অডিও শুনতে এখানে ক্লিক করুন
১সেই সময় ইদুল-মাত্ছ কাছে এসে গিয়েছিলো। এটিকে ইদুল-ফেসাখও বলা হয়। ২প্রধান ইমামেরা ও আলিমরা তাঁকে হত্যা করার পথ খুঁজছিলেন, কারণ তারা লোকদের ভয় করতেন। ৩এই সময় ইহুদা, যাকে ইস্কারিয়োত বলা হতো, তার ভেতরে শয়তান ঢুকলো। তিনি ছিলেন সেই বারোজনের মধ্যে একজন। ৪তিনি গিয়ে প্রধান ইমামদের ও বায়তুল-মোকাদ্দসের পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে পরামর্শ করলেন কীভাবে তাঁকে তাদের হাতে তুলে দেবেন। ৫এতে তারা খুব খুশি হয়ে তাকে টাকা দিতে রাজি হলেন। ৬সুতরাং তিনি রাজি হলেন এবং উপযুক্ত সুযোগ খুঁজতে লাগলেন, যাতে লোকদের অনুপস্থিতিতে হযরত ইসা আ.কে ধরিয়ে দিতে পারেন।
৭অতঃপর এলো ইদুল-মাত্ছ, ওই দিন ইদুল-ফেসাখের ভেড়া কোরবানি করতে হতো। ৮সুতরাং তিনি হযরত পিতর রা. ও হযরত ইউহোন্না রা.কে বলে পাঠালেন, “তোমরা গিয়ে আমাদের জন্য ইদুল-ফেসাখের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করো, যেনো আমরা তা খেতে পারি।” ৯তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কোথায় আমাদের এই ভোজ প্রস্তুত করতে বলেন?” ১০তিনি তাদের বললেন, “শোনো, তোমরা যখন শহরে ঢুকবে, তখন এক লোককে এক কলস পানি নিয়ে যেতে দেখবে; তার পেছনে পেছনে গিয়ে সে যে-ঘরে ঢুকবে, তোমরা সেই ঘরেই ঢুকবে।
১১সেই ঘরের মালিককে বলবে, ‘হুজুর আপনার কাছে জানতে চাচ্ছেন, “সেই মেহমানখানাটি কোথায়, যেখানে আমি আমার হাওয়ারিদের সাথে ইদুল-ফেসাখের খাওয়া-দাওয়া করতে পারি?”’ ১২সে তোমাদের ওপর তলায় একটি সাজানো বড়ো ঘর দেখিয়ে দেবে; সেখানেই সবকিছু প্রস্তুত করো।”
১৩তারা গেলেন ও তিনি যেভাবে তাদের বলেছিলেন, সবকিছু সেরকমই দেখতে পেলেন এবং ইদুল-ফেসাখের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করলেন। ১৪যখন ঠিক সময় এলো, তখন তিনি তাঁর হাওয়ারিদের সাথে খেতে বসলেন। ১৫তিনি তাদের বললেন, “আমার কষ্ট ভোগের আগে আমি তোমাদের নিয়ে ইদুল-ফেসাখের এই খাবার খাওয়ার জন্য গভীরভাবে আগ্রহী ছিলাম। ১৬কারণ আমি তোমাদের বলছি, আমি আর এই খাবার খাবো না, যতোদিন-না আল্লাহর রাজ্যে এটি পূর্ণ হয়।” ১৭অতঃপর তিনি একটি গ্লাস নিলেন এবং শুকরিয়া জানিয়ে বললেন, “এটি নাও এবং তোমাদের মধ্যে এটি ভাগ করে নাও। ১৮কারণ আমি তোমাদের বলছি, এখন থেকে আল্লাহর রাজ্য না আসা পর্যন্ত আমি আর কখনো আঙুররস খাবো না।”
১৯তারপর তিনি রুটি নিয়ে শুকরিয়া জানিয়ে টুকরো টুকরো করে তাদের দিয়ে বললেন, “এ আমার শরীর, যা তোমাদের জন্য দেয়া হয়েছে। আমাকে স্মরণ করার জন্য এরকম করো। ২০একইভাবে খাওয়ার পর তিনি গ্লাসটি নিয়ে বললেন, “এই গ্লাস আমার রক্তে প্রতিষ্ঠিত নতুন ওয়াদা, যে-রক্ত তোমাদের জন্য বহানো হবে।
২১কিন্তু দেখো, যে আমাকে ধরিয়ে দেবে, তার হাত আমার সাথে এই টেবিলের ওপরেই রয়েছে। ২২আর ইবনুল-ইনসান তাঁর নির্ধারিত পথেই যাচ্ছেন কিন্তু দুর্ভাগা সেই লোক, যে তাঁকে তুলে দেবে!” ২৩তখন তারা একে অন্যকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন যে, তাদের মধ্যে কে সেই লোক হতে পারে, যে এমন কাজ করতে পারে?
২৪তাদের মধ্যে এই তর্কাতর্কিও শুরু হলো যে, তাদের মধ্যে কে অন্যদের থেকে বড়ো। ২৫কিন্তু তিনি তাদের বললেন, “অন্যান্য জাতির বাদশারা তাদের ওপর প্রভুত্ব করে আর তাদের শাসনকর্তাদের উপকারী নেতা বলে ডাকা হয় ২৬কিন্তু তোমাদের মধ্যে এরকম হওয়া উচিত নয়। বরং তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড়ো, সে সবচেয়ে ছোটোর মতোই হোক; আর যে নেতা, সে খাদেমের মতো হোক। ২৭কে বড়ো? যে খেতে বসে নাকি যে পরিবেশন করে? যে খেতে বসে সে নয় কি? কিন্তু আমি তোমাদের মধ্যে খাদেমের মতো হয়েছি।
২৮আমার সমস্ত বাধা-বিঘ্নের মধ্যে তোমরাই আমার সাথে রয়েছো। ২৯আমার প্রতিপালক যেমন আমাকে একটি রাজ্য দিয়েছেন, তেমনি আমিও তোমাদের দিচ্ছি, ৩০যেনো তোমরা আমার রাজ্যে আমার সাথে খাওয়া-দাওয়া করো এবং সিংহাসনে বসে ইস্রাইলের বারো বংশের বিচার করো।
৩১সাফওয়ান, সাফওয়ান, দেখো! শয়তান তোমাদের সবাইকে গমের মতো করে চালুনি দিয়ে চালার অনুমতি চেয়েছে। ৩২কিন্তু আমি তোমার জন্য মোনাজাত করেছি, যেনো তোমার নিজের ইমান নষ্ট না হয় এবং তুমি যখন ফিরে আসবে, তখন তোমার ভাইদের শক্তিশালী করে তোলো।” ৩৩কিন্তু তিনি তাঁকে বললেন, “মালিক, আমি আপনার সাথে জেলে যেতে এবং মরতেও প্রস্তুত আছি!” ৩৪হযরত ইসা আ. বললেন, “পিতর, আমি তোমাকে বলছি, “তুমি আমাকে চেনো না- একথা বলে তিনবার অস্বীকার করার আগে আজ মোরগ ডাকবে না।”
৩৫অতঃপর তিনি তাদের বললেন, “আমি যখন তোমাদের টাকার থলি, ঝুলি ও জুতা ছাড়া পাঠিয়েছিলাম, তখন কি তোমাদের কোনোকিছুর অভাব হয়েছিলো?” তারা বললেন, “না, একটি জিনিসেরও না।” ৩৬তিনি তাদের বললেন, “কিন্তু এখন যার টাকার থলি বা ঝুলি আছে, সে তা নিক। যার তরবারি নেই, সে তার চাদর বিক্রি করে একটি তরবারি কিনুক। ৩৭আমি তোমাদের বলছি, আল্লাহর এই কালাম আমার ওপর অবশ্যই পূর্ণ হবে, ‘তাঁকে গুনাহগারদের সাথে গোনা হলো।’ নিশ্চয়ই আমার বিষয়ে যা লেখা আছে তা পূর্ণ হচ্ছে।” ৩৮তারা বললেন, “হুজুর, দেখুন, এখানে দুটো তরবারি আছে।” তিনি জবাব দিলেন, “এ-ই যথেষ্ট।”
৩৯তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নিজের নিয়ম অনুসারে জৈতুন পাহাড়ে গেলেন আর হাওয়ারিরা তাঁর পেছনে পেছনে গেলেন। ৪০জায়গামতো পৌঁছে তিনি তাদের বললেন, “মোনাজাত করো, যেনো পরীক্ষায় না পড়ো।”
৪১তারপর তিনি তাদের কাছ থেকে কিছু দূরে গিয়ে হাঁটু পেতে এই বলে মোনাজাত করতে লাগলেন, ৪২“হে প্রতিপালক, যদি তোমার ইচ্ছা হয়, তাহলে এই গ্লাস আমার কাছ থেকে সরিয়ে নাও। তবুও আমার ইচ্ছামতো নয় কিন্তু তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।”
৪৩তখন বেহেস্ত থেকে একজন ফেরেস্তা এসে তাঁকে শক্তি যোগালেন। ৪৪মনের কষ্টে তিনি আরো আকুলভাবে মোনাজাত করলেন। তাঁর গায়ের ঘাম রক্তের ফোটার মতো হয়ে মাটিতে পড়তে লাগলো।
৪৫মোনাজাত থেকে উঠে তিনি তাঁর হাওয়ারিদের কাছে এলেন এবং দেখলেন, দুঃখে ক্লান্ত হয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। ৪৬তিনি তাদের বললেন, “কেনো তোমরা ঘুমাচ্ছো? ওঠো, মোনাজাত করো, যেনো পরীক্ষায় না পড়ো।”
৪৭তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখনই হঠাৎ অনেক লোক সেখানে এলো এবং বারোজনের একজন- ইহুদা- তাদের নিয়ে এলেন। তিনি চুমু দেবার জন্য হযরত ইসা আ.র দিকে এগিয়ে গেলেন। ৪৮কিন্তু হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “ইহুদা, চুমু দিয়ে কি ইবনুল-ইনসানকে ধরিয়ে দিচ্ছো?” ৪৯যারা তাঁর চারপাশে ছিলেন, তারা বুঝলেন কী হতে যাচ্ছে। তারা জিজ্ঞেস করলেন, “মালিক, আমরা কি তরবারি দিয়ে আঘাত করবো?” ৫০তাদের মধ্যে একজন তরবারির আঘাতে মহাইমামের গোলামের ডান কানটি কেটে ফেললেন। ৫১কিন্তু হযরত ইসা আ. বললেন, “এবার থামো, আর নয়!” আর তিনি তার কান ছুঁয়ে তাকে সুস্থ করলেন।
৫২অতঃপর যেসব প্রধান ইমাম, বায়তুল-মোকাদ্দসের পুুলিশ অফিসার এবং বুজুর্গরা তাঁকে ধরতে এসেছিলেন, তাদের তিনি বললেন, “আমি কি ডাকাত যে, তোমরা তরবারি ও লাঠি নিয়ে এসেছো? ৫৩আমি যখন বায়তুল-মোকাদ্দসে দিনের পর দিন তোমাদের সাথে ছিলাম, তখন তোমরা আমাকে ধরোনি; কিন্তু এখন সময় তোমাদের ও অন্ধকারের ক্ষমতার।”
৫৪তখন তারা তাঁকে ধরে মহাইমামের বাড়ির উঠানে নিয়ে গেলেন। হযরত পিতর রা. দূরে দূরে থেকে তাদের পেছনে পেছনে যাচ্ছিলেন। ৫৫যখন তারা উঠানের মাঝখানে আগুন জ্বেলে বসলেন, তখন হযরত পিতর রা. এসে তাদের মধ্যে বসলেন। ৫৬তখন এক চাকরানী আগুনের আলোতে হযরত পিতর রা.কে দেখতে পেলো এবং ভালো করে তাকিয়ে দেখে বললো, “এই লোকটিও তার সাথে ছিলো।” ৫৭কিন্তু তিনি অস্বীকার করে বললেন, “হে মহিলা, আমি তাঁকে চিনি না।” ৫৮কিছুক্ষণ পর আরেকজন তাকে দেখে বললো, “তুমিও তো ওদেরই একজন।”
কিন্তু হযরত পিতর রা. বললেন, “না, আমি নই।” ৫৯প্রায় এক ঘন্টা পরে আরেকজন জোর দিয়ে বললো, “এই লোকটি নিশ্চয়ই তার সাথে ছিলো, কারণ সেও তো একজন গালিলীয়।” ৬০কিন্তু হযরত পিতর রা. বললেন, “দেখো, তুমি কী বলছো, আমি বুঝতে পারছি না।” ঠিক সেই সময় হযরত পিতর রা.র কথা শেষ না হতেই একটি মোরগ ডেকে উঠলো। ৬১তখন হযরত ইসা আ. মুখ ফিরিয়ে পিতরের দিকে তাকালেন। এতে তাঁর বলা এই কথাটি হযরত পিতরের মনে পড়লো, “আজ মোরগ ডাকার আগে তুমি তিনবার আমাকে অস্বীকার করবে।” ৬২তখন তিনি বাইরে গিয়ে ভীষণভাবে কাঁদতে লাগলেন।
৬৩যারা হযরত ইসা আ.কে পাহারা দিচ্ছিলো, তারা তাঁকে ঠাট্টা করতে ও মারতে লাগলো। ৬৪তারা হযরত ইসা আ.র চোখ বেঁধে দিয়ে বলতে থাকলো, “নবি হলে বল্ তো দেখি, কে তোকে মারলো?” ৬৫এভাবে তারা আরো অনেক কথা বলে তাঁকে অপমান করতে থাকলো।
৬৬সকালে লোকদের বুজুর্গরা, প্রধান ইমামেরা এবং আলিমরা একসাথে জমায়েত হলেন এবং তারা তাদের মহাসভার সামনে তাঁকে আনলেন। ৬৭তারা বললেন, “তুমি যদি মসিহ হও, তাহলে আমাদের বলো।” তিনি উত্তর দিলেন, “আমি যদি বলি, তবুও তোমরা বিশ্বাস করবে না, ৬৮এবং আমি কিছু জিজ্ঞেস করলে তোমরা জবাব দেবে না। ৬৯কিন্তু এখন থেকে ইবনুল-ইনসান সর্বশক্তিমান আল্লাহর ডান পাশে বসে থাকবেন।”
৭০তারা সকলে জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে তুমি কি আল্লাহর একান্ত প্রিয় মনোনীতজন?” তিনি তাদের বললেন, “তোমরা ঠিকই বলছো, আমিই তিনি।” ৭১তখন তারা বললেন, “আমাদের আর সাক্ষ্যের কী দরকার? আমরা নিজেরাই তো ওর মুখ থেকে শুনলাম।”
Facebook
WhatsApp
Telegram
Email
























