অডিও শুনতে এখানে ক্লিক করুন
১অতঃপর তিনি সেই বারোজনকে একত্রে ডাকলেন এবং তাদেরকে সমস্ত ভূতের ওপরে ক্ষমতা ও অধিকার এবং রোগ ভালো করার ক্ষমতাও দিলেন। ২তিনি তাদের আল্লাহর রাজ্যের বিষয়ে প্রচার করতে ও রোগীদের সুস্থ করতে পাঠিয়ে দিলেন। ৩তিনি তাদের বললেন, “তোমরা পথের জন্য লাঠি, থলি, রুটি বা টাকা, কিছুই নিয়ো না। এমনকি অতিরিক্ত জামাও না। ৪যে-বাড়িতে তোমরা ঢুকবে, শেষ পর্যন্ত সেখানেই থেকো এবং সেখান থেকেই বিদায় নিয়ো।
৫যদি লোকে তোমাদের গ্রহণ না করে, তাহলে তাদের শহর ছেড়ে যাবার সময় তোমাদের পায়ের ধুলো ঝেড়ে ফেলো, যেনো সেটিই তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হয়। ৬তারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে আল্লাহর রাজ্যের সুখবর প্রচার করতে এবং রোগ ভালো করতে লাগলেন।
৭যা-কিছু ঘটছে, শাসনকর্তা হেরোদ তা শুনছিলেন কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কারণ কেউ কেউ বলছিলো, হযরত ইয়াহিয়া আ. মৃত্যু থেকে বেঁচে উঠেছেন। ৮কেউ কেউ বলছিলো, হযরত ইলিয়াস আ. দেখা দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলছিলো, অনেকদিন আগেকার একজন নবি বেঁচে উঠেছেন। ৯হেরোদ বললেন, “আমি তো হযরত ইয়াহিয়া আ.র মাথা কেটে ফেলেছি; তাহলে যাঁর বিষয়ে আমি এসব শুনছি, তিনি কে?” তিনি তাঁকে দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন।
১০হাওয়ারিরা ফিরে এলেন এবং তারা যা যা করেছেন, তার সবকিছু হযরত ইসা আ.কে জানালেন। তিনি তাদের নিয়ে গোপনে বেতসাইদা নামক শহরে গেলেন। ১১এ-খবর জানতে পেরে অনেক লোক তাঁর পেছনে পেছনে চললো। তিনি তাদের গ্রহণ করলেন। তাদের কাছে আল্লাহর রাজ্যের বিষয়ে কথা বললেন এবং যাদের সুস্থ হওয়ার দরকার ছিলো, তাদের সুস্থ করলেন।
১২বেলা যখন শেষ হয়ে এলো, তখন সেই বারোজন তাঁর কাছে এসে বললেন, “এই লোকদের বিদায় দিন, যেনো তারা আশেপাশের শহর ও গ্রামগুলোতে গিয়ে খাবার এবং থাকার জায়গা খুঁজে নিতে পারে; কারণ আমরা একটি নির্জন জায়গায় রয়েছি। ১৩কিন্তু তিনি তাদের বললেন, “তোমরাই ওদের কিছু খেতে দাও।” তারা বললেন, “আমাদের কাছে পাঁচটি রুটি ও দুটো মাছ ছাড়া আর কিছুই নেই। এই সব লোককে খাওয়াতে হলে আমাদের খাবার কিনতে হবে।” ১৪সেখানে কমবেশি পাঁচ হাজার পুরুষ ছিলো এবং তিনি তাঁর হাওয়ারিদের বললেন, “পঞ্চাশজন পঞ্চাশজন করে এক এক দলে লোকদের বসিয়ে দাও।” ১৫তারা সেভাবেই সবাইকে বসিয়ে দিলেন। ১৬ ওই পাঁচটি রুটি ও দুটো মাছ নিয়ে তিনি আসমানের দিকে তাকালেন এবং শুকরিয়া জানিয়ে সেগুলো টুকরা টুকরা করে লোকদের দেবার জন্য হাওয়ারিদের হাতে দিলেন। ১৭সবাই পেট ভরে খেলো। পরে যে-টুকরাগুলো অবশিষ্ট রইলো তা দিয়ে বারোটি ঝুড়ি ভর্তি করা হলো।
১৮একবার হযরত ইসা আ. একটি নির্জন জায়গায় মোনাজাত করছিলেন। তাঁর সাথে কেবল তাঁর হাওয়ারিরাই ছিলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কে, এ-বিষয়ে লোকে কী বলে?” ১৯তারা বললেন, “কেউ কেউ বলে, আপনি হযরত ইয়াহিয়া আ.; কেউ কেউ বলে, হযরত ইলিয়াস আ.; আবার কেউ কেউ বলে, অনেকদিন আগেকার একজন নবি বেঁচে উঠেছেন।” ২০তিনি তাদের বললেন, “কিন্তু তোমরা কী বলো, আমি কে?” হযরত পিতর রা. উত্তর দিলেন, “আল্লাহর মসিহ।” ২১তিনি তাদের সাবধান করলেন এবং হুকুম দিলেন, যেনো তারা কাউকে একথা না বলেন। ২২বললেন, “ইবনুল-ইনসানকে অনেক দুঃখভোগ করতে হবে। বুজুর্গরা, প্রধান ইমামেরা ও আলিমরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবে। তাঁকে হত্যা করা হবে এবং তৃতীয় দিনে তাঁকে জীবিত হয়ে উঠতে হবে।”
২৩অতঃপর তিনি সবাইকে বললেন, “যদি কেউ আমার অনুসারী হতে চায়, তাহলে সে নিজেকে অস্বীকার করুক। এবং প্রত্যেক দিন নিজের সলিব বয়ে নিয়ে আমার পেছনে আসুক। ২৪কারণ যারা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে চায়, তারা তা হারাবে কিন্তু যারা আমার জন্য তাদের প্রাণ হারায়, তারা তা রক্ষা করবে। ২৫যদি তারা সমস্ত দুনিয়া লাভ করেও নিজেদের প্রাণ হারায়, তাহলে তাতে তাদের কী লাভ? ২৬যারা আমাকে ও আমার কালাম নিয়ে লজ্জাবোধ করে, ইবনুল-ইনসান যখন নিজের ও প্রতিপালকের মহিমায় এবং তাঁর পবিত্র ফেরেস্তাদের মহিমায় আসবেন, তখন তিনিও তাদের সম্বন্ধে লজ্জাবোধ করবেন। ২৭কিন্তু আমি তোমাদের সত্যিই বলছি, এখানে এমন কয়েকজন আছে, যারা আল্লাহর রাজ্য না দেখা পর্যন্ত মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে না।”
২৮এসব কথা বলার প্রায় আট দিন পর মোনাজাত করার জন্য হযরত ইসা আ. হযরত পিতর রা., হযরত ইউহোন্না রা. ও হযরত ইয়াকুব রা.কে নিয়ে পাহাড়ের ওপরে গেলেন। ২৯মোনাজাতের সময় তাঁর মুখের চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেলো এবং তাঁর জামা-কাপড় চোখ ঝলসানো সাদা হয়ে গেলো। ৩০হঠাৎ তারা হযরত মুসা আ. ও হযরত ইলিয়াস আ.কে তাঁর সাথে কথা বলতে দেখলেন। ৩১তারা মহিমার সাথে এলেন এবং তাঁর চলে যাওয়ার বিষয়ে কথাবার্তা বলছিলেন, যা তিনি জেরুসালেমে পূর্ণ করতে যাচ্ছেন।
৩২হযরত পিতর ও তার সঙ্গীরা তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। তারা জেগে উঠে তাঁর মহিমা দেখতে পেলেন এবং তাঁর সাথে দাঁড়ানো দু’জন লোককেও দেখলেন। ৩৩সেই দু’জন যখন তাঁর কাছ থেকে চলে যাচ্ছিলেন, তখন হযরত পিতর রা. হযরত ইসা আ.কে বললেন, “হুজুর, আমাদের জন্য ভালোই হয়েছে যে, আমরা এখানে আছি। আসুন, আমরা এখানে তিনটে কুঁড়েঘর তৈরি করি- একটি আপনার, একটি হযরত মুসা আ.র ও একটি হযরত ইলিয়াস আ.র জন্য।” তিনি যে কী বলছিলেন তা তিনি নিজেই বুঝলেন না। ৩৪তিনি যখন একথা বলছিলেন, তখন একখন্ড মেঘ এসে তাঁদের ঢেকে ফেললো এবং যখন তাঁরা মেঘের মধ্যে ঢুকলেন, তখন তারা ভয় পেলেন। ৩৫অতঃপর সেই মেঘ থেকে একটি কণ্ঠস্বর বললেন, “এ-ই আমার একান্ত প্রিয়জন, যাকে আমি মনোনীত করেছি; তার কথা শোনো!” ৩৬কণ্ঠস্বর থেমে গেলে দেখা গেলো, হযরত ইসা আ. একাই রয়েছেন। তারা যা দেখেছিলেন, সে-বিষয়ে ওই দিনগুলোতে কাউকে কিছু না বলে তারা নীরব রইলেন।
৩৭পরদিন তারা পাহাড় থেকে নেমে এলে অনেক লোক তাঁর সাথে দেখা করতে এলো। ৩৮তখন ভিড়ের মধ্য থেকে এক লোক চিৎকার করে বললো, “হুজুর, দয়া করে আমার ছেলেটিকে দেখুন। সে আমার একমাত্র সন্তান। ৩৯একটি ভূত তাকে প্রায়ই ধরে এবং সে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে। সেই ভূত যখন তাকে মুচড়ে ধরে, তখন তার মুখ থেকে ফেনা বের হয়। তারপর সে তাকে খুব কষ্ট দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে ছেড়ে দেয়। ৪০আমি আপনার হাওয়ারিদের কাছে কাকুতি-মিনতি করেছিলাম, যেনো এটিকে ছাড়িয়ে দেন কিন্তু তারা পারলেন না।” ৪১হযরত ইসা আ. বললেন, “অবিশ্বাসী ও দুষ্ট লোকেরা! আর কতোদিন আমি তোমাদের সাথে থাকবো এবং তোমাদের সহ্য করবো? তোমার ছেলেকে এখানে আনো।” ৪২তাকে যখন আনা হচ্ছিলো, তখন সেই ভূত তাকে আছাড় মেরে মুচড়ে ধরলো। কিন্তু হযরত ইসা আ. সেই ভূতকে ধমক দিলেন এবং ছেলেটিকে সুস্থ করে তার বাবার কাছে ফিরিয়ে দিলেন।
৪৩আল্লাহর মহত্ত্ব দেখে এবং তিনি যা-কিছু করেছেন তা দেখে সবাই যখন আশ্চর্য হলো, তখন তিনি তাঁর হাওয়ারিদেরকে বললেন,
৪৪“আমার একথা মন দিয়ে শোনো- ইবনুল-ইনসানকে মানুষের হাতে তুলে দেয়া হবে।” ৪৫কিন্তু তারা সেকথা বুঝলেন না। তাদের কাছ থেকে তা গোপন রাখা হয়েছিলো, যেনো তারা বুঝতে না পারেন। এবং এ-বিষয়ে তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করতেও তাদের ভয় হলো।
৪৬হাওয়রিদের মধ্যে কে বড়ো, এ-বিষয়ে তাদের মধ্যে তর্ক হচ্ছিলো। ৪৭কিন্তু হযরত ইসা আ. তাদের মনের চিন্তা বুঝতে পেরে একটি শিশুকে নিয়ে নিজের পাশে দাঁড় করালেন ৪৮এবং তাদের বললেন, “যে কেউ আমার নামে এই শিশুকে গ্রহণ করে, সে আমাকেই গ্রহণ করে এবং যে আমাকে গ্রহণ করে, যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, সে তাঁকেই গ্রহণ করে; কেননা তোমাদের সকলের মধ্যে যে সবচেয়ে ছোটো, সে-ই বড়ো।”
৪৯হযরত ইউহোন্না রা. বললেন, “হুজুর, আপনার নামে আমরা একজনকে ভূত ছাড়াতে দেখেছি। সে আমাদের দলের লোক নয় বলে আমরা তাকে নিষেধ করেছি।” ৫০কিন্তু হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “তাকে নিষেধ কোরো না, কারণ যে তোমাদের বিপক্ষে নয়, সে তো তোমাদের পক্ষেই।”
৫১তাঁকে যখন ওপরে তুলে নেবার সময় এগিয়ে আসছিলো, তখন তিনি জেরুসালেমে যাবার জন্য মনস্থির করলেন। ৫২তিনি তাঁর আগে সংবাদ-বাহকদেরও পাঠিয়ে দিলেন। যাবার পথে তারা তাঁর জন্য সবকিছুর ব্যবস্থা করতে সামেরীয়দের একটি গ্রামে ঢুকলেন। ৫৩কিন্তু তিনি জেরুসালেমে যাচ্ছেন বলে তারা তাঁকে গ্রহণ করলো না। ৫৪এই অবস্থা দেখে তাঁর হাওয়ারি হযরত ইয়াকুব রা. ও হযরত ইউহোন্না রা. বললেন, “হুজুর, আপনি কি চান যে, আমরা এদের ধ্বংস করার জন্য আকাশ থেকে আগুন নামিয়ে আনি?” ৫৫কিন্তু তিনি তাদের দিকে ফিরে তাদেরকে ধমক দিলেন। ৫৬অতঃপর তারা অন্য গ্রামে গেলেন।
৫৭তারা পথে যাচ্ছেন, এমন সময় কেউ একজন তাঁকে বললো, “আপনি যেখানে যাবেন, আমিও আপনার সাথে সেখানে যাবো।” ৫৮হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “শিয়ালের গর্ত আছে এবং পাখির বাসা আছে কিন্তু ইবনুল-ইনসানের মাথা রাখার জায়গা নেই।” ৫৯অন্য আরেকজনকে তিনি বললেন, “আমাকে অনুসরণ করো।” কিন্তু সে বললো, “হুজুর, আগে আমার বাবাকে দাফন করে আসতে দিন।”
৬০হযরত ইসা আ.তাকে বললেন, “মৃতেরাই তাদের মৃতদের দাফন করুক কিন্তু তুমি এসে আল্লাহর রাজ্যের কথা ঘোষণা করো।” ৬১আরেকজন বললো, “হুজুর, আমি আপনার সাথে যাবো কিন্তু আগে আমাকে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে আসতে দিন।” ৬২হযরত ইসা আ. তাকে বললেন, “লাঙলে হাত দিয়ে যে পেছন দিকে তাকিয়ে থাকে, সে আল্লাহর রাজ্যের উপযুক্ত নয়।”
Facebook
WhatsApp
Telegram
Email
























