”

(২২)এ-পর্যন্ত তারা তাঁর কথা শুনছিলো, কিন্তু এরপর তারা জোরে চিৎকার করে বলতে লাগলো, “ওকে দুনিয়া থেকে দূর করে দাও। ও বেঁচে থাকার উপযুক্ত নয়।”

(২৩)লোকেরা যখন চিৎকার করছিলো এবং কাপড়-চোপড় ছুঁড়ে আকাশে ধুলো ছড়াচ্ছিলো, তখন প্রধান সেনাপতি তাঁকে সেনানিবাসে নিয়ে যাবার হুকুম দিলেন। (২৪)এবং কেনো লোকেরা তাঁর বিরুদ্ধে এভাবে চিৎকার করছে, তা জানার জন্য তাকে চাবুক মেরে জেরা করার হুকুম দিলেন।

(২৫)কিন্তু যখন তাকে চাবুক মারার জন্য বাঁধা হলো, তখন যে-লেফটেন্যান্ট সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হযরত পৌল রা. তাকে বললেন, “যাকে এখনো দোষী বলে ঠিক করা হয়নি, এমন একজন রোমীয় নাগরিককে চাবুক মারা কি আপনাদের পক্ষে আইন-সম্মত কাজ হচ্ছে?”

(২৬)এ-কথা শুনে সেই লেফটেন্যান্ট প্রধান সেনাপতির কাছে গিয়ে বললেন, “আপনি কী করতে যাচ্ছেন? এই লোকটি তো রোমীয় নাগরিক।”

(২৭)তখন প্রধান সেনাপতি পৌলের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আমাকে বলো দেখি, তুমি কি রোমীয় নাগরিক?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” (২৮)প্রধান সেনাপতি বললেন, “নাগরিকত্ব পাবার জন্য আমার অনেক টাকা-পয়সা খরচ করতে হয়েছে।” পৌল বললেন, “কিন্তু আমি রোমীয় নাগরিক হয়েই জন্মেছি।”

(২৯)এ-কথা শুনে যারা তাঁকে জেরা করতে যাচ্ছিলো, তারা তখনই চলে গেলো। প্রধান সেনাপতি ভয় পেলেন, কারণ তিনি বুঝতে পারলেন যে, তিনি একজন রোমীয় নাগরিক এবং তিনি তাকে বেঁধেছেন। (৩০)ইহুদীরা কেনো হযরত পৌল রা.-কে দোষ দিচ্ছে, তা ঠিকভাবে জানার জন্য পরদিন প্রধান সেনাপতি পৌলের বাঁধন খুলে দিলেন এবং প্রধান ইমামদের ও মহাসভার লোকদের এক সংগে মিলিত হবার হুকুম দিলেন। তারপর তিনি হযরত পৌল রা.-কে নিয়ে এসে তাদের সামনে দাঁড় করালেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)হযরত পৌল রা. সোজা মহাসভার লোকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার ভাইয়েরা, আজ পর্যন্ত আমি আল্লাহর সামনে পরিষ্কার বিবেকে জীবন-যাপন করছি।” (২)তখন মহাইমাম অননিয় যারা হযরত পৌল রা.-এর কাছে দাঁড়িয়েছিলো, তাদেরকে তাঁর মুখে আঘাত করতে হুকুম দিলেন।

(৩)এতে হযরত পৌল রা. তাকে বললেন, “আপনি চুনকাম করা দেয়াল। আল্লাহ্ আপনাকেও আঘাত করবেন! আইন-মতো আমার বিচার করার জন্য আপনি ওখানে বসেছেন, কিন্তু আমাকে মারতে হুকুম দিয়ে কি আপনি নিজেই আইন ভঙ্গ করছেন না?” (৪)যারা হযরত পৌল রা-র কাছে দাঁড়িয়েছিলো, তারা তাঁকে বললো, “তুমি কি আল্লাহর মহাইমামকে অপমান করার সাহস দেখাচ্ছো?” (৫)তিনি বললেন, “ভাইয়েরা, আমি জানতাম না যে, উনি মহাইমাম। কারণ লেখা আছে, ‘তোমার জাতির নেতার বিরুদ্ধে খারাপ কথা বলো না।’”

(৬)যখন হযরত পৌল রা. দেখলেন যে, কয়েকজন সদ্দুকি ও কয়েকজন ফরিসীও সেখানে রয়েছেন, তখন তিনি মহাসভার মধ্যে জোরে বললেন, “আমার ভাইয়েরা, আমি একজন ফরিসী ও ফরিসীর সন্তান। আমার বিচার হচ্ছে, কারণ আমি মৃতদের পুনরুত্থানের আশা করি।” (৭)তার এই কথাতে ফরিসী ও সদ্দুকিদের মধ্যে মত বিরোধ দেখা দিলো এবং মহাসভার লোকেরা দু’ভাগ হয়ে গেলো। (৮)সদ্দুকিরা বলেন যে, পুনরুত্থান নেই। ফেরেস্তাও নেই। কোনো রুহও নেই। কিন্তু ফরিসীরা এই সবই বিশ্বাস করেন।

(৯)তখন ভীষণ গোলমাল শুরু হলো এবং ফরিসী দলের কয়েকজন আলিম উঠে খুব জোরে বললেন, “আমরা এই লোকটির কোনো দোষ দেখতে পাচ্ছি না। হয়তো কোনো রুহ্ বা ফেরেস্তা এর সংগে কথা বলেছেন।”

(১০)সেই ঝগড়া এমন ভীষণ হয়ে উঠলো যে, প্রধান সেনাপতির ভয় হলো, হয়তো তারা হযরত পৌল রা.-কে ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে ফেলবেন। তিনি সৈন্যদের হুকুম দিলেন, যেনো তারা গিয়ে লোকদের হাত থেকে হযরত পৌল রা.-কে ছাড়িয়ে এনে সেনানিবাসে নিয়ে যায়। (১১)সেদিন রাতে হযরত ইসা আ. তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, “সাহসী হও। জেরুসালেমে তুমি যেভাবে আমার বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছো, সেভাবে রোমেও সাক্ষ্য দিতে হবে।”

(১২)সকালবেলা ইহুদিরা একটি ষড়যন্ত্র করলো এবং হযরত পৌল রা.কে হত্যা না-করা পর্যন্ত কিছুই খাবে না বলে কসম খেলো। (১৩)চল্লিশ জনেরও বেশি লোক এই ষড়যন্ত্রে সামিল হলো। (১৪)তারা প্রধান ইমামদের ও বুজুর্গদের কাছে গিয়ে বললো, “পৌলকে হত্যা না-করা পর্যন্ত কিছুই খাব না বলে আমরা কঠিন কসম খেয়েছি।

(১৫)এখন আপনারা ও মহাসভার লোকেরা এ-ব্যাপারে আরো ভালো করে তদন্ত করার অজুহাতে পৌলকে আপনাদের সামনে আনার জন্য প্রধান সেনাপতির কাছে খবর পাঠান। সে এখানে পৌঁছার আগেই আমরা তাকে শেষ করে ফেলার জন্য প্রস্তুত হয়ে রইলাম।”

(১৬)হযরত পৌল রা.-র বোনের ছেলে এই ষড়যন্ত্রের কথা শুনতে পেয়ে সেনানিবাসে গেলো এবং তাঁকে সেই খবর জানালো। (১৭)তিনি একজন লেফটেন্যান্টকে ডেকে বললেন, “এই যুবককে প্রধান সেনাপতির কাছে নিয়ে যান, তার কাছে এর কিছু বলার আছে।” (১৮)তখন তিনি তাকে প্রধান সেনাপতির কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, “বন্দি পৌল আমাকে ডেকে পাঠিয়ে এই যুবককে আপনার কাছে নিয়ে আসতে বললো, কারণ আপনাকে এর কিছু বলার আছে।”

(১৯)প্রধান সেনাপতি তাকে হাত ধরে এক পাশে নিয়ে গিয়ে গোপনে জিজ্ঞেস করলেন, “আমাকে তুমি কী জানাতে চাও?” (২০)সে উত্তর দিলো, “ইহুদিরা ঠিক করেছে যে, হযরত পৌল রা.-র বিষয়ে আরো ভালো ভাবে খোঁজ-খবর নেবার অজুহাতে তাকে আগামীকাল মহাসভার সামনে নিয়ে যাবার জন্য আপনাকে অনুরোধ করবে। (২১)কিন্তু তাদের কথায় রাজি হবেন না। কারণ চল্লিশ জনেরও বেশি লোক লুকিয়ে থেকে তাঁর জন্য অপেক্ষা করে আছে। তাঁকে হত্যা না-করা পর্যন্ত এই লোকেরা কিছুই খাবে না বা পান করবে না বলে কসম খেয়েছে। তারা প্রস্তুত হয়ে এখন কেবল আপনার রাজি হওয়ার অপেক্ষায় আছে।

(২২)প্রধান সেনাপতি সেই যুবককে বিদায় করার সময় এই হুকুম দিলেন, “এ-কথা যে তুমি আমাকে জানিয়েছো, তা কাউকে বলো না।”

(২৩)পরে প্রধান সেনাপতি তার দু’জন লেফটেন্যান্টকে ডেকে বললেন, “দুশো সৈন্য, সত্তরজন ঘোড়সওয়ার সৈন্য এবং দুশো বর্শাধারী সৈন্যকে আজ রাত ন’টার সময় কৈসরিয়াতে যাবার জন্য প্রস্তুত রাখো। (২৪)পৌলের জন্যও ঘোড়ার ব্যবস্থা করো এবং তাকে নিরাপদে গভর্নর ফিলিক্সের কাছে নিয়ে যাও।”

(২৫)তিনি সেখানে এই চিঠি লিখলেন- (২৬)“আমি ক্লডিয়াস লুসিয়াস, মহামান্য গভর্নর ফিলিক্সের কাছে লিখছি, আমার সালাম গ্রহণ করুন। (২৭)ইহুদিরা এই লোকটিকে ধরে প্রায় হত্যা করে ফেলেছিলো।

কিন্তু আমি যখন জানতে পারলাম যে, সে একজন রোমীয়, তখন আমি আমার সৈন্যদের নিয়ে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে এনেছি।

(২৮)যেহেতু আমি জানতে চাইলাম কেনো লোকেরা তাকে দোষী করছে, সেহেতু আমি তাকে তাদের মহাসভার কাছে নিয়ে গেলাম। (২৯)আমি বুঝতে পারলাম যে, তাদের শরিয়তের বিষয় নিয়ে তারা তাকে দোষী করছে; কিন্তু মরার বা জেলে দেবার মতো এমন কোনো দোষ তার নেই। (৩০)যখন আমি জানতে পারলাম যে, তারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে, তখনই আমি তাকে আপনার কাছে পাঠালাম। যারা তাকে দোষ দিচ্ছে, তাদেরও আমি হুকুম দিলাম, যেনো তারা এর দোষের বিষয়ে আপনার কাছে গিয়ে বলে।”

(৩১)সুতরাং, প্রাপ্ত হুকুম মতো সৈন্যরা পৌলকে নিয়ে রাতের বেলায় আন্তিপাত্রি পর্যন্ত গেলো। (৩২)পরদিন তারা ঘোড়সওয়ার সৈন্যদের সংগে হযরত পৌল রা.-কে পাঠিয়ে দিয়ে সেনানিবাসে ফিরে গেলো। (৩৩)তারা কৈসরিয়াতে পৌঁছে চিঠিটা ও পৌলকে গভর্নরের হাতে তুলে দিলো। (৩৪)চিঠিটা পড়ে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কোন প্রদেশের লোক।

(৩৫)যখন তিনি জানলেন যে, তিনি কিলিকিয়া প্রদেশের লোক, তখন তিনি বললেন, “তোমাকে যারা দোষী করছে, তারা এখানে আসার পর আমি তোমার কথা শুনবো।” পরে তিনি হেরোদের প্রধান কার্যালয়ে তাকে পাহারা দিয়ে রাখার হুকুম দিলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)পাঁচদিন পরে মহাইমাম অননিয় কয়েকজন ইহুদি বুজুর্গকে ও তর্তুল্লস নামে একজন উকিলকে নিয়ে সেখানে এলেন এবং গভর্নরের কাছে হযরত পৌল রা.-এর বিরুদ্ধে নালিস জানালেন।

(২-৩)হযরত পৌল রা.-কে ডেকে আনার পর তর্তুল্লস এই বলে তাকে দোষারোপ করতে লাগলেন, “হে মাননীয় ফিলিক্স, আপনার অধীনে আমরা অনেকদিন ধরে খুব শান্তিতে আছি। আপনি আপনার দূর দৃষ্টির দ্বারা এই জাতির অনেক উন্নতি করেছেন। আমরা সব সময় সব জায়গায় কৃতজ্ঞতার সংগে তা স্মরণ করি।

(৪)কিন্তু আপনার সময় নষ্ট না-করার জন্য আমি এই অনুরোধ করি, দয়া করে আমাদের কথা শুনুন। আমরা অল্প কথায় সব বলবো।

(৫)আমরা দেখেছি, এই লোকটা একটা আপদ। সব সময় গোলমালের সৃষ্টি করে থাকে। সারা দুনিয়ায় ইহুদিদের মধ্যে সে গোলমাল বাধিয়ে বেড়ায়। সে নাসারা (নাজারিন বা নাজারিনিস) নামে একটি ধর্মীয় উপদলের নেতা।

(৬,৭)এমনকি বায়তুল-মোকাদ্দস পর্যন্ত সে নাপাক করার চেষ্টা করেছে এবং আমরা তাকে ধরেছি। (৮)আমরা তাকে যে-সব দোষ দিচ্ছি, আপনি নিজে তাকে জেরা করলে সবকিছুই জানতে পারবেন।” (৯)এসব কথা যে সত্যি, তাতে ইহুদিরাও সায় দিলো।

(১০)তখন গভর্নর তাকে ইসারা করার পর হযরত পৌল রা বলতে লাগলেন- “আমি খুব খুশি হয়েই নিজের পক্ষে কথা বলছি। আমি জানি যে, বেশ কয়েক বছর ধরে আপনি এই জাতির বিচার করে আসছেন। (১১)আপনি খোঁজ নিলে সহজেই জানতে পারবেন যে, আজ বারো দিনের বেশি হয়নি আমি এবাদত করার জন্য জেরুসালেমে গিয়েছিলাম।

(১২)তারা আমাকে বায়তুল-মোকাদ্দসে কারো সংগে তর্কাতর্কি করতে দেখেননি বা সিনাগোগে কিংবা শহরের অন্য কোথাও লোকদের উসকানি দিতে দেখেননি। (১৩)আমার বিরুদ্ধে এখন তারা যে-দোষ দেখাচ্ছেন, তার প্রমাণ তারা আপনার কাছে দিতে পারবেন না। (১৪)কিন্তু এ-কথা আমি আপনার কাছে স্বীকার করছি, যে-পথকে তারা ধর্মীয় উপদল বলছেন, আমি সেই পথেই আমার পূর্বপুরুষদের আল্লাহর ইবাদত করে থাকি। তওরাতের সংগে যা-কিছুর মিল আছে, তাতে এবং নবিদের কিতাবে আমি ইমান রাখি।

(১৫)তারা যেমন আশা করেন, তেমনি আমারও আল্লাহর ওপর এই আশা আছে যে, ধার্মিক এবং অধার্মিক সকলেরই পুনরুত্থান হবে। (১৬)এ-জন্য আমি আল্লাহ্ ও মানুষের কাছে সব সময় আমার বিবেককে পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করি। (১৭)অনেক বছর পর আমি আমার জাতির গরিব লোকদের দান-খয়রাত করতে ও কোরবানি দিতে গিয়েছিলাম।

(১৮)নিজেকে পাকসাফ করার পর যখন আমি সেই কাজ করছিলাম, তখনই তারা আমাকে বায়তুল-মোকাদ্দসে দেখতে পেয়েছিলেন। আমার কাছে লোকজনের ভিড়ও ছিলো না কিংবা আমাকে নিয়ে কোনো গোলমালও হয়নি। (১৯)কিন্তু এশিয়ার কয়েকজন ইহুদি সেখানে ছিলো। যদি আমার বিরুদ্ধে তাদের কিছু বলার থাকে, তাহলে তাদেরই আপনার কাছে আসা উচিত ছিলো।

(২০)কিংবা এখানে যারা উপস্থিত আছেন তারা ইবলুন, আমি যখন মহাসভার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তখন তারা আমার কী দোষ পেয়েছিলেন? (২১)কেবল একটি বিষয়ে তারা আমার দোষ দিতে পারেন যে, আমি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে জোর গলায় বলেছিলাম, ‘মৃতদের পুনরুত্থানের বিষয় নিয়ে আজ আপনাদের সামনে আমার বিচার হচ্ছে।’”

(২২)কিন্তু ফিলিক্স খুব ভালো করেই ‘পথের বিষয়ে’ জানতেন। বিচার বন্ধ করে তিনি বললেন, “প্রধান সেনাপতি লুসিয়াস আসার পর আমি তোমাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবো।” (২৩)হযরত পৌল রা.-কে পাহারা দেবার জন্য তিনি লেফটেন্যান্টকে হুকুম দিলেন। কিন্তু তাঁকে কিছুটা স্বাধীনভাবে রাখতে বললেন এবং তাঁর বন্ধুরা যাতে তাঁর দেখাশোনা করতে পারেন, তাতে বাধা রাখলেন না।

(২৪)কয়েকদিন পর ফিলিক্স তার ইহুদি স্ত্রী দ্রুসিল্লাকে সংগে নিয়ে এলেন। তিনি হযরত পৌল রা.-কে ডেকে পাঠিয়ে তার কাছে হযরত মসিহ ইসার ওপর ইমানের কথা শুনলেন।

(২৫)হযরত পৌল রা. যখন সৎভাবে চলা, নিজেকে দমনে রাখা এবং রোজ-হাশরের বিষয়ে বললেন, তখন ফিলিক্স ভয় পেয়ে বললেন, “তুমি এখন যাও, সময়-সুযোগ মতো আমি তোমাকে ডাকবো।”

(২৬)একই সময় তিনি আশা করেছিলেন যে, হযরত পৌল রা. তাকে ঘুষ দেবেন এবং সে-জন্য বারবার তাকে ডেকে এনে তার সংগে কথা বলতেন। (২৭)দু’বছর পার হয়ে গেলে পর ফিলিক্সের জায়গায় পর্কিয়ুস ফাস্তুস এলেন। এদিকে ফিলিক্স ইহুদিদের খুশি করার জন্য হযরত পৌল রা.-কে জেলখানাতেই রেখে গেলেন।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)ফাস্তুস সেই প্রদেশে আসার তিনদিন পর কৈসরিয়া থেকে জেরুসালেমে গেলেন। (২)সেখানে প্রধান ইমামেরা ও নেতারা তার কাছে গিয়ে পৌলের বিরুদ্ধে নালিস জানালেন। (৩)তারা তাকে অনুরোধ করলেন, যেনো তিনি তাদের ওপর দয়া করে হযরত পৌল রা.-কে জেরুসালেমে ডেকে পাঠান। আসলে তারা পথের মধ্যে লুকিয়ে থেকে হযরত পৌল রা.-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করছিলেন।

(৪)তখন ফাস্তুস বললেন যে, তাকে কৈসরিয়াতে আটক রাখা হয়েছে এবং তিনি নিজেই শিগগির সেখানে যাবেন। তিনি বললেন, “সুতরাং, (৫)তোমাদের কয়েকজন ক্ষমতাশালী লোক আমার সংগে আসুক এবং সেই লোক দোষী হয়ে থাকলে তা দেখিয়ে দিক।”

(৬)ফাস্তুস তাদের মধ্যে আট-দশ দিন থাকার পর কৈসরিয়াতে গেলেন এবং পরদিন তিনি বিচার-সভায় বসে হযরত পৌল রা.-কে তার সামনে আনার হুকুম দিলেন।

(৭)যখন তিনি এলেন, তখন যে-ইহুদিরা জেরুসালেম থেকে এসেছিলো, তারা তাকে ঘিরে ধরলো। তাঁর বিরুদ্ধে অনেক ভীষণ রকমের দোষ দিলো কিন্তু সেগুলোর কোনো প্রমাণ দিতে পারলো না।

(৮)হযরত পৌল রা. নিজের পক্ষে বললেন, “আমি ইহুদিদের শরিয়ত বা বায়তুল-মোকাদ্দস কিংবা সম্রাটের বিরুদ্ধে কোনো অন্যায় করিনি।” (৯)কিন্তু ফাস্তুস ইহুদিদের খুশি করার জন্য তাঁকে বললেন, “এসব দোষের বিচার আমি যেনো জেরুসালেমে করতে পারি, সে-জন্য তুমি কি সেখানে যেতে রাজি আছো?”

(১০)হযরত পৌল রা. বললেন, “আমি সম্রাটের বিচার-সভায় আপিল করছি, সেখানে আমার বিচার হওয়া উচিত। আপনি নিজে জানেন যে, আমি ইহুদিদের ওপরে কোনো অন্যায় করিনি। (১১)যা হোক, যদি আমি মৃত্যুর উপযুক্ত কোনো দোষ করে থাকি, তাহলে আমি মরতেও রাজি আছি। কিন্তু এরা আমার বিরুদ্ধে যে-সব দোষ দিচ্ছে, তা যদি সত্যি না-হয়, তাহলে এদের হাতে আমাকে ছেড়ে দেবার অধিকার কারো নেই। আমি সম্রাটের কাছে আপিল করছি।”

(১২)ফাস্তুস তার পরামর্শ-দাতাদের সংগে পরামর্শ করে বললেন, “তুমি সম্রাটের কাছে আপিল করেছো, সম্রাটের কাছেই তুমি যাবে।” (১৩)এর কিছুদিন পরে বাদশাহ আগ্রিপ্প ও বার্নিকি ফাস্তুসকে স্বাগত জানাবার জন্য কৈসরিয়াতে এলেন।

(১৪)তারা অনেকদিন সেখানে ছিলেন বলে ফাস্তুস হযরত পৌল রা.-র বিষয় বাদশাহকে জানালেন। বললেন, “ফিলিক্স এক লোককে এখানে বন্দি হিসাবে রেখে গেছেন।

(১৫)আমি যখন জেরুজালেমে গিয়েছিলাম, তখন প্রধান ইমামরা ও ইহুদিদের বুজুর্গরা তার বিষয়ে আমাকে জানিয়ে ছিলেন এবং একে শাস্তি দিতে বলেছিলেন। (১৬)আমি তাদের বললাম, ‘কোনো লোকের বিরুদ্ধে যদি কোনো নালিস করা হয়, তাহলে যারা নালিস করেছে, তাদের সামনে নিজেকে নির্দোষ বলে প্রমাণ করার সুযোগ না-পাওয়া পর্যন্ত তাকে শাস্তি দেয়া রোমীয়দের নীতি নয়। (১৭)তারা এখানে আসার পর আমি দেরি না-করে পরদিনই বিচার করতে বসলাম এবং সেই লোককে আনতে হুকুম দিলাম।

(১৮)যে-লোকেরা তাকে দোষ দিচ্ছিলো, তারা যখন কথা বলার জন্য উঠে দাঁড়ালো, তখন যেমন ভেবেছিলাম, তেমন কোনো নালিস তারা করলো না। (১৯)বরং তার সংগে তাদের মতের অমিল দেখা গেলো- তাদের ধর্মমত এবং হযরত ইসা আ. নামের এক লোক, যার মৃত্যু হয়েছে, তার সম্বন্ধে। পৌল নামে লোকটা দাবি করে যে, সেই হযরত ইসা আ. জীবিত হয়ে উঠেছেন। (২০)এসব বিষয়ে কী করে খোঁজ নেবো তা বুঝতে না-পেরে আমি জিজ্ঞেস করলাম, এসব দোষারোপের বিচারের জন্য সে জেরুসালেমে যেতে রাজি আছে কি-না। (২১)কিন্তু পৌল যখন সম্রাটের রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে আমার কাছে আপিল করলো, তখন সম্রাটের কাছে না-পাঠানো পর্যন্ত তাকে পাহারা দিয়ে রাখতে আমি হুকুম দিয়েছি।”

(২২)তখন আগ্রিপ্প ফাস্তুসকে বললেন, “আমি নিজে এই লোকের কথা শুনতে ইচ্ছা করি।” তিনি বললেন, “কাল শুনতে পাবেন।” (২৩)পরদিন বাদশাহ আগ্রিপ্প ও বার্নিকি প্রধান সেনাপতিদের ও শহরের প্রধান-প্রধান লোকদের নিয়ে মহা-জাঁকজমকের সংগে সভা-ঘরের মধ্যে ঢুকলেন। ফাস্তুসের হুকুমে হযরত পৌল রা.-কে সেখানে আনা হলো।

(২৪)এবং ফাস্তুস বললেন, “বাদশাহ আগ্রিপ্প এবং আর যারা আমাদের সংগে উপস্থিত আছেন, আপনারা এই লোকটিকে দেখছেন। এর বিষয়ে গোটা ইহুদি সমাজ জেরুজালেমে ও এখানেও আমার কাছে দরখাস্ত করেছে এবং চিৎকার করে বলেছে যে, এই লোকটির আর বেঁচে থাকা উচিত নয়। (২৫)কিন্তু আমি দেখলাম যে, মৃত্যুর শাস্তি দেয়া যায় এমন কোনো দোষ সে করেনি। এবং সে নিজেই যখন সম্রাটের কাছে আপিল করেছে, তখন আমি তাকে সম্রাটের কাছে পাঠানোই ঠিক মনে করলাম;

(২৬)কিন্তু মহামান্যকে লেখার মতো এমন সঠিক কিছুই পেলাম না। তাই আমি আপনাদের সকলের সামনে, বিশেষ করে বাদশাহ আগ্রিপ্প, আপনার সামনে তাকে এনেছি, যাতে তাকে জেরা করে অন্তত আমি কিছু লিখতে পারি। (২৭)কারণ আমার মতে, কোনো বন্দির বিরুদ্ধে আনীত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া তাকে চালান দেয়া উচিত নয়।”

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)তখন আগ্রিপ্প হযরত পৌল রা.-কে বললেন, “তোমার নিজের পক্ষে কথা বলার জন্য তোমাকে অনুমতি দেয়া গেলো।” (২)তখন তিনি হাত বাড়িয়ে দিয়ে নিজের পক্ষে এই কথা বলতে লাগলেন, “হে বাদশাহ আগ্রিপ্প, আপনার সামনে দাঁড়াবার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। ইহুদিরা আমার বিরুদ্ধে যে-সব অভিযোগ করেছে, আজ আমি তার সব খন্ডন করবো। (৩)কারণ বিশেষ করে আপনি ইহুদিদের রীতিনীতি এবং মত বিরোধের বিষয়গুলো জানেন। এ-জন্য ধৈর্য ধরে আমার কথাগুলো শুনতে আপনাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।

(৪)ইহুদিরা সবাই আমার ছেলেবেলা থেকে শুরু করে আমার জীবনের সবকিছু জানে, যে-জীবন আমি আমার লোকদের মধ্যে ও জেরুসালেমে কাটিয়েছি। (৫)তারা অনেকদিন ধরেই আমাকে চেনে এবং ইচ্ছা করলে তারা এই সাক্ষ্য দিতে পারে যে, আমি আমাদের ধর্মের ধর্মীয় গোঁড়া দলের লোক এবং ফরিসী হিসাবেই জীবন কাটিয়েছি।

(৬)এখন আমি বিচারের সামনে দাঁড়িয়েছি এ-জন্য যে, আল্লাহ আমার পূর্বপুরুষদের কাছে যে-ওয়াদা করেছিলেন, তাতে আমি আশা রাখি। (৭)কেবল একটি ওয়াদার পূর্ণতা দেখার আশায় আমাদের বারো গোষ্ঠীর লোকেরা দিনরাত মন-প্রাণ দিয়ে আল্লাহর এবাদত করে। মহারাজ, সেই আশার জন্যই ইহুদিরা আমাকে দোষারোপ করছে।

(৮)আপনারা কেনো বিশ্বাস করতে পারেন না যে, আল্লাহ মৃতদের জীবিত করে তুলতে পারেন? (৯)আমি নিজেই বিশ্বাস করতাম যে, নাসরতের হযরত ইসা আ.-এর নামের বিরুদ্ধে যা করা যায়, তার সবই আমার করা উচিত। আর জেরুসালেমে আমি ঠিক তা-ই করছিলাম।

(১০)প্রধান ইমামদের কাছ থেকে ক্ষমতা পেয়ে আমি কামেলদের শুধু জেলেই বন্দি করিনি, তাঁদের হত্যা করার সময় তাঁদের বিরুদ্ধে সায়ও দিতাম।

(১১)আমি প্রায় প্রতিটি সিনাগোগে গিয়ে তাঁদের শাস্তি দিয়েছি এবং আল্লাহর নিন্দা করার জন্য তাঁদের ওপর জোর খাটিয়েছি। তাঁদের ওপর আমার এতো রাগ ছিলো যে, তাঁদের ওপর এতো জুলুম করেছি যে, তাঁদের বিতাড়িত করে বিদেশে ঠেলে দিয়েছি। (১২)এভাবে একবার প্রধান ইমামদের কাছ থেকে ক্ষমতা ও হুকুম নিয়ে আমি দামেস্কে যাচ্ছিলাম।

(১৩)মহারাজ, তখন বেলা প্রায় দুপুর। আমি দেখলাম, পথের মধ্যে সূর্য থেকেও উজ্জ্বল একটি আলো আসমান থেকে আমার ও আমার সঙ্গীদের চারদিকে জ্বলতে লাগলো। (১৪)আমরা সবাই মাটিতে পড়ে গেলাম এবং আমি শুনলাম, একটি কণ্ঠস্বর ইব্রানি ভাষায় আমাকে বলছেন, ‘শৌল, শৌল, কেনো তুমি আমার ওপর জুলুম করছো? কাঁটা বসানো লাঠির মুখে লাথি মারলে তোমার ক্ষতি হবে।’

(১৫)আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘মালিক, আপনি কে?’

(১৬)তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি ইসা, যাঁর ওপর তুমি জুলুম করছো। কিন্তু এখন ওঠো, তোমার পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াও, কারণ আমি তোমাকে দেখা দিলাম, যেনো তুমি আমাকে যেভাবে দেখলে এবং আমি তোমাকে যা দেখাবো, তার সাক্ষী ও সেবাকারী হিসাবে তোমাকে নিযুক্ত করতে পারি। (১৭)আমি তোমাকে যাদের কাছে পাঠাচ্ছি, তোমার সেই নিজের লোকদের ও অ-ইহুদিদের হাত থেকে আমি তোমাকে উদ্ধার করবো, যেনো তুমি তাদের চোখ খুলে দাও; (১৮)তারা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ও শয়তানের কর্তৃত্ব থেকে আল্লাহর দিকে ফিরে এবং আমার ওপর ইমান এনে গুনাহের মাফ ও পাকসাফ হওয়া লোকদের মধ্যে স্থান পায়।’

(১৯)বাদশাহ আগ্রিপ্প, এরপর থেকে আমি এই বেহেস্তি দর্শনের অবাধ্য হইনি। (২০)কিন্তু যাঁরা দামেস্কে আছে, তাঁদের কাছে প্রথমে, তারপর জেরুসালেমে এবং গোটা ইহুদিয়া প্রদেশে এবং অইহুদিদের কাছেও প্রচার করেছি যে, যেনো তাঁরা তওবা করে আল্লাহর দিকে ফেরে এবং সব সময় তওবার উপযোগী কাজ করে। (২১)এ-জন্যই ইহুদিরা আমাকে বায়তুল-মোকাদ্দসে ধরে হত্যা করার চেষ্টা করছিলো।

(২২)আজ পর্যন্ত আল্লাহ্ আমাকে সাহায্য করেছেন এবং এ-জন্যই আমি এখানে দাঁড়িয়ে ছোট-বড়ো সবার কাছে সাক্ষ্য দিচ্ছি। নবিরা এবং হযরত মুসা আ. যা-যা ঘটার কথা বলেছেন, তার বাইরে আমি কিছুই বলছি না।

(২৩)তাহলো এই যে, মসিহকে কষ্টভোগ করতে হবে এবং মৃতদের মধ্য থেকে প্রথমে জীবিত হয়ে উঠে তাঁর নিজের জাতির লোকদের ও অ-ইহুদিদের কাছে আলোর বিষয়ে ঘোষণা করতে হবে।”

(২৪)এভাবে যখন তিনি নিজের পক্ষে কথা বলছিলেন, তখন ফাস্তুস তাকে বাধা দিয়ে চিৎকার করে বললেন, “পৌল, তুমি পাগল হয়ে গেছো! অনেক পড়াশোনা তোমাকে পাগল করে তুলেছে।” (২৫)কিন্তু হযরত পৌল রা. বললেন, “মাননীয় ফাস্তুস, আমি পাগল হইনি। কিন্তু আমি সত্যি ও যুক্তিপুর্ণ কথা বলছি। (২৬)নিশ্চয়ই বাদশাহ এসব বিষয়ে জানেন এবং আমি তাঁর সংগে খোলা-খুলিভাবে কথা বলি। আর এ-কথা আমি নিশ্চয়ই জানি যে, এর কিছুই তাঁর চোখ এড়ায়নি, কারণ এসব তো গোপনে করা হয়নি।

(২৭)বাদশাহ আগ্রিপ্প, আপনি কি নবিদের কথা বিশ্বাস করেন? আমি জানি আপনি করেন।” (২৮)তখন আগ্রিপ্প হযরত পৌল রা.-কে বললেন, “তুমি কি এতো অল্পতেই আমাকে মসিহের অনুসারী করে ফেলতে চাও?” (২৯)হযরত পৌল রা. বললেন, “অল্প হোক বা বেশি হোক, আমি আল্লাহর কাছে এই মোনাজাত করি যে, কেবল আপনি নন কিন্তু যারা আজ আমার কথা শুনছেন, তারা সবাই যেনো আমার মতো হন-কেবল এই শেকল ছাড়া।”

(৩০)তখন বাদশাহ উঠে দাঁড়ালেন এবং তার সাথে-সাথে গভর্নর ফাস্তুস ও বার্নিকি এবং যারা তাদের সংগে বসেছিলেন, সবাই উঠে দাঁড়ালেন।

(৩১)তারপর তারা সেই ঘর ছেড়ে চলে যাবার সময় একে অন্যকে বলতে লাগলেন, “এই লোকটি মৃত্যুর শাস্তি পাবার বা জেলখাটার মতো কিছুই করেনি।” (৩২)আগ্রিপ্প ফাস্তুসকে বললেন, “এই লোকটি যদি সম্রাটের কাছে আপিল না-করতো, তাহলে তাকে ছেড়ে দেয়া যেতো।”

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১)যখন জাহাজে করে আমাদের ইতালিতে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো, তখন হযরত পৌল রা. এবং আরো কয়েকজন বন্দিকে জুলিয়াস নামে সম্রাটের এক লেফটেন্যান্টের হাতে তুলে দেয়া হলো। (২)আমরা আদ্রামুত্তিয়ামের একটি জাহাজে উঠে যাত্রা শুরু করলাম। এশিয়ার ভিন্ন-ভিন্ন বন্দরে যাবার জন্য জাহাজটি প্রস্তুত হয়েছিলো। মেসিডোনিয়ার থিসালোনিকি শহরের আরিস্টার্খ আমাদের সংগে ছিলেন।

(৩)পরদিন আমাদের জাহাজ সিডনে থামলো। জুলিয়াস পৌলের সংগে ভালো ব্যবহার করলেন এবং তাকে তার বন্ধুদের কাছে যাবার অনুমতি দিলেন, যেনো তার বন্ধুরা তার সেবা যত্ন করতে পারেন।

(৪)পরে সেখান থেকে জাহাজ ছেড়ে আমরা সাইপ্রাস দ্বীপের আড়াল দিয়ে গেলাম, কারণ বাতাস আমাদের উল্টো দিকে ছিলো। (৫)পরে আমরা কিলিকিয়া ও পামফুলিয়ার সাগর পার হয়ে লুকিয়ার মুরায় উপস্থিত হলাম।

(৬)লেফটেন্যান্ট সেখানে আলেকজান্দ্রিয়ার একটি জাহাজ পেলেন। সেটা ইতালিতে যাচ্ছিলো বলে তিনি আমাদের নিয়ে সেই জাহাজে তুলে দিলেন। (৭)আমাদের জাহাজটি কয়েকদিন ধরে আস্তে-আস্তে চলে খুব কষ্টে ক্লিদোন শহরের কাছাকাছি উপস্থিত হলো, কিন্তু বাতাস আমাদেরকে আর এগিয়ে যেতে দিলো না। তখন আমরা ক্রিট দ্বীপের যে-দিকে বাতাস ছিলো না, সেই দিক ধরে সলমোনির পাশ দিয়ে চললাম। (৮)সাগরের কিনার ধরে, কষ্ট করে চলে, আমরা সুন্দর পোতাশ্রয় বলে একটি জায়গায় এলাম। তার কাছেই ছিলো লাসেয়া শহর।

(৯)এভাবে অনেকদিন নষ্ট হয়ে গেলো এবং জাহাজ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠলো। তখন রোজা চলে গেছে, শীতকাল প্রায় এসে গেছে। (১০)এ-জন্য হযরত পৌল রা. পরামর্শ দিয়ে বললেন, “দেখুন, আমি দেখতে পাচ্ছি, আমাদের এই যাত্রা খুব বিপজ্জনক ও অনেক ক্ষতিকর হবে। সেই ক্ষতি যে কেবল জাহাজ আর মালপত্রের হবে তা নয়, আমাদের জীবনেরও ক্ষতি হবে।”

(১১)কিন্তু লেফটেন্যান্ট হযরত পৌলের রা.-র কথা না-শুনে জাহাজের কাপ্তান ও মালিকের কথা শুনলেন।

(১২)বন্দরটা শীতকাল কাটাবার উপযুক্ত ছিলো না বলে বেশির ভাগ লোক চাইলো যে, সেখান থেকে যাত্রা করে সম্ভব হলে ফৈনিকে গিয়ে শীতকাল কাটানো হবে। এটা ছিলো দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক খোলা, ক্রিট দ্বীপের সমুদ্র বন্দর।

(১৩)পরে যখন আস্তে-আস্তে দখিনা বাতাস বইতে লাগলো, তখন তারা মনে করলো যে, তাদের ইচ্ছাপূর্ণ হবে। তাই তারা নোঙর তুলে ক্রিট দ্বীপের কিনার ধরে চললো। (১৪)কিন্তু একটু পরেই সেই দ্বীপ থেকে উত্তর-কুনো বলে ভীষণ এক তুফান শুরু হলো আর জাহাজটি সেই তুফানে পড়লো। (১৫)বাতাসের মুখে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব হওয়ায় আমরা এগিয়ে যাবার চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে জাহাজটিকে বাতাসে ভেসে যেতে দিলাম।

(১৬)পরে কৌদা নামে একটি ছোট দ্বীপের যে-দিকে বাতাস ছিলো না, আমরা সেইদিক ধরে চললাম এবং জাহাজে যে ছোটো নৌকা থাকে, সেই নৌকাটি খুব কষ্ট করে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচালাম। (১৭)লোকেরা নৌকাটি জাহাজে টেনে তুললো এবং তারপর দড়ি দিয়ে জাহাজের খোলটা বাঁধলো, যেনো তক্তাগুলো খুলে আলাদা হয়ে না-পড়ে। সুর্তি নামের সাগরের চরে জাহাজ আটকে যাবার ভয়ে পালগুলো নামিয়ে ফেলে জাহাজটি বাতাসে চলতে দেয়া হলো।

(১৮)ঝড়ের ভীষণ আঘাতে আমাদের জাহাজটি এমনভাবে দুলতে লাগলো যে, পরদিন লোকেরা জাহাজের মালপত্র পানিতে ফেলে দিতে লাগলো। (১৯)তৃতীয়দিনে তারা নিজের হাতে জাহাজের সাজ-সরঞ্জামও ফেলে দিলো।

(২০)অনেকদিন ধরে সূর্য বা তারা কিছুই দেখা গেলো না এবং ভীষণ ঝড় বইতেই থাকলো। শেষে আমরা রক্ষা পাবার সব আশাই ছেড়ে দিলাম।

(২১)অনেকদিন ধরে তারা কিছু খায়নি বলে হযরত পৌল রা. তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “দেখুন, আমার কথা শোনার পরেও ক্রিটদ্বীপ থেকে জাহাজ ছাড়া আপনাদের উচিত ছিলো না। তাহলে এই বিপদ ও ক্ষতির হাত থেকে আপনারা রক্ষা পেতেন। (২২)এখন আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, আপনারা মনে সাহস রাখুন। কারণ আপনাদের জীবনের ক্ষতি হবে না কিন্তু এই জাহাজ নষ্ট হবে।

(২৩)আমি যাঁর লোক এবং যাঁর ইবাদত করি, সেই আল্লাহর এক ফেরেস্তা গত রাতে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘পৌল, ভয় করো না।

(২৪)তোমাকে সম্রাটের সামনে দাঁড়াতে হবে। এবং এই জাহাজে যারা তোমার সংগে যাচ্ছে, তাদের সকলের জীবন আল্লাহ্ নিরাপদ করেছেন।’

(২৫)তাই মনে সাহস রাখুন। কারণ আল্লাহর ওপর আমার বিশ্বাস আছে যে, তিনি আমাকে যা বলেছেন, ঠিক তা-ই হবে। (২৬)তবে আমরা কোনো একটি দ্বীপের ওপর গিয়ে পড়বো।”

(২৭)চৌদ্দ দিনের দিন মাঝরাতে আমরা আদ্রিয়া সাগরের ওপর দিয়ে যাচ্ছিলাম এবং নাবিকদের মনে হলো তারা ডাঙার কাছে এসেছে। (২৮)তারা পানির গভীরতা মেপে দেখলো যে, সেখানকার পানি আশি হাত গভীর। এর কিছুক্ষণ পরে তারা আবার মেপে দেখলো যে, সেখানে পানি ষাট হাত। (২৯)পাথরের সাথে ধাক্কা লাগার ভয়ে জাহাজের পেছন দিক থেকে তারা চারটা নোঙর ফেলে দিলো এবং দিনের আলোর জন্য মোনাজাত করতে লাগলো।

(৩০)পরে জাহাজের নাবিকরা পালিয়ে যাবার চেষ্টায় জাহাজের সামনের দিকে নোঙর ফেলার ভান করে নৌকাটি সাগরে নামিয়ে দিলো। (৩১)তখন হযরত পৌল রা. লেফটেন্যান্ট ও সৈন্যদের বললেন, “এই নাবিকরা জাহাজে না-থাকলে আপনারা রক্ষা পাবেন না।” (৩২)তখন সৈন্যরা নৌকার দড়ি কেটে দিলো, যাতে নৌকাটি পানিতে পড়ে যায়।

(৩৩)সকাল হওয়ার আগে হযরত পৌল রা. সকলকে কিছু খাওয়ার অনুরোধ করে বললেন, “আজ চৌদ্দ দিন হলো, কী হবে না হবে সেই চিন্তায় আপনারা না-খেয়ে আছেন।

(৩৪)এখন আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, কিছু খেয়ে নিন, তা আপনাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে। আপনাদের কারো মাথার একটি চুলও নষ্ট হবে না।” (৩৫)এ-কথা বলে তিনি রুটি নিয়ে, তাদের সকলের সামনে, আল্লাহকে শুকরিয়া জানালেন এবং তা ভেঙে খেতে লাগলেন। (৩৬)তখন তারা সবাই সাহস পেয়ে খেতে লাগলো। (৩৭,৩৮)আমরা জাহাজে মোট দুশো ছিয়াত্তরজন ছিলাম। সবাই পেটভরে খাওয়ার পর জাহাজের ভার কমাবার জন্য তার সমস্ত গম সাগরে ফেলে দিলো।

(৩৯)সকালে তারা জায়গাটা চিনতে পারলো না, কিন্তু একটি ছোট উইসাগরীয় সৈকত দেখতে পেলো। তখন তারা ঠিক করলো, সম্ভব হলে জাহাজটি সেই কিনারে তুলে দেবে। (৪০)তাই তারা জাহাজের নোঙরগুলো কেটে সাগরেই ফেলে দিলো এবং হালের বাঁধনের দড়িগুলো খুলে দিলো।

এরপর তারা বাতাসের মুখে সামনের পাল খাটিয়ে দিলো এবং জাহাজটি কিনারের দিকে এগিয়ে গিয়ে চরে আটকে গেলো।

(৪১)তাড়াতাড়ি ভেসে যাওয়াতে সামনের অংশটা নিচে আটকে গেলো। জাহাজটি অচল হয়ে গেলো আর ঢেউয়ের আঘাতে পেছনদিকটা টুকরো-টুকরো হয়ে ভেঙে যেতে লাগলো। (৪২)তখন সৈন্যরা বন্দিদের হত্যা করবে বলে ঠিক করলো, যেনো তাদের মধ্যে কেউ সাঁতরে পালিয়ে যেতে না-পারে। (৪৩)কিন্তু লেফটেন্যান্ট হযরত পৌল রা. প্রাণ বাঁচাতে চেয়েছিলেন বলে সৈন্যদের ইচ্ছামতো কাজ করতে দিলেন না। তিনি হুকুম দিলেন, যারা সাঁতার জানে, তারা প্রথমে জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়ে কিনারে গিয়ে উঠুক (৪৪)আর বাকি সবাই জাহাজের তক্তা বা অন্য কোনো টুকরো ধরে সেখানে যাক। এভাবেই সবাই নিরাপদে ডাঙায় পৌঁছলো।

রুকু PDF আকারে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

(১,২)আমরা নিরাপদে কিনারে পৌঁছে জানতে পারলাম যে, দ্বীপটার নাম মাল্টা। এর অধিবাসীরা আমাদের সংগে খুব দয়া দেখালো। তখন বৃষ্টি আরম্ভ হলো এবং খুব ঠান্ডা ছিলো বলে তারা আগুন জ্বেলে আমাদের সবাইকে ডাকলো। (৩)হযরত পৌল রা. এক বোঝা শুকনো কাঠ জড়ো করে আগুনে দেবার সময় আগুনের তাপে একটি বিষাক্ত সাপ সেই বোঝা থেকে বের হয়ে তার হাত পেঁচিয়ে ধরলো।

(৪)সাপটিকে তার হাতে ঝুলতে দেখে স্থানীয় লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো, “এই লোকটা নিশ্চয়ই খুনি। সাগরের হাত থেকে রক্ষা পেলেও ন্যায়বিচার তাকে বাঁচতে দিলো না।”

(৫)তিনি হাত ঝাড়া দিয়ে সাপটি আগুনে ফেলে দিলেন। তার কোনোই ক্ষতি হলো না। (৬)তারা ভাবছিলো যে, তার শরীর ফুলে উঠবে বা হঠাৎ তিনি মরে পড়ে যাবেন। কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও তার কিছু হলো না দেখে তারা মত বদলে বলতে লাগলো, “উনি দেবতা।”

(৭)সেখানে কাছেই দ্বীপের প্রধানের একটি জমিদারি ছিলো। জমিদারের নাম পুবলিয়াস। তিনি তার বাড়িতে আমাদের গ্রহণ করলেন এবং তিনদিন ধরে খুব আদরের সংগে আমাদের সেবাযত্ন করলেন।

(৮)সেই সময় পুবলিয়াসের পিতা জ্বর ও আমাশয় রোগে বিছানায় পড়ে ভুগছিলেন। হযরত পৌল রা. ভেতরে তার কাছে গিয়ে মোনাজাত করলেন এবং তার গায়ে হাত দিয়ে তাকে সুস্থ করলেন। (৯)এই ঘটনার পরে সেই দ্বীপের বাকি সমস্ত রোগী এসে সুস্থ হলো।

(১০)তারা নানাভাবেই আমাদের সম্মান দেখাতে লাগলো এবং পরে জাহাজ ছাড়ার সময় আমাদের দরকারি জিনিসপত্র জাহাজে বোঝাই করে দিলো। (১১)তিন মাস পরে আমরা একটি জাহাজে করে যাত্রা করলাম। জাহাজটি সেই দ্বীপেই শীতকাল কাটিয়ে ছিলো। সেটা ছিলো আলেকজান্দ্রিয়ার জাহাজ এবং তার মাথায় যমজ দেবের প্রতিমা খোদাই করা ছিলো।

(১২)আমরা সুরাকুসে জাহাজ বেঁধে তিনদিন রইলাম। (১৩)সেখান থেকে যাত্রা করে আমরা পুতয়লিতে পৌঁছলাম। (১৪)এখানে আমরা কয়েকজন ইমানদার ভাইয়ের দেখা পেলাম। তাদের সংগে সপ্তাহ খানেক কাটাবার জন্য তারা আমাদের অনুরোধ করলো। এভাবে আমরা রোমে পৌঁছলাম।

(১৫)সেখানকার ইমানদার ভাইয়েরা যখন আমাদের আসার খবর শুনলো, তখন পথে আমাদের সংগে দেখা করার জন্য তাদের কেউ-কেউ আপ্পিয় হাট থেকে, কেউ-কেউ একশো মাইল দূর থেকেও এলো। এদের দেখে হযরত পৌল রা. আল্লাহর শুকরিয়া জানালেন এবং তিনি নিজে উৎসাহিত হলেন। (১৬)আমরা রোমে পৌঁছার পর হযরত পৌল রা. আলাদা ঘরে থাকার অনুমতি পেলেন এবং একজন সৈন্য তাকে পাহারা দিতো।

(১৭)তিনদিন পর তিনি সেখানকার ইহুদি নেতাদের ডেকে তাদের সংগে মিলিত করলেন। তিনি তাদের বললেন, “আমার ভাইয়েরা, যদিও আমি আমাদের জাতির বিরুদ্ধে বা পূর্ব-পুরুষদের নিয়ম-নীতির বিরুদ্ধে কিছুই করিনি, তবুও জেরুসালেমে আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং রোমীয়দের হাতে দেয়া হয়েছে। (১৮)রোমীয়রা আমাকে জেরা করার পর ছেড়ে দিতে চেয়েছিলো, কারণ মৃত্যুর উপযুক্ত কোনো দোষ আমি করিনি।

(১৯)কিন্তু ইহুদিরা এতে বাঁধা দেয়ায় বাধ্য হয়ে আমি সম্রাটের কাছে আপিল করেছি। যদিও আমার নিজের লোকদের বিরুদ্ধে নালিস করার কিছু নেই। (২০)এ-জন্যই আমি আপনাদের সংগে দেখা করতে ও কথা বলতে চেয়েছি। কারণ এটা বনি-ইস্রায়েলের সেই আশা, যে-আশার জন্যই আমাকে এই শেকল পরানো হয়েছে।”

(২১)উত্তরে তারা বললেন, “আপনার সম্বন্ধে ইহুদিয়া থেকে আমরা কোনো চিঠি পাইনি। যে-ভাইয়েরা সেখান থেকে এসেছেন, তারাও কেউ আপনার সম্বন্ধে কোনো খারাপ কিছুই বলেননি। (২২)তবে আমরা আপনার মতামত শুনতে চাই। কারণ আমরা জানি, সব জায়গাতেই লোকেরা ‘সেই দলের’ বিরুদ্ধে কথা বলে।”

(২৩)হযরত পৌল রা.-র সংগে মিলিত হবার জন্য তারা একটি দিন ঠিক করলেন। হযরত পৌল রা. যেখানে থাকতেন, সেখানে তারা ছাড়া আরো অনেকে এলেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি আল্লাহর রাজ্যের বিষয়ে তাদের জানালেন ও বোঝালেন। হযরত মুসা আ. এর তওরাত ও নবিদের কিতাবের মধ্য থেকে হযরত ইসা আ. এর বিষয় দেখিয়ে তাঁর সম্বন্ধে তাদের বোঝাতে চেষ্টা করলেন।

(২৪)তিনি যা বলেছিলেন তাতে কেউ-কেউ ইমান আনলেন, আবার কেউ-কেউ ইমান আনতে অস্বীকার করলেন। (২৫)তাই তাদের মধ্যে মতের অমিল হলো। আর যখন তারা সেখান থেকে চলে যাচ্ছিলেন, তখন হযরত পৌল রা. আরেকটা মন্তব্য করলেন, “আল্লাহর রুহ্ নবি হযরত ইসাইয়া আ. এর মাধ্যমে আপনাদের পূর্ব-পুরুষদের কাছে সত্যি কথাই বলেছিলেন, (২৬)এই লোকদের কাছে যাও এবং বলো, ‘তোমরা শুনবে কিন্তু কোনো মতেই বুঝবে না; দেখবে কিন্তু কোনো মতেই জানবে না।

(২৭)কারণ এসব লোকের অন্তর অসাড় এবং কান বন্ধ হয়ে গেছে, আর তারা তাদের চোখও বন্ধ করে রেখেছে, যেনো তারা চোখ দিয়ে না-দেখে, কান দিয়ে না-শোনে এবং অন্তর দিয়ে না-বোঝে, আর ভালো হবার জন্য আমার কাছে ফিরে না-আসে।’ (২৮,২৯)এ-জন্য আপনারা জেনে রাখুন, আল্লাহর নাজাত অইহুদিদের কাছে পাঠানো হয়েছে, আর তারাই সেই কথা শুনবে।”

(৩০)পুরো দু’বছর ধরে হযরত পৌল রা. তার নিজের ভাড়া বাড়িতে ছিলেন এবং যারা তাঁর সংগে দেখা করতে আসতো, তিনি তাদের সবাইকে গ্রহণ করতেন। (৩১)তিনি সাহসের সংগে, বিনা বাধায়, আল্লাহর রাজ্যের বিষয়ে প্রচার করতেন এবং হযরত ইসা মসিহের বিষয়ে শিক্ষা দিতেন।

Facebook
WhatsApp
Telegram
Email